আপাতত দু’সপ্তাহের জন্য ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার ভোরে (ভারতীয় সময়) ট্রুথ স্যোশালের পোস্টে যুদ্ধবিরতির কথা জানান তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘ইরানে এখনই সেনা পাঠাচ্ছি না। বোমাও ফেলব না।’’
অন্য দিকে আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলকে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মোজ়তবা খামেনেই বার্তা দিয়েছেন, দু’সপ্তাহের সংঘর্ষবিরতি মানেই যুদ্ধে ইতি নয়। তবে এ-ও জানিয়েছেন, সেনাবাহিনীকে আপাতত ক্ষেপণাস্ত্রবর্ষণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
এর আগে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়ে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, মঙ্গলবার রাত ৮টার (আমেরিকার সময় অনুযায়ী। ভারতীয় সময়ে বুধবার সকাল সাড়ে ৬টা) মধ্যে যদি ইরান হরমুজ় প্রণালী খুলে না দেয় তবে তেহরানকে ‘নরকে পাঠানো হবে’। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেন তিনি। এ-ও জানান, এই যুদ্ধবিরতি দু’তরফেই। অর্থাৎ, আপাতত ইরান বা আমেরিকা— দু’দেশই সামরিক অভিযান বন্ধ রাখবে।
একই সঙ্গে ট্রাম্প জানিয়েছেন, কার মধ্যস্থতায় এই যুদ্ধবিরতি সম্ভব হয়েছে। ট্রাম্প তাঁর পোস্টে প্রথমেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, শাহবাজ় এবং মুনিরের দেওয়া প্রস্তাব তিনি গ্রহণ করেছেন।
ট্রাম্পের কথায়, “পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শহবাজ় শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে আমার আলাপ-আলোচনা হয়েছে। তাঁরা আমাকে আজ রাতে ইরানের দিকে ধ্বংসাত্মক শক্তি না পাঠানোর অনুরোধ করেন। ইরানও হরমুজ় প্রণালীর সম্পূর্ণ, অবিলম্বে ও নিরাপদ উন্মোচনে সম্মত হওয়ার শর্তে রাজি হওয়ায় আমি দু’সপ্তাহের জন্য ইরানের ওপর বোমাবর্ষণ এবং হামলা স্থগিত করতে রাজি হচ্ছি।”
পাকিস্তান যে যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করেছে, তা আমেরিকার পাশাপাশি স্বীকার করে নিয়েছে ইরানও। যদিও ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপদ পরিষদ জানিয়েছে, আলোচনার মাধ্যমে বিস্তারিত বিষয়গুলি চূড়ান্ত হলে তবেই ইরান যুদ্ধের অবসান মেনে নেবে তারা। তারা জোর দিয়েছে, আলোচনায় তাদের ১০ দফা পরিকল্পনার কথা কঠোর ভাবে উপস্থাপিত করা হবে। আগামী ১০ এপ্রিল থেকে ইসলামাবাদে এই আলোচনা শুরু হওয়ার কথা আছে।
কিন্তু কী ভাবে পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকা-ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করাল ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশী? বিভিন্ন সূত্র বলছে, ইরানকে ‘ওড়ানোর’ সিদ্ধান্ত এক রকম নিয়েই ফেলেছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু শেষ মুহূর্তের কূটনৈতিক পদক্ষেপে আরও মারাত্মক সামরিক সংঘাতের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে এসেছে পশ্চিম এশিয়া।
ইরান এবং আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধবিরতিকে, কৌশলগত পুনর্বিন্যাস এবং আলোচনার সুযোগ— উভয় হিসাবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞেরা। তবে সূত্রের খবর, ইরানের জন্য ট্রাম্পের নির্ধারিত সময়সীমার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই এই যুদ্ধবিরতির বিষয়টি চূড়ান্ত হয়।
ফলে যুদ্ধবিরতির বিষয়টিকে একটি বৃহত্তর এবং সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ইঙ্গিত হিসাবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক মহলের বিশেষজ্ঞেরা। আর সেখানেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শহবাজ় শরিফ এবং পাক সেনাপ্রধান বা সেনা সর্বাধিনায়ক (চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস) আসিম মুনিরকে কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সূত্র বলছে, পাকিস্তান যে আমেরিকা এবং ইরানকে যুদ্ধে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়ে সঙ্কট নিরসনের কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছেছে, তার নেপথ্যে রয়েছে শরিফ এবং মুনিরের বেশ কিছু গোপন যোগাযোগ। যুদ্ধ বন্ধের জন্য নাকি উভয় পক্ষের সঙ্গে নিরন্তর কথাবার্তাও চালিয়ে গিয়েছিল ইসলামাবাদ।
সংবাদমাধ্যম আল জাজ়িরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মকর্তারা বলেছেন যে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে মুনির গত দু’দিনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের বিদেশমন্ত্রী সইদ আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে একাধিক বার কথা বলেছেন। সেখানেই অনেকগুলি বিষয় তুলে ধরে যুদ্ধবিরতির ডাক দেন তিনি।
যদিও ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা করেছেন, তবে পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা প্রশমন মূলত সম্মিলিত কূটনৈতিক চাপের কারণেই ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে। আর সেই কূটনৈতিক চাপের কারণেই যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে তেহরানও। তেমনটাই মনে করছে আন্তর্জাতিক মহল।
এ ক্ষেত্রে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় মধ্যস্থতাকারী হিসাবে আবির্ভূত হলেও জানা গিয়েছে, দু’পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জোরদার করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে চিনও। তবে চিনের ভূমিকা ছিল নীরব।
বিভিন্ন সূত্রকে উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে, পাকিস্তানের পাশাপাশি চিন, তুরস্ক এবং মিশর-সহ একাধিক মধ্যস্থতাকারী তেহরানকে যুদ্ধবিরতির পথে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে নীরব কিন্তু প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছে।
এর আগে চিনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র মাও নিং বলেছিলেন, “সকল পক্ষকে আন্তরিকতা দেখাতে হবে এবং দ্রুত এই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হবে। কারণ, এই যুদ্ধ হওয়াই অনুচিত ছিল।” একই সঙ্গে তিনি সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করেছিলেন।
তাই সামগ্রিক ঘটনাপ্রবাহ দেখে বিশেষজ্ঞদের মত, যুদ্ধবিরতি কোনও একক পক্ষের প্রচেষ্টা বা মধ্যস্থতায় কাজ করেনি। আরও অনেকে অনুঘটক হিসাবে কাজ করেছে। একাধিক পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই সম্ভব হয়েছে যুদ্ধবিরতি।
অর্থাৎ পাকিস্তানের শেষ মুহূর্তের মধ্যস্থতা, চিনের নীরব চাপ এবং ইরানের আলোচনায় অংশগ্রহণের প্রস্তুতি— এই সব কিছুর চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং আলোচনার পথ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত।
তবে যুদ্ধবিরতির বিষয়টিকে ‘জয়’ হিসাবে দেখছে ইরান এবং আমেরিকা দু’পক্ষই। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপদ পরিষদ যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর এক দীর্ঘ বিবৃতি জারি করে। সেই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘‘যুদ্ধের প্রায় সকল উদ্দেশ্যই অর্জিত। শত্রুপক্ষ এক মাসের বেশি সময় ধরে যুদ্ধবিরতির জন্য অনুনয়-বিনয় করছে।’’ তেহরান এই পরিস্থিতিকে ‘ঐতিহাসিক জয়’ হিসাবে দেখছে। তারা বুঝিয়েছে, আমেরিকার সামনে কখনওই মাথা নত করেনি। সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকা বার বার যে সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার কথা বলেছে সে প্রসঙ্গে তেহরান জানিয়েছে, তারা এই সব বিষয়কে পাত্তা দিতে রাজি ছিল না।
ইরানের মতো আমেরিকাও ‘জয়’ দেখছে। হোয়াইট হাউসের তরফে জানানো হয়েছে, এটা মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং মার্কিন বাহিনীর জয়। অন্য দিকে, ইরানের দেওয়া প্রস্তাব সম্পর্কে ট্রাম্প জানিয়েছেন, তেহরানের থেকে একটি ১০ দফা প্রস্তাব পেয়েছেন, যা একটি অত্যন্ত কার্যকর সূচনা। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আশাবাদী, ‘‘ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি সংক্রান্ত একটি চূড়ান্ত চুক্তির পথে আমরা অনেক দূর অগ্রসর হয়েছি।’’ আসন্ন দু’সপ্তাহের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা সম্ভব।