সংসারে ছিল নুন আনতে পান্তা ফুরনোর মতো পরিস্থিতি। ছোটবেলা থেকে অর্থাভাবে দিন কাটিয়ে অর্থের মূল্য বুঝেছিলেন নারায়ণ পূজারী। কাঁধে যখন সংসারের খরচ বহন করার দায়িত্ব পড়ে, তখন উপার্জনের স্বপ্ন নিয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে পাড়ি দিয়েছিলেন অন্য রাজ্যে।
কর্নাটকের উদিপি জেলার ছোট্ট একটি গ্রামে জন্ম নারায়ণের। বাবা-মায়ের সঙ্গে সেখানেই থাকতেন তিনি। অর্থাভাবের কারণে বেশি দূর পড়াশোনা হয়নি তাঁর। বরং কম বয়সেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।
উপার্জনের জন্য স্কুলের পড়াশোনা মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে গ্রামের বাড়ি ছেড়ে ‘স্বপ্নের নগরী’ মুম্বইয়ে চলে যান নারায়ণ। বড় শহরে রোজগারের উপায় সহজে পেয়ে যাবেন, এমনটাই ভেবেছিলেন তিনি। কিন্তু তা যে সহজ ছিল না, দিন কয়েকের মধ্যেই বুঝতে পারলেন নারায়ণ।
বাড়ি ছাড়ার সময় পকেটে ছিল মাত্র ৩৫ টাকা। নামমাত্র টাকায় দিন গুজরান সম্ভব ছিল না তাঁর। উপায় না পেয়ে রাস্তার ধারের হোটেলে টেবিল মোছার কাজ শুরু করেন তিনি।
টেবিল মোছা, বাসন মাজা থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে খাবার পরিবেশনের কাজও শুরু করেন নারায়ণ। রোজগারের পথ খুলে গেলেও শিক্ষাগত যোগ্যতা কম থাকায় কেরিয়ারের দৌড়ে মুখ থুবড়ে পড়তে হবে, তা বুঝে গিয়েছিলেন তিনি।
হোটেলে কাজের পাশাপাশি একটি স্কুলে ভর্তি হন নারায়ণ। দিনে কাজকর্ম এবং রাতে পড়াশোনা— এ ভাবেই দিন কাটত তাঁর। মুম্বইয়ে থাকাকালীন পণ্যবাহী জাহাজের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে তিনি বাইরের জগৎ সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে পড়েন। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর খিদে আরও বাড়তে থাকে তাঁর।
হোটেলের চাকরি ছেড়ে মুম্বইয়ের ব্যস্ত পাড়ায় আইসক্রিমের দোকান খোলেন নারায়ণ। সেই দোকানে নারায়ণ ছাড়া দ্বিতীয় কোনও কর্মী ছিলেন না। প্রতি দিন আইসক্রিম বিক্রি করে ভালই উপার্জন হত তাঁর।
একদিন নারায়ণের দোকানে আইসক্রিম খেতে খেতে এক ক্রেতা নারায়ণকে বলেছিলেন, ‘‘আপনি তো পাও ভাজিও বিক্রি করতে পারেন। বিক্রিবাটা আরও বেশি হবে।’’ তাঁর কথা মনে ধরে নারায়ণের।
আইসক্রিমের পাশাপাশি পাও ভাজি বিক্রি করতে শুরু করেন নারায়ণ। রাতারাতি তাঁর রোজগারের পরিমাণ বেড়ে যায়। ক্রেতার সংখ্যাও বাড়তে থাকে।
ক্রেতাদের ভিড় দেখে পাও ভাজির পাশাপাশি পিৎজ়া এবং নানা ধরনের মুখরোচক খাবার পরিবেশন করতে শুরু করেন নারায়ণ। আকারে-আয়তনে বাড়তে শুরু করে তাঁর দোকান।
মু্ম্বইয়ের একটি ছোট দোকান থেকে যাত্রা শুরু হয় নারায়ণের। খাবার নিয়েই ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন তিনি। মুম্বইয়ের অন্য জায়গায়ও একই নামে দোকান খুলতে শুরু করেন।
স্থানীয়দের অধিকাংশের দাবি, তাঁর রেস্তরাঁয় গিয়ে পাও ভাজি এক বার চেখে দেখলে সেই স্বাদ বহু দিন জিভে লেগে থাকে। পরবর্তী কালে দক্ষিণী খাবারের উপরেও জোর দিতে শুরু করেন নারায়ণ।
মুম্বইয়ের পাশাপাশি পুণে এবং অহমদাবাদেও রেস্তরাঁ খুলে ফেলেন নারায়ণ। বড় মাপের তারকাদের পছন্দের তালিকায়ও নাম রয়েছে তাঁর রেস্তরাঁর।
এককালে পকেটে মাত্র ৩৫ টাকা নিয়ে মুম্বই গিয়েছিলেন নারায়ণ। পরিশ্রমের মাধ্যমে স্বপ্নপূরণ করেছেন তিনি। বর্তমানে ব্যবসা থেকে কোটি কোটি টাকা উপার্জন নারায়ণের।
সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, রেস্তরাঁ থেকে বার্ষিক ৭৫ কোটি টাকা আয় করেন নারায়ণ। এর পাশাপাশি আতিথেয়তা বিষয়ক পরিষেবা সংস্থাও গড়ে তুলেছেন তিনি।