Libya petrol price

এক লিটার ‘তরল সোনার’ দাম আড়াই টাকারও কম! জলের চেয়ে সস্তা পেট্রল-ডিজ়েল, ইরান যুদ্ধের আঁচ পড়েনি যে দেশে

এমন একটি দেশ রয়েছে, যেখানে মাত্র ১০০ টাকায় গাড়ির ট্যাঙ্ক ভরে তেল নেওয়া সম্ভব! শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটা সত্যি। সে দেশে জলের চেয়েও সস্তা পেট্রল। লিটারপ্রতি মাত্র ২ টাকা ২০ পয়সা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:১৯
Share:
০১ ১৮

ইরান-আমেরিকার যুদ্ধে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি থেকে হরমুজ় প্রণালী পেরিয়ে ভারতে ঢোকে তেলবাহী ট্যাঙ্কার এবং জাহাজগুলি। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কৌশলগত কারণেই ওই প্রণালী কার্যত অবরুদ্ধ রেখেছে ইরান। এর ফলে গোটা বিশ্বেই অশোধিত তেলের দাম চড়চড় করে বাড়তে থাকে।

০২ ১৮

চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। পেট্রলের দাম বেড়েই চলেছে দুনিয়া জুড়ে। টাকার দামে পতন এবং পশ্চিম এশিয়া জুড়ে ভূ-রাজনৈতিক ডামাডোলে তেলের দাম কমার আপাতত কোনও লক্ষণ নেই।

Advertisement
০৩ ১৮

অর্থনীতি এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার উপর জ্বালানির দামের প্রভাব পড়তে বাধ্য। আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জমানায় ডলার আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে অপরিশোধিত তেল আরও দামি হতে পারে।

০৪ ১৮

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং যুদ্ধের আশঙ্কা গভীর হওয়ায় অনেক দেশেই পেট্রল, ডিজ়েল ও গ্যাসের দাম আকাশছোঁয়া। মধ্যবিত্তের রান্নাঘরে অরন্ধনের জোগাড়। এ দেশেও জ্বালানির ঘাটতির খবর সামনে আসছে। কিন্তু এমন একটি দেশ আছে যার গায়ে যুদ্ধের ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সামান্যতম আঁচ পর্যন্ত লাগেনি।

০৫ ১৮

কিন্তু এমনও একটি দেশ রয়েছে, যেখানে মাত্র ১০০ টাকায় গাড়ির ট্যাঙ্ক ভর্তি করে তেল নেওয়া সম্ভব! শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই সত্যি। উত্তর আফ্রিকার একটি দেশ রয়েছে যেখানে জলের থেকেও সস্তা পেট্রল। লিটারপ্রতি মাত্র ২ টাকা ২০ পয়সা বা ০.১৫ লিবিয়ান দিনার, যা মার্কিন ডলারে প্রায় ০.০২৩ ডলার।

০৬ ১৮

উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত ছোট্ট একটি দেশ। দেশটির বেশির ভাগ অংশ জুড়ে সাহারা মরুভূমি। এর উত্তরে ভূমধ্যসাগর, পূর্বে মিশর, দক্ষিণ-পূর্বে সুদান, দক্ষিণে চাদ ও নাইজার এবং পশ্চিমে আলজিরিয়া ও তিউনিশিয়া। দেশটি হল লিবিয়া। মুয়াম্মর গদ্দাফির দেশ।

০৭ ১৮

বিশ্বে সবচেয়ে সস্তা পেট্রলের দেশগুলোর মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে লিবিয়া। ইরানের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারে পেট্রলের দামে কোনও হেরফের ঘটেনি। বছরের পর বছর ধরে দামের কাঁটা একই জায়গায় স্থির। এর পরেই রয়েছে ইরান। সে দেশে প্রায় ০.০২৯ ডলারে বিকোয় এক লিটার পেট্রল। তৃতীয় স্থানে ভেনেজ়ুয়েলা। এক লিটার পেট্রল কিনতে সেখানে খরচ হয় ০.০৩৫ ডলার।

০৮ ১৮

বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লেও লিবিয়ার সাধারণ নাগরিকদের চড়া দামের বোঝা বহন করতে হয় না। এর প্রধান কারণ হল লিবিয়ার বিশাল তেলের ভান্ডার। এই দেশটি বিশ্বের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।

০৯ ১৮

লিবিয়ায় পেট্রলের দাম বাজারমূল্য বা বিশ্ববাজারের চাহিদার ওপর নির্ভর করে না। লিবিয়া সরকার জ্বালানির ওপর বিশেষ ভর্তুকি প্রদান করে। ১৯৭০ সালের পর থেকে সেখানে পেট্রলের দাম প্রায় স্থির রয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেলেও সরকার সেই বাড়তি খরচ বহন করে। ফলে জনগণের জন্য দাম অপরিবর্তিতই রয়ে গিয়েছে।

১০ ১৮

লিবিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ জটিল। ২০১১ সাল থেকে দেশটি গৃহযুদ্ধে অতিষ্ঠ। কয়েক দশক ধরে লিবিয়া অস্থির পরিস্থিতি এবং বিভাজন প্রত্যক্ষ করেছে। তবুও সে দেশের সরকার তার জ্বালানি ভর্তুকির নীতি পরিবর্তন করেনি। লিবিয়ায় পেট্রলের দাম নাগরিকদের জন্য একটি বড় স্বস্তির কারণ।

১১ ১৮

পেট্রলের দাম কম হওয়ার কারণ হল দেশটি জীবাশ্ম জ্বালানি ও তেলের ভান্ডারে সমৃদ্ধ। লজিস্টিকস ক্যাপাসিটি অ্যাসেসমেন্ট নামের একটি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়ার সরকারি তেল সংস্থা ন্যাশনাল অয়েল কর্পোরেশনের অধীনে রয়েছে তিনটি সংস্থা ব্রেগা কোম্পানি, আলরাহিলা, শারারা অয়েল সার্ভিস কোং এবং অয়েল লিবিয়া। এই তিন সংস্থাই দেশটির অভ্যন্তরে তেলের বিভিন্ন পণ্য বিপণনের দায়িত্বে রয়েছে।

১২ ১৮

লিবিয়ায় নিজস্ব শোধনাগার না থাকায় তারা বিদেশ থেকে পরিশোধিত তেল আমদানি করে। ২০২৪-২৬ সালের সঙ্কটের সময় তারা সরাসরি নগদ অর্থের বদলে অপরিশোধিত তেলের বিনিময়ে পরিশোধিত তেল নেওয়ার কৌশল ব্যবহার করে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের দাম বা তেলের দামের ওঠানামা সে দেশের পাম্পে বিক্রি হওয়া জ্বালানি পণ্যের মূল্যে প্রভাব ফেলতে পারেনি।

১৩ ১৮

লিবিয়ার তেলের দামে ইরানের হরমুজ় অবরোধের প্রভাব না পড়ার অন্যতম কারণ হল দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান। লিবিয়া উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত এবং তাদের তেলের বাজার মূলত ভূমধ্যসাগরকেন্দ্রিক। লিবিয়া উত্তর আফ্রিকার মাঝামাঝি এমন এক জায়গায় অবস্থিত যার পুরো উত্তর সীমান্ত জুড়ে রয়েছে ভূমধ্যসাগর। তাই লিবিয়ার তেল সরবরাহের পথগুলি ইরান বা লোহিত সাগরের অস্থিরতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।

১৪ ১৮

বর্তমানে ইয়েমেনের পরিস্থিতি বা লোহিত সাগরের অস্থিরতায় বিশ্ববাণিজ্য যখন সমস্যায়, লিবিয়াকে সেই পথ মাড়াতেই হচ্ছে না। লিবিয়ার সঙ্গে ইউরোপের সরাসরি পাইপলাইন সংযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ৫৪০ কিমি দীর্ঘ ‘গ্রিনস্ট্রিম পাইপলাইনের’ মাধ্যমে লিবিয়া থেকে সরাসরি ইটালিতে প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ করা হয়। সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যাওয়া এই পথটির যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা কম বলে মনে করা হয়।

১৫ ১৮

লোহিত সাগর বা পারস্য উপসাগর যখন উত্তপ্ত থাকে, তখন লিবিয়ার তেল হয়ে ওঠে ইউরোপের জন্য সবচেয়ে সহজলভ্য এবং নিরাপদ বিকল্প। এই ভৌগোলিক সুবিধাই লিবিয়াকে বৈশ্বিক অস্থিরতার মাঝেও অভ্যন্তরীণ তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করছে।

১৬ ১৮

তবে লিবিয়ায় অবিশ্বাস্য মূল্যের জ্বালানি তেল দেশটির অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলিতে (প্রধানত তিউনিসিয়া, চাদ, নাইজার এবং সুদান) তেলের দাম তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। এর ফলে লিবিয়ার অভ্যন্তরে বিক্রির জন্য বরাদ্দ করা তেলের একটি বিশাল অংশ অবৈধ ভাবে সীমান্ত দিয়ে পাচার হয়ে যায়।

১৭ ১৮

লিবিয়ার রাজস্বের প্রধান উৎস কী ভাবে পরিকল্পিত পথে লুণ্ঠিত হয়েছে, সে বিষয়ে একাধিক বিশদ প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে পশ্চিমি দেশের গণমাধ্যমে। প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে রাষ্ট্র অনুমোদিত জ্বালানি চোরাচালান বেড়ে যাওয়ায় লিবিয়ার জনগণের প্রায় ২০০০ কোটি ডলার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। তদন্ত ও নীতি নির্ধারক সংস্থা ‘দ্য সেন্ট্রি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, “যে সব রাজনীতিবিদ ও নিরাপত্তা প্রধান জনগণের সেবা এবং সংগঠিত অপরাধ দমনের দাবি করেন, তাঁরাই প্রকৃতপক্ষে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর মদতে লিবিয়ার জ্বালানি চোরাচালানে যুক্ত।

১৮ ১৮

লিবিয়ায় এক লিটার বোতলজাত জলের দাম এক লিটার পেট্রলের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। এই চরম অসামঞ্জস্যই মূলত পাচারকারীদের সবচেয়ে বড় সুযোগ করে দেয়। লিবিয়ার সরকার এই পাচার রোধে অনেক সময় সীমান্তে কড়াকড়ি করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বিশাল মরুভূমির সীমান্ত হওয়ায় এটি নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে লিবিয়া সরকারের।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement