কিশোরী বয়সেই বড়পর্দায় কেরিয়ার শুরু করেছিলেন তিনি। প্রথম ছবি বলিউডের ‘খিলাড়়ি’ অক্ষয় কুমারের সঙ্গে। তার পর কেটে গিয়েছে দশ দশটি বছর। অক্ষয়ের সঙ্গে অভিনয়ের সুবর্ণসুযোগ পাওয়ার পরেও বলিপাড়ার আর দেখা যায় না ঋতিকা বাদিয়ানিকে। রোজগারের জন্য অন্য পথ বেছে নিয়েছেন তিনি।
২০০১ সালের অক্টোবরে গুজরাতের পোরবন্দরে জন্ম ঋতিকার। নেটপ্রভাবীদের দুনিয়ায় অবশ্য রিট্স নামে অধিক পরিচিত তিনি। পোরবন্দরে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতেন ঋতিকা। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের শখ ছিল তাঁর।
মেয়ের শখপূরণে সম্মতি জানিয়েছিলেন তাঁর বাবা-মা। টিনসেল নগরী মুম্বইয়ে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকায় পরিবার নিয়ে গুজরাত থেকে মুম্বই চলে যান তিনি। মুম্বইয়ের এক স্কুলে ভর্তি হন ঋতিকা।
ঋতিকার স্কুলের সহপাঠীরা যখন পড়াশোনা এবং খেলাধুলো নিয়ে ব্যস্ত, তখন ঋতিকা ব্যস্ত হয়ে পড়েন স্বপ্নের পিছনে ছুটতে। অভিনয়ের জন্য নানা জায়গায় অডিশন দিতে শুরু করেন তিনি। কম সময়ের মধ্যে বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপনে মুখ দেখানোর সুযোগও পেয়ে যান।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে বড়পর্দায় অভিনয়ের প্রস্তাব পান ঋতিকা। ২০১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘এয়ারলিফ্ট’ ছবিতে শিশুশিল্পী হিসাবে অভিনয় করেন তিনি। পাশাপাশি সমাজমাধ্যমের পাতায় নাচের ভিডিয়োও পোস্ট করতে শুরু করেন ঋতিকা।
‘এয়ারলিফ্ট’ মুক্তির বছরেই ‘১০ কল্পনাকাল’ নামের মালয়ালম ভাষার একটি ছবিতেও শিশুশিল্পী হিসাবে অভিনয় করেন ঋতিকা। বেশ কয়েকটি মিউজ়িক ভিডিয়োয় অভিনয় করে নৃত্যশিল্পী হিসাবে নজর কাড়েন তিনি। কিন্তু তাঁর নৃত্যদক্ষতা আটকে থাকে শুধুমাত্র সমাজমাধ্যমের পাতায়।
টিকটক মাধ্যমে নাচের ভিডিয়ো বানিয়ে সেখানেই নিজস্ব অনুরাগীমহল তৈরি করে ফেলেন ঋতিকা। মঞ্জুল খট্টর নামের এক নেটপ্রভাবীর সঙ্গে মেলামেশা বাড়তে থাকে তাঁর। অধিকাংশ ভিডিয়োয় মঞ্জুলের সঙ্গে জুটি বেঁধে নাচ করতে দেখা যেত ঋতিকাকে।
সমাজমাধ্যমের পাতায় পরস্পরের সঙ্গে প্রচুর রোম্যান্টিক এবং মজার ভিডিয়ো শেয়ার করতেন ঋতিকা এবং মঞ্জুল। একসঙ্গে ভ্রমণ করা, জন্মদিনে একে অপরকে বিশেষ ভাবে শুভেচ্ছা জানানো এবং পরস্পরের পরিবারের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক থাকার কারণে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে আরও জল্পনা শুরু হয়েছিল।
কানাঘুষো শোনা যেতে থাকে যে, মঞ্জুলের সঙ্গে গোপনে আংটিবদলও সেরে ফেলেছেন ঋতিকা। সমাজমাধ্যমে তাঁদের অনুরাগীরা ভালবেসে তাঁদের পছন্দের জুটিকে ‘মঞ্জিকা’ বলে ডাকতে শুরু করেন। কিন্তু সেই জল্পনায় জল ঢেলে দেন অভিনেত্রী নিজেই।
ঋতিকা স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, মঞ্জুলের সঙ্গে কাজের রসায়ন ভীষণ ভাল। কিন্তু তাঁদের মধ্যে কোনও রকম প্রেমের সম্পর্ক নেই। মঞ্জুল তাঁর প্রিয় বন্ধু এবং সেরা সহকর্মী। তার চেয়ে বেশি কিছু নয়। তার পরেও মঞ্জুলের সঙ্গে ঋতিকার সম্পর্ক নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি।
ভারতে নিষিদ্ধ হওয়ার আগে টিকটকের সফল তারকা ছিলেন ঋতিকা। কিন্তু সেই সাফল্যই প্রভাব ফেলেছিল তাঁর অভিনয়জীবনে। ঋতিকা এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, কোনও গুরুগম্ভীর চরিত্রের অডিশন দিতে গেলে তাঁকে প্রথমেই বাদ দিয়ে দেওয়া হত। কারণ জিজ্ঞাসা করে হলে অনেকেই ঋতিকাকে বলতেন, ‘‘তোমার অভিনয়দক্ষতার জন্য সুযোগ দেওয়া হয় না। সমাজমাধ্যমে অনুরাগীসংখ্যার জন্য সুযোগ দেওয়া হয়। সুন্দর মিষ্টি মিষ্টি ভিডিয়ো বানানোর জন্যই তুমি আদর্শ।’’
সফল নেটপ্রভাবীর তকমা থেকে বেরিয়ে অভিনেত্রী হওয়ার জন্য কঠিন লড়াইয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছিল ঋতিকাকে। ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহলের দিকে তাকিয়ে তিনি বুঝে গিয়েছিলেন যে, মাথার উপর প্রভাবশালী কারও হাত না থাকলে বলিউডে কেরিয়ার গড়া মুশকিল।
২০২০ সালে ওটিটির পর্দায় মুক্তি পায় ‘চমন বাহার’ নামের একটি রোম্যান্টিক ঘরানার ছবি। এই ছবিতে বলি অভিনেতা জীতেন্দ্র কুমারের বিপরীতে অভিনয় করতে দেখা যায় ঋতিকাকে। তার পর আবার ‘উধাও’ হয়ে যান তিনি।
ঋতিকা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। অনেক সময় কথা পাকাপাকি হওয়ার পরেও শেষ মুহূর্তে কাজ হাতছাড়া হয়ে যায়।’’ ‘চমন বাহার’ ছবিতে অভিনয়ের পর তিনি হিন্দি এবং পঞ্জাবি ভাষার একাধিক মিউজ়িক ভিডিয়োয় কাজ করেছেন।
ঋতিকার অভিযোগ, ব্যক্তিগত জীবন এবং কাজ নিয়ে প্রায়শই সমাজমাধ্যমে কুরুচিকর মন্তব্যের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। আগে এই সব সমালোচনা শুনে ভেঙে পড়তেন ঋতিকা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে শক্ত করেছেন তিনি। ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকতে গেলে যে দৃঢ় মানসিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন, তা বুঝতে পেরেছেন অভিনেত্রী।
ঋতিকার মতে, কাজ না পাওয়ার অর্থ যে, সেই ব্যক্তির যোগ্যতা নেই এমনটা নয়। ইন্ডাস্ট্রির রাজনীতি এবং সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করার বোধের অভাবও তার বড় কারণ। মুম্বইয়ের মতো শহরে টিকে থাকা এবং প্রতি দিন অডিশন দেওয়া অনেক খরচ এবং পরিশ্রমের ব্যাপার। মাসের পর মাস কাজ না থাকা অথবা অডিশনে ব্যর্থ হওয়াকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে মেনে নিয়েছেন ঋতিকা।
ছোটোখাটো কাজ করে কেরিয়ার নষ্ট করার চেয়ে ধৈর্য রেখে ভাল চিত্রনাট্যের জন্য অপেক্ষা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ঋতিকা। তা অনেক সময় হতাশাজনক হলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী তিনি।
আরও পরিণত চরিত্রে অভিনয় করে বড়পর্দায় ফেরার জন্য নিজেকে নতুন ভাবে তৈরি করছেন ঋতিকা। তবে সমাজমাধ্যমে নিজেকে বেশ সক্রিয় রেখেছেন তিনি। ইতিমধ্যেই ইনস্টাগ্রামের পাতায় তাঁর অনুগামীর সংখ্যা ৭৪ লক্ষের গণ্ডি পার করে ফেলেছে।