প্রায় ৫০ হাজার কিমি রাস্তা। এক কথায়, গোটা পৃথিবী ভ্রমণ। হেঁটেই ‘বিশ্বজয়’ করার সহস দেখান মাত্র ২৯ বছর বয়সে। নাম তাঁর কার্ল বুশবি। ২৭ বছরের মধ্যে সেই যাত্রা পূরণ করার প্রতিজ্ঞাও করেছিলেন তিনি।
প্রায় গোটা বিশ্ব যখন দু’মাইল যাওয়ার জন্যও হাঁটা ব্যতীত আর কী ভাবে যাওয়া যায় তার খোঁজে মগ্ন, সেই সময় দাঁড়িয়ে কার্লের গল্প সত্যিই নজিরবিহীন। রোমাঞ্চের নেশায় ঘরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন ওই ব্রিটিশ তরুণ।
১৯৯৮ সাল থেকে শুরু হয়েছে কার্লের বিশ্বভ্রমণের যাত্রা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে সেই সফর শেষ হওয়ার কথা। মাঝের ২৭ বছর ধরে তিনি নানা ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করে হেঁটেই চলেছেন।
হেঁটে বিশ্বসফর শুরুর আগে কার্লকে কেবল একটাই শর্ত দেওয়া হয়েছিল। গোটা রাস্তা হেঁটেই শেষ করতে হবে। মাঝে যা-ই হোক না কেন, কোনও রকম যানবাহনে চাপা যাবে না।
কার্লের জন্ম ১৯৬৯ সালে ইংল্যান্ডের হুলে। তবে ছোট থেকেই কার্লের মাথায় বিশ্বভ্রমণের ভূত চেপে বসেনি। তাঁর জীবন বদলে যায় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর।
পেশাজীবনে কাছ থেকে দেখা বিভিন্ন জনের মৃত্যু জীবনের প্রতি কার্লের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। তাঁর মনে হয় যে, জীবনের কোনও নিশ্চয়তা নেই। আজ আছি, কাল না-ও থাকতে পারি। মনে করেন, নিজেকে ঘরবন্দি করে রেখে লাভ নেই। এ ভাবেই রোমাঞ্চের প্রতি প্রেম জাগ্রত হয় তাঁর।
১৯৯৮ সালে শুরু হয় কার্লের বিশ্বসফর। তিনি দক্ষিণ আমেরিকার নিম্নভাগ থেকে হাঁটা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। ২৭ বছর ধরে হাঁটার পর ইংল্যান্ডে ফিরে এসে যাত্রা শেষ করবেন বলে জানান।
ওই বছরের নভেম্বরে চিলির দক্ষিণ প্রান্ত থেকে শুরু হয় কার্লের যাত্রা। সেই সময় তাঁর সম্বল বলতে ছিল আনুমানিক ৫০০ ডলার।
যাত্রাপথে কখনও তিনি তাঁবু খাটিয়ে ঘুমোন। কখনও আবার এমন কোনও অচেনা মানুষের বাড়িতে আশ্রয় নেন, যাঁরা দয়া করে তাঁর খাওয়া এবং শোয়ার বন্দোবস্ত করে দেন। এ ভাবে কেটে যায় দু’বছর। কার্ল এত দিনে গোটা দক্ষিণ আমেরিকা ঘুরে ফেলেছেন। এসে পৌঁছিয়েছেন ডারিয়ন গ্যাপের দোরগোড়ায়।
বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জায়গাগুলির মধ্যে অন্যতম ডারিয়ন গ্যাপ। নানা রকমের বেআইনি কাজকর্মের আঁতুড়ঘর এই জায়গা। সেগুলি চালনা করার জন্য রয়েছে নানা সংগঠন। এদের মধ্যে প্রায়শই অন্তর্দ্বন্দ্ব লেগে থাকে।
ডারিয়ন গ্যাপ অতিক্রমের রাস্তা সহজ ছিল না কার্লের জন্য। তিনি ডারিয়ন কাঁপিয়ে বেড়ানো এক সংগঠনের অংশ হয়ে কোনও রকমে সেখান থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে অপর প্রান্তে পৌঁছোন। সময় লাগে ৫০ দিন।
এর পর ছয় বছর ধরে তিনি উত্তর আমেরিকা হেঁটে পার করে পৌঁছোন বেরিং প্রণালী। সাল ২০০৬। এটিও তাঁর সফরের অন্যতম কঠিন অংশ ছিল বলে জানিয়েছেন কার্ল নিজেই। বেরিং প্রণালীর সাদা বরফের চাদর অতিক্রম করে তিনি পৌঁছোন রাশিয়ায়। তাঁর সঙ্গী ছিলেন দিমিত্রি কিফার।
বেরিং প্রণালী পেরিয়ে রাশিয়ায় পৌঁছে তাঁকে পড়তে হয় অন্য রকম বিপদের মুখে। প্রাকৃতিক নয়, এই বিপদ ছিল রাজনৈতিক। অননুমোদিত সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করায় তাঁকে রাশিয়ায় ৫৭ দিনের জন্য জেলবন্দি করে রাখা হয়।
২০১৩ সালে কার্লের রাশিয়ান ভিসা বাতিল করে দেওয়া হয়। তখন তিনি লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে ওয়াশিংটন ডিসি হেঁটে যান ভিসার উপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তোলার জন্য। সফলও হন।
ভিসা ছাড়াতে সফল হলেও সাইবেরিয়া পেরোতে কার্লের সময় লেগে যায় দীর্ঘ ১১ বছর। সেই সময় আর্থিক সঙ্কট ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। দোসর ছিল কোভিড-১৯ মহামারিও। কিন্তু কার্ল হার মানেননি। তিনি নিজের ছন্দে এগিয়ে চলেন।
২০২৪ সালে কাজ়াখস্তান পেরিয়ে কার্ল পৌঁছোন কাস্পিয়ান সাগরে। স্থলপথে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও তিনি জলপথকেই বেছে নেন। ৩১ দিন ধরে কাস্পিয়ান সাগরে সাঁতার কেটে কাজ়াখস্তান থেকে আজ়ারবাইজানে পৌঁছোন তিনি। সঙ্গে নিয়েছিলেন একটি ছোট্ট নৌকো। তবে সেই নৌকোর সাহায্যে সাগর পেরোননি কার্ল। সাঁতারের মাঝে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য তিনি সেই নৌকোয় উঠে ঘুমোতেন।
এর পর তিনি ককেসাস, তুরস্ক ঘুরে যখন ইউরোপ পৌঁছোন, তখন ২০২৫ প্রায় শেষ। আর চার থেকে পাঁচ মাসের অপেক্ষা। তার পরই দীর্ঘ প্রায় তিন দশকের সফর শেষে কার্ল নিজের ঘরে ফিরবেন।
কার্লের এই দীর্ঘ সফরের নাম দেওয়া হয়েছে ‘দ্য গোলিয়াথ এক্সপেডিশন’। আনুমানিক ২৫টি দেশ ঘুরে আসার পর রোমাঞ্চপ্রেমী কার্ল বুশ এখন নিজের শহরের মাটি ছোঁয়ার দিন গুনছেন।