পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হওয়ার জন্য মরিয়া ইরান। হাজারো নিষেধাজ্ঞা চাপানোর পরও পরমাণু অস্ত্রভান্ডার তৈরির গোঁ ছাড়তে নারাজ তেহরান। সেই লক্ষ্যে গোপনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ বাড়িয়েছে তেহরান। বিষয়টি নজরে আসতেই প্রমাদ গোনে যুক্তরাষ্ট্র ও রাষ্ট্রপুঞ্জ। নিরস্ত করতে তেহরানকে সমঝোতার পথে হাঁটানোর চেষ্টা করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার। তেহরানের সঙ্গে জেসিপোয়া সমঝোতার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন বারাক হুসেন ওবামা। তাঁর যুক্তি ছিল, নিষেধাজ্ঞা থেকে কিছুটা মুক্তি পেলে পরমাণু বোমা তৈরির লক্ষ্য থেকে সরে আসবে ইরান।
পারমাণবিক অস্ত্র মজুত করা থেকে ইরানকে বিরত রাখার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করে আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সর্বশেষ প্রচেষ্টা সামরিক হামলার হুমকি। নরমে গরমে চাপ সৃষ্টি করার পাশাপাশি একাধিক গোপন অভিযান ব্যবহার করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ব্যাহত করার চেষ্টা করেছে ওয়াশিংটন। ইরানের পরমাণু প্রকল্পকে সমূলে উৎখাত করার জন্য আরও একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে গাঁটছড়া বেধেছিল আমেরিকা। ইরানের প্রতিবেশী ইজ়রায়েল।
গোপন সেই সাইবার অভিযানের পোশাকি নাম ছিল ‘অপারেশন অলিম্পিক গেমস’। ইতিহাসের অন্যতম গোপন এবং আলোচিত একটি সাইবার অভিযান। কোনও সামরিক শক্তি ব্যবহার না করে শুধুমাত্র কোড বা ম্যালঅয়্যার ব্যবহার করে একটি দেশের পারমাণবিক কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করার প্রথম ধাপ। উদ্দেশ্য ছিল সরাসরি যুদ্ধ বা বোমার হামলা এড়িয়ে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে কয়েক যোজন পিছিয়ে দেওয়া।
তেহরান থেকে ২২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে ইরানের কেন্দ্রীয় মালভূমিতে রয়েছে নাতান্জ় পরমাণুকেন্দ্র। এই ঘাঁটির একটি বড় অংশ মাটির নীচে রয়েছে। বাকি অংশ রয়েছে মাটির উপরে। নাতান্জ় পরমাণুকেন্দ্রকে ইরানের ‘ইউরেনিয়াম বিশুদ্ধকরণের মুকুট’ বলা হয়। কেন্দ্রেও ইউরেনিয়াম ৬০ শতাংশ পরিশুদ্ধ করা যায়। এতে সামান্য তেজষ্ক্রিয় স্তরে পৌঁছোয় ইউরেনিয়াম, কিন্তু পরমাণু বোমা তৈরির জন্য তা যথেষ্ট নয়।
রাষ্ট্রপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা’ বা আইএইএ-র (ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি) রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি বছরের ১০ জুন পর্যন্ত ইরানের হাতে ছিল আনুমানিক ৪০৯ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম। আণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ইউরেনিয়ামকে ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধ হতে হয়। সেই পর্যায়ে পৌঁছোতে পারলে ওই পরিমাণ ইউরেনিয়াম দিয়ে ন’টির বেশি পরমাণু বোমা তৈরি করতে পারবে তেহরান।
অপারেশন অলিম্পিক গেমস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজ়রায়েলের সঙ্গে যৌথ ভাবে পরিচালিত হয়েছিল। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে তেহরানের পরমাণু শক্তিধর হওয়ার বাসনায় জল ঢালার জন্য এই গোপন সাইবার অভিযানের প্রস্তুতি শুরু হয়। ওবামার শাসনকালে এই অভিযানটিতে স্টাক্সনেট নামের একটি ম্যালঅয়্যার ব্যবহার করা হয়েছিল। ইরানের নাতান্জ় পরমাণুকেন্দ্রের কম্পিউটার সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করে এই জটিল ভাইরাসটি।
স্টাক্সনেট ছিল একটি অনন্য জটিল ম্যালওয়্যার। ইরানের পরমাণুকেন্দ্রের পরিচালন ক্ষমতাকে সম্পূর্ণ বিনষ্ট করে দেওয়ার জন্য তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে তৈরি করা হয়েছিল এবং এটি নাটান্জ়ের অবকাঠামোর একাধিক স্তরে আক্রমণ করতে সক্ষম ছিল। স্টাক্সনেটকে বিশ্বের প্রথম ডিজিটাল অস্ত্র হিসাবেও বিবেচনা করা হয়।
স্টাক্সনেটের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানের নাতান্জ় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র। কোনও সাধারণ ভাইরাস হিসাবে জন্ম দেওয়া হয়নি স্টাক্সনেটকে। এটি অত্যন্ত জটিল এবং শক্তিশালী কম্পিউটার ভাইরাস। মূলত ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে আঘাত করার জন্যই তৈরি করা হয়েছে। এই ম্যালঅয়্যারটিকে একটি নির্দিষ্ট বহু স্তরের সাইবার আক্রমণের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এর কাজ করার পদ্ধতিও ছিল অত্যন্ত সুচারু ও নিখুঁত।
তবে নাতানজ় কেন্দ্রের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা এড়িয়ে ম্যালঅয়্যারটিকে পরমাণুকেন্দ্রের মূল সিস্টেমে প্রবেশ করানো বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। কারণ নাতান্জ় কেন্দ্রটির সঙ্গে বাইরের ইন্টারনেটের কোনও সংযোগ রাখা হয়নি। নিরাপত্তার কারণে বাইরের সমস্ত যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয় পরমাণুকেন্দ্রটিকে।
এই ভাইরাসটির লক্ষ্য ছিল ইরানের পরমাণু কর্মসূচির মূল যন্ত্র, বিশেষ করে এর সেন্ট্রিফিউজ়গুলিকে নষ্ট করে দেওয়া। সেগুলির গতি নিয়ন্ত্রণ করে সেগুলিকে অকেজো করে দেওয়া, যাতে ইরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির কাজ বিলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত করা সম্ভব হয়।
স্টাক্সনেট একটি ইন্টারনেট ওয়ার্ম যা উইন্ডোজ় কম্পিউটারকে সংক্রামিত করে। প্রধানত ইউএসবি স্টিকের মাধ্যমে এটিকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে এটি এমন সব কম্পিউটার এবং নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে পারে যেগুলি সাধারণত ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে না। এক বার কোনও নেটওয়ার্কে প্রবেশ করার পর, এটি সেই নেটওয়ার্কের অন্যান্য মেশিনে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেগুলোকে সংক্রামিত করার পর আসল লক্ষ্যে পৌঁছোনোর কাজ শুরু করে।
কম্পিউটারে প্রবেশ করার পর, এটি মাইক্রোসফ্ট উইন্ডোজ়ের কয়েকটি অজানা নিরাপত্তা ত্রুটি ব্যবহার করে স্থানীয় নেটওয়ার্কের অন্যান্য কম্পিউটারে ছড়িয়ে পড়ত। স্টাক্সনেট আসলে ওই সব সংক্রামিত উইন্ডোজ় কম্পিউটারগুলির কোনও ক্ষতিই করে না। উইন্ডোজ় কম্পিউটারকে সংক্রামিত করা এর আসল লক্ষ্য নয়। স্টাক্সনেট যা খোঁজে তা হল সিমেন্সের তৈরি একটি নির্দিষ্ট মডেলের প্রোগ্রামেবল লজিক কন্ট্রোলার বা পিএলসি।
স্টাক্সনেট পিএলসি-এর সফ্টঅয়্যার এবং হার্ডঅয়্যার খোঁজ করত। এই পিএলসিগুলোই নাতানজ়ের সেন্ট্রিফিউজ়ের গতি নিয়ন্ত্রণ করত। ভাইরাস বা ম্যালঅয়্যারটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু খুঁজে না পেলে এটি নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়ে যেত সিস্টেমে। সঠিক পিএলসি খুঁজে পাওয়ার পর, স্টাক্সনেট সেন্ট্রিফিউজ়ের নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থায় গোপনে প্রবেশ করে। এটি সেন্ট্রিফিউজ়ের ঘূর্ণন গতি হঠাৎ খুব বাড়িয়ে দেয় এবং কিছু ক্ষণ পর আবার কমিয়ে দেয়।
এই অস্বাভাবিক গতি পরিবর্তনের ফলে সেন্ট্রিফিউজ়গুলো অত্যধিক উত্তপ্ত হয়ে এবং যান্ত্রিক চাপে একসময় ভেঙে বা নষ্ট হয়ে যায়। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে যখন এটি ইরানি পরমাণুকেন্দ্রের সেন্ট্রিফিউজ় ধ্বংস করছিল, তখন সেই ক্ষতির আঁচ বিন্দুমাত্র টের পাননি সেখানকার কম্পিউটার বিশেষজ্ঞেরা। কন্ট্রোল রুমের মনিটরে এমন তথ্য দেখাচ্ছিল যেন সব কিছু স্বাভাবিক ভাবে চলছে। ফলে ইরানি পরমাণু বিশেষজ্ঞেরা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বুঝতে পারেননি কেন তাঁদের সেন্ট্রিফিউজ়গুলো একের পর এক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
২০১০ সালের জুন মাসে বেলারুশের একটি নিরাপত্তা সংস্থা এই ম্যালঅয়্যারটি প্রথম শনাক্ত করে। এটি তখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল, যদিও এর মূল ক্ষতি কেবল নাতান্জ় কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ ছিল। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, স্টাক্সনেট ইরানের নাতানজ় কেন্দ্রের প্রায় ১০০০ সেন্ট্রিফিউজ় (প্রায় এক-পঞ্চমাংশ) ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি কয়েক বছরের জন্য পিছিয়ে যায়।
স্টাক্সনেট কোনও অপরাধমূলক ভাইরাসের মতো কাজ করে না। এটি নির্বিচারে ছড়ায় না। এটি ক্রেডিট কার্ডের তথ্য বা অ্যাকাউন্টের লগ ইনের তথ্য চুরি করে না। সংক্রামিত কম্পিউটারগুলোকে একত্রিত করে কোনও বটনেটও তৈরি করে না। ২০১০ সালের জুন মাসে বেলারুশের একটি নিরাপত্তা সংস্থা এই ম্যালঅয়্যারটি প্রথম শনাক্ত করে। তত দিনে এটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে ক্ষতি যা হওয়ার তা কেবল ইরানের পরমাণুকেন্দ্র নাতানজ়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
যদিও আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনও সংস্থা বা হ্যাকিং গোষ্ঠী এই সাইবার হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অত্যন্ত জটিল এবং ব্যয়বহুল সাইবার অস্ত্রটি তৈরিতে সম্ভবত আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের গোয়েন্দা সংস্থার যৌথ শ্রম ছিল। এ ব্যাপারে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল প্রেসিডেন্ট বুশের আমলে ‘অলিম্পিক গেমস’ ছদ্মনামে শুরু হওয়া এই অভিযান ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে দুই থেকে তিন বছর পিছিয়ে দিয়েছিল।
স্টাক্সনেটের কথা চাউর হওয়ার পরই বিশ্ব জুড়ে সাইবার যুদ্ধের ধারণা পুরোপুরি বদলে যায়। এটি প্রমাণ করে যে, কেবল কোড লিখেও একটি দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র, পারমাণবিক পরিকাঠামো বা যে কোনও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কেন্দ্র ধ্বংস করা সম্ভব। স্টাক্সনেটের ভয়াবহতাই পরবর্তী কালে বিশ্বের বহু দেশের সাইবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও জোরদার করে তোলে।