আর ‘বাঙ্কার বাস্টার’ নয়। ইরান-ইজ়রায়েল সংঘাতে খামেনেই-রাজের পতন ঘটাতে এ বার নাকি কৌশলগত পরমাণু হামলা চালাবে আমেরিকা! পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির দাবি, বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই চিন্তাভাবনাও শুরু করে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পদস্থ সেনা অফিসারদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে উঠেছে সেই প্রসঙ্গ। যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত নিলে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ যে আরও ভয়ঙ্কর রূপ নেবে, তা বলাই বাহুল্য। তবে এই নিয়ে সরকারি ভাবে কোনও বিবৃতি দেয়নি ওয়াশিংটন।
ইরানের পরমাণুকেন্দ্রগুলির অন্যতম হল ফোর্ডো। ইজ়রায়েলি গুপ্তচরদের অনুমান, ভূগর্ভের অন্তত ৩০০ ফুট গভীরে এটিকে তৈরি করেছে তেহরান। ফলে ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা ব্যবহার করে আদৌ ওই আণবিক কেন্দ্রের কোনও ক্ষতি করা যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান মার্কিন ফৌজি জেনারেলরা। সূত্রের খবর, সেই কারণে ‘বি-২ স্পিরিট’ বোমারু বিমান থেকে সেখানে কৌশলগত পরমাণু বোমা ফেলার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। যদিও এই সিদ্ধান্ত নেওয়া মোটেই সহজ নয়।
বিষয়টি নিয়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর কাছে মুখ খুলেছেন নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক পেন্টাগনের দুই পদস্থ আধিকারিক। তাঁদের কথায়, ‘‘বাঙ্কার বাস্টার বোমা মাটির যথেষ্ট গভীরে প্রবেশ করে না। এর সাহায্যে শুধুমাত্র ভূগর্ভস্থ টানেলের ক্ষতি করা সম্ভব। ইরানি পরমাণুকেন্দ্রগুলি আবার পাহাড়ের ভিতরে মাটির গভীরে অবস্থিত। ফলে বাঙ্কার বাস্টারের প্রয়োগে সেখানে তেমন ক্ষতি না-ও হতে পারে। তা ছাড়া টানেলের কিছু অংশ ধসে গেলে সেটা খুব সহজে মেরামত করে নিতে পারবে তেহরান।’’
প্রায় একই কথা বলতে শোনা গিয়েছে আমেরিকার ‘ডিফেন্স থ্রেট রিডাকশান এজেন্সি’ বা ডিটিআরএ-র প্রাক্তন ডেপুটি ডিরেক্টর তথা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল র্যান্ডি ম্যানারের গলায়। সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘‘শুনতে যতটা সহজ মনে হচ্ছে, ‘বাঙ্কার বাস্টার’-এর ব্যবহার মোটেই তত সহজ নয়। কারণ, পাহাড়ের বুকে অনেকটা গভীরে থাকা কোনও টানেল বা ভূগর্ভস্থ কাঠামোর কথা চিন্তা করে একে তৈরি করা হয়নি। মাটির নীচের সাধারণ বাঙ্কারকে ধ্বংস করতে এর নির্মাণ করেছেন প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানীরা।’’
অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ম্যানার অবশ্য সরাসরি ইরানে পরমাণু হামলার কথা বলেননি। কিন্তু, তার পরও মার্কিন গণমাধ্যমগুলিতে এই নিয়ে তুঙ্গে উঠেছে জল্পনা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবার সংশ্লিষ্ট যুদ্ধে জড়ানোর ব্যাপারে দু’সপ্তাহের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়ে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টিতে বেশ মতপার্থক্য রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের দাবি, এই পরিস্থিতিতে তাঁর পক্ষে সাবেক পারস্য দেশে কৌশলগত পরমাণু হামলার নির্দেশ দেওয়া বেশ কঠিন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ট্রাম্প পশ্চিম এশিয়ায় পরমাণু হামলার নির্দেশ দিলে মোটেই হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবে না রাশিয়া। তা ছাড়া চিনেরও প্রচ্ছন্ন সমর্থন রয়েছে তেহরানের দিকে। সে ক্ষেত্রে গোটা আরব দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে পারে যুদ্ধ। আর তাতে আর্থিক এবং সামরিক দু’দিক থেকে যথেষ্ট ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। পাশাপাশি, আণবিক যুদ্ধে গেলে মারাত্মক ভাবে আণবিক চাপের মুখে পড়তে পারে ওয়াশিংটন। আর তাই কোনও অবস্থাতেই সেই ঝুঁকি নিতে চাইবেন না ট্রাম্প।
চলতি বছরের ১৯ জুন এ ব্যাপারে আমেরিকাকে হুঁশিয়ারি দেয় মস্কো। রুশ বিদেশ মন্ত্রকের তরফে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, ইজ়রায়েলের পাশে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা করলে তার ফল হবে ভয়াবহ! আন্তর্জাতিক মহলে তেহরানের ‘বন্ধু’ হিসাবে ক্রেমলিনের পরিচিতি রয়েছে। গত তিন বছর ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে আত্মঘাতী ড্রোন সরবরাহ করে যথেষ্ট সাহায্য করেছে সাবেক পারস্য দেশ। এর জেরে দু’পক্ষের মধ্যে বেড়েছে ঘনিষ্ঠতা।
তবে এর উল্টো যুক্তিও রয়েছে। সংবাদ সংস্থা ‘বিবিসি’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান-ইজ়রায়েল সংঘাত থেকে কিছুটা ‘দূরত্ব’ বজায় রাখতে চাইছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। গত ২০ জুন সেন্ট পিটার্সবার্গে ‘আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরাম’-এর অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘‘আমরা কোথাও নেই। আমরা মধ্যস্থতাকারীও হতে চাইছি না। শুধুমাত্র কিছু পরামর্শ দিতে চাইছি।’’ বিশ্লেষকদের দাবি, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণেই নতুন করে কোনও সংঘাতে জড়াতে চাইছে না মস্কো।
তবে ইরানে আমেরিকা কৌশলগত পরমাণু হামলা চালালে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অন্য দিকে বাঁক নিতে পারে। বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন, সে ক্ষেত্রে পুতিনের সামনে খুলে যাবে ইউক্রেনে একই রকমের পদক্ষেপের দরজা। ব্রিটেন, ফ্রান্স থেকে শুরু করে ইউরোপীয় ইউনিয়ান (ইইউ) ভুক্ত দেশগুলির এতে প্রবল আপত্তি রয়েছে। আর তাই ক্রমাগত যুদ্ধ বন্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। এ ব্যাপারে ট্রাম্পের উপর চাপ তৈরিতে খামতি নেই তাদের।
দ্বিতীয়ত মার্কিন গোয়েন্দাদের রিপোর্ট অনুযায়ী, তেহরানের যে পরিমাণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে, তাতে অচিরেই ‘নোংরা বোমা’ (পড়ুন ডার্টি বম্ব) তৈরি করতে পারবে তারা। তবে পরমাণু অস্ত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণকে আরও কয়েক গুণ বৃদ্ধি করতে হবে তাদের। ফলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে ওই ‘নোংরা বোমা’য় ইজ়রায়েল এবং পশ্চিম এশিয়ার মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিকে নিশানা করতে পারে শিয়া ফৌজ। এ ছাড়া তাদের হাতে রয়েছে অত্যাধুনিক ব্যালেস্টিক এবং হাইপারসনিক (শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ গতি সম্পন্ন) ক্ষেপণাস্ত্র।
ফলে সম্ভাব্য ইরানি হামলার কথা মাথায় রেখে ইতিমধ্যেই সতর্ক হয়েছে আমেরিকা। এতে ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন রণনীতি নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা সদর দফতর পেন্টাগন। সংবাদ সংস্থা ‘রয়টার্স’ জানিয়েছে, তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র হানার আশঙ্কা রয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার এমন ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ কয়েকটি সেনাঘাঁটি থেকে যুদ্ধবিমান ও রণতরী সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ওই এলাকায় স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে রয়েছে ১৯টি মার্কিন সেনাছাউনি। মোতায়েন রয়েছে ৫০ হাজারের বেশি সেনা।
ইরানে কৌশলগত পরমাণু হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের দ্বিতীয় কাঁটা হল চিন। বিশ্বে বিমান চলাচলের উপর নজরদারি চালানো সংস্থা ‘ফ্লাইটরেডার২৪’-কে উদ্ধৃত করে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ফক্স নিউজ়’ জানিয়েছে, সম্প্রতি বেজিং থেকে তেহরানের দিকে উড়ে গিয়েছে পাঁচটি বোয়িং-৭৮৭ মডেলের উড়োজাহাজ। ড্রাগনভূমির মাটি ছাড়ার পর প্রথমে সেগুলি কাজ়াখস্তানের দিকে উড়ছিল। তার পর দক্ষিণে বাঁক নিয়ে উজ়বেকিস্তান এবং তুর্কমেনিস্তান পৌঁছোয়। রেডার-তথ্য বলছে, সেই সময় বিমানগুলির অভিমুখ ছিল ইরানের দিকে।
পরে অবশ্য ওই চিনা বিমানগুলির আর কোনও হদিস দিতে পারেনি ‘ফ্লাইটরেডার২৪’। ফলে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘনিয়েছে রহস্য। এ ব্যাপারে মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছে ড্রাগনভূমির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের সরকার। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, শুল্কযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বর্তমানে আমেরিকা এবং চিনের মধ্যে ফাটল আরও চওড়া হয়েছে। ফলে বেজিং তলে তলে ‘বন্ধু’ ইরানকে সাহায্য করছে বলে জোর গুঞ্জন শুরু হয়ে গিয়েছে। কারণ আমদানি করা প্রাকৃতিক গ্যাস এবং খনিজ তেলের ৪৩ শতাংশ মূলত সাবেক পারস্য দেশ থেকে নিয়ে থাকে ড্রাগন সরকার।
অন্য দিকে, ইরানের শিয়া ধর্মগুরু তথা ‘সর্বোচ্চ নেতা’ (পড়ুন সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লা আলি খামেনেইকে নিকেশ করে সেখানে জমানা বদল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ইজ়রায়েল। সূত্রের খবর, এর জন্য আমেরিকাকে দ্রুত যুদ্ধে টেনে নামাতে চাইছেন ইহুদি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। ইজ়রায়েলের আশা, সাবেক পারস্য দেশের মাটি নরম করতে প্রথম ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা ব্যবহার করবে যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় পর্যায়ে কৌশলগত পরমাণু বোমা ফেলতে আসরে নামবে ‘বি-২ স্পিরিট’ বোমারু বিমান।
ইহুদি গুপ্তচরবাহিনী মোসাদের দাবি, বর্তমানে ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে লুকিয়ে রয়েছেন আলি খামেনেই। তাঁকে অবশ্য ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমায় ও়ড়ানো যাবে বলে একরকম নিশ্চিত নেতানিয়াহুর ফৌজ। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, আমেরিকা খুব ভাল করেই জানে যে ইজ়রায়েলের একার পক্ষে খুব বেশি দিন এই যুদ্ধ চালিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু মুহুর্মুহু আক্রমণ চালিয়ে ইরানি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অনেকটাই ভেঙে দিতে পারবে তারা। সে ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তে লড়াইতে নামলে সুবিধাই হবে যুক্তরাষ্ট্রের।
কূটনীতিকদের অনেকের মতে, সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর বদলে ইরানের সঙ্গে আলোচনার দরজা খোলা রাখতে চাইছেন ট্রাম্প। সেই কারণেই দু’সপ্তাহ সময় নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। প্রেসিডেন্টকে উদ্ধৃত করে হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিটের দেওয়া বিবৃতিতে মিলেছে তাঁর ইঙ্গিত। তিনি বলেছেন, ‘‘তেহরানের সঙ্গে অদূর ভবিষ্যতে সমঝোতায় আসার প্রভূত সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের প্রেসিডেন্ট কূটনৈতিক সমাধান চাইছেন। শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁকে সেরা ব্যক্তি বলা যেতে পারে।’’
ইরানে হামলা চালানোর বিষয়ে ট্রাম্প দু’সপ্তাহের সময় নেওয়ায় আসরে নেমেছে ইউরোপের তিন দেশ। তেহরানের উপর চাপ বৃদ্ধি করতে সেখানকার বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠকে বসবেন ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং জার্মানির প্রতিনিধিরা। সেখানে থাকবেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্যরাও। সুইৎজ়ারল্যান্ডের জেনেভায় সংশ্লিষ্ট বৈঠকটি হবে বলে জানা গিয়েছে।
তবে তেহরানের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র অনড় রয়েছে ইজ়রায়েল। ইহুদি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, আমেরিকার থেকে সাহায্য না মিললেও আক্রমণ বজায় থাকবে। তেহরানে জমানা বদল না হওয়া পর্যন্ত লড়াই বন্ধ করার প্রশ্নই নেই। পাল্টা ইরানের হুঁশিয়ারি, আমেরিকা যুদ্ধে জড়ালে তাঁদেরও ছেড়ে কথা বলবে না শিয়া ফৌজ। পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের যাবতীয় সামরিক ছাউনিকে গুঁড়িয়ে দেবে তেহরান।
মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মধ্যে একমাত্র হ্যারি ট্রুম্যানই পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁর আমলে ১৯৪৫ সালের ৬ এবং ৯ অগস্ট জাপানের হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে আণবিক হামলা চালায় আমেরিকা। ফলে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে টোকিয়ো। শেষ হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তবে পরমাণু বোমার ধ্বংসক্ষমতা দেখে শিউরে উঠেছিল গোটা বিশ্ব। ৮০ বছর পর ট্রাম্প জমানায় ফের তা প্রত্যক্ষ করবে দুনিয়া? তার উত্তর দেবে সময়।