‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা আরশোলা জনতা পার্টি নিয়ে তুমুল উত্তেজনা দেশ জুড়ে। আবির্ভাবেই সাড়া ফেলে দিয়েছে অনলাইন এই ব্যাঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। লোকসভা নির্বাচনের প্রচারের মতো গভীর এবং মিমের মতো হালকা বিষয় নিয়ে নেটমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি।
৩০ থেকে ৩৫ কোটি বছর আগে (ডাইনোসর আসারও প্রায় ১২ কোটি বছর আগে) থেকে পৃথিবীতে বাস করা এই পতঙ্গের নাম নিয়ে আপাতত উত্তাল জেন জ়ি। রাজনীতির অঙ্গনে চর্চা হওয়ার পাশাপাশি আরশোলা নিয়ে আরও একটি বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। ছোট্ট এই পতঙ্গটি দেখলে অনেকের বিরক্তির উদ্রেক ঘটলেও এর সম্পর্কে এমন অনেক অদ্ভুত তথ্য রয়েছে যা সত্যিই অবাক করার মতো।
জনমানবহীন একটি শহর পুড়ছে। কংক্রিটের দেওয়ালে ফাটল ধরেছে। কাচ গলে রাস্তায় মিশে যাচ্ছে। সেই ধ্বংসস্তূপের কোথাও, মানুষ চলে যাওয়ার অনেক পরে, দেয়ালের নীচ থেকে ছোট্ট কিছু একটা হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসে। এই ধরনের দৃশ্য কল্পবিজ্ঞানের সিনেমায় ফুটে উঠলেও বাস্তবে আরশোলাদের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। প্রচলিত আছে ভূমিকম্প হলে বাড়িঘর এবং মানুষজনের ক্ষতি হলেও আরশোলাদের কোনও ক্ষতি হয় না।
একই ভাবে পপ সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র কিংবা ইন্টারনেট মিমে এই ধারণাটি এতটাই গেঁথে গিয়েছে যে, মনে করা হয় পারমাণবিক যুদ্ধের পর পৃথিবীতে একমাত্র বেঁচে থাকতে পারে আরশোলাই। খোদ পতঙ্গটির মতো, এই কিংবদন্তিটিও ‘মরতে’ নারাজ। কিন্তু সত্যি বলতে, এই মিথ বা প্রচলিত তথ্যটি বিজ্ঞানের চেয়ে কল্পকাহিনির দিকেই বেশি হেলে আছে। এই বহুলপ্রচলিত ধারণার নেপথ্যের আসল সত্যিটা কী? হদিস রইল এই প্রতিবেদনে।
কী ভাবে আরশোলা ‘শেষ জীবিত প্রাণী’ হয়ে উঠল? এই ধারণা বা মিথটি হঠাৎ করে ছড়িয়ে পড়েনি। ১৯৪৫ সালের হিরোশিমা ও নাগাসাকির সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতাই মূলত এই ‘আরশোলা অমর’ কিংবদন্তিটির জন্ম দিয়েছিল। পারমাণবিক বোমার বিধ্বংসী আঘাতের পর এই দুই শহরের চারদিকে ছিল শুধু ছাই আর ধ্বংসস্তূপ। তার মধ্যেই দিব্যি ঘুরে বে়ড়াচ্ছিল আরশোলা।
এই দৃশ্যটি মানুষের মনে এক গভীর অস্বস্তি ও বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পর্যবেক্ষণটি একটি বড় দাবিতে পরিণত হয়। মানুষের মনে গেঁথে যায়, পারমাণবিক যুদ্ধে মানুষ মারা গেলেও আরশোলারা বেঁচে থাকবে। পরবর্তী কালে বিজ্ঞানও আংশিক ভাবে এই কিংবদন্তিকে ইন্ধন জুগিয়েছিল।
বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের তুলনায় আরশোলার রেডিয়েশন বা বিকিরণ সহ্য করার ক্ষমতা অনেক বেশি, এটা সত্যি। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এক জন মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে এমন বিকিরণের চেয়ে বহু গুণ বেশি মাত্রার তেজস্ক্রিয়তা সহ্য করতে পারে বেশ কিছু প্রজাতির আরশোলা।
একজন মানুষ যেখানে মাত্র ৪০০ থেকে ১০০০ র্যা ড (মানবদেহের শোষিত বিকিরণ মাত্রার একক) বিকিরণেই মারা যেতে পারেন, সেখানে একটি আরশোলা প্রায় ১০,০০০ র্যা ড পর্যন্ত বিকিরণ সহ্য করে বেঁচে থাকতে পারে। কোষ বিভাজনের গতি ধীর হওয়ার কারণে তারা এই সুবিধা পায়।
তাই অনেক সময়ই বলা হয়, পৃথিবীতে বড় কোনও পারমাণবিক বিপর্যয় হলেও আরশোলা টিকে যাবে। তাপ সহ্য করার ক্ষমতা বেশি থাকলেও আদতে আরশোলার পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ সহ্য করার ক্ষমতা নেই। তবে মারা যাওয়ার আগে এরা অনেক বেশি তেজস্ক্রিয়তা সহ্য করতে পারে।
তা হলে আরশোলা কি সরাসরি পারমাণবিক বিস্ফোরণে বাঁচতে পারে? এর উত্তর হল, না। পারমাণবিক বোমার মূল আঘাত, প্রচণ্ড তাপ এবং প্রাথমিক বিস্ফোরণ আরশোলা কোনও ভাবেই এড়াতে পারবে না। তারা কেবল বিস্ফোরণ-পরবর্তী তেজস্ক্রিয়তা কিছুটা সহ্য করতে পারে।
যদি কোনও আরশোলা বিস্ফোরণস্থল থেকে যথেষ্ট দূরে, মাটির নীচে বা কোনও শক্তপোক্ত কাঠামোর ভিতরে লুকিয়ে থাকে, তবে এটি এমন তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা থেকে বেঁচেও যেতে পারে। সেই তেজস্ক্রিয়তার মাত্রার মুখে পড়লে অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর জীবনীশক্তি হার মানবে।
ঠান্ডা যুদ্ধের সময় থেকেই এই ধারণাটি অতিরঞ্জিত হয়ে মানুষের মুখে মুখে ফিরতে শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, পারমাণবিক হামলার পর ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরগুলিতে বিপুল পরিমাণ পচনশীল জৈব পদার্থ এবং নষ্ট হওয়া খাবার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। এই বিশাল খাবারের উৎস পোকামাকড়দের, বিশেষ করে মাছি ও আরশোলাদের দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে এবং টিকে থাকতে সাহায্য করেছিল।
হিরোশিমা বা নাগাসাকিতে একদম ‘গ্রাউন্ড জ়িরো’ বা বিস্ফোরণের মূল কেন্দ্রে থাকা আরশোলা তাৎক্ষণিক প্রচণ্ড উত্তাপ ও শকওয়েভে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কেন্দ্র থেকে কিছুটা দূরে মাটির নীচে, নর্দমায় বা কংক্রিটের গভীর ফাটলে থাকা আরশোলা তাদের শক্ত খোলস এবং সুরক্ষিত অবস্থানের কারণে বেঁচে যায়। মানুষ যে ভাবে পরবর্তী তেজস্ক্রিয়তায় মারা যাচ্ছিল সেই তুলনায় উচ্চ বিকিরণ সহনশীলতার কারণে আরশোলাদের তেমন ক্ষতি হয়নি।
হিরোশিমার ধ্বংসস্তূপে আরশোলার এই দ্রুত পুনরাবির্ভাবের নেপথ্যে কোনও অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা ছিল না। বরং এটি ছিল একটি চরম বিপর্যস্ত বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক ফল।
বিজ্ঞান বলছে, পারমাণবিক যুদ্ধের পর যদি কোনও প্রাণী পৃথিবীর দখল নেয়, তবে সেই তালিকায় বেশ পিছনের সারিতে থাকবে আরশোলা। পারমাণবিক যুদ্ধ হলে পৃথিবীতে আরশোলার একচ্ছত্র সাম্রাজ্য তৈরি হবে— এই ধারণাটি সর্বৈব ভ্রান্ত।
আরশোলা কোনও অমর প্রাণী নয়, প্রকৃতির আশীর্বাদে টিকে থাকায় ওস্তাদ কেবল। কার্বনিফেরাস যুগ (প্রায় ৩০-৩২ কোটি বছর আগে) থেকে আজ পর্যন্ত তারা যে ভাবে টিকে আছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। ডাইনোসরেরা যখন বিশাল শরীর আর নির্দিষ্ট জীবনযাত্রার কারণে পরিবেশের আচমকা পরিবর্তন সহ্য করতে না পেরে বিলুপ্ত হয়ে গেল, আরশোলারা তখন তাদের কিছু সাধারণ কিন্তু কার্যকর বৈশিষ্ট্যের কারণে ‘অবিনশ্বর’ রইল।
এদের শরীরের গঠন এতটাই চমৎকার যে, এরা মাটির নীচের যে কোনও ছোট ফাটল বা পাথরের নীচে আশ্রয় নিতে পারে। যখন উল্কাপাত বা গণবিলুপ্তির সময় পৃথিবীর উপরের পরিবেশ নরকসম হয়ে উঠেছিল, তখন এই ছোট্ট চ্যাপ্টা শরীরই তাদের রক্ষা করেছিল।
বরং পারমাণবিক বিস্ফোরণ হলে টিকে থাকার তালিকায় যে পোকামাক়়ড়েরা উপরের দিকে থাকবে সেগুলি হল ফ্লাওয়ার বিট্ল, জল ভালুক বা ‘টারডিগ্রেড’। যে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ মানুষের জন্য প্রাণঘাতী, তার থেকে প্রায় ১০০০ গুণ বেশি বিকিরণ সহ্য করার ক্ষমতা রয়েছে ক্ষুদ্র জীবটির। আবার ফ্লাওয়ার বিট্ল ১,০০,০০০ র্যা ড বিকিরণ সহ্য করতে পারে। ডিনোকক্কাস রেডিয়োডুরানস নামের ব্যাক্টেরিয়াটি প্রচুর পরিমাণে ডিএনএ মেরামত প্রক্রিয়া এবং অনন্য জিনোমিক বৈশিষ্ট্যগুলির কারণে চরম মাত্রার বিকিরণ থেকে বাঁচতে সক্ষম।