Problem with Hormuz Strait

হরমুজ়ে ট্রেলার, পাঁচ সামুদ্রিক গলিপথে সংঘাতে জড়াতে পারে বহু দেশ! দুইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ভারতের নাম

আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরানি ফৌজের রণকৌশলের অংশ হিসাবে উঠে এসেছে হরমুজ় প্রণালী অবরোধ। এই ধরনের আর কোন কোন সামুদ্রিক রাস্তায় মুখোমুখি সংঘাতে জড়াতে পারে একাধিক মহাশক্তি?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ৩০ মার্চ ২০২৬ ১৩:০৭
Share:
০১ ১৮

পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকা-ইজ়রায়েল বনাম ইরান যুদ্ধে খবরের শিরোনামে রয়েছে সঙ্কীর্ণ একটা জলপথ যার পোশাকি নাম হরমুজ় প্রণালী। লড়াইয়ের গোড়াতেই ওই রাস্তা অবরুদ্ধ করে তেহরান। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, এর জেরে চার সপ্তাহ পেরিয়েও সাবেক পারস্যকে হারাতে পারছে না ‘মহাশক্তিধর’ ওয়াশিংটন। আগামী দিনে সংঘর্ষের ‘হটস্পট’ হয়ে উঠবে আর কোন কোন সামুদ্রিক পথ? উপসাগরীয় এলাকায় সংঘাতের মধ্যে বাড়ছে সেই জল্পনা।

০২ ১৮

সমুদ্রবিজ্ঞানের ভাষায়, দু’টি সাগরের সংযোগকারী সঙ্কীর্ণ জলপথকে বলা হয় প্রণালী। আবহমান কাল ধরে এগুলি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা হিসাবে ব্যবহার হয়ে আসছে। আর তাই কৌশলগত অবস্থানের কারণে সুপ্রাচীন যুগ থেকে এই সব প্রণালী নিয়ন্ত্রণে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছেন ইতিহাসের একাধিক মহান নৌসেনাপতি। ২১ শতকে ইরানি আধাসেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসির হাত ধরে তারই পুনরাবৃত্তি দেখছে বিশ্ব।

Advertisement
০৩ ১৮

যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদি ফৌজের আক্রমণ ঠেকাতে হরমুজ় অবরোধকে তেহরানের দুর্দান্ত রণকৌশল হিসাবে ইতিমধ্যেই ব্যাখ্যা করেছেন সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ। পারস্য উপসাগর এবং ওমান সাগরের সংযোগকারী ওই জলপথটি মাত্র ১৬৭ কিলোমিটার লম্বা। প্রস্থে এর সঙ্কীর্ণতম অংশটি মাত্র ৩৩ কিলোমিটার। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, হরমুজ়ের রাস্তাতেই বিশ্বের ২০ শতাংশ খনিজ তেল সরবরাহ করে থাকে পশ্চিম এশিয়ার প্রায় প্রতিটি আরব রাষ্ট্র। এ ছাড়া ওই রুটে অহরহ যাতায়াত করে তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের ট্যাঙ্কার।

০৪ ১৮

এ-হেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ় বন্ধ হওয়ায় বিশ্ববাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে তরল সোনা ও এলএনজির (লিকুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) দর। এর প্রভাবে অস্থির হয়ে উঠেছে ভারত, চিন থেকে শুরু করে ইউরোপ ও আমেরিকার অর্থনীতি। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এই পরিস্থিতি বজায় থাকলে অচিরেই মুদ্রাস্ফীতির কবলে পড়বে দুনিয়ার প্রায় প্রতিটা দেশ। সে ক্ষেত্রে ঘরোয়া বাজারে দামি হবে যাবতীয় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। আর তাই হরমুজ় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েলের উপর বাড়ছে চাপ।

০৫ ১৮

এই পরিস্থিতিতে খনিজ তেলের সরবরাহ বজায় রাখতে বাব এল মান্দেব নামের প্রণালীকে আঁকড়ে ধরেছে সৌদি আরব। কৌশলগত দিক থেকে এর অবস্থান হরমুজের থেকেও জটিল। সংশ্লিষ্ট সামুদ্রিক রাস্তাটি লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরকে সংযুক্ত করেছে। এর এক দিকে রয়েছে আরব উপদ্বীপের ইয়েমেন। অপর অংশটি ‘আফ্রিকার শিং’ বা ‘হর্ন অফ আফ্রিকা’ নামে পরিচিত। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাব এল মান্দেবের বাইপাস পথে তেল সরবরাহ শুরু হলে উত্তপ্ত হবে ওই এলাকাও, বলছেন দুনিয়ার তাবড় প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।

০৬ ১৮

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, দক্ষিণ ইউরোপের ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে লোহিত সাগরকে সংযুক্ত করেছে মিশরের সুয়েজ় খাল। একে এশিয়া ও ইউরোপের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ‘লাইফলাইন’ বলা যেতে পারে। কিন্তু, সমস্যা হল সুয়েজ়ে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে বাব এল মান্দেব দিয়ে যেতে হবে পণ্যবাহী জাহাজকে। সংঘর্ষের মধ্যে সেই পথ বন্ধ করার ছক কষছে ইরান মদতপুষ্ট ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। এ ছাড়া আফ্রিকার দিক থেকে মাঝেমধ্যেই সেখানে সক্রিয় হয়ে ওঠে সোমালিয়ার জলদস্যুরা।

০৭ ১৮

এই তালিকায় তৃতীয় নাম অবশ্যই মলাক্কা প্রণালী। আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ থেকে এর দূরত্ব মেরেকেটে ৬০০ কিলোমিটার। ভারত মহাসাগর এবং দক্ষিণ চিন সাগরের মধ্যবর্তী সরু এই জলপথটির উত্তরে আছে মালয় উপদ্বীপ আর দক্ষিণে সাবেক সুমাত্রা (বর্তমান নাম ইন্দোনেশিয়া)। এ-হেন মলাক্কার উপর চিনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশ নির্ভরশীল। পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট রাস্তা দিয়ে ৮০ শতাংশ কাঁচা তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করে থাকে বেজিং।

০৮ ১৮

আর তাই ড্রাগনের কাছে মলাক্কা প্রণালী অত্যন্ত সংবেদনশীল। গত কয়েক বছরে এর বিকল্প রাস্তা পেতে একাধিক চেষ্টা চালিয়েছে বেজিং। সেই লক্ষ্যে ইসলামাবাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তৈরি করছে ‘চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক বারান্দা’ বা সিপিইসি (চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর)। যদিও এতে এখনও আসেনি সাফল্য। উল্টে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরে ‘দৌরাত্ম্যের’ বদনাম লেগেছে তাদের ‘পিপল্‌স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ নৌবাহিনীর গায়ে।

০৯ ১৮

এ-হেন পরিস্থিতিতে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে চাইছে চিন। বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়াতে পারে বেজিং। তা ছাড়া নয়াদিল্লির সঙ্গেও রয়েছে ড্রাগনের দীর্ঘ দিনের পুরনো সীমান্ত সংঘাত। সে ক্ষেত্রে ইরানি কায়দায় সংঘাত পরিস্থিতিতে মলাক্কা প্রণালী অবরুদ্ধ করবে এ দেশের নৌবাহিনী। আর তাতে ভেঙে পড়তে পারে মান্দারিনভাষীদের অর্থনীতি।

১০ ১৮

ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে থাকা পক প্রণালীও কম গুরুত্বপূর্ণ ‘চোক পয়েন্ট’ নয়। বঙ্গোপসাগর এবং মান্নার উপসাগরকে সংযুক্ত করেছে ওই সরু সামুদ্রিক রাস্তা। এর মধ্যে বিন্দুর মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ২৮৫ একর (প্রায় ১.৯ বর্গকিলোমিটার) আয়তনের একটি দ্বীপ, নাম কচ্চতীবু। এর থেকে তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমের দূরত্ব কম-বেশি ৩০ কিলোমিটার। দ্বীপটির খুব কাছেই রয়েছে উত্তর শ্রীলঙ্কার জাফনা এলাকার নেদুনথিভু। এই কচ্চতীবুকে নিয়ে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে পারদ চড়ছে বললে অত্যুক্তি হবে না।

১১ ১৮

১৭৫৭ সালের পলাশির যুদ্ধের পর ধীরে ধীরে ভারতে সাম্রাজ্য বিস্তার শুরু করে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। গোটা ১৮ শতক ধরে তা চালিয়ে গিয়েছিলেন ইংরেজ বণিকেরা। এই সময়কালে তামিলনাড়ুও চলে যায় ব্রিটিশদের দখলে। ফলে কচ্চতীবুর দখল পায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। পরবর্তী কালে প্রশাসনিক সুবিধার কথা চিন্তা করে মাদ্রাজ (বর্তমান চেন্নাই) প্রেসিডেন্সির আওতায় পক প্রণালীর দ্বীপটিকে রেখেছিলেন তাঁরা।

১২ ১৮

তবে বড়লাট (পড়ুন ভাইসরয়) লর্ড চেমসফোর্ডের আমলে জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ড (১৯১৯ সাল) এবং মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলনকে (১৯২০-’২২ সাল) কেন্দ্র করে উত্তাল হয় সারা ভারত। এর মধ্যেই প্রশাসনিক সুবিধার দোহাই দিয়ে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি থেকে কচ্চতীবুকে বিচ্ছিন্ন করে সিলোনের সঙ্গে পক প্রণালীর দ্বীপটিকে জুড়ে দেন তিনি। ১৯২১ সালের মধ্যে তা পুরোপুরি ভাবে চলে যায় কলম্বোর নিয়ন্ত্রণে।

১৩ ১৮

কিন্তু, ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় ফের ওই দ্বীপটিকে নয়াদিল্লির কাছে ফিরিয়ে দেয় ইংরেজ সরকার। ওই সময় ব্রিটিশদের যুক্তি ছিল, প্রশাসনিক সুবিধার জন্য কচ্চতীবুকে সিলোনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু, এটি প্রকৃতপক্ষে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির অংশ। আর তাই এর নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ভাবে দিল্লির পাওয়ার অধিকার রয়েছে, কলম্বোর নয়।

১৪ ১৮

অন্য দিকে, শ্রীলঙ্কায় ব্রিটিশ শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৪৮ সালে। এর পরই কচ্চতীবু দ্বীপটির উপর অধিকার দাবি করে বসে কলম্বো। শুধু তা-ই নয়, এই নিয়ে দুই দেশের মৎস্যজীবীদের মধ্যে বাড়তে থাকে বিরোধ। এই পরিস্থিতিতে সমস্যা সমাধানে ১৯৬৮ সালে ভারত সফর করেন শ্রীলঙ্কার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডুডলি সেনানায়েকে। ইন্দিরা গান্ধীর কাছে সরাসরি পক প্রণালীর দ্বীপটি চেয়ে বসেন তিনি। দু’তরফে শুরু হয় আলোচনা, যা চলেছিল টানা ছ’বছর।

১৫ ১৮

১৯৭৪ সালের জুনে কচ্চতীবু নিয়ে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েকের সঙ্গে একটি চুক্তি করেন ইন্দিরা গান্ধী। সেই সমঝোতামাফিক দ্বীপটির অধিকার পায় কলম্বো। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট চুক্তিতে পক প্রণালী এবং রাম সেতুর অন্তর্বর্তী এলাকায় সামুদ্রিক সীমান্ত নির্ধারণের প্রক্রিয়াও আনুষ্ঠানিক ভাবে সেরে ফেলে দুই প্রতিবেশী। ১৯৭৬ সালে দুই দেশের মধ্যে আরও একটি চুক্তি সম্পন্ন হয়। সেখানে সংশ্লিষ্ট দ্বীপে যাওয়ার অধিকার পান ভারতীয় মৎস্যজীবীরা।

১৬ ১৮

যদিও বন্দরনায়েক কুর্সি হারানোর পর নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে সীমান্ত বিবাদ। এ দেশের মাছশিকারিদের অভিযোগ, কচ্চতীবুতে যাওয়ার আইনগত অধিকার থাকা সত্ত্বেও তাঁদের উপর ‘দৌরাত্ম্য’ চালিয়ে থাকে লঙ্কার নৌবাহিনী। এর জেরে ট্রলার-সহ প্রায়ই আটক হতে হয় তাঁদের। অন্য দিকে কলম্বোর পাল্টা দাবি, সংশ্লিষ্ট দ্বীপ এবং তার আশপাশের এলাকা তাঁদের জলসীমার অন্তর্গত। অথচ সেখানে ঢুকে অহরহ মাছ শিকার করছেন ভারতীয় মৎস্যজীবীরা। সেই কারণেই বাধ্য হয়ে গ্রেফতার করতে হচ্ছে তাঁদের।

১৭ ১৮

সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ মনে করেন, কচ্চতীবুকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে যুদ্ধে জড়াতে পারে ভারত ও শ্রীলঙ্কা। যদিও কূটনৈতিক পথে অবশ্যই এর সমাধানের চেষ্টা করবে দিল্লি। এ ছাড়া জ়িব্রাল্টার প্রণালীকে কেন্দ্র করে ব্রিটেন এবং স্পেনের মধ্যে পুরনো বিবাদ রয়েছে। পূর্ব ভূমধ্যসাগর এবং পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগরকে যুক্ত করেছে ওই সামুদ্রিক রাস্তা। ১৭১৩ সালে একটি চুক্তির মাধ্যমে এর নিয়ন্ত্রণ পায় ইংরেজ নৌবাহিনী, যা কখনওই মেনে নেয়নি মাদ্রিদ।

১৮ ১৮

সুমেরু এবং প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝের বেরিং প্রণালীও আগামী দিনে উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। জায়গাটার এক দিকে আছে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা এবং অপর দিকে রাশিয়া। তাপমাত্রা কম থাকার দরুন বছরের অধিকাংশ সময়েই জমে থাকে বেরিঙের জল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব উষ্ণায়নের জেরে ধীরে ধীরে গলছে সেখানকার বরফ। ফলে সংশ্লিষ্ট রুটে আনাগোনা বেড়েছে চিনা রণতরীর, যা সংঘাত ডেকে আনবে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকদের একাংশ।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement