পঞ্চম সপ্তাহে পা দিয়ে আরও ভয়ঙ্কর হচ্ছে ইরান যুদ্ধ। সাবেক পারস্যে এ বার ‘গ্রাউন্ড অপারেশনে’ নামতে পারে মার্কিন ফৌজ! অন্য দিকে পশ্চিম এশিয়ায় সংঘর্ষের আঁচে জ্বালানি সঙ্কটের মুখে পড়েছে বহু দেশ। অভিঘাতে কিছুটা আহত ভারতও। পরিস্থিতি যে দিকে গড়াচ্ছে তাতে ফিরতে পারে গত শতাব্দীর ৭০-এর দশকের ‘অয়েল শক’। তার চেয়েও খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেকে।
এ বারের মতো ৭০-এর দশকের জ্বালানি সঙ্কটের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে যুদ্ধ ও ইজ়রায়েলের নাম। পশ্চিম এশিয়ার ক্ষুদ্র ইহুদি রাষ্ট্রটির বয়স তখন মাত্র ২৫ বছর। হঠাৎই একদিন দু’দিক থেকে তাদের আক্রমণ করে বসে মিশর ও সিরিয়া। শুধু তা-ই নয়, লড়াই শুরু করতে কায়রো ও দামাস্কাস বেছে নেয় ইহুদিদের উৎসবের দিন ‘ইয়ম কিপ্পুর’কে। পাশাপাশি, অন্য আরব রাষ্ট্রগুলির সমর্থনও আদায় করে নিয়েছিল তারা।
১৯৭৩ সালের ৬-২৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলা যুদ্ধের সময় শেষ বারের মতো ইজ়রায়েল অস্তিত্বের সঙ্কটের মুখে পড়ে বললে অত্যুক্তি হবে না। ইহুদি রাষ্ট্রটির প্রধানমন্ত্রীর পদে তখন ছিলেন গোল্ডা মেয়ার। প্রাথমিক ধাক্কা সামলে তাঁর নেতৃত্বেই ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায় তেল আভিভ। শুরু হয় জোড়া শত্রুর বিরুদ্ধে জোরালো প্রত্যাঘাত। ইজ়রায়েল ডিফেন্স ফোর্স বা আইডিএফের সেই আক্রমণে অচিরেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় মিশর ও সিরিয়ার যৌথ বাহিনী।
সেই লড়াইয়ে ইজ়রায়েলের পাশে খোলাখুলি ভাবে ছিল আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপ। যুদ্ধে যখন কায়রো ও দামাস্কাসের পরাজয় একরকম নিশ্চিত, তখনই তাদের পক্ষ নিয়ে আসরে নামে অন্যান্য আরব রাষ্ট্র। আস্তিন থেকে ‘তুরুপের তাস’ বার করে তারা। উপসাগরীয় দেশগুলির দাবি ছিল, অবিলম্বে তেল আভিভকে হাতিয়ার দেওয়া বন্ধ করতে হবে। নইলে এক ফোঁটাও তেল পাবে না যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। তাদের এই সিদ্ধান্তের জেরে রাতারাতি বিশ্ববাজারে লাগামছাড়া হয়ে যায় তরল সোনার দর।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখতে খনিজ তেল রফতানিকারী দেশগুলিকে নিয়ে ১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বরে তৈরি হয় ওপেক (অর্গানাইজ়েশন অফ পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ়)। ইয়ম কিপ্পুর যুদ্ধের সময় এর ভিতরে গজিয়ে ওঠে একটি উপগোষ্ঠী, যার নেতৃত্বে ছিল সৌদি আরব। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং ইরাককে পাশে পায় রিয়াধ। তাদের চালে মাত্র এক মাসের মধ্যে ৩০০-৪০০ শতাংশ বৃদ্ধি পায় তরল সোনার দর।
ইহুদি ও পশ্চিমি শক্তিকে বিপাকে ফেলতে ওই সময় ওপেকের অন্তর্ভুক্ত আরব উপগোষ্ঠীর দেশগুলি বেশ কিছু জটিল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। যেমন হঠাৎ হঠাৎ তরল সোনার উত্তোলন বন্ধ রাখা। কিংবা তেল রফতানিতে যুক্তরাষ্ট্রের উপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, যুদ্ধ শুরুর আগে ব্যারেলপ্রতি তরল সোনার দাম ছিল মাত্র তিন ডলার। ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর আসতে আসতে সেটা ১২ ডলারে গিয়ে পৌঁছোয়। একেই ‘অয়েল শক’ বলে উল্লেখ করেছিল একাধিক গণমাধ্যম।
ইতিহাসবিদদের একাংশের দাবি, ইয়ম কিপ্পুর যুদ্ধের প্রকৃত বিজেতা ছিল সৌদি আরব। লড়াই চলাকালীন খনিজ তেলকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে রাতারাতি ফুলেফেঁপে ওঠে রিয়াধ। অন্য দিকে, মুদ্রাস্ফীতি এবং মহামন্দার কবলে পড়ে ক্ষতবিক্ষত হয় মার্কিন অর্থনীতি। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রল পাম্পগুলির সামনে নিত্য দিন দেখা যেত লম্বা লাইন। ফলে রেশনিং ব্যবস্থার আওতায় জ্বালানিকে আনতে বাধ্য হন আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন।
যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইয়ম কিপ্পুর পর্বে জ্বালানি সঙ্কটে বেহাল দশা হয় ইউরোপেরও। উদাহরণ হিসাবে জার্মানির কথা বলা যেতে পারে। পেট্রল-ডিজ়েল মহার্ঘ হওয়ায় ওই সময় রবিবার ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে রাস্তায় চলাফেরার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বার্লিন প্রশাসন। এ ছাড়া গাড়ির সর্বোচ্চ গতি বেঁধে দিয়েছিল আমেরিকা-সহ বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ। এক কথায় বিশ্ব জুড়ে সকলেই জ্বালানি সাশ্রয়ে মরিয়া হয়ে ওঠে।
’৭০-এর এই ‘অয়েল শক’-এর জেরে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের আর্থিক গতি শ্লথ হয়ে পড়ে। জ্বালানির অভাবে বড় বড় শিল্পসংস্থার পণ্য উৎপাদনের ক্ষমতা কমেছিল। ফলে সেখানে শুরু হয় গণহারে ছাঁটাই। এক দিকে মুদ্রাস্ফীতি, অন্য দিকে আর্থিক স্থবিরতা। জোড়া ধাক্কায় একরকম নাজেহাল হয়ে যায় বিশ্ব অর্থনীতি। ভারতেও খুচরো বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং বেকারত্বকে কেন্দ্র করে সরকারের বিরুদ্ধে খেপে ওঠে আমজনতা।
ইয়ম কিপ্পুর যুদ্ধের পাঁচ মাস পর (পড়ুন ১৯৭৪ সালের মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে সৌদি আরব। ফলে হাঁপ ছেড়ে বাঁচে বিশ্ব। যদিও খনিজ তেলের দাম আর কখনওই আগের জায়গায় ফিরে আসেনি। এই সময়সীমার মধ্যে জ্বালানি আমদানির খরচ অন্তত তিন গুণ বাড়াতে হয়েছিল ভারতকে। কিন্তু তার পরেও এ বারের সমস্যাকে আরও কঠিন এবং জটিল বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
আর্থিক বিশেষজ্ঞদের কথায়, ’৭৩-এর ‘অয়েল শক’-এর সঙ্গে ২০২৬ সালের একটা মূলগত পার্থক্য রয়েছে। সে বার যুদ্ধের বাজারে অতিরিক্ত মুনাফার লোভে পুরোপুরি ইচ্ছাকৃত ভাবে তেলের দাম বাড়িয়েছিল সৌদি আরব। ফলে আন্তর্জাতিক স্তরে এর প্রভাব ছিল সীমিত। আসলে ১৯৪৮ সালে আরব মুলুকে জন্ম হওয়া ইজ়রায়েলের অস্তিত্ব কখনওই মেনে নিতে পারেনি রিয়াধ। তাই সুযোগ বুঝে আমেরিকা-সহ পশ্চিমি দুনিয়াকে শিক্ষা দিতে চাইছিল ওই উপসাগরীয় রাষ্ট্র।
অন্য দিকে, এ বারের ‘অয়েল শক’ একেবারেই ইচ্ছাকৃত নয়। বরং তাকে ইরানি রণকৌশলের একটা অংশ বলা যেতে পারে। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকাকে সঙ্গে নিয়ে সাবেক পারস্যে হামলা চালায় ইজ়রায়েল। ফলে পশ্চিম এশিয়ায় শুরু হয়েছে যুদ্ধ। লড়াইয়ের প্রথম দিনেই তেহরানের শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লা আলি খামেনেইকে হত্যা করে ইহুদি ও মার্কিন যৌথ বাহিনী।
এর পরই প্রত্যাঘাতে নেমে হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে খামেনেইয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। পাঁচ সপ্তাহ পেরিয়ে তা এখনও খুলতে পারেনি ইজ়রায়েল এবং আমেরিকা। পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী ১৬৭ কিমি লম্বা এবং ৩৩-৩৯ কিমি চওড়া সরু ওই জলপথটিকে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সামুদ্রিক রাস্তা বলা যেতে পারে।
পশ্চিম এশিয়ার প্রায় প্রতিটা আরব দেশই তরল সোনা রফতানিতে হরমুজ় প্রণালী ব্যবহার করে থাকে। বিশ্বের মোট খনিজ তেল সরবরাহের ২০ শতাংশ যায় এই রাস্তা দিয়ে। এ ছাড়া তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি (লিক্যুইফায়েড ন্যাচরাল গ্যাস) পাঠানোর ক্ষেত্রেও এই রুটটি উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলির একমাত্র ভরসা। এ-হেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ় অবরুদ্ধ হওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে তরল সোনা ও এলএনজির দাম।
ইয়ম কিপ্পুর যুদ্ধ এবং তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ‘অয়েল শক’ মোকাবিলায় ১৯৭৪ সালের নভেম্বরে গঠিত হয় ‘আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা’ বা আইইএ (ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি)। তাদের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৭০-এর দশকে সৌদির নিষেধাজ্ঞার জেরে দৈনিক তেলসঙ্কটের পরিমাণ ছিল ৪০-৫০ লক্ষ ব্যারেল। কিন্তু, এ বারের লড়াইয়ে সেটাই বেড়ে দৈনিক দু’কোটি ব্যারলে পৌঁছে গিয়েছে।
তা ছাড়া ইয়ম কিপ্পুরের লড়াইয়ে তৈল শোধনাগারকে নিশানা করেনি যুযুধান দুই পক্ষ। ৫৩ বছর পর ইরান যুদ্ধে সেই প্রবণতা দেখা গিয়েছে। ইতিমধ্যেই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েত, কাতার, ইরাক, ওমান এবং বাহরিনের তরল সোনা এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে আছড়ে পড়েছে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। ইহুদি ও আমেরিকানদের দাবি, এই হামলা চালিয়েছে তেহরান। অন্য দিকে সেগুলিকে শত্রুপক্ষের ‘ভুয়ো’ অভিযান বলে পাল্টা বিবৃতি দিয়েছে সাবেক পারস্যের বিদেশ মন্ত্রক।
এ বারের সমস্যার কথা বলতে গিয়ে একটি বিষয়ের উপরে বার বার জোর দিয়েছেন আইইএ-র কর্তা-ব্যক্তিরা। তাঁদের কথায়, গত শতাব্দীর ৭০-এর দশকে অর্থনীতিতে আসেনি কোনও বিশ্বায়ন। ঘরোয়া বাজারকে একরকম বন্ধই করে রেখেছিল দুনিয়ার প্রায় প্রতিটা দেশ। কিন্তু, ৯০-এর দশকের পর থেকে সেটা খুলে গিয়েছে। তা ছাড়া ’৭৩ সালে কেবলমাত্র আমেরিকা ও পশ্চিমি দুনিয়াকে বিপদে ফেলাই ছিল সৌদি আরবের উদ্দেশ্য। এ বারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বিজ্ঞানের অগ্রগতির জেরে বর্তমানে পেট্রোপণ্য কেবলমাত্র জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে, এমনটা নয়। এর বিভিন্ন উপজাত দ্রব্য রয়েছে। আমজনতার দৈনন্দিন জীবনে এর সর্বব্যাপী কার্যকারিতা দেখতে পাওয়া যায়। ফলে তেলের দামের ওঠাপড়ার উপর শেয়ার বাজার অনেকটাই নির্ভরশীল। এর জেরে এ বারের শকের আঁচে স্টকের সূচককে মারাত্মক ভাবে অস্থির হতে দেখা গিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে লগ্নিকারীদের উপরেও।
ইয়ম কিপ্পুর যুদ্ধের পর কৌশলগত খনিজ তেলের ভান্ডার গড়ে তোলার দিকে নজর দেয় বিশ্বের প্রায় প্রতিটা দেশ। বর্তমান পরিস্থিতিতে ঘরোয়া বাজারকে ঠিক রাখতে সেখান থেকে সর্বাধিক তরল সোনা বার করে ফেলতে হয়েছে বলে খবর পাওয়া গিয়েছে। ২০২২ সাল থেকে চলা ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে গত চার বছর ধরে রাশিয়ার উরাল ক্রুডের উপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে রেখেছে আমেরিকা-সহ পশ্চিমি দুনিয়া। গোদের উপর বিষফোড়ার মতো সুযোগ পেয়ে সেই তেলের দামও বাড়াতে শুরু করেছে মস্কো।
আর তাই আইইএ-র প্রধান ফাতিহ বিরোল বলেছেন, ‘‘পরিস্থিতির বদল না হলে ৭০-এর জ্বালানি সঙ্কটের চেয়েও খারাপ দিন দেখবে বিশ্ব।’’ ইতিমধ্যেই তরল সোনার দর ব্যারেলপ্রতি ১১৫-১১৭ ডলারে পৌঁছে গিয়েছে। তার মধ্যেও সামান্য স্বস্তিতে রয়েছে ভারত। কারণ নয়াদিল্লির ট্যাঙ্কারকে হরমুজ়ে আটকাচ্ছে না ইরান। পাশাপাশি, ‘বন্ধু’ রাশিয়ার থেকে বিপুল পরিমাণে ‘উরাল ক্রুড’ কিনছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার।