Iran Regime Change

খামেনেইয়ের পর কারা? ‘হিটলিস্ট’ তৈরি করে ফেলেছে সিআইএ-মোসাদ, মৃত্যুতালিকায় কোন ১০ ইরানি নেতা?

মার্কিন ফৌজের সঙ্গে যৌথ অভিযানে বড় সাফল্য পেল ইজ়রায়েল। তাঁদের হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা তথা শিয়া ধর্মগুরু আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই। এর জেরে কি সাবেক পারস্যে ঘটবে ক্ষমতার পালাবদল? তুঙ্গে উঠেছে সেই জল্পনা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০১ মার্চ ২০২৬ ১৬:০৬
Share:
০১ ১৮

ইহুদি-মার্কিন যৌথ অভিযানে রক্তাক্ত ইরান। সেখানকার শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইকে হত্যা করেছে তারা। শিয়া কট্টরপন্থীদের শাসনে থাকা পারস্যের প্রজাতন্ত্রিক সরকারের পতন কি তবে আসন্ন? উপসাগরীয় দেশটিতে ফের ক্ষমতায় ফিরবে রাজশাহি? পশ্চিম এশিয়ার বাতাসে ইতিমধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে এই সমস্ত প্রশ্ন। যদিও সেই ‘কাজ’ যে একেবারেই সহজ নয়, তা একবাক্যে স্বীকার করছেন দুনিয়ার তাবড় প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।

০২ ১৮

চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি যৌথ ভাবে ইরানকে নিশানা করে ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার ফৌজ। ওই দিন ভোরে সাবেক পারস্য দেশের রাজধানী তেহরান-সহ একাধিক শহরে আছড়ে পড়ে তাদের ছোড়া একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। ইহুদিরা এই অভিযানের নাম রেখেছে ‘অপারেশন লায়ন্স রোর’ (সিংহের গর্জন)। অন্য দিকে আমেরিকার আক্রমণের পোশাকি নাম ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ বা ‘মহাকাব্যিক ক্রোধ’। অভিযানে প্রাণ হারিয়েছেন খামেনেই-সহ তাঁর পরিবারের সদস্যেরা (পড়ুন মেয়ে, জামাই ও নাতনি)।

Advertisement
০৩ ১৮

ইজ়রায়েলি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে খামেনেই-হত্যার খবর জানিয়ে বিবৃতি দেন ইহুদি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। জানা যায়, ইরানি সর্বোচ্চ নেতার মৃতদেহের ছবি দেখানো হয়েছে মার্কিন প্রেডিসেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। তার পরই তেহরানে ‘ইসলামীয় প্রজাতন্ত্রের’ পতন শুধু সময়ের অপেক্ষা বলে পশ্চিম এশিয়া জুড়ে তীব্র হয় জল্পনা। যদিও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, সেটা করতে হলে পারস্য উপসাগরের কোলের দেশটিতে ক্ষমতায় শীর্ষে থাকা অন্তত ১০ জন নেতাকে সরাতে হবে ইহুদি ও আমেরিকানদের।

০৪ ১৮

এ ব্যাপারে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ‘জ়েরুজ়ালেম পোস্ট’। ইহুদি সংবাদমাধ্যমটির দাবি, ইরানে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র যে ১০ নেতার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, তাঁদের মধ্যে পাঁচ জনকে হত্যা করা গিয়েছে। বাকিদেরও শেষ করতে মোসাদ যে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। শুধু তা-ই নয়, ইজ়রায়েলি গুপ্তচর সংস্থার ‘হিটলিস্টে’ আছে তেহরানের এক ডজন সেনা কমান্ডার। তাঁদের উড়িয়ে দেওয়ার নীল নকশা তৈরি করে ফেলেছে তারা।

০৫ ১৮

বিশেষজ্ঞদের দাবি, ইরানের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পেতে ইহুদি ও মার্কিন সেনাকে পরবর্তী ধাপে সরাতে হবে মাসুদ পেজ়েশকিয়ানকে। ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হন তিনি। খামেনেইয়ের মতোই পর্দার আড়ালে থেকে গাজ়ার হামাস, লেবাননের হিজ়বুল্লা এবং ইয়েমেনের হুথির মতো পশ্চিম এশিয়ার প্যালেস্টাইনপন্থী বিদ্রোহীদের মদত দিয়ে গিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, সর্বোচ্চ নেতার নিয়ন্ত্রণে থাকা পারস্যের আধা সেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’-এর (আইআরজিসি) কমান্ডারেরা যথেষ্ট মান্য করেন তাঁকে।

০৬ ১৮

২৭ তারিখের অভিযানে খামেনেইয়ের মতো পেজ়েশকিয়ানকেও পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা করেছিল ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার যৌথ বাহিনী। উত্তর তেহরানে তাঁর কার্যালয় এবং বাসস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালায় তারা। ইরানি গণমাধ্যমগুলি জানিয়েছে, ওই দুই জায়গায় আছড়ে পড়ে অন্তত সাতটি ক্ষেপণাস্ত্র। ফলে চোখের নিমেষে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় গোটা এলাকা। পারস্যের প্রেসিডেন্ট অবশ্য ওই সময় সেখানে ছিলেন না। ফলে প্রাণে বেঁচে যান তিনি। আপাতত তাঁকে গোপন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

০৭ ১৮

পে‌জ়েশকিয়ানের দ্বিতীয় শক্তি হল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে তাঁর। খামেনেইয়ের মতো তিনিও চান পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হোক ইরান। আর তাই কুর্সিতে বসে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণে জোর দেন মাসুদ। তা ছাড়া গত কয়েক বছর ধরেই পরমাণু প্রতিরক্ষাবিজ্ঞানীদের নিরাপত্তায় জোর দিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। আইআরজিসির ‘হাইপারসনিক’ (শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ গতিশীল) ক্ষেপণাস্ত্রের বহর বৃদ্ধিতেও রয়েছে তাঁর হাতযশ।

০৮ ১৮

প্রেসিডেন্ট পেজ়েশকিয়ানকে বাদ দিলে সাবেক পারস্যের দ্বিতীয় শক্তিশালী নেতা হলেন মহম্মদ বাঘের কালিবাফ। ইরানি পার্লামেন্ট ‘মজলিস’-এর অধ্যক্ষ বা স্পিকারপদে রয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে শিয়া ফৌজের কমান্ডারদের ডেপুটি হিসাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর ইজ়রায়েল ও আমেরিকাকে চরম হুঁশিয়ারি দেন তিনি। কালিবাফ বলেছেন, ‘‘ওরা সমস্ত লাল রেখা অতিক্রম করে গিয়েছে। ওদের নেতারা নোংরা অপরাধী। আমরা এমন আঘাত হানব যে ওদের ভিক্ষা করতে হবে।’’

০৯ ১৮

এই তালিকায় নাম রয়েছে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলি লারিজানির। তাঁকে তেহরানের বিদেশনীতির শেষ কথা বলা যেতে পারে। গত বছর (২০২৫) জুনে ইজ়রায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের সময় আত্মগোপন করেন খামেনেই। তখন দেশ চালানোর ভার ছিল লারজানির উপরে। এখনও পর্যন্ত দু’বার তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করেছে ইহুদি গুপ্তচরবাহিনী মোসাদ। কিন্তু কোনও বারই সাফল্যের মুখ দেখতে পারেনি তারা।

১০ ১৮

পারস্য দখলে ইজ়রায়েল এবং মার্কিন সেনার জন্য সবচেয়ে বড় কাঁটা হতে পারেন আলি খামেনেইয়ের পুত্র মোজ়তবা। ইরানের রাজনীতিতে প্রকাশ্যে খুব একটা দেখা যায় না তাঁকে। সূত্রের খবর, গুপ্ত আড্ডা থেকে আইআরজিসিকে নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। খামেনেইয়ের মৃত্যুতে বাবার খালি কুর্সিতে তাঁকে বসাতে পারেন তেহরানের কট্টরপন্থীরা। এ ছাড়াও শিয়া রাষ্ট্রটির নিয়ন্ত্রণ পেতে হলে আব্বাস আরাঘচি এবং সাদেক লারিজানিকে রাস্তা থেকে সরাতে হবে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পকে, বলছেন বিশ্লেষকেরা।

১১ ১৮

বর্তমানে ইরানের বিদেশমন্ত্রীর পদে রয়েছে আব্বাস আরাঘচি। অন্য দিকে এক্সপিডিয়েন্সি ডিসকার্নমেন্ট (অভিভাবক) কাউন্সিলের প্রধানের দায়িত্বভার সামলাচ্ছেন লারিজানি। ২৭ তারিখের হামলায় ইরানি প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদেহের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছে ইজ়রায়েল। যদিও তাঁর মৃতদেহের কোনও হদিস মেলেনি। এ ছাড়া নিহতের তালিকায় মহম্মদ পাকপুরের নাম রেখেছে ‘জ়েরুজ়ালেম পোস্ট’। আইআরজিসির শীর্ষ কমান্ডার পদে ছিলেন তিনি।

১২ ১৮

এক দশকের বেশি সময় ধরে ইরানের নিরাপত্তা ও পরমাণু বিষয়ক সর্বোচ্চ নেতার সিনিয়র উপদেষ্টা পদে ছিলেন আলি শামখানি। বেশ কিছু দিন আইআরজিসির নৌবাহিনীর কমান্ডার হিসাবেও কাজ করেছেন তিনি। গত বছরের জুনে ইজ়রায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালীন তিনি মারা গিয়েছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু লড়াই থামতেই গোপন ডেরা থেকে বেরিয়ে এসে সবাইকে চমকে দেন শামখানি। এ বারের অভিযানে ফের তাঁর মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে, যা নিয়ে কোনও বিবৃতি দেয়নি তেহরান।

১৩ ১৮

খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর দেশ চালাতে পৃথক বন্দোবস্ত করেছে ইরান। তেহরানের সরকারি সংবাদসংস্থা জানিয়েছে, আপাতত প্রেসিডেন্ট পেজ়েশকিয়ান, বিচারব্যবস্থার প্রধান এবং অভিভাবক কাউন্সিলের এক আইন বিশেষজ্ঞকে নিয়ে একটি তিন সদস্যের কাউন্সিল তৈরি করা হচ্ছে। পরবর্তী শাসক নির্ধারিত না-হওয়া পর্যন্ত সাময়িক ভাবে শিয়া রাষ্ট্রটিকে নেতৃত্ব দেবেন তাঁরা। বিশেষজ্ঞদের দাবি, পারস্যে ‘ইসলামীয় প্রজাতন্ত্রের’ ভিত বেশ শক্ত। খামেনেই হত্যায় তাতে আঘাত করা গেলেও ভেঙে ফেলা সম্ভব হবে না।

১৪ ১৮

অন্য দিকে পালাবদলের ইরানে কাকে কুর্সিতে বসানো হবে, ইতিমধ্যেই তার হিসাব কষা শুরু করে দিয়েছে আমেরিকা। মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা ‘সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি’ বা সিআইএকে উদ্ধৃতকে সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে যে, আলোচনায় রয়েছেন পারস্যের নির্বাসিত যুবরাজ রেজ়া পহলভি। ট্রাম্পের সরকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফৌজের ভূয়সী প্রশংসা করে ইতিমধ্যেই সেখানকার একটি গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন তিনি।

১৫ ১৮

গত শতাব্দীর ৭০-এর দশকের শেষ পর্যন্ত ইরানে ছিল রাজশাহি। পারস্যের রাজা হিসাবে দেশ শাসন করছিলেন মহম্মদ রেজ়া শাহ পহেলভি। ১৯৭৯ সালে ‘ইসলামীয় বিপ্লব’-এর জেরে পতন হয় তাঁর। দেশ ছেড়ে পালিয়ে প্রাণে বাঁচেন তিনি। বাবা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগেই অবশ্য দেশ থেকে নির্বাসিত হন যুবরাজ রেজ়া পহেলভি। দীর্ঘ দিন ধরেই আমেরিকার স্থায়ী বাসিন্দা তিনি। ২৭ ফেব্রুয়ারি তেহরানে হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি মার্কিন গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেন তিনি।

১৬ ১৮

সাক্ষাৎকারে রেজ়া বলেন, ‘‘খামেনেইয়ের সাম্রাজ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের জনগণ।’’ ক্ষমতা পেলে গণভোটের মাধ্যমে নতুন সংবিধান তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। তবে রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর ভাগ্যে শিকে নাও ছিঁড়তে পারে। কারণ সিআইএর তালিকায় আছে আরও বেশ কয়েকটা নাম। তা ছাড়া মার্কিন গোয়েন্দারা মনে করেন, অচিরেই খামেনেইয়ের জায়গা নেবেন আইআরজিসির কোনও শীর্ষ কমান্ডার। সেই দিকেই ধাপে ধাপে এগোচ্ছে তেহরান।

১৭ ১৮

আর তাই খামেনেইয়ের মৃত্যুতে এখনই যুদ্ধ থামাতে রাজি নন ট্রাম্প। আগামী এক সপ্তাহ ইরানে লাগাতার বোমাবর্ষণ চলবে বলে ঘোষণা করেছেন তিনি। এর জবাব দিতে পশ্চিম এশিয়ার একাধিক মার্কিন ঘাঁটিতে ইতিমধ্যেই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে আইআরজিসি। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও সেগুলির সব ক’টি আটকাতে পারেনি সেখানকার আমেরিকান বাহিনী।

১৮ ১৮

চলতি বছরের ২ জানুয়ারি মধ্যরাতে সস্ত্রীক ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনে যুক্তরাষ্ট্রের ডেল্টা ফোর্স। ওই ঘটনার পর লাটিন (দক্ষিণ) আমেরিকার দেশটিতে নিজের পছন্দের ব্যক্তিকে বসাতে ট্রাম্পের খুব একটা সমস্যা হয়নি। বিশ্লেষকদের দাবি, সেই একই অঙ্ক কষে ইরানের ব্যাপারেও অগ্রসর হয়েছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত তাঁর হিসাব মেলে কি না, সেটাই এখন দেখার।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement