গুপ্তচরবৃত্তির কথা বললেই চোখের সামনে পর পর ভেসে ওঠে বলিউড, হলিউডসৃষ্ট চরিত্রেরা। অনেক ক্ষেত্রে পর্দার এই চরিত্রগুলির প্রেরণা বাস্তবের গুপ্তচরেরা। ‘ঠান্ডা যুদ্ধ’র সময়কালের এমনই এক দুর্ধর্ষ গুপ্তচর ছিলেন তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের গুপ্তচর ভিলিয়াম গেনরিখোভিচ ফিশার। কানাডায় সুচ হয়ে ঢুকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফাল হয়ে বেরিয়েছিলেন গুপ্তচর সংস্থা কেজিবির দুঁদে গোয়েন্দা ভিলিয়াম গেনরিখোভিচ ফিশার ওরফে রুডল্ফ আবেল।
ন’বছরের সফল গোপন অভিযান প্রকাশ্যে আসার ‘মাস্টার স্পাই’ এর সমার্থক হয়ে ওঠেন এই ব্যক্তি। রুডল্ফ ইভানোভিচ আবেল, ছদ্মনামে পরিচিত ছিলেন এমিল আর গোল্ডফাস নামে। আবেল ছিলেন উচ্চপদস্থ সোভিয়েত গোয়েন্দা। কেজিবিতে যোগদানের আগে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিদেশি গোয়েন্দা পরিষেবার অনুবাদক এবং তার পর রেডিয়ো অপারেটর হিসাবে কাজ করেছিলেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে ‘ঠান্ডা যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়ে আমেরিকা। ফলে দুই মহাশক্তির মধ্যে পারমাণবিক হামলার আশঙ্কা তুঙ্গে ওঠে। একে অপরের থেকে পরমাণু অস্ত্রের ফর্মুলা ও সামরিক খবরাখবর হাতাতে দুই দেশে স্পাই বা গোয়েন্দা চালাচালি ছিল ‘শীত যুদ্ধ’-এর অন্যতম স্ট্র্যাটেজি।
১৯৪৮ সালের অক্টোবরে একটি ভুয়ো পাসপোর্টের সাহায্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পা রাখার সুযোগ পান আবেল। মৃত লিথুয়ানীয়-আমেরিকান অ্যান্ড্রু ইয়ুরগেসোভিচ কায়োটিসের নাম ভাঁড়িয়ে নিউ ইয়র্কে পৌঁছোন তিনি। নিউ ইয়র্কে আসার পর, এক শিল্পী এবং আলোকচিত্রীর পরিচয় গ্রহণ করে এমিল রবার্ট গোল্ডফাস নামে পরিচিত হন। ব্রুকলিনের একটি স্টুডিয়ো অ্যাপার্টমেন্টে বাস করতেন তিনি। সেখানেই তিনি শর্টওয়েভ-রেডিয়ো তরঙ্গে বার্তা আদানপ্রদানের জন্য সরঞ্জাম লুকিয়ে রাখতেন।
মার্কিন সামরিক কেন্দ্র এবং রাষ্ট্রপুঞ্জ থেকে অতি গোপনীয় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করার জন্য আবেলকে ‘বাঘের গুহা’য় পাঠিয়েছিল সোভিয়েত সরকার। পাশাপাশি, আমেরিকার পারমাণবিক গোপন তথ্য খুঁজে বার করাও তাঁর কাজের অংশ ছিল। পরিশেষে সেই তথ্য সোভিয়েত ইউনিয়নে ফেরত পাঠানোর দায়িত্ব ছিল আবেল ওরফে গোল্ডফাসের।
সংগৃহীত তথ্য ক্রমাগত সোভিয়েতে পাঠানো হত। এ ছাড়াও, আবেলকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত এজেন্ট নিয়োগের সুবিধার্থে অন্য এক জন সোভিয়েত গুপ্তচরের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেই সঙ্গীই অবশ্য পরে আবেলের জীবনে শনি হয়ে উঠেছিলেন।
মাইক্রোফিল্ম করা গোপন বার্তাগুলি নিউ ইয়র্ক সিটির পার্কগুলিতে ল্যাম্পপোস্টের স্তম্ভে এবং কুইন্স সিনেমাহলগুলির ভিতরে ফাঁপা স্ক্রুয়ের মধ্যে রেখে দেওয়া হত। সোভিয়েত গোয়েন্দাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা পৌঁছে যেত যথাস্থানে। সব ঠিকঠাকই চলছিল। নিরবচ্ছিন্ন তথ্যপাচারে হঠাৎ করেই বিঘ্ন ঘটে আবেলের সহকর্মীর হঠকারিতায়।
রেইনো হাইহানেন নামের সোভিয়েত গোয়েন্দার কাজে বেচাল দেখে সোভিয়েত সরকার তাঁকে দেশে ফেরার নির্দেশ দেয়। সেই আদেশে দেশের বিরুদ্ধেই বিশ্বাসঘাতকতা করে বসেন রেইনো। মস্কো যাওয়ার পথে প্যারিসে পালিয়ে যান। নিজের দেশের সরকারের শাস্তির হাত থেকে বাঁচতে আমেরিকার কাছে আত্মসমর্পণ করে বসেন তিনি। নিজের পরিচয় এবং আবেলের পরিচয়ও ফাঁস করে দেন।
তার আগে অবশ্য আরও একটি ঘটনা ঘটেছিল। রেইনো আত্মসমর্পণের আগেই মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা এফবিআইয়ের হাতে একটি ফাঁপা নিকেলের মুদ্রা এসেছিল। সেটি আবিষ্কার করেছিলেন এক সাংবাদিক। তিনি হাতের মধ্যমায় এই নিকেল মুদ্রাটি রেখে দেখেছিলেন সাধারণ মুদ্রার তুলনায় এটি হালকা। তিনি এই মুদ্রাটি মেঝেয় ফেলে দিয়েছিলেন। সেটি দু’টুকরো হয়ে যেতেই তার ভিতর থেকে একটি ছোট ছবি বেরিয়ে আসে।
ছবিটিতে একটি সাঙ্কেতিক বার্তা ছিল। এর উৎস খুঁজে বার করার জন্য এফবিআই বছরের পর বছর ধরে চেষ্টা করে। পরীক্ষা করার সময় এফবিআইয়ের নিউ ইয়র্কস্থিত অফিসের গোয়েন্দারা লক্ষ করেন যে মাইক্রোফোটোগ্রাফটিতে টাইপ করা সারি সারি সংখ্যা ছাড়া আর কিছু ছিল না। প্রতিটি সারিতে পাঁচটি করে সংখ্যা ছিল।
এফবিআই গোয়েন্দারা তাৎক্ষণিক ভাবে সন্দেহ করেছিলেন একটি সঙ্কেতবার্তা রয়েছে তাতে। এটিকে এফবিআই গবেষণাগারে পাঠানো হয়। আবেলের সঙ্গী ধরা পড়ার পর তিনি বার্তাটি ডিকোড করে দেন। এটিই আবেলের কাছে পৌঁছোতে সহায়তা করেছিল মার্কিন গোয়েন্দাদের।
১৯৫৭ সালের ২১ জুন এফবিআই গোয়েন্দাদের জালে ধরা পড়েন আবেল। ন’বছর নিজের রুশ পরিচয় গোপন রেখে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের একের পর এক তথ্যপাচার করে গিয়েছিলেন এই রুশ গুপ্তচর। তিনি নিজেকে রুডল্ফ ইভোনোভিচ আবেল হিসাবে পরিচয় দেন। রুডল্ফ আবেল ছিল তাঁর আরও একটি ছদ্মনাম। সোভিয়েত গোয়েন্দা কর্মকর্তার আসল নাম ছিল ভিলিয়াম গেনরিখোভিচ ফিশার। ব্রুকলিনে তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে তল্লাশি চালানো হলে শর্টওয়েভ রেডিয়ো, সাইফার প্যাড, ক্যামেরা এবং মাইক্রোডট তৈরির জন্য ফিল্ম, দাড়ি কামানোর একটি ফাঁপা ব্রাশ, কাফলিঙ্ক এবং অন্যান্য গুপ্তচরবৃত্তির সরঞ্জাম খুঁজে পায় এফবিআই।
সেন্ট পিটার্সবার্গের শ্রমিকের পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ফিশার। একটি সংবাদ প্রতিবেদনে ফিশারের বাবাকে লেনিনের বন্ধু বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। ফিশারের বাবা ১৯০১ সালে ব্রিটেনে চলে আসেন। ১৯০৩ সালে ব্রিটেনে জন্ম হয় ফিশারের। ২০ বছর পর ফিশারের পরিবার রাশিয়ায় ফেরত চলে আসেন। ১৯২৭ সালে সোভিয়েত গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থায় যোগ দেন ফিশার ওরফে আবেল ওরফে এমিল।
সোভিয়েত পরিচয় গোপন করে মার্কিন নাগরিকদের সঙ্গে মিশে যাওয়ার দক্ষতার অন্যতম কারণ ছিল ফিশারের ভাষার প্রতিভা। ব্রিটেনে জন্ম হওয়ার সুবাদে নির্ভুল ঝরঝরে ইংরেজি বলতে পারতেন তিনি। কর্নেল আবেলের ভাষাগত দক্ষতাই চরবৃত্তিকে পেশা হিসাবে বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ ছিল।
ফিশারকে নিউ ইয়র্কের মার্কিন ফেডারেল আদালতে হাজির করা হয়। এই মামলাটি পরবর্তী কালে ‘ফাঁপা নিকেল মামলা’ নামে পরিচিত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের হয়ে চরবৃত্তি, ষড়যন্ত্র এবং তথ্যপাচার— এই তিনটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিলেন ফিশারে। কিন্তু তাঁর আইনজীবী জেমস বি ডোনোভানের দক্ষতায় মৃত্যুদণ্ড থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন ফিশার। তাঁকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড এবং ৩ হাজার ডলার জরিমানা করা হয়। তবে বেশি দিন তাঁকে মার্কিন সরকারের জেলের ভাত খেতে হয়নি। পাঁচ বছর পর মুক্তির এক অবিশ্বাস্য সুযোগ আসে তাঁর সামনে।
সোভিয়েত ও মার্কিন মুলুকের স্নায়ুযুদ্ধ তুঙ্গে থাকাকালীন ১৯৬০ সালে ১ মে সোভিয়েত দেশের ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ‘এস-৭৫ ডিভিনা’ ভূপতিত করে আমেরিকার একটি গুপ্তচর বিমানকে। বিমানটির চালক ছিলেন ফ্রান্সিস গ্যারি পাওয়ার্স। তিনি মার্কিন বিমানবাহিনীর প্রাক্তন সদস্য ও সেই সময় সিআইএ-তে কর্মরত ছিলেন। পাওয়ার্স সোভিয়েতদের হাতে বন্দি হন।
পাওয়ার্সকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি এবং অন্যান্য অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল মার্কিন বিমানচালককে। ১৯৬২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি, বন্দি হওয়ার এক বছর, ন’মাস, দশ দিন পর, পাওয়ার্সকে মুক্তি দেওয়া হয় সোভিয়েত গুপ্তচর কর্নেল রুডল্ফ আবেলের সঙ্গে বন্দি বিনিময়ের শর্তে। তৎকালীন বার্লিনের গ্লিয়েনিক ব্রিজে বন্দি বিনিময় সম্পন্ন হয়েছিল।
একটি এনকোডেড ফাঁপা মুদ্রা আবিষ্কারের মাধ্যমে যা শুরু হয়েছিল, তা নাটকীয় ভাবে শেষ হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের গুপ্তচরের ধরা পড়ার মাধ্যমে। গল্পটি ২০১৫ সালের সুপরিচিত ‘ব্রিজ অফ স্পাইস’ সিনেমায় উল্লেখ করা হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথমে দাবি করেছিল যে কর্নেল আবেলের গ্রেফতারের কোনও ভিত্তি নেই। কিন্তু মুক্তি পাওয়ার তিন বছরের মধ্যেই, ‘ঠান্ডা যুদ্ধ’-এ তাঁর ভূমিকা বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বীকৃতি দেয় সোভিয়েত সরকার।