বলিউডের সঞ্জু বাবার ‘এন্ট্রি সিন’ বলে কথা! ‘ধুরন্ধর’ ছবিতে ধুরন্ধরমার্কা ‘এন্ট্রি’ নিলেন বলি অভিনেতা সঞ্জয় দত্ত। তখনই নেপথ্যে বেজে উঠল আশির দশকের একটি অতি জনপ্রিয় গান। ‘হাওয়া হাওয়া’ গানটি আবার নতুন মোড়কে দর্শকের কাছে পরিবেশন করলেন ছবির পরিচালক আদিত্য ধর। তার পর থেকেই গানটির সৃষ্টিকর্তা হাসান জাহাঙ্গিরকে ঘিরে উন্মাদনা তৈরি হয়ে যায় দর্শকমহলে।
১৯৬২ সালের জুলাইয়ে পাকিস্তানের করাচিতে জন্ম হাসানের। গান গাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চে নাচও পরিবেশন করেন তিনি। সে কারণে হাসানকে অনেকেই পাকিস্তানের ‘মাইকেল জ্যাকসন’ বলে চেনেন।
১৯৮২ সালে প্রথম একক গান ‘ইমরান খান ইজ় আ সুপারম্যান’ গেয়ে সঙ্গীতজগতে আত্মপ্রকাশ করেন হাসান। তখন অবশ্য তিনি উঠতি শিল্পী হিসাবেই পরিচিত ছিলেন। মাইকেল জ্যাকসনের অন্ধ ভক্ত ছিলেন বলে তাঁর প্রকাশভঙ্গিও অনুকরণ করার চেষ্টা করতেন হাসান।
পাকিস্তানে যে সময় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চল ছিল, সেই সময় পপ সঙ্গীতের সঙ্গে শ্রোতার পরিচয় করিয়ে দেন হাসান। পাঁচ বছর গান করার পর হঠাৎ করে জনপ্রিয়তা পেয়ে যান তিনি। পাকিস্তানের কাঁটাতার পেরিয়ে তাঁর গান ভারত থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় ঝড় তোলে।
১৯৮৬ সালে ‘হাওয়া হাওয়া’ গানটি পাকিস্তানে মুক্তি পায়। সেই সময় এই গানটি বিপুল জনপ্রিয় হয়। ভারতে এই গানটির দেড় কোটি কপি বিক্রি হয়েছিল বলে শোনা যায়। তার পর থেকে হাসানের জীবনের মোড় ঘুরে যায়।
হাসানের ‘হাতো বাঁচো’, ‘শাদি না করনা ইয়ারো’, এবং ‘ইয়ে ফ্যাশন কে’ গানগুলোও লোকমুখে জনপ্রিয় হতে থাকে। সঙ্গীতশিল্পীর সঙ্গে ছিল বাংলা ভাষার নাড়ির সম্পর্ক। তাঁর মায়ের জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশে। সেই সূত্রে বাংলা ভাষার সঙ্গেও পরিচিতি ছিল হাসানের।
২০১১ সালে তিনি জনপ্রিয় বাংলা লোকগান ‘দোল দোল দুলুনি’র একটি আধুনিক সংস্করণ গেয়েছিলেন হাসান। তা ছাড়া তাঁর ‘হাওয়া হাওয়া’ গানটির সুর ব্যবহার করে অনেক প্যারোডি গানও তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘ কেরিয়ারে সঙ্গীতে বিশেষ অবদানের জন্য পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে ২০২৩ সালে ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’ এবং ২০২৪ সালে করাচি আর্টস কাউন্সিল থেকে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন হাসান। ২০১৮ সালে তিনি ‘কোক স্টুডিয়ো পাকিস্তান’-এর একাদশ সিজ়নে অংশগ্রহণ করে নতুন প্রজন্মের কাছেও পরিচিতি পেয়েছেন।
হাসানের গানগুলি আশির দশকে এতই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে, বলিউডের অনেক ছবিতে তাঁর গানের রিমেক সংস্করণ ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই সময় হাসানের কাছ থেকে কোনও অনুমতি নেওয়া হত না বলে এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছিলেন তিনি।
২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মুবারকন’ ছবিতে ব্যবহৃত হয়েছিল হাসানের গান। ২০১৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে হাসান জানিয়েছিলেন যে, পাকিস্তানে একসময় ‘হাওয়া হাওয়া’ গানটি ‘নিম্ন রুচিসম্পন্ন’ বলে তার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। পরে অবশ্য সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়া হয়।
হাসান জানিয়েছিলেন, ‘হাওয়া হাওয়া’ গানটির পর ভারতেও তাঁর জনপ্রিয়তা এত পরিমাণে বেড়ে যায় যে, মুম্বইয়ে গানের অনুষ্ঠান করতে গিয়েছিলেন তিনি। বহু নামকরা বলি তারকা তাঁর সঙ্গে মুম্বই বিমানবন্দরে দেখা করতে গিয়েছিলেন। এমনকি, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সঙ্গে দিল্লিতে গিয়ে নৈশভোজও সেরেছিলেন হাসান।
বর্তমানে স্ত্রী এবং কন্যাসন্তান নিয়ে সংসার হাসানের। তাঁর কন্যা পেশায় কণ্ঠশিল্পী। ২০২৪ সালে হাসানকে সম্মান জানাতে পাকিস্তানের করাচির একটি সড়কপথের নাম পরিবর্তন করে পাক গায়কের নামে রাখা হয়।
‘ধুরন্ধর’ ছবিতে ‘হাওয়া হাওয়া’ গানটির ব্যবহার নিয়ে হাসান এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, আগে কপিরাইটের কোনও রকম বন্দোবস্ত ছিল না। তাই তাঁর গানের লাগামছাড়া ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু ‘ধুরন্ধর’-এর ছবিনির্মাতারা তাঁর অনুমতি নিয়েই গানটি নিজেদের ছবিতে ব্যবহার করেছেন। আলাদা করে পারিশ্রমিকও পেয়েছেন হাসান।
‘ধুরন্ধর’ ছবিতে হাসানের গানটি কয়েক সেকেন্ড ব্যবহার করা হয়েছিল। পাক গায়কের অনুমতি নেওয়ার পর হাসানকে ৪৫ লক্ষ টাকা পারিশ্রমিক দিয়েছিলেন ছবিনির্মাতারা। এই সম্মান পেয়ে পাকিস্তানের পপ গায়ক যারপরনাই খুশি হয়েছেন।