আমেরিকা-ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে চেচনিয়ার একটি সশস্ত্র বাহিনীকে পাশে পেল ইরান। আমেরিকা স্থলযুদ্ধে অবতীর্ণ হলে ইরানকে সমর্থন জোগাবে চেচেন ‘কাদিরোভাইট’ যোদ্ধারা। এমনটাই ইঙ্গিত দিয়েছে রুশপন্থী চেচেন যোদ্ধাদের নেতা।
পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-ইজ়রায়েল-ইরান সংঘাতের উত্তেজনা ক্রমাগত বাড়ছে। মার্কিন ফৌজের স্থল আক্রমণের ঘটনা ঘটলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীকে সমর্থন জানাতে সেখানে মোতায়েন হবেন চেচনীয় যোদ্ধারা। এমন ইচ্ছাই প্রকাশ করেছে চেচেন নেতা রমজান কাদিরভের অনুগত বিশেষ সামরিক ইউনিটগুলি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে মস্কো-সমর্থিত নেতা কাদিরভের নেতৃত্বে চেচনিয়া-ভিত্তিক রুশপন্থী বাহিনীটি ইরানের ওপর সম্ভাব্য মার্কিন স্থল অভিযানের বিরুদ্ধে লড়াই করবে বলে ঘোষণা করেছে। এই লড়াইকে পশ্চিমি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আদর্শগত লড়াই হিসাবে দেখছেন চেচনীয় যোদ্ধারা।
চেচনিয়ার এই সশস্ত্র বাহিনী সম্ভাব্য এই লড়াইকে একটি ‘ধর্মযুদ্ধ’ হিসাবে অভিহিত করেছে। তাদের মতে, এটি হবে ‘ভাল এবং মন্দের’ মধ্যেকার লড়াই। সুন্নি ধর্মমতে বিশ্বাসী হলেও এই লড়াইয়ে শিয়া ধর্মাবলম্বী দেশ ইরানকে রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর চেচনীয় সশস্ত্র সংগঠনগুলি।
আন্তর্জাতিক মহলের মতে ইরানি যোদ্ধাদের সঙ্গে চেচেনের বাহিনী হাতে হাত মিলিয়ে যুদ্ধ লড়লে তার ব্যাপকতা আরও আন্তর্জাতিক রূপ নিতে পারে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, চেচেনরা জড়িয়ে পড়লে এই সংঘাতে আরও বিদেশি যোদ্ধা ও ছায়াযুদ্ধের সঙ্গে জড়িত বাহিনীর জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
শত্রু দেশের ঘরে ঢুকে হামলা চালানোর সলতে পাকাতে শুরু করে দিয়েছে পেন্টাগন। সূত্রের খবর, স্থলপথে ঢুকে ইরান বধের প্রস্তুতি নিচ্ছে আমেরিকা। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট কয়েক জন মার্কিন আধিকারিককে উল্লেখ করে জানিয়েছে, ইরানে ট্রাম্প স্থল অভিযানের অনুমতি দেবেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। নিশ্চিত কোনও নির্দেশ বা ইঙ্গিত এখনও ট্রাম্পের দফতর থেকে আসেনি। তবে প্রস্তুতিতে কোনও খামতি রাখা হচ্ছে না।
ইরানের সঙ্গে সংঘাতের আবহে পশ্চিম এশিয়ায় সেনা মোতায়েন বৃদ্ধি করেছে আমেরিকা। ওই অংশে জলপথে হাজার হাজার নৌসেনা মোতায়েন করা হয়েছে। শোনা যাচ্ছে, আকাশপথে আর কিছু দিনের মধ্যেই প্রচুর মার্কিন জওয়ান পশ্চিম এশিয়ায় পৌঁছোবেন। সাড়ে তিন হাজারের বেশি সৈন্য নিয়ে পশ্চিম এশিয়ায় পৌঁছে গিয়েছে মার্কিন রণতরী ইউএসএস ত্রিপোলি।
মার্কিন সেনারা ইরানের ভূখণ্ডে প্রবেশ করলে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না রাশিয়া মদতপুষ্ট এই কাদিরোভাইট যোদ্ধারা। রাশিয়ার উত্তর ককেশাস অঞ্চলের একটি আধাসামরিক বাহিনী হল কাদিরোভাইট। সংগঠনটি ক্রেমলিনের প্রতি দৃঢ় আনুগত্যের জন্য পরিচিত। ইউক্রেন-সহ বেশ কয়েকটি সংঘাতে তাদের মোতায়েন করেছে মস্কো। চেচনীয় যোদ্ধারা সমরকুশলী এবং বিদ্রোহ দমন অভিযানে প্রশিক্ষিত। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহারেও পারদর্শী।
কাদিরভের অনুসারী এই যোদ্ধারা নিজেদের রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ‘পদাতিক সৈন্য’ হিসাবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন। চেচনীয় নেতা কাদিরভ একসময় প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন, ‘‘আমরা সমগ্র বিশ্বকে জানাচ্ছি যে আমরা ভ্লাদিমির পুতিনের পদাতিক সৈন্য। বিশ্বের যে কোনও প্রান্তে তিনি আমাদের যে আদেশই দেবেন, আমরা তা পালন করব।’’
এই সংগঠনটি ইসলামি মূল্যবোধ এবং রুশ জাতীয়তাবাদের এক অদ্ভুত মিশ্রণ ধারণ করে। তারা মনে করে, পশ্চিমি বিশ্বের আগ্রাসী সামরিক প্রভাবের বিস্তার ঠেকানো তাদের নৈতিক দায়িত্ব। চেচেন সংগঠন বা সশস্ত্র বাহিনী বলতে মূলত রুশ ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত চেচেন প্রজাতন্ত্রের সামরিক ও আধা-সামরিক ইউনিটগুলোকে বোঝায়। বর্তমানে এদের সবচেয়ে কুখ্যাত ইউনিটটি হল ‘কাদিরভাইট’।
অথচ ২০০০ সালের আগে চেচনীয় সংগঠনগুলির চরম শত্রু ছিল রাশিয়াই। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মস্কোর বিরুদ্ধে দু’টি নৃশংস যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল সংগঠনটি। পুতিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রথম বছরে চেচনিয়া ছিল রাশিয়ার সবচেয়ে বিদ্রোহী প্রদেশ। পুতিন সেই বছর রুশ বিমানবাহিনী পাঠিয়ে চেচনিয়ার বিদ্রোহীদের ঠান্ডা করেন। ব্যাপক বোমাবর্ষণের ফলে শহরগুলো ধুলোয় মিশে যায়।
এই সামরিক অভিযানে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছিলেন। বিদ্রোহের আগুন নিবে গেলে কাদিরভের পরিবারের নেতৃত্বে একটি মস্কোপন্থী সরকার প্রতিষ্ঠা হয়। কাদিরভের বিরোধিতা বা সমালোচনাকারীদের অবৈধ ভাবে হত্যা, অপহরণ এবং নির্যাতন-সহ গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘ দিন ধরেই। মাথায় মস্কোর হাত থাকায় চেচনিয়ায় নিষ্কণ্টক আধিপত্য ভোগ করেন কাদিরভ ও তার মদতপুষ্ট সামরিক বাহিনী।
সেই চেচনিয়াই রাশিয়ার একমাত্র জায়গা যেখানে পুতিনকে এত খোলাখুলি এবং প্রকাশ্যে সমর্থন করা হয়। পুতিন এই অঞ্চলের ইসলামপন্থী বিদ্রোহীদের দমন করতেই সক্ষম হননি, উল্টে তাদের সবচেয়ে অনুগত বাহিনীতে পরিণত করেছেন। গত বছর পূর্ব ইউক্রেনের যুদ্ধের সময় রুশপন্থী সংগঠনদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভূখণ্ড দখল করতে সাহায্য করে এই বাহিনী।
চেচেন যোদ্ধাদের একটি প্রধান অস্ত্র হল তাদের দুর্ধর্ষ ‘ইমেজ’। গেরিলা যুদ্ধ এবং সন্ত্রাসদমন অভিযানে পারদর্শী তারা। গত কয়েক দশকে দু’টি চেচেন যুদ্ধ, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেওয়ায় বর্তমান প্রজন্মের যোদ্ধারা বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যন্ত অভিজ্ঞ বলে মনে করছেন সমরকৌশলীরা।
বর্তমানে এই যোদ্ধারা রাশিয়ার বৃহত্তর নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসাবে কাজ করে। যদিও তারা কেবল রুশ সামরিক কমান্ডের প্রতি নয়, বরং রমজান কাদিরভের প্রতি তাদের ব্যক্তিগত আনুগত্যের জন্যই বেশি পরিচিত। বছরের পর বছর ধরে, কাদিরোভাইটেরা আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। একে ১২, একে ২০৩-এর মতো কালাশনিকভ সিরিজ়ের সবচেয়ে আধুনিক সংস্করণ ব্যবহার করে এই বাহিনী, যাতে নাইট ভিশন এবং হলোগ্রাফিক সাইট লাগানো থাকে। নিঃশব্দে শত্রুকে ঘায়েল করতে স্নাইপার রাইফেল, শক্তিশালী মেশিনগান, সবই রাশিয়ার ‘দান’।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, চেচেনদের অংশগ্রহণ হয়তো মার্কিন বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পুরোপুরি থামাতে পারবে না। কিন্তু স্থল অভিযান শুরু হলে সংগঠনটি মার্কিন বাহিনীকে বড়সড় বেগ দিতে পারে। এটি যুদ্ধের খরচ এবং প্রাণহানির মাত্রা বহু গুণ বাড়িয়ে দেবে বলে মত অনেকেরই। চেচেনদের উপস্থিতি মানেই পর্দার আড়াল থেকে রাশিয়ার গোয়েন্দা তথ্য এবং উন্নত রুশ প্রযুক্তির সহায়তা পাওয়া। মার্কিন সেনাদের রসদ বা জ্বালানি সরবরাহের কনভয়গুলোতে চেচেনরা চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী এবং ব্যয়বহুল করে তুলতে পারে।
চরম আদর্শবাদী বলে কাদিরোভাইটদের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। প্রায়শই রাশিয়ার কৌশলগত স্বার্থ জড়িত উচ্চ পর্যায়ের বা রাজনৈতিক মুনাফা আছে এমন সংঘাতে ব্যবহৃত হওয়ার জন্য খ্যাতি অর্জন করেছে এরা। রাশিয়া দীর্ঘ দিন ধরে ইরানের সঙ্গে অস্ত্র সহযোগিতা-সহ ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এ-ও দাবি করা হয়েছে যে, চলমান সংঘাতের সময় মস্কো তেহরানের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করছে। যদিও ক্রেমলিন এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
আমেরিকার রণকৌশল ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নিয়ে সেনেটের সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। আমেরিকার সেনেটের বিদেশনীতি সম্পর্কিত কমিটির সদস্য ক্রিস মারফি সতর্ক করেছেন যে, ট্রাম্প প্রশাসন যদি ইরানে সীমিত পরিসরে স্থল আক্রমণের চেষ্টাও করে, তাহলে শত শত মার্কিন সৈন্য নিহত হতে পারেন। এই যুদ্ধটি ইতিমধ্যেই একটি চলমান বিপর্যয়ে পরিণত হচ্ছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে যদি প্রেসিডেন্ট স্থলবাহিনী পাঠানোর কথা বলেন। সে ক্ষেত্রে কয়েক ডজন, এমনকি কয়েকশো মার্কিন সেনার হতাহতের ঘটনা ঘটবে।