Iran War Palantir

অবাধ্য ইরানকে ‘শিক্ষা’ দিতে বড় কিছু করার ছক? সিআইএ-র হয়ে চরবৃত্তি করা মার্কিন এআই সংস্থার অদ্ভুত সিদ্ধান্তে উঠছে প্রশ্ন

ইরান সংঘাতের মধ্যেই ২০ লক্ষ স্টক বিক্রি করলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক এআই সংস্থা ‘প্যালান্টিয়ার টেকনোলজিস’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা পিটার থিয়েল। পেন্টাগনের অন্দরমহলে অবাধ যাতায়াত তাঁর। তেহরানে বড় কিছু হওয়ার আভাস পেয়েছেন তিনি? উঠছে প্রশ্ন।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৫৬
Share:
০১ ১৮

পশ্চিম এশিয়ার ফের যুদ্ধের বিউগল! হরমুজ় প্রণালীর অবরোধকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চড়ছে পারদ। এই আবহে খবরের শিরোনামে এসেছে আমেরিকার একটি প্রযুক্তি সংস্থা, নাম ‘প্যালান্টির টেকনোলজিস’। ওয়াশিংটনের যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে তাদের। সংঘাত পরিস্থিতিতে হঠাৎ করেই বিপুল স্টক বিক্রি করতে শুরু করেছে তারা। বিষয়টি দেখে চক্রান্তের গন্ধ পাচ্ছেন সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ।

০২ ১৮

যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি সংস্থা ‘প্যালান্টির টেকনোলজিস’কে একটি কৃত্রিম মেধা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বলা যেতে পারে। মূলত, তথ্য বিশ্লেষণ বা ডেটা অ্যানালিসিসের কাজ করে তারা। বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির প্রতি প্রবল ‘আনুগত্য’ রয়েছে তাদের। শুধু তা-ই নয়, সংস্থার সহ-প্রতিষ্ঠাতা পিটার থিয়েল আমেরিকার এই রাজনৈতিক দলটিকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের চাঁদা দিয়ে থাকেন।

Advertisement
০৩ ১৮

গত বছরের (২০২৫ সাল) জানুয়ারিতে ট্রাম্প শপথ নেওয়ার পর খুলে যায় ‘প্যালান্টির’-এর ভাগ্য। যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় গণমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইম্‌সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরবর্তী মাসগুলিতে পেন্টাগনের অন্দরমহলে ‘অবাধ যাতায়াত’ চালিয়ে গিয়েছেন থিয়েল। ফলে সহজেই একাধিক সামরিক এআই প্রযুক্তি সরবরাহের বরাত হস্তগত হয়েছে তাঁর। সব মিলিয়ে মাত্র এক বছরে সংশ্লিষ্ট সংস্থাটির রাজস্ব বাবদ ১২০ কোটি ডলার আয় হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

০৪ ১৮

কিন্তু, ২০২৬ সালের এপ্রিল আসতে আসতে ‘প্যালান্টির’-এ যেন দেখা যাচ্ছে উলটপুরাণ। নিউ ইয়র্ক টাইম্‌স জানিয়েছে, সম্প্রতি হঠাৎ করেই নিজের সংস্থার ২০ লক্ষ স্টক বিক্রি করেছেন থিয়েল। তাঁর এই পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ার বাজারে পড়ে যায় হইচই। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাহিনীকে সামরিক এআই প্রযুক্তি সরবরাহকারী সংস্থার সূচক ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার কথা। পাশাপাশি, অতিরিক্ত বরাত পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে তাদের। তা হলে বিপুল স্টক কেন ছেড়ে দিলেন সহ-প্রতিষ্ঠাতা?

০৫ ১৮

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সামরিক এআই প্রযুক্তি নির্মাণকারী সংস্থা ‘প্যালান্টির’-এর বিরুদ্ধে গণহত্যায় সমর্থন-সহ একাধিক বদনাম রয়েছে। গোড়ার দিকে স্টার্টআপ সংস্থা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে তারা। কিন্তু অচিরেই মার্কিন গুপ্তচরবাহিনী ‘সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি’র (সিআইএ) চোখে পড়ে যায় থিয়েলের কোম্পানি। তার পর অবশ্য তাদের আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সরকারি অর্থানুকূল্যে বিভিন্ন ধরনের তথ্য বিশ্লেষণের কাজ অবাধে চালিয়ে গিয়েছে ‘প্যালান্টির’।

০৬ ১৮

থিয়েল প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটির কাজ করার পদ্ধতিটি কিন্তু খুবই অদ্ভুত। যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নীতিকে খোলাখুলি ভাবে সমর্থন করে ‘প্যালান্টির’। এর জন্য ছলে-বলে-কৌশলে শত্রু দেশগুলির থেকে বিভিন্ন ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে তারা। সেই লক্ষ্যে ‘আড়িপাতা’ সফ্‌টঅয়্যার ঢালাও ব্যবহারের ভূরি ভূরি অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের কর্পোরেট সংস্থা থেকে শুরু করে ওষুধের দোকান বা কোনও হোটেল-রেস্তরাঁ-শপিং মলেও সিঁদ কাটতে পারে তারা।

০৭ ১৮

দ্বিতীয় দফায় এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সংগৃহীত ওই বিশাল তথ্যভান্ডারের থেকে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলি খুঁজে নেয় ‘প্যালান্টির’। এর মধ্যে সন্ত্রাসবাদীদের গুপ্তঘাঁটিতে যোগাযোগ রক্ষাকারী ব্যক্তি থেকে ভুয়ো ভিসায় থাকা সন্দেহভাজনের চিহ্নিতকরণ উল্লেখযোগ্য। সব শেষে এই ধরনের ‘সংবেদনশীল’ তথ্য সিআইএ-র হাতে তুলে দেয় থিয়েলের সংস্থা। এর উপর ভিত্তি করে চালানো অধিকাংশ সামরিক অভিযানে মেগা সাফল্য পেয়েছেন পেন্টাগনের দুঁদে কমান্ডারেরা।

০৮ ১৮

সূত্রের খবর, সিআইএ-র জন্য কাজ করা ‘প্যালান্টির’-এর তথ্য সংগ্রহে কোনও বাছবিচার নেই। শুল্ক-অভিবাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দফতর, হাসপাতাল, সন্দেহভাজনদের ব্যাঙ্কের তথ্য, ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের নম্বর এমনকি ড্রাইভিং লাইসেন্সের মতো খুঁটিনাটি তথ্যও জোগাড় করে তারা। পাশাপাশি, ফোনে আড়িপাতা, ইমেল এবং সিসিটিভি হ্যাকিংয়েও তাদের মুনশিয়ানা রয়েছে। আমেরিকাকে বাদ দিলে ইজ়রায়েলি সেনাবাহিনীকেও নানা ভাবে সাহায্য করেছে থিয়েল প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা।

০৯ ১৮

যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলি জানিয়েছে, ২০১৪ সালে ‘প্যালান্টির’-এর তৈরি একটি সফ্‌টঅয়্যারের ব্যবহার শুরু করে ইহুদি ফৌজ। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের সন্ত্রাসী হামলার পর প্যালেস্টাইনপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে তেল আভিভ। এই লড়াইয়ে ইজ়রায়েলি ডিফেন্স ফোর্স এবং বিমানবাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠে প্যালেস্টাইনের গাজ়ায় গণহত্যার অভিযোগ। এর দায় থিয়েলের সংস্থার তৈরি ওই সফ্‌টঅয়্যারের ঘাড়েই চাপিয়েছেন সাবেক সেনাকর্তাদের বড় অংশ।

১০ ১৮

পরবর্তী কালে এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে মুখ খোলেন ‘প্যালান্টির’-এর চিফ এক্‌জ়িকিউটিভ অফিসার অ্যালেক্স কার্প। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা সম্ভাব্য সমস্ত উপায়ে ইহুদিদের সমর্থন করতে পেরে খুশি।’’ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি বলেন, ‘‘প্রতিটা লড়াইয়েই আমাদের সফ্‌টঅয়্যার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে। এটা খুব বড় ব্যাপার।’’ প্যালান্টিয়ারের এক্‌জ়িকিউটিভ পদে থাকা শ্যাম শঙ্কর আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, ‘‘পেন্টাগনের জন্য এই প্রজন্মের ম্যানহাটন প্রজেক্ট হয়ে উঠেছে প্যালান্টির।’’

১১ ১৮

২০২৪-এর প্রেসিডেন্ট ভোটে দ্বিতীয় বারের জন্য ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর হু-হু করে বাড়তে থাকে থিয়েলের সংস্থাটির স্টকের দর। বর্তমানে তাঁর কিচেন ক্যাবিনেটের সদস্যপদ পেয়েছেন ‘প্যালান্টির’-এর ১৭ জন পদস্থ কর্তা। সেই তালিকায় নাম আছে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সেরও। নিজের কার্যালয় তথা বাসভবন হোয়াইট হাউসে একটি সুদৃশ্য বলরুম তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ‘পোটাস’ (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস)। এর জন্যও বিপুল অনুদান দিয়েছে এই সামরিক এআই সংস্থা।

১২ ১৮

এ-হেন ‘প্যালান্টির’-এর ২০ লক্ষ স্টক বিক্রির সিদ্ধান্তের নেপথ্যে একাধিক কারণ খুঁজে পেয়েছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। তাঁদের অনুমান, ইরানকে নিয়ে বড় কোনও সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে পেন্টাগন। আগাম আঁচ পেয়েই নিজের হাতে থাকা শেয়ার বাজারে ছেড়ে মুনাফা ঘরে তুলেছেন থিয়েল। তেহরানকে শিক্ষা দিতে এ বার হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধের পথে হেঁটেছেন ট্রাম্প। এর জেরে পশ্চিম এশিয়ার লড়াই আরও জটিল হতে চলেছে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

১৩ ১৮

যদিও সম্পূর্ণ অন্য যুক্তি দিয়েছেন মাইকেল ব্যুরি। তাঁকে ওয়াল স্ট্রিটের নামীদামি লগ্নিকারীদের একজন বললে অত্যুক্তি হবে না। ব্যুরির দাবি, ‘‘আমেরিকার বাজারে কৃত্রিম মেধাভিত্তিক সংস্থাগুলির স্টক একটা বুদ্‌বুদ তৈরি করে ফেলেছে। যে কোনও মুহূর্তে ফাটতে পারে সেটা। তখন হুড়হুড়িয়ে পড়বে শেয়ারের দাম। তবে এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্যালান্টিরের মতো সংস্থাগুলির সূচক ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা রয়েছে।’’

১৪ ১৮

‘প্যালান্টির’কে বাদ দিলে বহুজাতিক মার্কিন চিপ নির্মাণকারী সংস্থা ‘এনভিডিয়া’র ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কিছু দিন আগে রেকর্ড উচ্চতায় ওঠে তাদের স্টকের দাম। কিন্তু, তার পরই ঢালাও শেয়ার বিক্রি শুরু করেন কোম্পানির কর্তারা। লগ্নিকারী ব্যাঙ্কগুলিকেও তাদের স্টক ছেড়ে দিতে দেখা গিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ওয়াল স্ট্রিটের একাধিক ব্রোকারেজ ফার্ম।

১৫ ১৮

সূত্রের খবর, ‘এনভিডিয়া’র শেয়ার বিক্রি করে ইতিমধ্যেই ৫৮০ কোটি ডলার বাজার থেকে তুলে নিয়েছে সফ্‌টব্যাঙ্ক। সংস্থাটির অ্যাঙ্কার লগ্নিকারীদের অন্যতম মাইক্রো এলএলসি ছেড়ে দিয়েছে ৪০ শতাংশ স্টক। এ ছাড়া চিপ নির্মাণকারী সংস্থাটির কর্তাব্যক্তিরা বিক্রি করেছেন ৩৩ লক্ষ শেয়ার, যার বাজারমূল্য প্রায় ৬০ কোটি ডলার। সূত্রের খবর, স্টক ছেড়ে দেওয়ার তালিকায় সিইও জেনসেন হুয়াঙের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের বেশ কয়েক জন রয়েছেন।

১৬ ১৮

‘এনভিডিয়া’র শেয়ার বিক্রির কারণ ব্যাখ্যায় সফ্‌টব্যাঙ্ক জানিয়েছে, এআই পরিকাঠামো এবং নতুন স্টার্ট আপ সংস্থায় লগ্নির পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। সেই কারণে চিপ নির্মাণকারী সংস্থাটির স্টক বিক্রি করে টাকা তুলে নিয়েছে তারা। গত দু’বছরে তিন গুণ বেড়েছে ‘এনভিডিয়া’র সূচক। ফলে সেটি একটি বুদ্‌বুদের সৃষ্টি করেছে বলে মনে করেছেন অধিকাংশ বিশ্লেষক।

১৭ ১৮

ওয়াল স্ট্রিটের ব্রোকারেজ় ফার্মগুলির আশঙ্কা, ‘এনভিডিয়া’র বুদ্‌বুদ ফাটলে লগ্নিকারীদের লোকসানের পরিমাণ দাঁড়াবে ৩০ হাজার কোটি ডলার। তার থেকে বাঁচতে আগাম পদক্ষেপ করছে সফ্‌টব্যাঙ্ক ও মাইক্রো এলএলসির মতো সংস্থা। তবে দুনিয়া জুড়ে কৃত্রিম মেধার চাহিদা আরও বৃদ্ধি পেলে রাতারাতি বদলাতে পারে সেই চিত্র। তখন আবার চিপ নির্মাণকারী সংস্থাটির স্টক কিনতে বিনিয়োগকারীরা যে ঝাঁপিয়ে পড়বেন, তা বলাই বাহুল্য।

১৮ ১৮

তবে চরিত্রগত দিক থেকে ‘এনভিডিয়া’র সঙ্গে ‘প্যালান্টির’-এর বেশ পার্থক্য রয়েছে। দ্বিতীয় সংস্থাটি মার্কিন যুদ্ধ দফতর এবং গুপ্তচরবাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত। ফলে পশ্চিম এশিয়ার লড়াইয়ের উপর তাদের সূচকের ওঠানামা অনেকাংশেই নির্ভর করতে পারে। সেই সুযোগ চিপ নির্মাণকারী কোম্পানিটির নেই। ফলে ওয়াশিংটনের জন্য এক ঝটকায় তেহরানে সংঘর্ষের গতি সম্পূর্ণ অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিতে থিয়েলের কোম্পানি কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার।

ছবি: সংগৃহীত, প্রতীকী এবং এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement