বৈদিক যুগের বিশ্ববিদ্যালয় তক্ষশিলার (বর্তমান নাম ট্যাক্সিলা) প্রত্ন নিদর্শনস্থলের রক্ষণাবেক্ষণে চরম গাফিলতির অভিযোগ। সেই বিষয়ে এ বার পাকিস্তানকে সতর্ক করল রাষ্ট্রপুঞ্জের সাংস্কৃতিক শাখা ইউনেস্কো। তাদের দাবি, সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংস্কার করা হচ্ছে সেখানকার ইমারতের। এতে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ় সাইট’টির ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। যদিও যাবতীয় অভিযোগ খারিজ করেছে ইসলামাবাদ।
চলতি বছরের ২ জুলাই, ইউনেস্কোর পাঠানো সতর্কবার্তা প্রকাশ করে জনপ্রিয় পাক গণমাধ্যম ‘দ্য ডন’। সেখানে তক্ষশিলার দু’টি ঐতিহাসিক প্রত্ন সৌধের পুনর্নির্মাণের কাজ অবিলম্বে স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয় তারা। রাষ্ট্রপুঞ্জের শাখাটি জানিয়েছে, সংস্কারের নামে সিমেন্ট ব্যবহার করছে ইসলামাবাদ। ফলে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কয়েক হাজার বছরের পুরনো ইটের কাঠামো। এর জেরে ‘বিপন্ন হেরিটেজ’-এর তালিকায় উঠতে পারে নাম।
ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে পাক পঞ্জাব প্রদেশের অন্তর্গত ওই প্রাচীন শহরটির যথেষ্ট তাৎপর্য রয়েছে। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। ইতিহাসবিদদের দাবি, পরবর্তী বৈদিক যুগে এ দেশে একাধিক জনপদ গড়ে ওঠে। এর মধ্যে অন্যতম হল গান্ধার। গোড়ার দিকে সংশ্লিষ্ট রাজ্যটির মধ্যেই অবস্থিত ছিল তক্ষশিলা। রামায়ণ, মহাভারতের মতো মহাকাব্য ও বেশ কিছু সংস্কৃত গ্রন্থে আছে এর উল্লেখ।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, ৫৪০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিন্ধু উপত্যকা জয় করে সাবেক পারস্যের (বর্তমান ইরান) আখেমেনিয় সাম্রাজ্য। তাদের তৈরি ‘হিন্দুশ সত্রাপি’ বা প্রদেশের রাজধানী ছিল তক্ষশিলা। ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বে ভারত আক্রমণ করেন দিগ্বিজয়ী গ্রিক বীর আলেকজ়ান্ডার। আজকের আফগানিস্তান দখল করে দিল্লির দিকে এগোনোর পথে তক্ষশিলা ঘিরে ফেলে তাঁর অপরাজেয় ফৌজ। তবে শহর দখলে খুব একটা বাধার মুখে পড়তে হয়নি তাঁকে।
আলেকজ়ান্ডার শহর ঘিরতেই তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করে তক্ষশিলা। গ্রিকরা ফিরে গেলে গান্ধার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় ওই এলাকা। ৩১৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যায় প্রাচীন তক্ষশিলা। পরবর্তী বছরগুলিতে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে এগিয়েছে ওই এলাকা। দেখেছে বিপুল রক্তপাত ও ধ্বংসলীলা। আবার সেখানেই গড়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় এবং বৌদ্ধ শিক্ষার মতো জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্র।
খ্রিস্টপূর্ব ২০০ অব্দে ইন্দো-গ্রিক রাজ্যের অংশ হয় তক্ষশিলা। ৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ওই শহর দখল করে ইন্দো-সিথিয়ানরা। ৩০ খ্রিস্টাব্দের দিকে গোটা উত্তর ভারত জুড়ে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলে কুষাণ বংশ। তাদের রাজধানী ছিল পুরুষপুর যা আজকের পেশোয়ার। কুষাণ রাজারা তক্ষশিলাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে ফের তা নতুন ভাবে গড়ে তোলেন। তাঁদের আমল থেকেই সেখানে বাড়তে থাকে বৌদ্ধ শিক্ষার চর্চা।
পঞ্চম শতাব্দীতে হুণ আক্রমণের সময় ফের ধ্বংস হয় তক্ষশিলা। এর পর আর কখনওই সে ভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি ওই প্রাচীন শহর। তবে এশিয়ার প্রধান বাণিজ্যিক রাস্তাগুলির সংযোগস্থলে অবস্থান হওয়ার কারণে কখনওই পুরোপুরি মুছে যায়নি এর অস্তিত্ব। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুমান, প্রাচীন তক্ষশিলায় ছিল বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বাস। তাঁদের মধ্যে ভারতীয়, পারসিক, গ্রিক, সিথিয়ান এবং আখেমেনিয়রা উল্লেখযোগ্য।
প্রাচীন ভারতের তিনটি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছিল তক্ষশিলায়। তবে সেটি ঠিক কবে বা কোন সময়ে গড়ে ওঠে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা বেশ কঠিন। তবে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ থেকে তৃতীয় শতকের মধ্যে লেখা বৌদ্ধ জাতকের কাহিনিতে এর উল্লেখ রয়েছে। উদাহরণ হিসাবে আরুণি এবং তাঁর ছেলে শ্বেতকেতুর কথা বলা যেতে পারে। যাঁরা ছিলেন তক্ষশিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া।
তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদের ধারণা, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ থেকে পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যে সমৃদ্ধির চরম শিখরে পৌঁছোয় প্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্তের কিংবদন্তি মন্ত্রী, মুখ্য পরামর্শদাতা ও অর্থনীতিবিদ চাণক্যের (কৌটিল্য) নাম। অনেকের দাবি, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে তক্ষশিলায় বসেই ‘অষ্টাধ্যায়ী’ বইটি লেখেন ব্যাকরণবিদ পাণিনি। প্রাচীন ভারতের আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের জনক চরক ছিলেন তক্ষশিলার বাসিন্দা।
ব্রিটিশ ভারতে ১৮৬৩-’৬৪ সালে তক্ষশিলার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেন প্রত্নতাত্ত্বিক আলেকজ়ান্ডার কানিংহাম। ওই সময় ব্যাপক আকারে এর প্রত্নতাত্ত্বিক খনন হয়নি। ১৯১৩ সালে তা শুরু করেন জন মার্শাল, যা ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত চলেছিল। এই সময়সীমার মধ্যে সেখানে একটি মধ্যপ্রস্তর যুগের গুহা, চারটি প্রাচীন বসতির প্রত্নতাত্ত্বিক অবশেষ এবং কয়েকটি প্রাচীন বৌদ্ধবিহার খুঁজে পান তিনি।
প্রত্নতত্ত্ববিদ মার্শালের মতে, প্রথম পর্যায়ে তক্ষশিলা ছিল শুধুমাত্র সংস্কৃত এবং বৈদিক শিক্ষা লাভের কেন্দ্র। পরে বৌদ্ধ ধর্মচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যায় ওই বিশ্ববিদ্যালয়। আর তাই আদি বৌদ্ধ সাহিত্য, বিশেষত জাতকের কাহিনিতে এর বার বার উল্লেখ পাওয়া গিয়েছে। পড়ুয়ারা সেখানে বেদ, গণিত, চিকিৎসা, জ্যোতিষশাস্ত্র এবং অস্ত্র শিক্ষা করতেন। জৈন ভিক্ষুরাও তক্ষশিলায় আসতেন। তাঁদেরও ধর্মীয় শিক্ষা দিত ওই বিশ্ববিদ্যালয়।
১৯৮০ সালে তক্ষশিলার প্রত্ন এলাকাকে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’-এর তকমা দেয় ইউনেস্কো। ফলে এর মৌলিকত্ব এবং অখণ্ডতাকে রক্ষা করার দায় চলে আসে পাকিস্তানের ঘাড়ে। সম্প্রতি, এর অন্তর্গত মোহরা মোরাডু এবং সিরকাপের প্রত্ন কাঠামোর মেরামতির কাজে হাত দেয় ইসলামাবাদ। কিন্তু, যে ভাবে সেটা করা হচ্ছে তাতে প্রত্ন সৌধগুলির ‘চরিত্র’ বদলে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রপুঞ্জের ওই সংগঠন।
পাক প্রশাসনের এ-হেন পদক্ষেপের নেপথ্যে মূলত দু’টি উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রথমত, দেশভাগের পর থেকেই হিন্দু সংস্কৃতি মুছে ফেলতে তৎপর ছিল ইসলামাবাদ। প্রাক মুসলিম কোনও ঘটনা এখনও সে ভাবে অন্তর্ভুক্ত নেই সেখানকার স্কুল-কলেজের পাঠ্যে। প্রত্ন নির্দশনটি নষ্ট হলে কট্টরপন্থীদের কাছে গুরুত্ব বাড়বে সেনা ও সরকারের। সে ক্ষেত্রে ক্ষমতা ধরে রাখা অনেক বেশি সহজ হবে তাদের পক্ষে।
দ্বিতীয়ত, গত বছর (২০২৫ সাল) পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার পর সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত করে ভারত। এর জেরে পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ এলাকায় তৈরি হয়েছে জল সঙ্কট। ফলে নদীর জল পেতে ক্রমাগত সুর চড়াচ্ছে ইসলামাবাদ। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে প্রাচীন প্রত্ন নিদর্শনগুলির সংস্কারের তাগিদ অনুভব করতে দেখা যাচ্ছে তাদের। এর মাধ্যমে নিজেদের ‘প্রকৃত ভারত’ হিসাবে তুলে ধরার অপচেষ্টা রয়েছে তাদের।
সাবেক সেনাকর্তারা মনে করেন, সেই কারণেই তড়িঘড়ি তক্ষশিলার সৌধ সংস্কারে নেমেছে পাক পঞ্জাবের প্রশাসন। পাশাপাশি, মহেঞ্জোদারোয় নতুন করে খননকাজের দেওয়া হয়েছে নির্দেশে। তবে ইসলামাবাদের রাজনীতি, সমাজ এবং প্রশাসনে কট্টরপন্থীদের মারাত্মক প্রভাব রয়েছে। ফলে এগুলি করা পশ্চিমের প্রতিবেশীর সরকারের পক্ষে একেবারেই সহজ নয়। ফলে ঐতিহাসিক সৌধের ইসলামীয়করণ করতেও দেখা যেতে পারে তাদের।
এই পরিস্থিতিতে ইউনেস্কোর অভিযোগের জেরে তক্ষশিলার ঐতিহাসিক সৌধগুলি পরিদর্শন করে পাক প্রত্নতত্ত্ব এবং জাদুঘর দফতর। তাদের সঙ্গে ছিলেন জাতীয় ঐতিহ্য (হেরিটেজ) ও সংস্কৃতি মন্ত্রকের কর্তা ব্যক্তিরাও। পরে সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে মুখ খোলেন তাঁরা। সেখানে আন্তর্জাতিক সংগঠনটির যাবতীয় বক্তব্য নস্যাৎ করে সংস্কার কাজের ব্যাখ্যা দেয় ইসলামাবাদ।
এ প্রসঙ্গে ‘দ্য ডন’কে পঞ্জাব প্রদেশের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল মালিক জাহির আব্বাস বলেন, ‘‘সংস্কার কাজকে পুনর্নির্মাণ বলা ঠিক নয়। আমরা ঐতিহাসিক সৌধের মূল কাঠামো ঠিক রেখে সমস্ত কাজ করছি। কিন্তু, মনে রাখতে হবে যে হাজার হাজার বছরের পুরনো প্রযুক্তি আজ আর পৃথিবীর কোথাও নেই। ফলে আজকের যুগের সরঞ্জাম ছাড়া সেগুলিকে সাজিয়ে তোলা অসম্ভব।’’
পাকিস্তানের এই যুক্তি ইউনেস্কো কতটা মানবে তা নিয়ে বেশ সন্দেহ রয়েছে। অতীতে এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিতে দেখা গিয়েছে তাদের। উদাহরণ হিসাবে জার্মানির কথা বলা যেতে পারে। অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংস্কারের কারণে যাদের একটি প্রত্ন নিদর্শনের বিশ্ব ঐতিহ্যক্ষেত্রের মর্যাদা প্রত্যাহার করে ইউনেস্কো।
পাকিস্তান বর্তমানে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বুনারের বৌদ্ধস্তূপ, সিন্ধের থাট্টার সিথো-পার্থিয়ান এবং ভানভোরের বৌদ্ধ প্রত্নস্থলের ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ তকমা পাওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। তক্ষশিলার সংস্কার সেই রাস্তায় বাধা হয় কি না, সেটাই এখন দেখার।