নব্বইয়ের দশকে তিনি ছিলেন টেলিভিশনের দর্শকের কাছে অত্যন্ত পরিচিত মুখ। নির্ভীক সাংবাদিকের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের মন জয় করেছিলেন বৈষ্ণবী মাহান্ত ম্যাকডোনাল্ড। ‘শক্তিমান’ ধারাবাহিকের গীতা বিশ্বাস হিসাবেই অবশ্য তিনি অধিক পরিচিত। কৈশোরজীবন থেকেই বার বার ধাক্কা খেতে খেতে অভিনয়ের জগতে পা রেখেছিলেন বৈষ্ণবী। এখন কী করেন ‘শক্তিমানের’ নায়িকা?
১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে মধ্যপ্রদেশের ইনদওরে জন্ম বৈষ্ণবীর। বাবা-মা এবং বোনের সঙ্গে সেখানে থাকতেন তিনি। কিন্তু তাঁদের সংসারে শান্তির লেশমাত্র ছিল না। কারণে-অকারণে বৈষ্ণবীর বাবা-মায়ের মধ্যে ঝগড়া লেগে থাকত।
কানাঘুষো শোনা যায়, সাংসারিক অশান্তি থেকে দূরে থাকতে দুই কন্যাকে নিয়ে মাঝেমধ্যেই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতেন বৈষ্ণবীর মা। এক হোটেল থেকে অন্য হোটেলে গিয়ে থাকতেন তিন জন। তার ফলে বৈষ্ণবীর পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটেছিল।
টেলিপাড়ার গুঞ্জন, শৈশব থেকেই পড়াশোনায় আগ্রহ ছিল বৈষ্ণবীর। বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর। কিন্তু পারিবারিক অশান্তির কারণে পড়াশোনায় মন দিতে পারতেন না তিনি। চতুর্থ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত টানা ছ’বছর ভাল করে পড়াশোনা করতে পারেননি বৈষ্ণবী।
বৈষ্ণবী যখন ১৪ বছরের কিশোরী, তখন পরিবার-সহ হায়দরাবাদের একটি ভাড়াবাড়িতে থাকতে শুরু করেন তাঁরা। সব কিছু থিতু হয়েছে ভেবে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন বৈষ্ণবী। কিন্তু তাঁর ধারণা কয়েক মাসের মধ্যেই ভেঙে গিয়েছিল।
সম্প্রতি এক পডকাস্টে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় বৈষ্ণবী জানান, হায়দরাবাদ যাওয়ার দু’-তিন মাসের মাথায় তাঁর বাবা হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যান। শত চেষ্টা করেও তাঁর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। এ দিকে, বৈষ্ণবীর মায়ের কাঁধে চাপছিল সংসার চালানোর খরচের বোঝা।
স্বামী নিখোঁজ। দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাকে নিয়ে সংসার। কী ভাবে সংসার চালাবেন তা বুঝতে পারছিলেন না বৈষ্ণবীর মা। কিছু টাকা ধার নিয়ে রোজগারের আশায় হায়দরাবাদ থেকে মুম্বই চলে যান তিনি। কিন্তু তাতেও খুব একটা লাভ হয় না। বরং দেনার পরিমাণ ক্রমশ বাড়তে থাকে।
দু’বেলা তিন জনের পেট চালানোর মতো সামর্থ্য ছিল না বৈষ্ণবীর মায়ের। বাড়িভাড়া মেটানোর মতো টাকাও ছিল না তাঁর। সাক্ষাৎকারে বৈষ্ণবীর দাবি, অর্থাভাবে দিন কাটানোর চেয়ে মৃত্যুবরণ করাই শ্রেয় বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন তাঁর মা।
বৈষ্ণবী বলেন, ‘‘আমি তখন ষোড়শী। বোনের বয়স মাত্র ১২ বছর। মা ভেবেছিল খাবারে বিষ মিশিয়ে আমাদের খাইয়ে দেবে। নিজেও মরত, আমাদেরও মেরে ফেলত। বেঁচে থেকে আমরা পাছে অসৎ সঙ্গে পড়ি, সেই ভয় পেয়েছিল মা।’’
বৈষ্ণবী জানান, চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁর মা শেষ বারের মতো গির্জায় যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর অলৌকিক অভিজ্ঞতার সাক্ষী হন বৈষ্ণবী। অভিনেত্রী সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘‘আমি যেন সারা শরীরে ঐশ্বরিক শক্তি অনুভব করতে পারছিলাম। কেঁদে ফেলেছিলাম গির্জায় ঢুকে। তার পর গির্জা থেকে ফিরে দেখি এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছে। বাড়ির দরজার সামনে পড়ে রয়েছে ১০০ টাকার নোটের বান্ডিল। কোথা থেকে টাকা এল তা কেউ জানত না।’’
বৈষ্ণবী জানান, বাড়ির সামনে পড়ে থাকা নোটের বান্ডিল খরচ করে সমস্ত দেনা মিটিয়েছিলেন তাঁর মা। এমনকি, দু’সপ্তাহের মধ্যে এক বেডরুমের একটি বাড়িতে পাকাপাকি ভাবে থাকতেও শুরু করেন তাঁরা। সবই ‘ভগবানের কৃপা’ বলে দাবি করেন অভিনেত্রী।
নিখোঁজ হওয়ার দু’বছর পর বাবাকে খুঁজে পেয়েছিলেন বৈষ্ণবী। দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন তাঁর বাবা। এমনকি, ধর্মান্তরিতও হয়েছিলেন। তখনই সব স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল বৈষ্ণবীর পরিবারের কাছে। অভিনেত্রী বলেন, ‘‘বাবা কেন আমাদের ছেড়ে গিয়েছিলেন তা বুঝতে আর কিছু বাকি ছিল না। তবে, মনের মধ্যে রাগ পুষে রাখিনি। বাবা যখন মৃত্যুশয্যায়, সেই মুহূর্তে তাঁর পাশেই ছিলাম।’’
১৯৮৮ সালে রামসে ব্রাদার্সের ‘ভিরানা’ নামের হরর ঘরানার ছবিতে শিশু অভিনেতা হিসাবে কাজ করার সুযোগ পান বৈষ্ণবী। সেই ছবি মুক্তির পর নাকি অভিনেত্রীর সঙ্গে অদ্ভুত ধরনের ঘটনা ঘটতে শুরু করেছিল। বৈষ্ণবী বলেন, ‘‘আমি মাঝরাতে ঘুমের ঘোরে হাঁটতে শুরু করতাম। বুঝতে পারতাম জেগে রয়েছি। কিন্তু হাঁটাচলা থামাতে পারতাম না। কেন এ রকম হত, তা জানি না। কিন্তু খুব ভয়ে ভয়ে থাকতাম।’’
বড়পর্দায় অভিনয় নিয়ে কেরিয়ার গড়বেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বৈষ্ণবী। হাতেগোনা কয়েকটি দক্ষিণী ছবিতে অভিনয়ও করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই কেরিয়ার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
বৈষ্ণবীর দাবি, তাঁকে বেশ কয়েকটি ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেই সমস্ত ছবির কাজই থমকে যায়। ফলে কোনও ছবিতেই অভিনয় করা হয়ে ওঠেনি।
বড়পর্দায় অভিনয়ের আশা ত্যাগ করে ছোটপর্দার ধারাবাহিকের জন্য অডিশন দিতে শুরু করেন বৈষ্ণবী। ভাগ্যও সহায় হয়েছিল তাঁর। ১৯৯৭ সাল থেকে টেলিভিশনের পর্দায় সম্প্রচার শুরু হয় জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘শক্তিমান’-এর। সেই ধারাবাহিকে মুকেশ খন্নার বিপরীতে অভিনয়ের সুযোগ পান বৈষ্ণবী।
‘শক্তিমান’ ধারাবাহিকে গীতা বিশ্বাসের চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায় বৈষ্ণবীকে। ধারাবাহিকের প্রথম কয়েকটি পর্বে গীতার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন কিটু গিদওয়ানি। কিন্তু ধারাবাহিকের দ্রুত গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিলেন না কিটু।
মুকেশ জানিয়েছিলেন, ধারাবাহিকের পরিচালক দিনকর জানির কাছে গিয়ে কিটু নিজেই কাজ থেকে সরে যাওয়ার আর্জি জানিয়েছিলেন। মাঝপথে শুটিংয়ে যাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছিলেন তিনি। রাতারাতি নতুন করে গীতার চরিত্রের জন্য অডিশন নেওয়া শুরু হয় এবং বৈষ্ণবীকে পছন্দ করেন নির্মাতারা।
১৯৯৭ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা আট বছর ‘শক্তিমান’ ধারাবাহিকে অভিনয় করেছিলেন বৈষ্ণবী। গীতা বিশ্বাস নামেই পরিচিতি পেতে শুরু করেন তিনি। তার পর একাধিক হিন্দি ধারাবাহিকে অভিনয় করলেও সেই পরিচয় মুছে যায়নি।
১৯৯৮ সালের অগস্টে লেসলি ম্যাকডোনাল্ডকে বিয়ে করেন বৈষ্ণবী। ব্রিটেনের বাসিন্দা লেসলি পেশায় প্রযুক্তিবিদ বলে জানা যায়। বিয়ের পর এক কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন বৈষ্ণবী। একাধিক হিন্দি ছবিতে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন তিনি। বর্তমানে ‘রিমঝিম’ নামের একটি হিন্দি ধারাবাহিকে অভিনয় করছেন ‘শক্তিমানের’ নায়িকা।