পশ্চিম এশিয়ায় চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে পৌষ মাস বেজিঙের। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ইরানকে সমর্থন জানিয়ে আখের গোছাতে শুরু করেছে চিন। ইজ়রায়েল ও আমেরিকার যৌথ অভিযানের পর তেহরানের প্রতি ‘নীরব’ সমর্থন জানিয়েছে চিন। তেহরানের উপর দুই দেশের হামলার নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েছে সে দেশের বিদেশ মন্ত্রক। ১ মার্চ বিদেশ মন্ত্রক বিবৃতি জারি করে জানায়, ইরানে আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের যৌথ হামলা নিয়ে বেজিং উদ্বিগ্ন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক নিয়ম ভাঙা হয়েছে বলে দাবি চিনের। অবিলম্বে ওই অঞ্চলে শান্তি ফেরানোর জন্য সংঘর্ষবিরতির আহ্বান জানিয়েছে বেজিং। ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসনের সময়ও একই ভাবে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়েছিল বেজিঙের বিদেশ মন্ত্রক। চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, কোনও দেশেরই ‘বিশ্ব পুলিশ’-এর ভূমিকা নেওয়া বা নিজেকে ‘আন্তর্জাতিক বিচারক’ হিসাবে প্রতিপন্ন করা উচিত নয়।
কূটনৈতিক নিন্দার বাইরেও শিয়া মুলুকের সঙ্গে চিনের হাতে হাত মেলানোর অন্যতম কারণ হল যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ ও মার্কিন তথ্য হাতানো। ২৫ বছরের সামরিক সহযোগিতা কর্মসূচি এবং নিরাপত্তা অংশীদারি সমঝোতার মাধ্যমে তেহরানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে বেজিং। নির্ভুল হামলা এবং নজরদারি ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য শিয়া অধ্যুষিত রাষ্ট্রটির হাতে চিন তুলে দিয়েছে উন্নত স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা ও উন্নত সামরিক প্রযুক্তি।
২০১৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জমানায় ইরানের সঙ্গে তিন বছরের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি করেছিল ছয় শক্তিধর রাষ্ট্র— ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া, জার্মানি, চিন এবং আমেরিকা। চুক্তির নাম ছিল ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন’ (জেসিপিওএ)। তাতে স্থির হয়, ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি এবং পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টা বন্ধ রাখলে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে রাষ্ট্রপুঞ্জ, আমেরিকা এবং অন্য কয়েকটি দেশ। এতে উভয় পক্ষই লাভবান হয়েছিল।
বিগত এক দশক ধরে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল যে তারা পারমাণবিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করবে। ২০১৫ সালে আমেরিকা-ইরান যে পরমাণু চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল তাতে পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে তাদের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছিল। ইরানের পরমাণু চুক্তিতে অনেক বিষয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টিকে খুব একটা আমল দেয়নি ওয়াশিংটন। তারা জানিয়েছিল, পরে এই বিষয়টি নিয়ে ভাবনাচিন্তা করবে।
এই ছোট্ট ফাঁকটিই তেহরানের কাছে সামরিক শক্তিবৃদ্ধির ক্ষেত্রে তুরুপের তাস হয়ে ওঠে। কিন্তু চুক্তিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে গুরুত্ব না দেওয়ার ফাঁকটি বেজিঙের কাছে সুবর্ণসুযোগ হয়ে ওঠে। চিন সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ইরানকে সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়। গোটা বিশ্ব যখন ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের উপর নজর দিচ্ছিল, তখন চিন নীরবে ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছিল।
২০১৬ সালে প্রথম বার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরে ট্রাম্প জানান, এই পরমাণু চুক্তি ছিল ওবামার ভুল পদক্ষেপ। এর ফলে আমেরিকার কোনও সুবিধা হয়নি, উল্টে লাভ হয়েছে ইরানের। ২০১৮ সালে তাঁর নির্দেশেই ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি ভেঙে বেরিয়ে আসে আমেরিকা। কিন্তু ২০২৪ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের পর্যবেক্ষক সংস্থা আইএইএ একটি রিপোর্টে জানায়, ফের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শুরু করেছে ইরান।
এর পরেই নড়েচড়ে বসে আমেরিকা-সহ পশ্চিমি দুনিয়া। কিন্তু পাঁচ দফা আলোচনার পরেও এখনও ট্রাম্পের শর্ত মেনে পরমাণু চুক্তি করতে রাজি হয়নি ইরান। ইরানের দাবি ছিল শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরমাণু শক্তি ব্যবহারের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি চালিয়ে যাবে তারা। ওয়াশিংটনের শর্ত মেনে পরমাণু কর্মসূচি ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে রাজি নয় তেহরান।
পরমাণ চুক্তি নিয়ে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা হওয়ার আগেই পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে ইরান বনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েলের যুদ্ধ। রণাঙ্গনে জোড়া শত্রুকে ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে সাবেক পারস্য দেশ। পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে থাকা শত্রুঘাঁটিকে লক্ষ্য করে আছড়ে পড়ছে ইরানি ‘হাইপারসনিক’ (শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ গতিশীল) ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘কামিকাজ়ে’ (আত্মঘাতী) ড্রোন।
একাধিক প্রতিরক্ষা প্রতিবেদনে দাবি উঠেছে, শত্রুঘাঁটিতে নির্ভুল নিশানায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত হানার নেপথ্যে রয়েছে চৈনিক নির্দেশিকা প্রযুক্তি এবং বেইডু নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত উপগ্রহের নজরদারি (স্যাটেলাইট নেভিগেশন)। ধীরে ধীরে আমেরিকান জিপিএসের উপর নির্ভরতা কমিয়ে ইরান চিনা প্রযুক্তিতে ভরসা করেছে। তাতেই মিলেছে সাফল্য। আমেরিকা-ইজ়রায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতে চিনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম, বেইডু।
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন সরকারের মালিকানাধীন এবং নিয়ন্ত্রিত প্রভাবশালী গ্লোবাল পজ়িশনিং সিস্টেম (জিপিএস) এর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে উঠে এসেছে চিনা নেভিগেশন প্রযুক্তিটি। সামরিক অভিযান এবং ড্রোন থেকে শুরু করে স্মার্টফোন নেভিগেশন এবং দুর্যোগ মোকাবিলা পর্যন্ত সব কিছুকে শক্তিশালী করে এটি। এতে প্রায় ৩০টি উপগ্রহকে ব্যবহার করা হয়। ২০২৫ সালে ইরান ও ইজ়রায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় জিপিএস জ্যামিংয়ের কারণে ইরানের অসামরিক ও সামরিক উভয় ক্ষেত্রেই যোগাযোগ ব্যবস্থা থমকে গিয়েছিল।
সেই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে তেহরান জিপিএস থেকে মুখ ফিরিয়ে চিনা প্রযুক্তির উপর ভরসা করে বেইডুকে বেছে নিয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘাতে হাতেনাতে সাফল্য পেয়েছে ইরানি প্রতিরক্ষাবাহিনী। ইরানের সামরিক বাহিনী হামলার কৌশলগত দিক থেকে বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়েছে বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা। উদাহরণস্বরূপ আমেরিকার সামরিক সম্পদের উপর নিখুঁত নজরদারিতে সক্ষম হয়েছেন ইরানি কমান্ডারেরা।
ইরানকে অবিচ্ছিন্ন গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্কেত দেওয়ার জন্য ভূখণ্ডের ম্যাপিং সম্পর্কে সহায়তা করতে ৫০০-এর বেশি উপগ্রহ ব্যবহার করার ছাড়পত্র দিয়ে রেখেছে বেজিঙের সংস্থাটি। পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর গতিবিধি রিয়্যাল টাইমে নজরদারি করতে তা সহায়তা করছে ইরানকে।
ইরানের হাতে আসা সেই সামরিক তথ্য কাজে লাগানোর সুযোগ পাচ্ছেন চিনের লাল ফৌজের কর্তারাও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ‘মিত্র দেশ’ ইজ়রায়েলের সঙ্গে সংঘাতে লাভবান হচ্ছে চিন। এমনটাই মত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের। আমেরিকার সামরিক সক্ষমতা মূল্যায়ন করার কাজে লাগানোর জন্য ইরানকে ব্যবহার করছে চিন, এমনটাই মত একাংশের। তাইওয়ানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ময়দানে নামার আগে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতির জন্য দরকারি সামরিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করছে চিন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার আঞ্চলিক মিত্রদের চ্যালেঞ্জ জানাতে ক্ষেপণাস্ত্র-কেন্দ্রিক সামরিক কৌশল প্রয়োগ বাড়িয়ে চলেছে ইরান। পশ্চিম এশিয়ায় ইরান ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের দিক থেকে সবচেয়ে শক্তিধর দেশ। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানের হাতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে ৩,০০০-এরও বেশি। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা তুলনামূলক ভাবে সস্তা। এই সমস্ত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করার প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে চিন। চিনা উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের উপর নির্ভর করে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি নির্ভুল লক্ষ্যে আঘাত হানার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনগুলিকে থামানোর জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিন ইন্টারসেপ্টরগুলি অনেক বেশি ব্যয়বহুল। একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরান যেখানে প্রতি মাসে ১০০টি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে, সেখানে আমেরিকা মাত্র ৬টি ইন্টারসেপ্টর তৈরি করতে সক্ষম। ত্রিমুখী লড়াইয়ে সকলের অলক্ষে কলকাঠি নেড়ে চলেছে বেজিংই। কারণ ইরান যুদ্ধে আমেরিকার ক্ষয়ক্ষতির অর্থ তাইওয়ানের সঙ্গে লড়াইয়ে চিনের জমি শক্ত হওয়া। চিনা উপগ্রহের নজরদারির মাধ্যমে মার্কিন বাহিনীর ব্যয়বহুল অস্ত্রের অবক্ষয় পর্যবেক্ষণ করে বেজিংও কৌশলগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করছে।
যৌথ হামলা শুরু হওয়ার ঠিক আগে নৌপথে মার্কিন সেনার সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে চিনের দ্বারস্থ হয়েছিল ইরান। যুদ্ধজাহাজ বিধ্বংসী সুপারসনিক (শব্দের চেয়ে বেশি গতিবেগ সম্পন্ন) ক্ষেপণাস্ত্র সিএম-৩০২ কিনতে চুক্তি চূড়ান্ত করেছিল তেহরান। চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের সরকার খুব তাড়াতাড়িই তেহরানকে ওই ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ শুরু করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগেও চিনের কাছ থেকে এইচকিউ-৯বি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনেছে তেহরান। ইরানের সামরিক বাহিনী বর্তমানে যে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলি ব্যবহার করে, তার মধ্যে অন্যতম এটি।
সমরকুশলীদের মতে, ইরানের যুদ্ধ চিনের জন্য আশীর্বাদ। আমেরিকার এবং ইজ়রায়েলি অস্ত্রভান্ডারের অন্ধিসন্ধি ও ভবিষ্যৎ সামরিক কৌশল নির্ধারণের সুবর্ণসুযোগ। ক্ষেপণাস্ত্র এবং রেডার ব্যবস্থাগুলিকে উন্নত করতে ইরানের যুদ্ধ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করবে চিন। আমেরিকা যদি আঞ্চলিক সংঘাতের জালে জড়িয়ে পড়ে, তবে তাইওয়ান প্রশ্ন-সহ এশিয়ার ইস্যুগুলো স্বাভাবিক ভাবেই আর উত্থাপিত হবে না। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষাশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহে চিনের প্রভাব এশিয়ায় আরও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।