সঙ্গীতজগতে কেরিয়ার গড়ে তোলার জন্য পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়েছিলেন। নিজের গানের সিডি বার করে পানশালার বাইরে দাঁড়িয়ে বিক্রিও করতে হয়েছে। গায়িকা হওয়ার স্বপ্নপূরণ করলেন ঠিকই, কিন্তু গায়কের সঙ্গে সম্পর্কে ভাঙার পর নিজের পেশায় ‘বিপ্লবী’ হয়ে উঠলেন ‘ধুরন্ধর’-এর গায়িকা জ্যাসমীন স্যান্ডলস।
১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বরে পঞ্জাবের জলন্ধরে জন্ম জ্যাসমীনের। বাবা-মা, দিদি এবং ভাইয়ের সঙ্গে সেখানেই থাকতেন তিনি। জ্যাসমীনের পিতা পেশায় আইনজীবী ছিলেন। জলন্ধরে স্কুলের পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি জ্যাসমীন। কম বয়সেই বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি।
জ্যাসমীনের যখন মাত্র ১২ বছর বয়স, তখন পরিবার-সহ পঞ্জাব থেকে ক্যালিফর্নিয়ায় চলে যান। সেখানে গিয়ে স্কুল-কলেজের পড়াশোনা শেষ করেন তিনি। ছোটবেলা থেকে গানের প্রতি খুব আগ্রহ ছিল জ্যাসমীনের। নিজে নিজেই গানের রেওয়াজ করতেন তিনি।
জ্যাসমীনের বাবা-মা চাইতেন না তাঁদের মেয়ে সঙ্গীতকে পেশা হিসাবে বেছে নিক। জ্যাসমীন গান গাওয়া নিয়ে উৎসাহ দেখালেও বেশি আশকারা দিতেন না তাঁরা। নাচ-গানকে জীবনের একটি শখ হিসাবে রাখতে বলেছিলেন জ্যাসমীনের বাবা-মা। কিন্তু জ্যাসমীন স্বপ্ন বুনছিলেন গায়িকা হওয়ার।
ক্যালিফর্নিয়া থেকে মনোবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করে স্নাতক হন জ্যাসমীন। উপার্জনের জন্য কখনও জুতোর দোকানে কাজ করতেন। কখনও আবার জার্সি বিক্রির দোকানে কাজ করতে হত তাঁকে। দু’বছর শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। কিন্তু রোজগারের পাশাপাশি গানবাজনা নিয়েও নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন জ্যাসমীন।
১৬ বছর বয়স থেকে গান লিখতে শুরু করেছিলেন জ্যাসমীন। কিন্তু বিদেশে থেকে কী ভাবে গায়িকা হিসাবে কেরিয়ার শুরু করবেন তা বুঝতে পারছিলেন না। নিজের গানের সিডি তৈরি করে রোজ রাতে ক্যালিফর্নিয়ার পানশালাগুলির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন তিনি।
গানের সিডির পিছনে যোগাযোগ করার জন্য নিজের ফোন নম্বর লিখে দিতেন জ্যাসমীন। পানশালা থেকে কেউ বার হলেই তাঁর হাতে সিডি গুঁজে দিতেন তিনি। কোনও সঙ্গীত পরিচালকের সঙ্গে পরিচিতি থাকলে যেন জ্যাসমীনের সেই সিডি পৌঁছে দেন— পানশালার অপরিচিতদের কাছে সেই অনুরোধ করতেন তিনি।
জ্যাসমীনের সিডি বিলিয়ে দেওয়ার পন্থাই একদিন সুবর্ণসুযোগ এনে দিল। একটি গানের অ্যালবাম তৈরি করার জন্য ডাক পেলেন জ্যাসমীন। ২০০৭ সালে প্রথম গানের অ্যালবাম প্রকাশ পায় তাঁর। কেরিয়ারের প্রথম ছ’-সাত বছর অ্যালবামেই গান গেয়েছিলেন তিনি।
২০১৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সলমন খানের ‘কিক’ ছবিতে হনী সিংহের সঙ্গে ‘ইয়ার না মিলে’ গানটি গেয়েছিলেন জ্যাসমীন। কানাঘুষো শোনা যায়, ফোন করে জ্যাসমীনকে গানের প্রথম দু’কলি গাইতে বলেছিলেন হনী। জ্যাসমীনের গলা ফোনে শুনেই ভাল লেগে গিয়েছিল তাঁর। পরে জ্যাসমীনকেই পুরো গানটি লিখে গাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন হনী।
২০১৪ সালে বলিউডের সঙ্গীতজগতে পা রাখেন জ্যাসমীন। পাশাপাশি পঞ্জাবি গায়িকা হিসাবেও পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে শুরু করেন তিনি। ২০১৭ সালে পঞ্জাবি গায়ক গ্যারি সান্ধুর সঙ্গে জুটি বাঁধেন জ্যাসমীন। ‘ইললিগাল উইপন’, ‘সিপ সিপ’, ‘লাড্ডু’র মতো একাধিক জনপ্রিয় গান উপহার দিতে শুরু করেন জ্যাসমীন-গ্যারির জুটি। ব্যক্তিগত জীবনেও মোড় ঘুরে যায় গায়িকার।
পেশাগত সূত্রে গ্যারির সঙ্গে আলাপ হলেও গায়ককে ভালবেসে ফেলেন জ্যাসমীন। প্রকাশ্যে নিজেদের সম্পর্কের কথা স্বীকারও করেছিলেন তাঁরা। শোনা যেতে থাকে, ২০১৮ সালে গোপনে বাগ্দানও সেরে ফেলেছিলেন দু’জনে। কিন্তু তাঁদের সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে জ্যাসমীনের সঙ্গে গ্যারির দূরত্ব বাড়তে শুরু করে। পরস্পরের সঙ্গে সমাজমাধ্যমেও ‘আড়ি’ নিয়ে নেন তাঁরা। বিচ্ছেদের কারণ স্পষ্ট ভাবে না জানালেও গুঞ্জন শোনা যেতে থাকে, জ্যাসমীন অত্যন্ত স্বাধীনচেতা এবং স্পষ্টভাষী। তাঁর এমন আচরণের কারণে দু’জনের মধ্যে মতের অমিল হত।
পরে অবশ্য গ্যারি সমাজমাধ্যমে একটি ভিডিয়ো পোস্ট করে জানিয়েছিলেন যে, জ্যাসমীনকে তিনি যথেষ্ট সময় দিতে পারেননি। সে কারণেই তাঁদের সম্পর্কে ভেঙে গিয়েছিল। বিচ্ছেদের পর নাকি অবসাদে ডুবে গিয়েছিলেন গায়িকা। তার প্রভাব পড়েছিল জ্যাসমীনের কেরিয়ারেও।
কানাঘুষো শোনা যেতে থাকে, বিচ্ছেদের পর জ্যাসমীন জ্বালাময়ী গান লিখতে শুরু করেছিলেন। তাঁর গানে প্রতিবাদের সুরও নাকি ভেসে উঠতে থাকে। চার বছরের সাময়িক বিরতির পর আবার বলিউডে ফিরে আসেন গায়িকা। ২০২৪ সালে ‘মুঞ্জ্যা’ ছবিতে ‘তরস’ গানটি গেয়েছেন তিনি।
‘উলঝ’, ‘রেড ২’, ‘থামা’, ‘ইক্কিস’ ছবির পাশাপাশি শাহরুখ খানের পুত্র আরিয়ান খানের ‘ব্যাডস অফ বলিউড’ সিরিজ়েও গান গেয়েছেন জ্যাসমীন। ‘ধুরন্ধর’ ছবিতে বাঙালি গায়িকা মধুবন্তী বাগচীর সঙ্গে ‘শরারত’ গানটি গাওয়ার পাশাপাশি অভিনয়ও করেছেন তিনি।
চলতি মাসে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’। এই ছবিতে একাধিক গান গাইতে শোনা গিয়েছে জ্যাসমীনকে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দিল্লির জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠান করতে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে গিয়ে মাঝপথেই অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেন তিনি।
বলিপাড়া সূত্রে খবর, অনুষ্ঠান চলাকালীন নাকি দুই যুবক আশপাশের মহিলাদের হেনস্থা করতে শুরু করেন। ওই ঘটনা চোখে পড়ে জ্যাসমীনের। তিনি প্রতিবাদ জানাতেই তৎপর হয়ে ওঠেন নিরাপত্তারক্ষীরা। গায়িকার হস্তক্ষেপে অনুষ্ঠান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় অভিযুক্ত ওই দুই যুবককে। এর পরে আবার অনুষ্ঠান শুরু করেছিলেন গায়িকা।
কানাঘুষো শোনা যায়, দিল্লির কনসার্টের জন্য আমেরিকা থেকে বিমানবন্দরে নামামাত্রই খুনের হুমকি পেতে শুরু করেছিলেন জ্যাসমীন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নম্বর থেকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল গায়িকাকে। খবর পেতেই কনসার্টে নিরাপত্তা বাড়িয়ে দিয়েছিল দিল্লি পুলিশ। এমনকি, যে বিলাসবহুল হোটেলে গায়িকা ছিলেন, সেখানেও আঁটসাঁট করা হয়েছিল নিরাপত্তা।
পঞ্জাবি গায়ক সিধু মুসেওয়ালা খুনে মূল অভিযুক্ত বিশ্নোই গ্যাংয়ের প্রধান লরেন্স বিশ্নোই হুমকি দিচ্ছিলেন জ্যাসমীনকে। ফোনে হুমকি দিয়ে বলা হয়েছিল, মঞ্চে উঠলেই নাকি গায়িকার উপর হামলা করা হবে। তা শুনেও কনসার্ট বাতিল করেননি জ্যাসমীন। বরং, তাঁর অনুষ্ঠানে মহিলাদের হেনস্থা হতে দেখে প্রতিবাদ করেছিলেন তিনি।
‘ধুরন্ধর’ ছবিতে গান গাওয়ার পর আরও জনপ্রিয়তা বেড়ে গিয়েছে জ্যাসমীনের। সমাজমাধ্যমে নিজস্ব অনুরাগীমহল তৈরি হয়েছে গায়িকার। ইতিমধ্যে ইনস্টাগ্রামের পাতায় তাঁর অনুগামীর সংখ্যা ৮৭ লক্ষের গণ্ডি পার করে ফেলেছে।