এ বার আফগানিস্তানে ‘আরব বসন্ত’! নারীশিক্ষা ও ইন্টারনেট ব্যবহারকে কেন্দ্র করে তালিবানের অন্দরে ভাঙনের ইঙ্গিত মিলতেই তুঙ্গে উঠেছে সেই জল্পনা। এতে হাওয়া দিয়েছে জনপ্রিয় ব্রিটিশ সংবাদসংস্থা বিবিসি। সম্প্রতি দলটির শীর্ষনেতার ফাঁস হওয়া একটি অডিয়ো ক্লিপকে সামনে রেখে তদন্তমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তারা। পঠানভূমির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি অস্থির হলে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে যে ইসলামাবাদ ছাড়বে না, তা ভালই জানে নয়াদিল্লি। আর তাই কপালের ভাঁজ চওড়া হচ্ছে সাউথ ব্লকের।
চলতি বছরের জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে আফগানিস্তান নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিবিসি। ‘তালিবানের শীর্ষে ফাটল’ শীর্ষক ওই রিপোর্টে হিন্দুকুশের কোলের দেশটির গদিতে থাকা দলটি দু’টি গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে গিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর এক দিকে আছেন তালিবানের সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) তথা কট্টরপন্থী হিবাতুল্লাহ আখুন্দজ়াদা ও তাঁর অনুগামীরা। উল্টো দিকে গোষ্ঠীটিকে নেতৃত্বে দিচ্ছেন সেখানকার ভারপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজ়ুদ্দিন হক্কানি।
পশ্চিমি গণমাধ্যমটির দাবি, তালিবানের অন্দরে শুরু হয়েছে মতাদর্শের লড়াই। সেই সঙ্গে মাথাচাড়া দিচ্ছে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। একে কাবুল ও কন্দহর গোষ্ঠীর সংঘাত বলে দাবি করেছে বিবিসি। প্রমাণ হিসাবে আখুন্দজ়াদার ফাঁস হওয়া একটি অডিয়ো ক্লিপ সামনে এনেছে তারা। সেখানে একটি মাদ্রাসায় বক্তৃতা দেওয়ার সময় বিষয়টি নিয়ে দলীয় নেতৃত্বকে সতর্ক করেছেন তিনি। অডিয়ো ক্লিপে ‘বিভাজনের জেরে আমিরশাহি ভেঙে পড়বে এবং তা অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে’, এ কথাও বলতে শোনা গিয়েছে তাঁকে।
অডিয়ো ক্লিপটির পাশাপাশি অত্যন্ত গোপনে শতাধিক তালিবান নেতার সাক্ষাৎকার নিয়েছে বিবিসি। তাঁরা প্রত্যেকেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কথা কবুল করেছেন। শুধু তা-ই নয়, ফাঁস হওয়া ক্লিপটির কণ্ঠস্বর যে সর্বোচ্চ নেতা আখুন্দজ়াদারই, তাও মেনেছেন সশস্ত্র গোষ্ঠীটির শীর্ষনেতৃত্ব। ফলে আফগানিস্তানের অন্দরের বিভাজনের রাজনীতিতে পাকিস্তানের উস্কানি থাকতে পারে বলে দানা বেঁধেছে সন্দেহ। যদিও ইসলামাবাদকে নিয়ে প্রকাশ্যে কোনও বিবৃতি দেয়নি কাবুল।
২০২১ সালে আমু দরিয়ার পার থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৈন্য প্রত্যাহার করলে দ্বিতীয় বারের জন্য সেখানে ক্ষমতায় ফেরে তালিবান। প্রথমেই দেশের নাম বদলে ‘ইসলামীয় আমিরশাহি আফগানিস্তান’ (ইসলামিক এমিরেট্স অফ আফগানিস্তান) করে তারা। তার পর ধীরে ধীরে সরকার গঠনে মন দেয় কট্টরপন্থী ওই সশস্ত্র গোষ্ঠী। বিবাদের বীজ কিন্তু তখনই পোঁতা হয়ে গিয়েছিল। কারণ, ক্ষমতার ভরকেন্দ্র কাবুল ও কন্দহর দুই জায়গাতেই রাখার সিদ্ধান্ত নেয় তালিবান।
আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল হলেও কন্দহরের সঙ্গে সেখানকার শাসকদের নাড়ির টান রয়েছে। গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকের মাঝামাঝি ওই এলাকাতেই জন্ম হয় তালিবানের। গোড়ার দিকে তা তালিব বা পড়ুয়াদের নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল। ১৯৯৪ সালে পঠানভূমিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে এই সশস্ত্র গোষ্ঠী। এর ঠিক দু’বছরের মাথায় তাদের হাতেই পতন হয় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মহম্মদ নজ়িবুল্লাহ আহমেদজ়াইয়ের। গ্রেফতার করে তাঁকে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝোলায় তালিবান।
গৃহযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৯৪ সালের নভেম্বরে এক আকস্মিক হামলায় কন্দহর দখল করে এই সশস্ত্র গোষ্ঠী। ওই বছরই তালিবান নেতৃত্বের নির্দেশে সেখানে গড়ে ওঠে দলের সদর কার্যালয়। একসময় কন্দহরের দফতর থেকে সরকার পরিচালনা করত তারা। যদিও দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় এসে সেই রাস্তায় হাঁটেননি তালিবান নেতৃত্ব। প্রশাসনিক কাজের জন্য কাবুলকেই বেছে নিয়েছেন তাঁরা। অন্য দিকে দলের মতাদর্শগত প্রচারের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে কন্দহরের সদর দফতর।
আফগানিস্তানের তালিবান সরকারের দৈনন্দিন কাজকর্ম চালানোর একটা বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে। কন্দহরের দফতরে থাকেন সর্বোচ্চ নেতা আখুন্দজ়াদা। কিন্তু তাঁর অন্তর্বর্তিকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী-সহ মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের দফতর রয়েছে কাবুলে। আখুন্দজ়াদার নির্দেশেই সেগুলি পরিচালিত হয়। মাঝেমধ্যেই নানা ধরনের ফতোয়া জারি করেন পঠানভূমির এই কট্টরপন্থী নেতা। তখনই নারীশিক্ষা ও সঙ্গীত বন্ধ করা, প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত বা মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিতে দেখা যায় তালিবানকে।
এই নিয়মের জাঁতাকলে পড়ে প্রশাসন চালানোর জন্য আখুন্দজ়াদা-সহ কন্দহরের কট্টরপন্থীদের নির্দেশ মানতে হচ্ছে কাবুলের মন্ত্রীদের। এতে বহু ক্ষেত্রেই জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ছে তাঁদের। দ্বিতীয়ত, অন্তর্বর্তিকালীন সরকারের একাংশ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আফগানিস্তানকে তুলে ধরতে ইচ্ছুক। বিদেশি লগ্নি এনে যুদ্ধবিধ্বস্ত হিন্দুকুশের কোলের দেশটিকে সাজাতে চাইছেন তাঁরা। বিবিসির দাবি, বর্তমানে সেই পরিকল্পনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল কন্দহর গোষ্ঠীর ধর্মীয় গোঁড়ামি।
এর জেরে সাম্প্রতিক সময়ে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে ফাটল চওড়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে স্পষ্ট করেছে সংশ্লিষ্ট ব্রিটিশ গণমাধ্যম। তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা আখুন্দজ়াদার সঙ্গে রয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ হাসান আখুন্দ, উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী নেডা মহম্মদ নাদিম এবং প্রধান বিচারপতি আবদুল হাকিম হাক্কানি। অন্য দিকে, ভারপ্রাপ্ত উপপ্রধানমন্ত্রী আবদুল গনি বরাদর এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী মহম্মদ ইয়াকুব মুজ়াহিদের সমর্থন পাচ্ছেন সিরাজ়ুদ্দিন হক্কানি।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের (২০২৫ সালের) ২৯ সেপ্টেম্বর ইন্টারনেটকে কেন্দ্র করে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত প্রকাশ্যে চলে আসে। ওই তারিখে সারা দেশে নেট পরিষেবা বন্ধ করার নির্দেশ দেন আখুন্দজ়াদা। ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরোপুরি অকেজো হয়ে যায় মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে কম্পিউটার-ল্যাপটপের মতো গ্যাজেট। কন্দহর গোষ্ঠীর এ-হেন ফতোয়া মেনে নিতে পারেনি কাবুল প্রশাসন।
ওই সময় আখুন্দজ়াদার নির্দেশকে একরকম অমান্য করে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই আফগানিস্তানে ফের ইন্টারনেট ফেরায় কাবুল প্রশাসন। সূত্রের খবর, এতে বড় ভূমিকা নেন ভারপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজ়ুদ্দিন হক্কানি। কট্টরপন্থীদের বিরুদ্ধে এ-হেন নাছোড় মনোভাবের জেরে পঠানভূমিতে হু-হু করে বাড়তে থাকে তাঁর জনপ্রিয়তা। বর্তমানে তাঁকে হিন্দুকুশের কোলের দেশটির সবচেয়ে লোকপ্রিয় নেতা বললে অত্যুক্তি করা হবে না।
কাবুল গোষ্ঠীর তালিবান নেতৃত্বের দাবি, বর্তমানে সরকারি প্রশাসন সুষ্ঠু ভাবে চালানোর ক্ষেত্রে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হল ইন্টারনেট। ভারত-সহ বিশ্বের বেশ কয়েকটা দেশে দূতাবাস রয়েছে তাদের। ইন্টারনেট ছাড়া সেখানকার কর্মীদের সঙ্গে কোনও ভাবেই যোগাযোগ রাখতে পারবেন না তাঁরা। সেই কারণেই সংশ্লিষ্ট পরিষেবাটি চালু রাখার পক্ষে সওয়াল করতে দেখা গিয়েছে তাঁদের।
কট্টরপন্থী আখুন্দজ়াদা গোষ্ঠীর সদস্যদের আবার দাবি, এতে ইসলামীয় রীতিনীতিতে আফগানিস্তানের মতো দেশকে বেঁধে রাখা কঠিন হবে। উল্টে আমজনতার মনে ঢুকতে পারে পশ্চিমি ‘মুক্ত চিন্তা’। কোনও অবস্থাতেই তা চান না তাঁরা। সেই কারণেই ইন্টারনেটের পাশাপাশি টিভি বা মোবাইল ফোনের মতো অত্যাধুনিক বৈদ্যুতিন সরঞ্জামগুলি উপর বার বার কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করতে দেখা গিয়েছে হিন্দুকুশের কোলের দেশটির সর্বোচ্চ নেতাকে।
ইন্টারনেটকে বাদ দিলে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাদের দ্বিতীয় কারণ হল নারীশিক্ষা। বর্তমানে আফগানিস্তানে বসবাসকারী মহিলাদের সংখ্যা দু’কোটি ছাড়িয়ে গিয়েছে। দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় আসার পর প্রথমে তাঁদের উচ্চশিক্ষা বন্ধ করেন আখুন্দজ়াদা। ফলে কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিষিদ্ধ হয় মহিলাদের প্রবেশ। এই নিয়ে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেন পড়ুয়াদের একাংশ। যদিও তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। উল্টে তালিবানি ফতোয়া মেনে নেয় অন্যান্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলিও।
এর কিছু দিন পর মহিলাদের স্কুলে যাওয়ার উপর ফতোয়া জারি করেন আখুন্দজ়াদা। এর ফলে আফগানিস্তানে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় নারীশিক্ষা। ফলে এই ইস্যুতে কন্দহর গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই সুর চড়ান ভারপ্রাপ্ত উপ বিদেশমন্ত্রী মহম্মদ আব্বাস স্ট্যানিকজ়াই। বলেন, ‘‘দেশের মেয়েদের মূর্খ বানিয়ে রাখতে চাইছেন আখুন্দজ়াদা। কিন্তু তাতে কোনও লাভ নেই। কারণ আধুনিক পৃথিবীতে মহিলাদের ছাড়া কোনও রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব।’’
এই মন্তব্যের পর স্বাভাবিক ভাবেই কন্দহর গোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন স্ট্যানিকজ়াই। ফলে আমজনতার সামনে থেকে একরকম গায়েব হয়ে যান তিনি। সূত্রের খবর, কয়েক বছর আগে দেশ ছেড়ে পালিয়ে কাতারের দোহায় আশ্রয় নিয়েছেন স্ট্যানিকজ়াই। তবে দীর্ঘ দিন তাঁকে প্রকাশ্যে দেখতে না পাওয়ায় সন্দেহ দানা বেঁধেছে। তাঁকে নিয়ে মুখ খোলেননি তালিবান নেতৃত্ব।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, আফগানিস্তানের শাসনক্ষমতায় থাকা গোষ্ঠীটির অন্দরে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আরও তীব্র হলে আখেরে লাভ হবে পাকিস্তানের। কারণ, তখন পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলানোর সুযোগ পাবে ইসলামাবাদ। তা ছাড়া মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে সেখানকার বাসিন্দাদের ভারতের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলতে পারে তারা, যা নয়াদিল্লির কাছে উদ্বেগজনক।
অতীতে আফগান যোদ্ধাদের জম্মু-কাশ্মীরের সীমান্ত পার সন্ত্রাসে যথেচ্ছ ভাবে ব্যবহার করেছে পাক গুপ্তচরবাহিনী আইএসআই (ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স)। যদিও দ্বিতীয় বারের জন্য তালিবান শাসন সেখানে ফেরার পর কাবুলের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। সীমান্ত বিবাদকে কেন্দ্র করে গত বছর বেশ কয়েক দফায় সংঘর্ষেও জড়িয়ে পড়ে দুই প্রতিবেশী। অন্য দিকে, গত চার বছরে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বেশ মজবুত করেছে পঠানভূমির শাসনগোষ্ঠী।
তবে এগুলির উল্টো যুক্তিও রয়েছে। ২০২১ সালের পর থেকে বেশ কয়েক বার তালিবানের অন্দরের ভাঙন নিয়ে খবর প্রকাশ করেছে পশ্চিমি গণমাধ্যম। যদিও প্রকাশ্যে ভাঙনের কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি। আর তাই বিবিসির রিপোর্ট কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।