পরমাণু হামলা হোক বা ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা পৃথিবীর শেষের দিন। সহজ কথায় পৃথিবী ধ্বংসের মুখোমুখি হলেও নিজেদের প্রাণ যাতে বিপন্ন না হয় তার ব্যবস্থা করে রাখছেন বিশ্বের তাবড় ধনকুবেররা। পৃথিবীতে চরম সঙ্কট উপস্থিত হলে প্রাণ বাঁচাতে বাঙ্কারে আশ্রয় নেবেন তাঁরা।
মহাপ্রলয়ের ধারণাকে উড়িয়ে দিচ্ছেন না ধনপতিরা। বিশেষত সিলিকন ভ্যালির ধনী অভিজাতেরা। ডুমস্ডে বা শেষের সে দিনকে একটি গুরুতর হুমকি হিসাবেই দেখছেন তাঁরা। সমগ্র মানবজাতির সম্ভাব্য ধ্বংসের দিনের প্রস্তুতি হিসাবে বাঙ্কার তৈরি করছেন এক এক জন ধনকুবের প্রযুক্তিবিদ।
পারমাণবিক যুদ্ধ, মহামারি বা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকে তাঁরা নিজেদের এবং পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে চান। কৃত্রিম মেধা এবং উচ্চ মানের প্রযুক্তি দিয়ে বিশ্বের জনগণের সেবা করে বাহবা কুড়িয়েছেন তাঁরা। আবার এঁরা সেই পরিষেবারই সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে নিজেরাই আগেভাগে সচেতন ও সতর্ক।
যাঁরাই বেশি করে কৃত্রিম মেধা ও বুদ্ধিমত্তার হয়ে সওয়াল করছেন সেই সব পরিচিত ধনকুবেরই নিজেদের সুরক্ষার জন্য মাটির নীচে বাঙ্কার তৈরি করে রাখছেন। উদ্দেশ্য, অদূর ভবিষ্যতে যে কোনও অনভিপ্রেত পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে যাতে নিরাপদ আশ্রয়ে ঢুকে পড়া যায়।
সামরিক বাহিনীতেই এই বাঙ্কার শব্দটি বেশি প্রচলিত। শত্রুর আক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে কৌশলগত কারণেই বাঙ্কারে আশ্রয় নেন সামরিক বাহিনীর সদস্যেরা। ধনকুবেরদের বাঙ্কারের প্রয়োজনীয়তা অবশ্য অন্য। মানবগ্রহে সঙ্কট উপস্থিত হলে ধনী এবং ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা জনগণের দুর্ভোগ থেকে অনেক দূরে নিরাপদ জায়গায় থেকে সেই ধ্বংসের সাক্ষী হবেন। সেই জন্যই এই বিশাল কর্মকাণ্ড চলছে বিশ্ব জুড়ে।
‘ডুমস্ডে বাঙ্কার’ তৈরির তালিকায় রয়েছেন সিলিকন ভ্যালির রথী-মহারথীরা। সবচেয়ে পরিচিত নামগুলিই ভূগর্ভস্থ আশ্রয়স্থল বানানোর ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছেন। এঁদের মধ্যে রয়েছেন মেটার সিইও মার্ক জ়ুকেরবার্গ, ওপেন এআইয়ের কর্তা স্যাম অল্টম্যান, ওরাকলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ-সহ রিড হফম্যান, বিল গেটস, অপরাহ উইনফ্রে, রিচার্ড ব্র্যানসন।
এঁরা সকলেই ‘অ্যাপোক্যালিপস ইনশিয়োর্যান্স’-এর সপক্ষে সওয়াল করেছেন। অনেক শীর্ষস্থানীয় কম্পিউটার বিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তিবিদেরা অনেক দিন ধরেই আশঙ্কা করছেন যে কৃত্রিম মেধার উপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ফলে সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেবে, যা মানবসভ্যতাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে।
তাই বহু বিজ্ঞানীই মনে করছেন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা নিজেদের এমন একটি ভবিষ্যৎ তৈরি করতে চাইছেন যেখানে তাঁদের টিকির নাগালও পাওয়া যাবে না। শুধু ধনকুবেররাই নন, আমেরিকার অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নাগরিক এই পূর্বপ্রস্তুতির কথা স্বীকার করেছেন। এমনকি ফ্ল্যাট বা জমির মাপে ভূগর্ভস্থ আশ্রয়স্থল কিনছেন বহু সাধারণ মার্কিন নাগরিক।
মেটার সিইও মার্ক জ়ুকেরবার্গ হাওয়াইয়ে ১০ কোটি ডলারের একটি বিশাল কম্পাউন্ড তৈরি করছেন। সেখানেই তিনি তৈরি করছেন একটি বিশাল বাঙ্কার। জ়ুকেরবার্গ হাওয়াইয়ের দ্বীপ কাউয়াইতে একটি ডুমস্ডে বাঙ্কার তৈরি করছেন বলে জানা গিয়েছে। হাওয়াই দ্বীপের উত্তর-পূর্বে কাপা এবং হানালেইয়ে মাঝে উঁচু প্রাচীর ঘেরা বিশাল জমি। সেখানেই ২০১৪ সাল থেকে তৈরি হচ্ছে গোপন আস্তানা।
ওয়ার্ড ম্যাগাজ়িনের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, মেটাকর্তার স্বপ্নের এই প্রকল্পটি ১,৪০০ একর জমির উপর তৈরি করা হচ্ছে। শতাধিক নির্মাণকর্মী এর সঙ্গে যুক্ত। তাঁরা এখানে কী কাজ করছেন, সেই নিয়ে মুখ খোলার অনুমতি নেই। সেই শর্তেই তাঁদের কাজে নেওয়া হয়েছে। নির্মাণস্থলের ছবি যদি কেউ প্রকাশ করেন, তা হলেও রয়েছে শাস্তি।
এই জমিতে নির্মাণের জন্য জ়ুকেরবার্গের খরচ পড়ছে ১০ কোটি আমেরিকান ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৯০০ কোটি টাকা। প্রাচীরঘেরা জমিতে বিশাল প্রাসাদ তৈরি হচ্ছে। অত্যাধুনিক অট্টালিকা, গাছ-বাড়ি ছাড়াও থাকবে পাঁচ হাজার বর্গমিটারের ভূগর্ভস্থ আশ্রয়স্থল বা বাঙ্কার। সেই বাঙ্কারে বহু দিন থাকার জন্য রয়েছে একাধিক ঘর। রয়েছে আলাদা একটি যন্ত্রপাতির ঘরও।
এই সম্পত্তিটি ছাড়াও ক্যালিফোর্নিয়ার পালো আল্টোর ক্রিসেন্ট পার্ক এলাকায় ১১টি সম্পত্তির জন্য জ়ুকেরবার্গ ১১ কোটি ডলার ব্যয় করেছেন। তিনি ৭,০০০ বর্গফুট বিস্তৃত একটি ভূগর্ভস্থ স্থান তৈরি করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাঁর প্রতিবেশীরা একে ‘ধনকুবেরের বাদুড়ের গুহা’ বলেন। এই কম্পাউন্ডের নীচে গত আট বছর ধরে চলছে বেসমেন্ট তৈরির কাজ। বিস্তৃত ওই বেসমেন্ট তৈরির কাজে দিনরাত বিশাল বিশাল মালবোঝাই ট্রাকের যাওয়া-আসা লেগেই থাকে।
এই তথাকথিত বাঙ্কার নির্মাণের সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্য হল নিউ জ়িল্যান্ড। ওপেনএআই-এর প্রধান স্যাম অল্টম্যান প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন যে, যদি বিশ্বব্যাপী কোনও দুর্যোগ আসে, তা হলে তিনি নিউ জ়িল্যান্ডের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিশাল জমিতে বাঙ্কার তৈরি করবেন। তাঁর এই পরিকল্পনায় পাশে পেতে চান জার্মান-আমেরিকান উদ্যোগপতি এবং পেপ্যালের সহ-প্রতিষ্ঠাতা পিটার থিয়েলকে।
ইলন মাস্ক টেক্সাসের অস্টিনের ঠিক বাইরে সাড়ে তিন লক্ষ ডলারের একটি বিশাল সম্পত্তি কিনেছেন, যা ৪ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। এই সম্পত্তিতে তাঁর ১২ সন্তানের জন্য একাধিক বাড়ি, তাঁদের মায়েদের জন্য আরও তিনটি সম্পত্তি এবং প্রচুর জায়গাজমি রয়েছে।
যদিও মাস্ক ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নন। এ বিষয়ে টেসলা কর্তার মত, যদি পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যায়, তা হলে তিনি তাঁর পরিবারকে নিয়ে মঙ্গল গ্রহে আশ্রয় নেবেন।
কিম কার্দাশিয়ান, শাকিল ও’নিল এবং টম ক্রুজ়ের মতো তারকারা তাঁদের বাড়ির ভিতরে নিজস্ব বাঙ্কার বা নিরাপদ কক্ষ তৈরি করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এই বিলাসবহুল বাঙ্কারগুলিতে এমন ব্যবস্থা রয়েছে যা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কল্পনারও অতীত।