হাতেগোনা কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। বিড়ালাক্ষি অভিনেত্রীর সৌন্দর্যে মাতোয়ারা হয়েছিলেন দর্শক। বলিপাড়ার জনপ্রিয় পরিচালক থেকে শুরু করে সঞ্জয় দত্তের মতো অভিনেতার সঙ্গেও নাম জড়িয়েছিল তাঁর। হঠাৎ করেই বলিপাড়া থেকে ‘উধাও’ হয়ে যান লিজ়া রানি রে।
১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে কানাডার টরন্টোয় জন্ম লিজ়ার। তাঁর বাবা ছিলেন বাঙালি। মা ছিলেন বিদেশিনি। বাবার দৌলতেই সিনেমার প্রতি আগ্রহ জন্মায় লিজ়ার। সত্যজিৎ রায় থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক স্তরের পরিচালকের ছবি বাবার সঙ্গে বসে দেখতেন তিনি।
বিদেশেই স্কুলের পড়াশোনা শেষ করেন লিজ়া। ছোট থেকেই পড়াশোনায় দুর্দান্ত ছিলেন তিনি। মেধার জোরে পাঁচ বছরের পড়াশোনা চার বছরেই শেষ করে ফেলেছিলেন তিনি। ছুটি কাটাতে মাঝেমধ্যে পরিবার-সহ ভারতে আসতেন তিনি। সেই সূত্রেই মডেলিংজগতের সঙ্গে জুড়ে পড়েন লিজ়া।
কিশোরী বয়সে বাবা-মায়ের সঙ্গে ভারতে এসেছিলেন লিজ়া। সেই সময় এক জনপ্রিয় সংস্থার বিজ্ঞাপনে অভিনয়ের জন্য প্রস্তাব পান তিনি। বলি অভিনেতা শশী কপূরের পুত্র কুণাল কপূরের সঙ্গে সংস্থার হয়ে মডেলিং করেন লিজ়া। তার পর আবার বিদেশে ফিরে যান তিনি।
বিদেশে গিয়ে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করবেন বলে স্থির করেন লিজ়া। কিন্তু এক পথ দুর্ঘটনায় লিজ়ার মা পঙ্গু হয়ে যান। রোজগারের জন্য ভারতে ফিরে আসেন লিজ়া।
নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে ভারতের প্রথম সারির মডেলের তালিকায় জায়গা করে ফেলেন লিজ়া। বহু জনপ্রিয় বিজ্ঞাপনের প্রচারমুখ ছিলেন তিনি। নুসরত ফতেহ আলি খানের মতো গায়কের মিউজ়িক ভিডিয়োয় অভিনয় করতেও দেখা যায় তাঁকে।
১৯৯৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হাসতে খেলতে’ নামের একটি হিন্দি ছবিতে ক্ষণিকের জন্য মুখ দেখিয়েছিলেন লিজ়া। তার পর বহু ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব পেতে শুরু করেন তিনি। অবশেষে ২০০১ সালে বলিপাড়ায় পদার্পণ করেন লিজ়া।
২০০১ সালে বিক্রম ভট্টের পরিচালনায় প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ‘কসুর’। সেই ছবিতে মুখ্যচরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায় লিজ়াকে। স্পষ্ট হিন্দি বলতে পারতেন না তিনি। তাই লিজ়ার চরিত্রে কণ্ঠ দিয়েছিলেন বলি অভিনেত্রী দিব্যা দত্ত।
‘কসুর’ মুক্তির সময় বিক্রমের প্রশংসায় সর্বদা মুখর থাকতেন লিজ়া। বিক্রমের মতো বলি পরিচালকের হাত ধরে কেরিয়ারের প্রথম ছবি লিজ়ার। তিল থেকে তাল হতে বেশি দেরি হয়নি।
কানাঘুষো শোনা যেতে থাকে, বিক্রমের সঙ্গে সম্পর্কে জড়়িয়ে পড়েছিলেন লিজ়া। বলিপাড়ায় নিজের জমি শক্ত করার জন্যই নাকি পরিচালকের সঙ্গে প্রেম করছেন তিনি— এমন কথাও রটে যায় চারদিকে। লিজ়ার ‘প্রেমিকের’ তালিকায় নাম লিখিয়ে ফেলেছিলেন বলি অভিনেতা সঞ্জয় দত্তও।
সঞ্জয়ের ব্যক্তিগত এবং পেশাগত জীবনে যখন কঠিন সময় চলছিল তখন নাকি অভিনেতার পাশে ছিলেন লিজ়া। দুই তারকার মধ্যে সম্পর্কও ছিল বলে বলিপাড়ার গুঞ্জন। কিন্তু তা রটনা বলে উড়িয়ে দেন লিজ়া।
এক সাক্ষাৎকারে লিজ়া জানিয়েছিলেন, ১৯৯০ সালের প্রথম দিকে তিনি যখন মুম্বই গিয়েছিলেন তখন সঞ্জয়ের পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। সঞ্জয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক নেই, তা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিলেন অভিনেত্রী।
২০০২ সালে দীপা মেহতার পরিচালনায় ‘বলিউড/হলিউড’ নামের একটি ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান লিজ়া। তার পরেই অভিনয় নিয়ে পাকাপাকি ভাবে কেরিয়ার গড়ার কথা চিন্তা করেন তিনি। অভিনয়ে প্রশিক্ষণ নিতে বিদেশে পাড়ি দেন তিনি।
অভিনয় নিয়ে পড়াশোনা করতে লন্ডনের একটি কলেজে ভর্তি হন লিজ়া। সাহিত্য নিয়েও চর্চা শুরু করেন তিনি। ২০০৪ সালে অভিনয় নিয়ে স্নাতকোত্তর হন লিজ়া। পড়়াশোনা শেষ হতে না হতেই দীপা মেহতা পরিচালিত ‘ওয়াটার’ ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি।
২০০৫ সালে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ‘ওয়াটার’। আন্তর্জাতিক স্তরে অভিনয়ের জন্য প্রশংসা পেতে শুরু করেন লিজ়া। তার পর আমেরিকা, ইউরোপের নানা জায়গায় অভিনয়ের সূত্রে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেন তিনি। বহু বিদেশি ছবিতে অভিনয় করতেও দেখা যায় তাঁকে।
বিদেশি চ্যানেলে একটি খাবারের রিয়্যালিটি শোয়ের পাশাপাশি ট্রাভেল শোয়ের সঞ্চালনা করতেন লিজ়া। ২০০৯ সালে বিরল রক্ত ক্যানসার ধরা পড়ে তাঁর। ক্যানসারের চিকিৎসা চলাকালীন কাজ হারাতে শুরু করেন লিজ়া।
কানাঘুষো শোনা যায়, কেমোথেরাপির পর পরচুলা পরতেন লিজ়া। কিন্তু পরচুলায় নিজেকে দেখে হাসি পেত তাঁর। তাই টাক মাথায় ঘুরতে শুরু করেছিলেন তিনি। সে কারণে শিরোনামেও এসেছিলেন অভিনেত্রী।
লিজ়া যে শোয়ে সঞ্চালনা করতেন, সেখানে বড় চুলের কোনও তরুণীকে খুঁজছিলেন চ্যানেল কর্তৃপক্ষ। সে কারণেই নাকি লিজ়ার চাকরি চলে যায়। ক্যানসারের কাছে হার মানেননি লিজ়া। ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে ক্যানসারমুক্ত হন তিনি।
ধীরে ধীরে আবার বিদেশি ছবিতে অভিনয় শুরু করেন লিজ়া। ২০১৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত জনপ্রিয় একটি হিন্দি ওয়েব সিরিজ়েও অভিনয় করতে দেখা যায় লিজ়াকে।
কানাঘুষো শোনা যায়, ফ্যাশন আলোকচিত্রশিল্পী পাওলো জ়ামবালডির সঙ্গে সম্পর্কে ছিলেন লিজ়া। সেই সম্পর্ক ভেঙে গেলে কানাডার ব্যবসায়ী ব্রেট উইলসনের সঙ্গে প্রেম করতে শুরু করেন লিজ়া।
২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জেসন দেহনির সঙ্গে বাগ্দান সারেন লিজ়া। ব্যাঙ্কের চাকরি ছেড়ে বর্তমানে ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট পদে কর্মরত জেসন। একই বছর অক্টোবর মাসে জেসনকে বিয়ে করেন লিজ়া।
২০১৮ সালের জুন মাসে সারোগেসির মাধ্যমে যমজ কন্যার জন্ম হয় লিজ়ার। ৪৬ বছর বয়সে একটি বই প্রকাশিত হয় তাঁর। ৫০ বছর বয়সে শিল্পোদ্যোগী হিসাবে উপার্জন করতে শুরু করেন লিজ়া।
লিজ়া সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে বলিউড থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার কারণ স্পষ্ট জানিয়েছেন। অনেকে ভাবেন যে, কাজের অভাব থাকার কারণে তাঁকে আর বড়পর্দায় দেখা যায়নি। তবে, এ কথা সম্পূর্ণ ভুল। ক্যানসার থেকে সেরে ওঠার পর নিজের সিদ্ধান্তেই জীবনে এগিয়ে গিয়েছেন লিজ়া। বলিপাড়া থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তও নিজেই নিয়েছেন তিনি।
সমাজমাধ্যমে বেশ সক্রিয় দেখা যায় লিজ়াকে। সেখানেই নিজস্ব অনুরাগীমহল রয়েছে তাঁর। ইতিমধ্যেই ইনস্টাগ্রামের পাতায় তাঁর অনুগামীর সংখ্যা তিন লক্ষের গণ্ডি পার করে ফেলেছে।