Cartel Leader El Mencho

স্নাইপার, রকেট, গ্রেনেড, সাঁজোয়া যানে সজ্জিত বাহিনী! নিজস্ব ‘মিলিটারি’ দিয়ে মেক্সিকো শাসন করতেন মাদকসম্রাট

অন্যতম শক্তিশালী অপরাধী সংগঠন এবং বিশ্বব্যাপী মাদকপাচারের এই দলটি একটি সমান্তরাল প্রশাসন চালিয়ে গিয়েছে পশ্চিম মেক্সিকো জুড়ে। মেঞ্চো তাঁর সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব কায়দাতেই। সুসজ্জিত বাহিনী তৈরি করা হয়েছিল কার্টেলের অভ্যন্তরে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:২৭
Share:
০১ ১৮

জ়ালিস্কো পাহাড়ে তখন সবে ভোরের আলো ফুটছে। জ়ালিস্কোর রাজধানী গুয়াদালাজারায় গোপন সেনা অভিযান হয় মেক্সিকোর কুখ্যাত মাদকসম্রাটের বিরুদ্ধে। রবিবার গোপন ডেরায় সামরিক অভিযানে মেক্সিকোর সেনাবাহিনীর সদস্যেরা নিকেশ করেছেন নেমেসিয়ো ওসেগুয়েরা ওরফে এল মেঞ্চোকে। মেঞ্চোর মৃত্যুর মাধ্যমে শেষ হল তাঁর ‘শাসনকালের’। ‘জ়ালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেল’ (সিজেএনজি)-র নেতা নেমেসিয়ো নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েও দিয়েছে মেক্সিকো সরকার।

০২ ১৮

মেঞ্চোর অবস্থান সম্পর্কে মেক্সিকোকে অবহিত করে আমেরিকার বিশেষ সামরিক টাস্ক ফোর্স, ‘জয়েন্ট ইন্টারএজেন্সি টাস্ক ফোর্স-কাউন্টার কার্টেল (জেআইটিএফ-সিসি)’। তা না হলে এই অভিযানের সাফল্য অনেকটাই মাঠে মারা যেত। মার্কিন গোয়েন্দাদের থেকে তথ্য পাওয়ার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন মেক্সিকো কর্তৃপক্ষও।

Advertisement
০৩ ১৮

মেঞ্চোর মৃত্যু মেক্সিকো এবং আমেরিকা দুই দেশকেই স্বস্তি এনে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। মার্কিন-মেক্সিকো সীমান্ত জুড়ে পরিচালিত মাদক কার্টেলগুলির মধ্যে ৫৯ বছর বয়সি এল মেঞ্চোর দলবল নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাত মেক্সিকো প্রশাসনকে, এমন গুঞ্জন ছিল দেশ জুড়ে। জ়ালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেল (সিজেএনজি)-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং শীর্ষনেতা মেঞ্চো ছিলেন লাটিন আমেরিকার এই দেশটির মোস্ট ওয়ান্টেডের তালিকার উপরের দিকে।

০৪ ১৮

মেক্সিকোর অন্যতম শক্তিশালী অপরাধী সংগঠন এবং বিশ্বব্যাপী মাদকপাচারের এই দলটি একটি সমান্তরাল প্রশাসন চালিয়ে গিয়েছে পশ্চিম মেক্সিকো জুড়ে। আঞ্চলিক দল হিসাবে উত্থান হলেও ধীরে ধীরে নিজস্ব সামরিক বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন মেঞ্চো। মেক্সিকোর অপরাধজগতে তাঁর সীমাহীন প্রতিপত্তি ছিল। প্রভাব ছিল রাজনীতিতেও।

০৫ ১৮

একসময় মেক্সিকো পুলিশের দুঁদে অফিসার ছিলেন মেঞ্চো। তাঁর নামে হাঁটু কাঁপত অপরাধীদের। কিন্তু পরবর্তী কালে তিনি নিজেই অপরাধজগতের সঙ্গে ওঠাবসা শুরু করেন। ১৯৯০ সালে মাদকপাচারে হাতেখড়ি হয় মেঞ্চোর। সেখান থেকে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন মেক্সিকোর মাদকপাচারের দুনিয়ার অবিসংবাদী নেতা।

০৬ ১৮

শুধু মাদকপাচারে সিদ্ধহস্ত ছিলেন তেমনটা নয়, খুন, তোলাবাজি, মানবপাচারের মতো গুরুতর অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে ছিল। তাঁর সিজেএনজি কার্টেল বর্তমানে মেক্সিকোর ‘সবচেয়ে শক্তিশালী এবং নির্মম অপরাধী সংগঠন’ হিসাবে বিবেচিত। তিনি দল তৈরি করার পর মাদক কার্টেলের পরিচালন পদ্ধতি সম্পূর্ণ বদলে দেন। স্থানীয় ভাবে ছোট ছোট ‘পকেটে’ ব্যবসা চালানোর পক্ষপাতী ছিলেন না মেঞ্চো।

০৭ ১৮

২০০৭ সালে এরিক ভ্যালেন্সিয়া সালাজ়ার ওরফে ‘এল ৮৫’-এর সঙ্গে যৌথ ভাবে সিজেএনজি কার্টেল তৈরি করেছিলেন মেঞ্চো। সিজেএনজি কার্টেল পরে সিনালোয়া কার্টেল থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং মেক্সিকোর মাদকব্যবসায় সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়। এল মেঞ্চোর নেতৃত্বে মাদকপাচারকারী দলটির নেটওয়ার্ক দ্রুত বিভিন্ন রাজ্যে প্রসারিত হয়ে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সংযোগ তৈরি করে সিজেএনজি কার্টেল। সিনালোয়া কার্টেলের প্রভাব-প্রতিপত্তি কমিয়ে মাথাচাড়া দেয় মেঞ্চোর কার্টেল।

০৮ ১৮

মেঞ্চো তাঁর সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব কায়দাতেই। সুসজ্জিত বাহিনী তৈরি করা হয়েছিল কার্টেলের অভ্যন্তরে। পুলিশে চাকরির সুবাদে বহু প্রাক্তন পুলিশ আধিকারিক ও প্রাক্তন সেনাসদস্যকে দলে টেনে নিয়েছিলেন মেক্সিকান ড্রাগ মাফিয়া।

০৯ ১৮

এই দলের সদস্যেরা যোদ্ধার মতো প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতেন এবং সমন্বিত ইউনিটের মতো কাজ করতেন। যখন নেতৃত্বের সঙ্কট দেখা দেয়, তখন তাৎক্ষণিক প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সংগঠনটির প্রশিক্ষিত যোদ্ধারা রাস্তায় নেমে পড়েন। এর উদাহরণ প্রত্যক্ষ করেছে মেক্সিকো।

১০ ১৮

মেঞ্চোর মৃত্যুর খবরে দেশ জুড়ে অশান্তি শুরু হয়েছে। আগুন জ্বলছে মেক্সিকোর একাধিক প্রদেশে। মেঞ্চোর অনুগামীরা দেশের নানা প্রান্তে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেছেন। আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে একাধিক গাড়ি এবং দোকানে। হিংসার কারণে সোমবার বেশ কয়েকটি প্রদেশে স্কুল বন্ধ রাখা হয়। আতঙ্কিত মানুষজন প্রাণভয়ে গুয়াদালাজারা বিমানবন্দর দিয়ে ছুটে পালানোর চেষ্টা করেন। পর্যটন শহর পুয়ের্তো ভালার্তার আকাশে ছিল শুধু ধোঁয়ার কুণ্ডলী।

১১ ১৮

২০১৫ সালে এক বার মেক্সিকো সেনার তাড়া খেয়ে ফাঁদে পড়া ইঁদুরের মতো ছটফট করছিলেন মেঞ্চো। সেই অবস্থায় তাঁকে পালানোর সুযোগ করে দিতে রকেটচালিত গ্রেনেড দিয়ে একটি সামরিক হেলিকপ্টারকে গুলি করে ধ্বংস করে তাঁর বাহিনী। সিজেএনজির সশস্ত্র ইউনিটগুলিকে নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় কমান্ড তৈরি করেছিলেন মেঞ্চো। এই দলটির হাতে রয়েছে আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র থেকে শুরু করে সাঁজোয়া যান, বিভিন্ন কৌশলগত সরঞ্জাম, বিস্ফোরক বহনকারী ড্রোন এবং উন্নত বিস্ফোরক।

১২ ১৮

প্রতি বারই পুলিশের গ্রেফতারি এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন মেঞ্চো। বছরের পর বছর ধরে তিনি জ়ালিস্কোর ভিতরে নিজের সাম্রাজ্য পরিচালনা করে গিয়েছেন নির্ভয়ে। পিঠ বাঁচাতে পুলিশকে টাকা পাঠাতেন। রাজনৈতিক সুরক্ষাও চেয়েছিলেন নেতাদের কাছে। স্থানীয় এলাকায় রাজনৈতিক দলগুলির প্রচারের পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠেছিলেন এই ড্রাগমাফিয়াই।

১৩ ১৮

২০২০ সালের করোনা অতিমারির সময় লকডাউনে সরকারি কর্মীদের নয়, বরং কার্টেলের বন্দুকধারীদের বিতরণ করা সিজেএনজি-স্ট্যাম্প দেওয়া খাবারের প্যাকেটের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন মেক্সিকানরা। সরকারের বিকল্প হিসাবে তাঁকেই বেছে নিয়েছিল আমজনতা।

১৪ ১৮

সিজেএনজি কার্টেল বাহিনীর মতো বেশ কয়েকটি কার্টেলেও নিজেদের মতো করে সামরিক বাহিনী প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে। সিনালোয়া কার্টেলেও রয়েছে সশস্ত্র দল, সাঁজোয়া যান, অত্যাধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম। কার্টেল সামরিকীকরণের পথিকৃৎ বলতে অবশ্য জেটাসের নামই সবার আগে উঠে আসে। বিশেষ বাহিনীর প্রাক্তন সৈন্যদের নিয়ে গঠিত একটি প্রশিক্ষিত বাহিনী রয়েছে এই দলটির।

১৫ ১৮

জেটাসের একটি শাখা কার্টেল দেল নোরেস্টও সংঘর্ষের সময় সাঁজোয়া ট্রাক এবং আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করে থাকে। মেক্সিকোর প্রাচীনতম সংগঠিত অপরাধ গোষ্ঠীগুলির মধ্যে একটি হল উপসাগরীয় কার্টেল বা গাল্‌ফ কার্টেল। সীমান্ত অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষ লেগেই থাকে। সেই সমস্ত সংঘর্ষে সশস্ত্র বাহিনী পাঠায় এই মাদকপাচারকারী দলটি।

১৬ ১৮

জ়ালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেলের উপর নিয়ন্ত্রণের লাগাম টেনে ধরতে পেরেছিলেন এল মেঞ্চো। তাঁর মৃত্যুর পর কোনও যোগ্য উত্তরসূরি নেই। কারণ দলের বেশ কয়েক জন পাণ্ডা বা মাথা ইতিমধ্যেই জেলবন্দি বা মারা গিয়েছেন।

১৭ ১৮

আধা-স্বায়ত্তশাসিত সশস্ত্র বাহিনীগুলি সিজেএনজি আঞ্চলিক ইউনিটগুলির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই গোষ্ঠীগুলি সশস্ত্র, প্রশিক্ষিত এবং সংগঠিত। ফলস্বরূপ, তারা নতুন নির্দেশের জন্য অপেক্ষা না করেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সমন্বিত প্রতিশোধ নিতে মেক্সিকো জুড়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে।

১৮ ১৮

মেক্সিকোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে, তারা আমেরিকার কাছ থেকে গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছিল এই অভিযানের আগে। মেঞ্চোর মৃত্যু-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশে যে হিংসা ও অশান্তির আবহ তৈরি হয়েছে, তা সামলানোই এখন প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।

ছবি: রয়টার্স, সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement