৩১ বছর আগে অপহরণ এবং খুনের মামলায় অভিযুক্ত। গা ঢাকা দিয়ে, নাম ভাঁড়িয়ে জাঁকিয়ে বসেছিলেন ইউটিউবে। সেই ইউটিউবার সেলিম খান ওরফে সেলিম ওয়াস্তিক ওরফে সেলিম আহমদকে গ্রেফতার করল দিল্লি পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ।
ওয়াস্তিক সম্প্রতি তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে ছুরিকাহত হয়েছিলেন। দু’দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি ভুয়ো পরিচয়ে বসবাস করছিলেন তিনি। পুলিশ জানিয়েছে, একটি গোপন সূত্রে খবর পেয়ে এবং পুরনো নথি, আঙুলের ছাপ ও ছবির মাধ্যমে তাঁর পরিচয় যাচাইয়ের পর গাজ়িয়াবাদের লোনী থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ফিরে দেখা যাক ৩১ বছর আগের সেই অপহরণ এবং খুনের মামলার দিকে। অভিযোগ, ১৯৯৫ সালে দিল্লির এক ব্যবসায়ীর ১৩ বছর বয়সি পুত্র সন্দীপ বনসলকে অপহরণ করেছিলেন সেলিম খান। পরে খুনও করেন কিশোরকে।
১৯৯৫ সালের ২০ জানুয়ারি স্কুল যাওয়ার পথে অপহরণ করা হয় সন্দীপকে। এর এক দিন পর মুক্তিপণের জন্য ফোন আসে তার পরিবারের কাছে। অপহরণকারী জানায়, বালকের নিরাপদে মুক্তির জন্য ৩০ হাজার টাকা দিতে হবে। পুলিশকে না জানানোর হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বনসল পরিবারকে। তবে পরিবারটি সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে খবর দেয় এবং গোকুলপুরী থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়।
মুক্তিপণের দাবি পূরণ করা সত্ত্বেও সন্দীপকে হত্যা করা হয়েছিল। তদন্ত চলাকালীন মুস্তাফাবাদ এলাকার একটি নর্দমা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল বালকের মৃতদেহ। সে সময় সন্দীপের স্কুলে মার্শাল আর্টস প্রশিক্ষক হিসাবে কাজ করতেন সেলিম। পুলিশি তদন্তের পরে তাঁকেই মূল অভিযুক্ত হিসাবে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার করা হয় সেলিমের সহযোগী অনিল নামে এক ব্যক্তিকেও।
জেরার সময় সেলিম অপরাধ স্বীকার করেছিলেন এবং তাঁর সহযোগী অনিলের যুক্ত থাকার কথাও জানিয়েছিলেন পুলিশকে। শুরু হয় মামলা। ১৯৯৭ সালে আদালত উভয়কেই দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা শোনায়।
২০০০ সালে দিল্লি হাই কোর্ট থেকে অন্তর্বর্তিকালীন জামিন পেয়ে কারাগারের বাইরে গিয়েছিলেন সেলিম। আর ফেরেননি। জামিনে মুক্ত থাকাকালীন দিল্লি ছেড়ে পালিয়ে যান তিনি।
পুলিশ সূত্রে খবর, এর পরেই শুরু হয় সেলিমের অজ্ঞাতবাস। বছরের পর বছর ধরে নতুন নতুন পরিচয় গ্রহণ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জীবনযাপন শুরু করেন তিনি। এমনকি, কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্ত করে গ্রেফতারি এড়ানোর জন্য নিজের মৃত্যুর নাটকও সাজিয়ে ফেলেছিলেন।
এর পর সেলিম আহমদ এবং সেলিম ওয়াস্তিক নামে জীবনযাপন শুরু করেন সেলিম খান। পরে এক জন ইউটিউবার এবং স্বঘোষিত সমাজকর্মী হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত হরিয়ানা এবং উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন স্থানে বছরের পর বছর ধরে ঘুরে বেড়ানোর পর অবশেষে লোনীর একটি জায়গায় পাকাপাকি ভাবে বসবাস শুরু করেন।
লোনীতে থাকাকালীন মহিলাদের পোশাকের একটি দোকান খুলেছিলেন সেলিম। সেখান থেকে পুলিশের খাতায় পলাতক থাকা সেলিম গত কয়েক বছরের চেষ্টায় সমাজমাধ্যমে নিজের পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন। ধর্মও পরিবর্তন করেছিলেন তিনি।
ইউটিউবে চ্যানেল খুলে নিয়মিত ভিডিয়ো আপলোড করতেন সেলিম। প্রচুর মানুষ দেখতেনও তাঁর ভিডিয়ো। শীঘ্রই লোনীর স্বনামধন্য ইউটিউবার হিসাবে পরিচিতি পেতে শুরু করেন তিনি। এমনকি, নিজের জীবনের উপর ভিত্তি করে একটি চলচ্চিত্র তৈরির পরিকল্পনাও করে ফেলেছিলেন সেলিম। আর তার জন্য প্রযোজকের থেকে অগ্রিম অর্থও পেয়েছিলেন।
এর পর গোয়েন্দা সূত্রে দিল্লি পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের কাছে খবর আসে এক জন পরিচিত ইউটিউবার দীর্ঘ দিন ধরে পলাতক থাকা এক জন অপরাধী হতে পারেন। এর পর ইনস্পেক্টর রবিন ত্যাগীর নেতৃত্বে ক্রাইম ব্রাঞ্চের একটি দল সেলিমের খোঁজে লোনী যায়। অভিযান চালানোর আগে সেলিমের পরিচয় নিশ্চিত করতে তাঁর আগের বেশ কিছু তথ্য মিলিয়ে দেখেন দিল্লি ক্রাইম ব্রাঞ্চের তদন্তকারীরা।
তদন্তকারীরা দেখেন, ১৯৯৫ সালের অপহরণ এবং খুনের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা পাওয়া সেলিম খান এবং লোনীর ইউটিউবার সেলিম ওয়াস্তিক, একই ব্যক্তি। এর পরেই গ্রেফতার করা হয় তাঁকে।
গ্রেফতারের পর সেলিমকে তিহাড় জেলে পাঠানো হয়েছে। দিল্লি পুলিশের কর্তারা জানিয়েছেন, এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, যতই সময় পেরিয়ে যাক না কেন, পলাতকদের খুঁজে বার করার জন্য তাঁদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। মামলাটি এ-ও তুলে ধরেছে যে, কী ভাবে অভিযুক্ত সেলিম ক্রমাগত নিজের পরিচয় এবং বাসস্থান পরিবর্তন করে ২৬ বছর ধরে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে আসছিলেন।
পুলিশ এ-ও জানিয়েছে, চলতি বছরের গত ২৬ ফেব্রুয়ারি হামলা চালানো হয়েছিল সেলিমের উপর। রাত ২টো নাগাদ সেলিমের অফিসে প্রবেশ করে তাঁর উপর ছুরি দিয়ে এলোপাথাড়ি কোপ মারেন দুই ব্যক্তি। তবে সেলিম ওই হামলা থেকে বেঁচে যান। নিকটবর্তী একটি হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা গ্রহণের পর সেরে ওঠেন তিনি।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ২৬ ফেব্রুয়ারি হেলমেটে মাথা-মুখ ঢেকে একটি মোটরবাইকে চড়ে গাজ়িয়াবাদের লোনীর অশোক বিহার কলোনিতে সেলিমের বাসভবনে ঢোকেন দুই অভিযুক্ত। নিজেদের পরিচয় প্রকাশ না করেই সেলিমের ঘাড় এবং পেটে বার বার ছুরিকাঘাত করা হয়। ছুরির কোপ পড়ে গলার কাছেও। পরে সিসিটিভি ফুটেজ এবং অপরাধে ব্যবহৃত মোটরবাইকের মাধ্যমে উভয় অভিযুক্তকে শনাক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্ত দু’জন সম্পর্কে দাদা এবং ভাই।
বিভিন্ন সংগঠন এবং ব্যক্তি সে সময় দাবি করেছিলেন, সেলিম ওয়াস্তিকের উপর এই হামলার কারণ ছিল, তাঁর প্রাক্তন মুসলিম পরিচয় এবং তাঁর ইসলাম-বিরোধী মতামত। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেলিমের উপর হামলা চালানোর সময় হামলাকারীদের বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘‘তুমি আমাদের সৃষ্টিকর্তাকে অপমান করছ।’’
এই ঘটনার সূত্র ধরে পুলিশ এক এনকাউন্টারে সেলিমের উপর হামলা চালানো দুই অভিযুক্ত জিশান এবং গুলফামকে গুলি করে হত্যা করে। তদন্তকারীদের মতে, সেই ঘটনার পরেই সেলিমের অতীত জীবন নতুন করে মনোযোগ আকর্ষণ করে, যা অবশেষে কয়েক দশক পুরনো মামলাটিতে একটি যুগান্তকারী অগ্রগতি এনে দেয়। গ্রেফতার হন সেলিম।
সেলিম ওয়াস্তিক জনসমক্ষে তাঁর সমালোচনামূলক মতামত প্রকাশের জন্য পরিচিত ছিলেন। ইউটিউবে দু’টি চ্যানেল চালাতেন তিনি। বিভিন্ন টিভি অনুষ্ঠানেও উপস্থিত হতেন। হামলার সময় তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে ১৭৯টি ভিডিয়ো ছিল। সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা ছিল ২৮.৪ হাজার।