সৈন্যশক্তির দিক থেকে কোন দেশ কতটা শক্তিশালী? প্রতি বছরের মতো এ বছরেও সেই তালিকা প্রকাশ করল গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স। সেখানে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে ভারত। যদিও ফৌজি ক্ষমতায় নয়াদিল্লির থেকে এক ধাপ উপরে রয়েছে চিন। অন্য দিকে অবনমন হয়েছে পাকিস্তানের।
মোট ৬০টি আলাদা আলাদা বিষয়কে বিচার-বিশ্লেষণ করে এই তালিকা তৈরি করে গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স। এর মধ্যে অন্যতম হল সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সামরিক বাজেট। এ ছাড়া কোন দেশের কাছে কী কী অত্যাধুনিক হাতিয়ার রয়েছে, তালিকা তৈরির সময়ে সেটিও খতিয়ে দেখে তারা। এ বার মোট ১৪৫টি দেশকে র্যােঙ্কিং দিয়েছে এই আন্তর্জাতিক ফৌজি সমীক্ষক সংস্থা।
২০০৫ সাল থেকে বিশ্বের তাবড় শক্তিশালী দেশগুলির ফৌজি শক্তি সংক্রান্ত তালিকা তৈরি করে গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার। প্রথম দিন থেকেই এক নম্বর স্থানটি ধরে রেখেছে আমেরিকা। এ বারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ধারেকাছে নেই অন্য কোনও দেশ। পাওয়ার ইনডেক্স ২০২৬-এ ওয়াশিংটনের প্রাপ্ত পয়েন্ট ০.০৭৪১। প্রসঙ্গত, এই সমীক্ষক সংস্থার সূচক অনুযায়ী, যে রাষ্ট্র শূন্যের যত কাছে থাকবে, তার ফৌজি শক্তি তত বেশি।
উল্লেখ্য, গত বছর পাওয়ার ইনডেক্সে আমেরিকার প্রাপ্ত নম্বর ছিল ০.০৭৪৪। অর্থাৎ ২০২৬ সালে পৌঁছে আরও শক্তিশালী হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী। এর নমুনা শেষ সাত মাসে দু’বার দেখেছে বিশ্ব। ২০২৫ সালের জুনে ইরানে ঢুকে তাদের গুপ্ত পরমাণু গবেষণাকেন্দ্রগুলিতে বোমাবর্ষণ করে মার্কিন বিমানবাহিনী। সেই অভিযানের পোশাকি নাম ছিল ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’। সংশ্লিষ্ট অভিযানের পর ইজ়রায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় তেহরান।
চলতি বছরের ২ জানুয়ারি মধ্যরাতে লাটিন (দক্ষিণ) আমেরিকার দেশ ভেনেজ়ুয়েলাকে নিশানা করে মার্কিন ফৌজ। শুধু তা-ই নয়, রাজধানী কারাকাসে ঢুকে সস্ত্রীক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে এনেছে যুক্তরাষ্ট্রের ডেল্টা ফোর্স। সংশ্লিষ্ট অভিযানের কোড নাম ছিল ‘অপারেশন সাউদার্ন স্পিয়ার’ এবং ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজ়লভ’। এতে ওয়াশিংটনের কমান্ডোরা কোনও রহস্যময় হাতিয়ার ব্যবহার করেছে বলেও তুঙ্গে উঠেছে জল্পনা। ইরান ও ভেনেজ়ুয়েলায় নিখুঁত সাফল্য পাওয়ায় ইনডেক্সে যে আমেরিকার নম্বর বেড়েছে, তা বলাই বাহুল্য।
গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে রাশিয়া। সমীক্ষকেরা মস্কোকে দিয়েছেন ০.০৭৯১ নম্বর। গত বছর ০.০৭৮৮-তে দাঁড়িয়েছিল ক্রেমলিনের পাওয়ার ইনডেক্স। অর্থাৎ ২০২৫ সালের তুলনায় নম্বর কিছুটা কমলেও এই তালিকায় নিজের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এর নেপথ্যে অবশ্য একাধিক কারণের কথা বলেছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।
বিশ্লেষকদের দাবি, গত প্রায় চার বছর ধরে ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে গেলেও দেশের এক ইঞ্চিও জমি হারাননি রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন। উল্টে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের অবস্থান মজবুত করেছে তাঁর ফৌজ। পাশাপাশি মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট নেটোর (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন) মনে ভয় ধরাতে পেরেছে তারা। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমি দুনিয়ার ১৬ হাজারের বেশি নিষেধাজ্ঞার চ্যালেঞ্জ সামলেও নতুন অত্যাধুনিক হাতিয়ার তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে ক্রেমলিন।
গত বছরের অক্টোবরে একটি সামরিক হাসপাতাল পরিদর্শন গিয়ে নতুন যুগের হাতিয়ার সম্পর্কে গণমাধ্যমের কাছে মুখ খোলেন পুতিন। তিনি বলেন, ‘‘পরমাণু শক্তিচালিত স্বয়ংক্রিয় মনুষ্যবিহীন সাবমার্সিবল যান ‘পোসাইডন’ পরীক্ষায় সাফল্য মিলেছে। এর পাল্লা সীমাহীন।’’ ২০২৫ সালের অক্টোবরে ২১ অক্টোবর পরমাণু অস্ত্রবহনে সক্ষম ৯এম৭৩০ বুরেভেস্টনিক (স্টর্ম পেট্রেল) নামের একটি ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায় রাশিয়া। উৎক্ষেপণের পর তা ১৪ হাজার কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করেছিল। আকাশে ছিল ১৫ ঘণ্টা।
গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের তালিকায় রাশিয়ার মতোই তৃতীয় স্থান ধরে রেখেছে গণপ্রজাতন্ত্রী চিন (পিপল্স রিপাবলিক অফ চায়না)। গত বছর মস্কোর সমান পয়েন্ট পেয়েছিল বেজিং। এ বার অবশ্য সেটা হয়নি। পাওয়ার ইনডেক্সে ড্রাগনের প্রাপ্ত নম্বর দাঁড়িয়েছে ০.০৯১৯। তার জন্য অবশ্য প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের অনেকেই পিএলএ-র অভ্যন্তরীণ কলহকে দায়ী করেছেন।
এ বছরের জানুয়ারিতে পিএলএর শীর্ষ আধিকারিক তথা চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঘনিষ্ঠ লিউ ঝেনলির বিরুদ্ধে আমেরিকাকে পরমাণু অস্ত্রের গোপন তথ্য পাচারের মারাত্মক অভিযোগ ওঠে। পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির একাংশের দাবি, সেনা অভ্যুত্থানের সলতে পাকাচ্ছিলেন তিনি। তখনই অবশ্য তাঁকে গ্রেফতার করে ড্রাগন প্রশাসন। চক্রান্ত আর এক শীর্ষ সেনা আধিকারিক ঝাং ইউশিয়া যুক্ত ছিলেন বলে মনে করা হচ্ছে। তবে তাঁকে আটক করা হয়েছে কি না, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়।
রাশিয়া ও চিনের মতোই পাওয়ার ইনডেক্সে নম্বর কমেছে ভারতের। তবে তালিকায় চতুর্থ স্থান ধরে রেখেছে নয়াদিল্লি। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের সমীক্ষকেরা এ বার ভারতকে দিয়েছেন ০.১৩৪৬ নম্বর। গত বছর যা ছিল ০.১১৮৪। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা এর জন্য মূলত দু’টি কারণকে চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, শেষ কয়েক বছরে সামরিক ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও হাতিয়ারের গবেষণা খাতে খুব কম খরচ করেছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। দ্বিতীয়ত, উপরের তিনটি দেশের তুলনায় প্রতিরক্ষা বাজেটের নিরিখে এখনও অনেকটাই পিছিয়ে আছে নয়াদিল্লি।
২০২৬-’২৭ আর্থিক বছরে প্রতিরক্ষা খাতে ৭ লক্ষ ৮৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে কেন্দ্র। ২০২৫-’২৬ অর্থবর্ষে তা ছিল ৬.৮১ লক্ষ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ বার সামরিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১৫.৩ শতাংশ। শুধু তা-ই নয়, চলতি বছরের বাজেটে প্রতিরক্ষাক্ষেত্রে আধুনিকীকরণের জন্য ২ লক্ষ ১৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে মোদী সরকার, গত অর্থবর্ষের তুলনায় যেটা ২১ শতাংশ বেশি।
গত ১ ফেব্রুয়ারি সংসদে পেশ করা বাজেট অনুযায়ী, ২০২৬-’২৭ অর্থবর্ষে দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) ১১ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করবে ভারত। ২০২৫-’২৬ আর্থিক বছরে সেটা ছিল মাত্র আট শতাংশ। তা ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে একটি বড় বাণিজ্যচুক্তি সেরেছে নয়াদিল্লি। ওই সংগঠনের ২৭টি দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সমঝোতা হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে আগামী দিনে ফ্রান্স, জার্মানি, ইটালি বা স্পেনের মতো দেশগুলির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে হাতিয়ার তৈরির সুযোগ পাবে কেন্দ্র।
অন্য দিকে সংশ্লিষ্ট তালিকায় অবনমন হয়েছে পাকিস্তানের। ২০২৪ সালে নবম স্থানে ইসলামাবাদকে রেখেছিলেন গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের সমীক্ষকেরা। গত বছর সেখান থেকে নেমে ১২-তে চলে যায় ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশী। এ বার ১৪ নম্বরে জায়গা পেয়েছেন রাওয়ালপিন্ডির ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। পাওয়ার ইনডেক্সে তাদের প্রাপ্ত নম্বর ০.২৬২৬। গত বছর যা ছিল ০.২৫১৩।
গত বছরের জুনে ভারতীয় সেনার ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মুখে পড়ে বেহাল দশা হয় পাকিস্তানের। নয়াদিল্লির ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় চোখের নিমেষে ধ্বংস হয়ে যায় ইসলামাবাদের ১১টি বায়ুসেনা ঘাঁটি। এ ছাড়াও মাঝ-আকাশের লড়াইয়ে একাধিক লড়াকু জেট হারান রাওয়ালপিন্ডির সেনা অফিসারেরা। ওই সংঘাত থামার পর আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে পাক সেনা। সেখানেও তালিবানের বিরুদ্ধে তেমন সুবিধা করতে পারেনি তারা। এগুলিকেই নম্বর কমার মুখ্য কারণ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।
তালিকায় পঞ্চম স্থানে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার নাম। উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে ফ্রান্সের। এ বার প্যারিসকে ছ’নম্বরে রেখেছেন সমীক্ষকেরা। ২০২৪ সালে নেপোলিয়নের দেশটি ছিল ১১ নম্বরে। গত বছর সেখান থেকে সাতে উঠে আসে তারা। অন্য দিকে আট থেকে সাতে উঠে এসেছে জাপান। অবনমন হয়েছে ব্রিটেনের।
এ বছরের তালিকায় অষ্টম স্থানে নেমে গিয়েছে দু’টি বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী হওয়া ইংরেজ ফৌজ। গত দু’বছর ধরে ষষ্ঠ স্থান ধরে রেখেছিল তারা। পাওয়ার ইনডেক্সে ০.২২১১ নম্বর নিয়ে ১০ নম্বর জায়গা ধরে রেখেছে ইটালি। উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে জার্মানির। ২০২৪ সালে সংশ্লিষ্ট তালিকায় ১৯ নম্বরে ছিল বার্লিনের নাম। এ বার ১২-তে চলে এসেছে তারা। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধরত ইউক্রেন আছে ২০-তে।
গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের তালিকায় এ বারও ১৫ নম্বর জায়গা ধরে রেখেছে ইজ়রায়েল। পাকিস্তানের ঘাড়ে একরকম নিঃশ্বাস ফেলছে তেল আভিভ। অন্য দিকে অবনমন হয়েছে ইহুদিদের ‘চিরশত্রু’ ইরানের। ১৪ থেকে ১৬-তে নেমে গিয়েছে তেহরান। এ ছাড়া নবম স্থানে রয়েছে তুরস্ক। আর ৩৪ থেকে ৩১ নম্বরে উঠে এসেছে উত্তর কোরিয়া বা ডিপিআরকে (ডেমোক্রেটিক পিপল্স রিপাবলিক অফ কোরিয়া)।
আন্তর্জাতিক সমীক্ষক সংস্থার দেওয়ার নম্বরের ভিত্তিতে ৩৭তম স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ। ২২ নম্বরে দাঁড়িয়ে আছে তাইওয়ান তথা সাবেক ফরমোজা দ্বীপ (রিপাবলিক অফ চায়না)। তবে দ্রুত সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ওই দ্বীপরাষ্ট্র। দীর্ঘ দিন ধরেই একে কব্জা করার স্বপ্ন দেখে আসছে চিন। প্রথম ১০-এ স্থান পাওয়া দেশগুলির মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, তুরস্ক এবং ইটালি পরমাণু শক্তিধর নয়। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, আণবিক হাতিয়ার থাকা সত্ত্বেও প্রথম দশে জায়গা পায়নি পাকিস্তান, ইজ়রায়েল এবং উত্তর কোরিয়া।
সংশ্লিষ্ট তালিকায় ২৫ নম্বর স্থানে নেমে গিয়েছে সৌদি আরব। গত বছর পাকিস্তানের সঙ্গে ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে সই করে রিয়াধ। সেখানে বলা হয়েছে, এই দু’য়ের মধ্যে কোনও একটি দেশ তৃতীয় কোনও শক্তি দ্বারা আক্রান্ত বা আগ্রাসনের শিকার হলে, তাকে উভয় দেশের উপর আঘাত বা যুদ্ধ হিসাবে বিবেচনা করা হবে। দু’টি দেশেরই অবনমন হওয়ায় সংঘাত পরিস্থিতিতে তারা একে অপরকে কতটা সাহায্য করতে পারবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।