Nuclear Explosion Plan in Moon

চন্দ্রপৃষ্ঠে পরমাণু বিস্ফোরণের ছক! নভশ্চর পাঠানোর বহু আগে পেশি ফুলিয়ে চমকাতে চেয়েছিল আমেরিকা

১৯৬৯ সালে চাঁদে প্রথম নভশ্চর পাঠায় মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের প্রতিষ্ঠান নাসা। তবে তার বহু আগেই চন্দ্রপৃষ্ঠে পরমাণু বিস্ফোরণের পরিকল্পনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী। কী হয়েছিল তার পর?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৫৮
Share:
০১ ১৮

২১ শতকে ফের চন্দ্রাভিযানে নেমেছে আমেরিকা। ইতিমধ্যেই পৃথিবীর উপগ্রহটির চারপাশে চক্কর কেটে ঘরে ফিরেছেন যুক্তরাষ্ট্রের চার নভশ্চর। ২০২৮ সালে চাঁদে আরও এক বার মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ বা নাসার। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ৬৮ বছর আগে ওই উপগ্রহ ‘দখল’ করতে সেখানে পরমাণু বোমা ফাটানোর ছক কষে ওয়াশিংটনের বায়ুসেনা।

০২ ১৮

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর (১৯৩৯-’৪৫) পৃথিবীতে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ‘ঠান্ডা লড়াই’য়ে (কোল্ড ওয়ার) জড়িয়ে পড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গত শতাব্দীর ৫০-এর দশক আসতে আসতে মহাকাশের দৌড়ে জিততে দুই ‘মহাশক্তি’ই (সুপার পাওয়ার) একরকম মরিয়া হয়ে ওঠে। ঠিক তখনই বড় সাফল্য পায় মস্কো। পৃথিবীর নিম্নকক্ষে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠাতে সক্ষম হয় তারা। রাতারাতি জ্যোতির্বিজ্ঞানের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল এই সাফল্য।

Advertisement
০৩ ১৮

সোভিয়েত মহাকাশ বিজ্ঞানীদের তৈরি করা ওই কৃত্রিম উপগ্রহের নাম ছিল ‘স্পুটনিক-১’। ১৯৫৭ সালের অক্টোবরে এর সফল উৎক্ষেপণ করে মস্কো। শুধু তা-ই নয়, পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছে টানা তিন সপ্তাহ ধরে সেটি বেতার সঙ্কেত পাঠাতেও সক্ষম হয়েছিল। ‘স্পুটনিক ১’-এর সাফল্য গোটা দুনিয়ায় হইচই ফেলে দেয়। তত দিনে অবশ্য অন্তত দু’বার কৃত্রিম উপগ্রহ মহাবিশ্বে পাঠানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকেরা।

০৪ ১৮

আমেরিকায় তখনও নাসার জন্ম হয়নি। মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম উপগ্রহ নির্মাণের ‘ভ্যানগার্ড প্রকল্পে’ রাত-দিন পরিশ্রম করছেন। একদিন খবর এল, সোভিয়েতের ‘স্পুটনিক-১’ বেতার সঙ্কেত পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। প্রমাদ গুনলেন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। কমিউনিস্ট শাসিত মস্কোর কাছে কিছুতেই হেরে যেতে রাজি নন তাঁরা। ফলে তড়িঘড়ি ‘ভ্যানগার্ড প্রকল্প’ বাতিল করে অন্য কায়দায় শক্তিপ্রদর্শনের পরিকল্পনা সেরে ফেলে ওয়াশিংটন।

০৫ ১৮

কী সেই পরিকল্পনা? মার্কিন বিমানবাহিনী সিদ্ধান্ত নেয় চাঁদে এ বার পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটাবে তারা। তত দিনে অবশ্য পৃথিবীর উপগ্রহটির উপরিভাগের জমি সংক্রান্ত বহু তথ্য হস্তগত করে ফেলেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। ফলে সেখানে যে ছোট-বড় নানা আকারের একগুচ্ছ গর্ত রয়েছে, তা অজানা ছিল না তাঁদের। আণবিক বোমা ফাটাতে তেমন কোনও গর্ত অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের বায়ুসেনা বেছে নেয়নি। তাদের লক্ষ্য ছিল চন্দ্রপৃষ্ঠে বিস্ফোরণ।

০৬ ১৮

মার্কিন বিমানবাহিনীর অত্যন্ত গোপন এই অভিযানের সাঙ্কেতিক নাম ছিল ‘প্রজেক্ট এ১১৯’। সেটা আবার ‘এ স্টাডি অফ লুনার রিসার্চ ফ্লাইটস’ নামেও পরিচিত। চন্দ্রপৃষ্ঠে পরমাণু বিস্ফোরণের পরিকল্পনার নেপথ্যে মূলত দু’টি যুক্তি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বায়ুসেনা। প্রথমত, এতে খালি চোখেই চাঁদে তীব্র আলোর ঝলকানি আবছা ভাবে দেখতে পাবে পৃথিবীর মানুষ। আর তাতেই প্রমাণ হবে কতটা শক্তিধর আমেরিকার ফৌজ।

০৭ ১৮

সাবেক সোভিয়েতের ‘স্পুটনিক-১’-এর সাফল্য যুক্তরাষ্ট্রের আমজনতাকে হতদ্যোম করে তোলে। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, তাঁদের মনোবল বৃদ্ধিই ছিল ‘প্রজেক্ট এ১১৯’-এর উদ্দেশ্য। দ্বিতীয়ত, চন্দ্রপৃষ্ঠে পরমাণু বিস্ফোরণ জ্যোতির্বিজ্ঞানের বহু অজানা প্রশ্নের সমাধান করবে বলেও মনে করা হয়েছিল। ফলে ১৯৫৮ সালের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের বাস্তবায়নের প্রথম দফার পরিকল্পনা সেরে ফেলে মার্কিন বিমানবাহিনী। শুরু হয় তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ।

০৮ ১৮

পাশাপাশি, মহাকাশের দৌড়ে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে হারাতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি পৃথক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে আমেরিকা। ফলে ১৯৫৮ সালের জুলাইয়ে তৈরি হয় নাসা। গোড়ার দিকে তাতে মার্কিন বিমানবাহিনীর একগুচ্ছ আধিকারিককে রেখেছিল ওয়াশিংটন। উদ্দেশ্য, বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের নভশ্চর হিসাবে গড়ে তোলা। তেমনই একজন ছিলেন লিওনার্ড রাইফেল। ২০০০ সালে ‘প্রজেক্ট এ১১৯’ নিয়ে গণমাধ্যমের কাছে মুখ খোলেন তিনি।

০৯ ১৮

নাসার সাবেক এক্‌জ়িকিউটিভ লিওনার্ডের দাবি, চন্দ্রপৃষ্ঠে প্রস্তাবিত পরমাণু বিস্ফোরণ প্রকল্পটি অত্যন্ত গোপন রাখা হয়েছিল। যদিও এর প্রতিটা খুঁটিনাটির খবর রাখতেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি আইজ়েনহাওয়ার। এই কাজে তাঁর সঙ্গী ছিলেন কার্ল সাগান নামের এক তরুণ অফিসার। পৃথিবীর উপগ্রহে আণবিক বিস্ফোরণের কী কী ক্ষতিকর প্রভাব মহাবিশ্বে পড়তে পারে, সে দিকে নজর রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। পাশাপাশি, বোমাটিকে চন্দ্রপৃষ্ঠে নিয়ে যাওয়ার নীলনকশা তৈরিতেও যথেষ্ট অবদান ছিল তাঁর।

১০ ১৮

১৯৪৯ সালে আমেরিকার শিকাগোর ‘ইলিনয় ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজ়ি’র অন্তর্গত ‘আর্মার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ (এআরএফ) পরিবেশের উপর পরমাণু বিস্ফোরণের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে গবেষণা শুরু করে। নাসার সাবেক এক্‌জ়িকিউটিভ লিওনার্ড জানিয়েছেন, চন্দ্রপৃষ্ঠে আণবিক বিস্ফোরণের জন্য তাদের সাহায্য নেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে তৈরি হয় সেখানকার গবেষকদের ১০ সদস্যের একটি দল। এঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী জেরার্ড কুপার।

১১ ১৮

লিওনার্ডের কথায়, প্রাথমিক ভাবে মহাকাশ গবেষকেরা চাঁদের বুকে একটি হাইড্রোজ়েন বোমা ফাটানোর পরিকল্পনা করেন। কিন্তু, সংশ্লিষ্ট অস্ত্রটির ওজন অনেকটাই বেশি হওয়ায় তাঁদের চিন্তাভাবনা মার্কিন বিমানবাহিনীর মনঃপুত হয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে পৃথিবীর উপগ্রহে ছোট আকারের ইউরেনিয়াম বোমা ফাটানোর সিদ্ধান্ত নেন ‘প্রজেক্ট এ১১৯’-এর জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এর ওজন মাত্র ১.৭ কিলোটন। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহার করা আণবিক বোমার ১০ ভাগের এক ভাগ ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন তাঁরা।

১২ ১৮

১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ অগস্ট জাপানের হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু হামলা চালায় মার্কিন বিমানবাহিনী। প্রথম শহরটিতে ফেলা আণবিক বোমার সাঙ্কেতিক নাম ছিল ‘লিটল বয়’। সম্পূর্ণ ইউরেনিয়ামে তৈরি গণবিধ্বংসী ওই হাতিয়ারের ওজন ছিল ১৩-১৭ কিলোটন। অন্য দিকে, চন্দ্রপৃষ্ঠে বিস্ফোরণের জন্য প্রস্তাবিত বোমাটির নাম ‘ডব্লিউ২৫’ রাখেন ‘প্রজেক্ট এ১১৯’-এর জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। একটি ‘আন্তঃমহাদেশীয়’ (ইন্টারকন্টিনেন্টাল) ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে সেটিকে পৃথিবীর উপগ্রহে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁদের।

১৩ ১৮

চন্দ্রপৃষ্ঠে পরমাণু বিস্ফোরণের ব্যাপারে মার্কিন প্রশাসন ও বায়ুসেনার উৎসাহের নেপথ্যে আরও একটা যুক্তি রয়েছে। ১৯৫৭ সালের শেষ থেকেই সোভিয়েত জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রকল্প নিয়ে একটি গুজব যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে দেয় সেখানকার একাধিক প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম। সেখানে বলা হয়, চাঁদের বুকে বড়সড় আণবিক বিস্ফোরণের ছক কষছে মস্কো। এবং তার দিনক্ষণও নাকি ঠিক করে ফেলেছেন ক্রেমলিনের কর্তা-ব্যক্তিরা।

১৪ ১৮

গত শতাব্দীর ৫০-এর দশকে এই ধরনের খবর প্রকাশের জন্য বেশ কিছু বেনামি সূত্র উল্লেখ করত যুক্তরাষ্ট্রের তাবড় গণমাধ্যম। তাদের বেশির ভাগেরই বক্তব্য ছিল, রুশ বিপ্লবের বর্ষপূর্তি উৎসব চলাকালীন নভেম্বরের কোনও এক চন্দ্রগ্রহণের দিনে সেখানে পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটাবেন সোভিয়েত মহাকাশ গবেষকেরা। এতে সাফল্য এলে পৃথিবীর উপগ্রহের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ যে মস্কোর হাতে চলে যাবে, তা বলাই বাহুল্য।

১৫ ১৮

এক দিকে গুজব, অন্য দিকে ‘স্পুটনিক-১’-এর সাফল্য, জোড়া ঘটনায় মার্কিন বিমানবাহিনীর উপর চাপ বাড়ছিল। তার পরেও ১৯৫৯ সাল আসতে আসতে ‘প্রজেক্ট এ১১৯’কে পুরোপুরি বাতিল করে তারা। কারণ হিসাবে তাঁদের বক্তব্য ছিল, এই পরিকল্পনা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। উৎক্ষেপণে সামান্য ভুল হলেই তার খেসারত দিতে হবে আমজনতাকে। তা ছাড়া এটা চাঁদে বসতি গড়ে তোলার স্বপ্নকে চিরতরে ভেঙে দিতে পারে, যা কখনওই চাননি তৎকালীন মার্কিন রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

১৬ ১৮

‘প্রজেক্ট এ১১৯’ বাতিল হওয়ার পর সোভিয়েত জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে দ্বিতীয় ধাক্কা খায় যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল মস্কোর ‘ভস্তক-১’ মহাকাশযানে চড়ে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেন বিশ্বের প্রথম নভশ্চর ইউরি গ্যাগারিন। এই ঘটনার পরই চাঁদে সরাসরি মানুষ পাঠানোর উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা নিয়ে ফেলে আমেরিকা। সেই লক্ষ্যে নাসার জন্য জলের মতো টাকা খরচ করতে কার্পণ্য করেনি ওয়াশিংটন।

১৭ ১৮

এ বার অবশ্য সাফল্য পায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে ‘অ্যাপোলো-১১’ মহাকাশযানে চড়ে চন্দ্রপৃষ্ঠে প্রথম মানুষ হিসাবে পা রাখেন আমেরিকার নভশ্চর নীল আর্মস্ট্রং এবং বাজ় অলড্রিন। শুধু তা-ই নয়, চন্দ্রপৃষ্ঠে পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের পরিকল্পনার কথাও এই সময় থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে নাকচ করে দেয় ওয়াশিংটন। এই সংক্রান্ত কোনও ফাইল আজও প্রকাশ করেনি তারা।

১৮ ১৮

২০১০ সালে বেশ কয়েকটি মার্কিন গণমাধ্যম ফের পুরনো ইস্যুকে খুঁচিয়ে তোলে। গত শতাব্দীর ৫০-এর দশকে সোভিয়েতের চন্দ্রপৃষ্ঠে পরমাণু বিস্ফোরণের পরিকল্পনা সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে তারা। ফাঁস হয় রুশ গুপ্তচরদের কিছু গোপন নথি। যদিও এ ব্যাপারে নতুন করে বিশ্ব জুড়ে আর আলোড়ন দেখা যায়নি। কারণ, তত দিনে মহাকাশ গবেষণায় অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

ছবি: সংগৃহীত, প্রতীকী এবং এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement