স্বাধীনতার আগে ভারতকে ব্রিটিশমুক্ত করতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন ভারতের বীর বিপ্লবীরা। ফলস্বরূপ, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরাজের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছিল ভারত। স্বাধীন হয় দেশ।
ভারতের স্বাধীনতা লাভের ৭৮ বছর পেরোনোর পর আবার ব্রিটেনের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করলেন মধ্যপ্রদেশের এক ব্যক্তি! অবিশ্বাস্য মনে হলেও এই ঘটনা সত্যি।
মধ্যপ্রদেশের সীহোরের ৬৩ বছর বয়সি বিবেক রুথিয়ার দাবি, ১৯১৭ সালে ব্রিটিশদের ৩৫,০০০ টাকা ধার দিয়েছিলেন তাঁর দাদু। সেই টাকা কখনও শোধ দেয়নি ব্রিটিশ সরকার। ফলে বকেয়া টাকার অঙ্ক কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে বিবেকের দাবি। আর সেই টাকা আদায়ের জন্যই ব্রিটেনের সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করার চিন্তাভাবনা করছেন তিনি।
বিবেক জানিয়েছেন, সম্প্রতি পারিবারিক নথি খোঁজার সময় ঋণপত্রটি খুঁজে পেয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘আমার দাদু দানধ্যানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকারকে ঋণ দেন। তবে সেই টাকা কখনও ফেরত পাননি। আমার বাবা কখনও সেই টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করেননি। তবে আমি আইনি পথে চেষ্টা চালাচ্ছি। আইনের নিয়মেই আমি সুদসমেত টাকা আদায়ের জন্য পদক্ষেপ করব।’’
পৈতৃক জমি এবং গয়নার ভাগ নিয়ে ঘরে ঘরে বিবাদ এখন যেখানে সাধারণ বিষয় হয়ে উঠেছে, সেখানে সীহোরের রুথিয়া পরিবারের সকলে বসেছেন ১০৯ বছরের পুরনো নথি নিয়ে। সেই নথির ধুলোবালি পরিষ্কার করে রুথিয়া পরিবার দেখেছে ব্রিটিশদের ৩৫ হাজার টাকা ধার দিয়েছিলেন পরিবারেরই সদস্য এবং বিবেকের দাদু জুম্মালাল রুথিয়া।
হিসাবের খাতা এবং অন্যান্য নথি বলছে, নামী ব্যবসায়ী শেঠ জুম্মালাল ১৯১৭ সালের ৪ জুন ভোপালের তৎকালীন রাজনৈতিক এজেন্ট ডব্লিউএস ডেভিসকে ওই টাকা ধার দিয়েছিলেন। রুথিয়া পরিবার মনে করছে, ১০৯ বছর ধরে ৫.৫ শতাংশ বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি সুদের হারে হিসাব করলে সুদসমেত ব্রিটেনের থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকা প্রাপ্য তাঁদের।
বহু দাতব্য কাজ এবং সামাজিক অবদানের জন্য সীহোর শহরে সুপরিচিত নাম রুথিয়ারা। শেঠ জুম্মালাল ছিলেন নামকরা ধনী। কাপড় এবং শস্যের ব্যবসা ছিল তাঁর। সে সময় বেশ কয়েকটি স্কুল এবং হাসপাতালও নির্মাণ করেছিলেন তিনি।
রুথিয়া পরিবারের সংরক্ষিত একটি শংসাপত্র অনুযায়ী, ‘শেঠ রমাকিষণ জসকরণ রুথিয়া ফার্ম’-এর তৎকালীন মালিক শেঠ জুম্মালাল ‘ভারতীয়দের সঙ্গে যুদ্ধে ইংরেজদের ৩৫,০০০ টাকা ধার দিয়েছিলেন এবং সেই টাকা ধার দিয়ে ব্রিটিশ সরকার এবং সাম্রাজ্যের প্রতি তাঁর আনুগত্য দেখিয়েছিলেন’। সেই নথিতে ভোপালের রাজনৈতিক এজেন্ট হিসাবে ডব্লিউএস ডেভিসের স্বাক্ষরও রয়েছে।
কিন্তু সেই ধারের টাকা কোনও দিন ফেরত আসেনি পরিবারে। ১৯৩৭ সালে জুম্মালাল মারা যান। পরিবারের অনেকেই তাঁর দেওয়া ধারের কথা জানতেন না। ফলে পরবর্তী প্রজন্মের কারও মাথায় টাকা ফেরত চাওয়ার বিষয়টি আসেনি।
তবে এ বার সেই টাকা আদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন শেঠ জুম্মালালের ৬৩ বছর বয়সি নাতি বিবেক। ইতিমধ্যেই টাকা ফেরত চেয়ে তিনি ব্রিটেনের দ্বারস্থ হওয়ার বিষয়ে মনস্থির করেছেন বলে জানা গিয়েছে।
রুথিয়া পরিবারের মতে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তীব্র আর্থিক সঙ্কটের মুখোমুখি হয় ব্রিটিশ সরকার। অনেক টাকার দরকার হয়ে পড়েছিল তাদের। সেই সময় স্থানীয় প্রশাসন নাকি অর্থসাহায্য চেয়ে শেঠ জুম্মালালের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। জুম্মালালও নাকি সাহায্য করতে রাজি হয়েছিলেন এবং ওই টাকা দিয়েছিলেন ব্রিটিশদের।
বিনিময়ে ব্রিটিশ কর্তারা ঋণ পরিশোধের আশ্বাস দিয়ে লিখিত নথিপত্র জারি করেছিলেন বলেও দাবি। তবে ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সেই ঋণ শোধ করা হয়নি। ফলে সুদসমেত টাকার অঙ্ক এখন কয়েক কোটি।
তাই এখন আন্তর্জাতিক আইনের পরিধি বুঝতে এবং ঔপনিবেশিক যুগে আর্থিক দায়বদ্ধতার জন্য একটি সার্বভৌম সরকারকে দায়ী করা যেতে পারে কি না তা বোঝার জন্য আইনজীবীদের সঙ্গে শলাপরামর্শ শুরু করেছেন বিবেক।
যদিও বিষয়টি নিয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও আইনি নোটিস জারি করা হয়নি। তবে বিবেক জানিয়েছেন, বর্তমান ব্রিটেন সরকারের কাছ থেকে ঔপনিবেশিক সময়ের ধার দেওয়া অর্থ দাবি করা যেতে পারে কি না তা জানতে আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলছেন তিনি।
তবে আইন বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন, ওই টাকা আদায় খুব সহজ হবে না। কারণ, এই ধরনের যে কোনও দাবি আইনি বাধার সম্মুখীন হবে। এ ছাড়া আরও অনেকগুলি জটিল বিষয় রয়েছে। আপাতত, ১৯১৭ সালের ঋণপত্রটি পরিবারের কাছে একটি ঐতিহাসিক দলিল হিসাবে গচ্ছিত রেখেছেন রুথিয়ারা।
ডেভিসের মতো ব্রিটিশ কর্তাদের দায়িত্ব ছিল স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে স্থানীয় শাসকদের সামঞ্জস্যও বজায় রাখতেন এঁরা। শাসন সংক্রান্ত বিষয়গুলিও তদারকি করতেন। ইতিহাসবিদেরা উল্লেখ করেছেন, একসময় ভোপালে সেই দায়িত্বে ছিলেন ডেভিস।
ইতিহাসবিদদের অনেকে এ-ও জানিয়েছেন, ডেভিস যে ভোপালে শুধু সরকারের হয়ে দায়িত্বে ছিলেন তা নয়, মধ্যপ্রদেশের ওই অঞ্চলের সঙ্গে গভীর সংযোগ তৈরি হয়েছিল তাঁর। ১৯১৮ সালে সুলতান জাহান বেগমের জীবনী ‘হায়াত-ই-কুদসি: লাইফ অফ দ্য নবাব গওহর বেগম’ অনুবাদ করেছিলেন তিনি।