Blackout Bomb in Iran War

সাবেক পারস্যে এ বার আছড়ে পড়ল ‘সিবিইউ-৯৪’! নেমে এল আঁধার, ইহুদি হামলায় অন্ধকারে হাতড়ে মরছে ইরানি ফৌজ

ইরান যুদ্ধে এ বার ‘ব্ল্যাক আউট’ বোমা ব্যবহার করল ইজ়রায়েল, যার জেরে লড়াইয়ের মধ্যেই পুরোপুরি অন্ধকারে ডুবে গিয়েছে রাজধানী তেহরান-সহ সাবেক পারস্যের একাধিক শহর। কতটা ভয়ঙ্কর এই ‘অন্ধকার বোমা’?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ১২:২৩
Share:
০১ ১৬

ইজ়রায়েলি হামলার জেরে ইরান জুড়ে লোডশেডিং! অন্ধকারে ঢেকে রাজধানী তেহরান-সহ দেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহর। যদিও সাবেক পারস্যের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিকে এখনও গুঁড়িয়ে দেয়নি ইহুদি-মার্কিন বিমানবাহিনী। তা হলে কী ভাবে বিদুৎ সরবরাহ বন্ধ হল সেখানে? সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, শত্রুকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করতে ‘ব্ল্যাক আউট’ বোমা ফেলেছে তেল আভিভ, যেটা এই লড়াইয়ের ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে উঠতে পারে।

০২ ১৬

কী এই ‘ব্ল্যাক আউট’ বোমা? সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত পোস্ট অনুযায়ী, এটা প্রকৃতপক্ষে অ্যালুমিনিয়ামের একটা জাল, যেটা লড়াকু জেটের সাহায্যে ইরানের বিভিন্ন পাওয়ার গ্রিডের উপর ছড়িয়ে দিয়েছে ইহুদি বিমানবাহিনী। এর জেরে শর্ট সার্কিটে বন্ধ হয় বিদ্যুৎ সরবরাহ। যদিও সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, এই কায়দায় একেবারেই কাজ করে না ‘ব্ল্যাক আউট’ বোমা। বরং এটিকে এক ধরনের উন্নত ‘জ্যামিং’ প্রযুক্তি বলা যেতে পারে।

Advertisement
০৩ ১৬

পশ্চিমি প্রতিরক্ষা জার্নালগুলি আবার জানিয়েছে, একাধিক পর্যায়ে কাজ করে ‘ব্ল্যাক আউট’ বোমা। ইজ়রায়েল যে হাতিয়ারটি ব্যবহার করছে তার সাঙ্কেতিক নাম ‘সিবিইউ-৯৪’। বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, এর জন্ম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। যদিও এই ব্যাপারে যথেষ্ট দ্বিমত রয়েছে। ইহুদি ও আমেরিকার বায়ুসেনাকে বাদ দিলে বর্তমানে সংশ্লিষ্ট ‘ব্রহ্মাস্ত্র’টি চিন এবং দক্ষিণ কোরিয়া বা আরওকের (রিপাবলিক অফ কোরিয়া) বিমানবাহিনীর বহরে আছে বলে জানা গিয়েছে।

০৪ ১৬

‘ব্ল্যাক আউট’ বোমা কোনও গণবিধ্বংসী হাতিয়ার নয়। এর কর্মপদ্ধতির সঙ্গে ক্লাস্টার হাতিয়ারের বেশ মিল রয়েছে। লড়াকু জেট থেকে এটি নিক্ষেপ করলে মূল বোমাটির ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে অসংখ্য ছোট ছোট অংশ। সেগুলির আকার কতকটা ঠান্ডা পানীয়ের ক্যানের মতো। বিশ্লেষকদের কথায়, একটা ‘ব্ল্যাক আউট’ বোমা থেকে ২,০০০ বা ৩,০০০ ক্যান নির্গত হতে পারে। সেগুলির সাহায্যে এক ঝটকায় থামিয়ে দেওয়া হয় পাওয়ার গ্রিডের কাজ।

০৫ ১৬

সাবেক সেনাকর্তারা জানিয়েছেন, মূল বোমা থেকে ক্যানগুলি নির্গত হওয়ার পর প্রতিটায় খুলে যায় একটি করে প্যারাশুট। ফলে খুব সহজেই ভাসতে ভাসতে সেগুলি কোনও পাওয়ার গ্রিডের উপর উল্লম্ব অবস্থান নিয়ে ফেলে। এর পর বিস্ফোরণের বদলে ক্যানগুলি থেকে বেরিয়ে আসে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও রাসায়নিক ভাবে প্রক্রিয়াজাত কার্বন তন্তু। শুধু তা-ই নয়, বিদ্যুতের তার এবং ট্রান্সফর্মারের উপর একটা ঘন মেঘের আস্তরণ তৈরি করে ফেলে এগুলি। এই কার্বন তন্তুগুলির জেরেই পাওয়ার গ্রিডে শুরু হয় শর্ট সার্কিট।

০৬ ১৬

তবে ‘ব্ল্যাক আউট’ বোমার বেশ কিছু অসুবিধা রয়েছে। প্রথমত, এর সাহায্যে শত্রু দেশকে পুরোপুরি ভাবে বিদুৎবিচ্ছিন্ন করে ফেলা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটির প্রভাব ছোট এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। দ্বিতীয়ত, ‘ব্ল্যাক আউট’ বোমার তাৎক্ষণিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা আনুষঙ্গিক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি নগণ্য। তবে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে জোরালো হামলা চালানোর সুযোগ যে সংশ্লিষ্ট পক্ষ পেয়ে যায়, তা বলাই বাহুল্য।

০৭ ১৬

গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) ২৬ জুন বেজিঙের সরকার নিয়ন্ত্রিত ‘চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশন’ বা সিসিটিভির একটি সমাজমাধ্যম চ্যানেলে প্রকাশিত হয় সংশ্লিষ্ট ‘ব্ল্যাক আউট’ বোমার একটি অ্যানিমেটেড ভিডিয়ো। এর পরেই গোটা দুনিয়া জুড়ে হইচই পড়ে যায়। অ্যানিমেটেড ভিডিয়োয় ‘পিপল্‌স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ-কে একটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করতে দেখা গিয়েছে, যার থেকে বেরিয়ে আসছে একাধিক গ্রাফাইট বোমা। তার নাম ‘ব্ল্যাক আউট বম্ব’ দিয়েছিল পশ্চিমি গণমাধ্যম।

০৮ ১৬

সিসিটিভির সমাজমাধ্যম চ্যানেলের ভিডিয়ো অনুযায়ী, একটি গাড়ির উপর বসানো লঞ্চার থেকে সংশ্লিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্রটিকে ছোড়ে চিনা লালফৌজ। এর পর সোজা উড়ে গিয়ে মাঝ-আকাশে ফেটে যায় ওই ক্ষেপণাস্ত্র। সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে বেরিয়ে আসে সিলিন্ডার আকারের ৯০টি ছোট ছোট গোলা। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত হানার মুখে শূন্যে সেগুলিকেও ফেটে যেতে দেখা গিয়েছে। হাতিয়ারটির পাল্লা এবং ক্ষমতা সম্পর্কে সরকারি ভাবে এখনও মুখ খোলেনি বেজিং।

০৯ ১৬

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, যুদ্ধের সময় মূলত শত্রুর ‘কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল’ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি নষ্ট করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই ধরনের বোমা তৈরি করেছে চিন। এর প্রয়োগে ১০ হাজার বর্গমিটার এলাকা জুড়ে ব্যাপক বিদ্যুৎবিভ্রাট তৈরি করতে পারবে বেজিঙের লালফৌজ। সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটির সঙ্গে কার্যপদ্ধতিগত মিল থাকলেও কিছু জায়গায় ইজ়রায়েলি বোমাটির মূলগত পার্থক্য রয়েছে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

১০ ১৬

সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়ো দেখে চিনা ‘ব্ল্যাক আউট’ বোমার পাল্লা ২৯০ কিলোমিটারের মধ্যে হবে বলে অনুমান করছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের আরও দাবি, সংশ্লিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্রটি ৪৯০ কেজি বিস্ফোরক বা ওয়ারহেড বহনে সক্ষম। শুধুমাত্র বিদ্যুৎ সাবস্টেশন এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিক পরিকাঠামোকে পঙ্গু করতে এর নকশা তৈরি করেছেন বেজিঙের প্রতিরক্ষা গবেষকেরা।

১১ ১৬

গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকের একাধিক যুদ্ধে প্রথম বার ‘ব্ল্যাক আউট’ বোমা ব্যবহার করে মার্কিন ফৌজ। উদাহরণ হিসাবে ১৯৯১ সালের ইরাক যুদ্ধের কথা বলা যেতে পারে। ওই লড়াইয়ে বাগদাদের বাহিনীকে পঙ্গু করতে টমাহক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে কার্বন তন্তু ছড়িয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্রের সেনা। এতে সেখানকার ৮৫ শতাংশ এলাকা বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে আরব দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকায় বোমাবর্ষণ করতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর কোনও অসুবিধা হয়নি।

১২ ১৬

মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরাকের আকাশ দখল করতে টমাহক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রে বিএলইউ-১১৪/বি গ্রাফাইট বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছিল। ১৯৯৯ সালে সার্বিয়ায় বিশেষ ধরনের এই ‘ব্ল্যাক আউট বোমা’ ফেলে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় শক্তিজোট ‘উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংগঠন’ বা নেটো (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন)। ওই আঘাতে ৭৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সংযোগ হারিয়ে ফেলে বেলগ্রেড। যুদ্ধে হার নিশ্চিত বুঝে নেটোর প্রস্তাবে রাজি হতে বাধ্য হয় পূর্ব ইউরোপের ওই দেশ।

১৩ ১৬

গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সাল) চিনা গণমাধ্যমে ‘ব্ল্যাক আউট বোমা’র অ্যানিমেটেড ভিডিয়ো প্রকাশ পেতেই দুনিয়া জুড়ে শুরু হয় জল্পনা। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের বড় অংশ মনে করেন, তাইওয়ান (রিপাবলিক অফ চায়না) দখলের জন্যই সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটি তৈরি করেছে বেজিং। এই ক্ষেপণাস্ত্রে দ্বীপরাষ্ট্রটিকে পুরোপুরি বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারলে আগ্রাসী পিএলএ-র বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে না তাইপে। সে ক্ষেত্রে একরকম বিনা যুদ্ধে গোটা দ্বীপরাষ্ট্রটি চলে যাবে ড্রাগনের কব্জায়।

১৪ ১৬

তাইওয়ান তথা সাবেক ফরমোজ়া দ্বীপকে কখনওই পৃথক রাষ্ট্র হিসাবে মান্যতা দেয়নি চিন। প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপটিকে বেজিং নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে। ২০২৩ সালে তৃতীয় বারের জন্য ড্রাগনভূমির প্রেসিডেন্ট হয়ে তাইওয়ানকে নিয়ে হুঁশিয়ারি দেন শি জিনপিং। ওই সময় দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ‘‘ঐক্যবদ্ধ চিন গড়ে ওঠার পথে কেউ বাধা হতে পারবে না।’’

১৫ ১৬

গত বছর চিনা লালফৌজের তাইওয়ান আক্রমণের সম্ভাব্য নীলনকশা নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় মার্কিন সংবাদমাধ্যম। সেখানে বলা হয়, দ্বীপরাষ্ট্রটির উত্তর অংশ দিয়ে আক্রমণ শুরু করা পিএলএ-র পক্ষে বেশি সহজ। বেজিঙের তৈরি ‘ব্ল্যাক আউট বম্ব’-এর পাল্লা কিন্তু বেশি নয়। ফলে আগে সেখানকার বিদ্যুৎ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতে চাইবে ড্রাগন ফৌজ।

১৬ ১৬

সাবেক সেনা অফিসারদের একাংশ অবশ্য মনে করেন, পিএলএ-র কাছে ‘ব্ল্যাকআউট বোমা’ থাকলেও তাইওয়ান দখল পিএলএ-র পক্ষে মোটেই সহজ নয়। কারণ, সংশ্লিষ্ট দ্বীপরাষ্ট্রে বেজিং আক্রমণ শানালে সেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে জাপান এবং আমেরিকা। সে ক্ষেত্রে বেজিঙের ওই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রকে মাঝ-আকাশেই ধ্বংস করার সক্ষমতা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর। পাশাপাশি, ইলেকট্রনিক যুদ্ধে ‘ব্ল্যাক আউট বোমা’ এঁটে উঠতে পারবে কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement