Iran oil export

উপচে পড়ছে তেলের কুয়ো, মার্কিন নাগপাশে বন্ধ রফতানি, তবু চাইলেই কেন উৎপাদন বন্ধ করতে পারছে না ইরান?

হরমুজ় প্রণালীতে মার্কিন অবরোধ এবং ইরানের তেল মজুত সঙ্কটের কারণে পারস্য উপসাগরে এক ধরনের ‘ডেডলক’ বা অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। তেহরান এখন চাইলেও তার মজুত করা তেল সরাতে পারছে না, আবার উত্তোলনও বন্ধ করতে পারছে না।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৫৭
Share:
০১ ১৯

দু’পক্ষই বন্দুক উঁচিয়ে কড়া পাহারায়। হরমুজ়ে মাছি গলতে দিতে রাজি নয় কেউই। সামরিক সংঘাতের জেরে হরমুজ় অবরুদ্ধ করে ইরান। পরে তাদের বাণিজ্যকে চাপে ফেলতে আমেরিকা পাল্টা অবরুদ্ধ করার পথে হাঁটে। হরমুজ়ের দু’পাশের জলপথ অবরুদ্ধ করে রেখেছে তারা। ফলে মার্চ মাসের গোড়া থেকে হরমুজ় প্রণালী দিয়ে সামুদ্রিক বাণিজ্যে চলছে নজিরবিহীন বাধা।

০২ ১৯

আমদানি হোক বা রফতানি, দু’দিকেই ধাক্কা খাচ্ছে পশ্চিম এশিয়ার তেলের ব্যবসা। ইরাক, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সৌদি আরবের তেল রফতানিতে বাধার ফলে সরবরাহ-সঙ্কট আরও তীব্র হয়েছে বিশ্ব জুড়ে। সঙ্কটে পড়েছে ইরানও।

Advertisement
০৩ ১৯

১৩ এপ্রিল থেকে তেহরানের উপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য ইরানি বন্দরগুলোর উপর অবরোধ তৈরি করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। লড়াইয়ের গোড়াতেই আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলকে বেকায়দায় ফেলতে হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে ইরান। শত চেষ্টা করেও ওই সঙ্কীর্ণ সামুদ্রিক রাস্তায় নিরাপদে তেলের ট্যাঙ্কার চলাচল নিশ্চিত করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। উল্টে পাল্টা চাপ তৈরি করতে হরমুজ় অবরোধ করে বসেছে মার্কিন নৌসেনা।

০৪ ১৯

তেহরান যাতে কোনও ভাবে তরল সোনা ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রি করতে না পারে, তাই এই ব্যবস্থা, যুক্তি দিয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন নৌ-অবরোধ এবং হরমুজ় প্রণালীতে উত্তেজনার কারণে ইরান তাদের উৎপাদিত তেল রফতানি করতে পারছে না। ফলে এই বিশাল পরিমাণ তেল জমিয়ে রাখার জায়গা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

০৫ ১৯

গত ১৭ এপ্রিল, শুক্রবার ইরানকে ‘নৌ অবরোধ’-এর হুঁশিয়ারি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দেওয়া হুমকির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই হরমুজ়ে ফের অবরোধ শুরুর কথা ঘোষণা করে দেয় মোজ়তবা খামেনেইয়ের দেশ। ১৮ এপ্রিল, শনিবার নতুন করে হরমুজ় অবরোধের কথা জানিয়ে দেয় ইরান। ফলে বিভিন্ন বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজগুলির উপর নৌ অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে আমেরিকা।

০৬ ১৯

মার্কিন সামরিক বাহিনী সূত্রে খবর, অবরোধের কারণে একাধিক জাহাজকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা চিনের মালিকানাধীন ‘রিচ স্টারি’ জাহাজ। মার্কিন অবরোধের মুখে পড়ে ফিরতে হয়েছে সেটিকে। মঙ্গলবার রওনা দিয়েছিল সেটি। কিন্তু আমেরিকার নাগপাশ ভেদ করে এগিয়ে যেতে পারেনি।

০৭ ১৯

জাহাজটিতে প্রায় ২,৫০,০০০ ব্যারেল মিথানল ছিল। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকে নেওয়া পণ্য বলে দাবি করা হলেও সেটিকে মূলত ইরানের পণ্য বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কড়াকড়ির কারণে ওমানের সোহার বন্দর বা অন্য কোনও সম্ভাব্য ক্রেতা চিনা নৌবহরটিকে নোঙর করার অনুমতি দেয়নি।

০৮ ১৯

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের তেলের আটটি ট্যাঙ্কার আটক করা হয়েছে। এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার ওমান উপসাগরে অবস্থিত ইরানের চাবাহার বন্দর থেকে তেলের দু’টি ট্যাঙ্কারকে একটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ার থামিয়ে দিয়েছে। রিচ স্টারির মতো জাহাজ যখন আন্তর্জাতিক বাজারে ঢুকতে না পেরে ফিরে আসে, তখন ইরানের কাছে তেল বা গ্যাস রফতানির পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

০৯ ১৯

হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন অবরোধ এবং ইরানের তেলমজুত সঙ্কটের কারণে পারস্য উপসাগরে এক ধরনের ‘ডেডলক’ বা অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। তেহরান এখন চাইলেও তার মজুত করা তেল সরাতে পারছে না, আবার উত্তোলনও বন্ধ করতে পারছে না। ফলে তেহরানের এখন শাঁখের করাত অবস্থা।

১০ ১৯

স্বাভাবিক সময়ে তেলকূপ থেকে তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি শোধনাগারে যায় অথবা বিশাল টার্মিনালগুলোতে (যেমন খার্গ দ্বীপ) জমা হয় রফতানির জন্য। কিন্তু রফতানি বন্ধ হলে প্রথমে টার্মিনালগুলো পূর্ণ হয়। এর পর পাইপলাইনের ভিতরের চাপ বাড়তে থাকে। সবশেষে শোধনাগারগুলির তাদের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতার সীমায় উপনীত হয়।

১১ ১৯

মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে রফতানি সীমিত হওয়ায় ইরানে অপরিশোধিত তেল মজুত করার জায়গা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তেলসম্পদের উত্তোলনকারী সংস্থার কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে, খার্গ দ্বীপের মতো গুরুত্বপূর্ণ মজুতকেন্দ্র কয়েক দিনের মধ্যেই ভরে যেতে পারে। এর ফলে যেটি সর্বাগ্রে ঘটবে তা হল তেলকূপগুলো বন্ধ করতে বাধ্য হবে ইরান। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপের ফলাফল হবে ভূ-রাজনীতির সঙ্কটের বাইরেও সুদূরপ্রসারী।

১২ ১৯

তেল উত্তোলন কেবল একটি খনি থেকে তরল তুলে আনা নয়। এটি একটি জটিল কারিগরি পন্থা। এক বার নষ্ট হলে পুরো খনিটি স্থায়ী ভাবে অকেজো হয়ে যেতে পারে। ভূতাত্ত্বিক এবং কারিগরি সীমাবদ্ধতাগুলিই ইরানের জন্য এই মুহূর্তে ‘মরণফাঁদ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১৩ ১৯

তেলের ভান্ডার কোনও ভূগর্ভস্থ হ্রদ নয়। তেলের সঞ্চিত ভান্ডারে হাইড্রোকার্বনে পরিপূর্ণ ছিদ্রযুক্ত শিলা থাকে। সেই শিলাগুলি গ্যাস, জল এবং চারপাশের শিলার চাপে যথাস্থানে আটকে থাকে। এই চাপকে সতর্কতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করার পরই তেল উত্তোলন করা হয়, যাতে তেল ভূপৃষ্ঠে প্রবাহিত হয়। তেল তোলার সময় এই চাপের একটি নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। যদি হঠাৎ উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে ভূগর্ভস্থ তেলের প্রবাহের ধরন বদলে যেতে পারে।

১৪ ১৯

যখন কূপগুলি হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন এই ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়। ইরানের অনেক তৈলক্ষেত্রের উৎপাদন বন্ধ করে দিলে নীচ থেকে জল উপচে উপরে উঠে আসতে পারে। এই ঘটনাটি ‘ওয়াটার কোনিং’ নামে পরিচিত। এক বার তেলবাহী শিলাস্তরে জল প্রবেশ করলে, কিছু তেল স্থায়ী ভাবে তাতে আটকা পড়ে যায় এবং তা থেকে আর তেল উত্তোলন করা যায় না।

১৫ ১৯

তেল রফতানি বন্ধ হওয়ার ফলে তেলের কূপগুলি উপচে পড়লে ইরান চাইলেও হঠাৎ করে তেল উৎপাদন বন্ধ করতে পারবে না, কারণ এমনটা করলে এর তেলভান্ডারগুলির স্থায়ী ভূতাত্ত্বিক ক্ষতি এবং তেল হারানোর অপূরণীয় ঝুঁকি রয়েছে। একটি সচল তেলকূপ এক বার পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে পরবর্তী কালে তা পুনরায় চালু করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ চাপের পরিবর্তনের কারণে কূপটি স্থায়ী ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বা এর উৎপাদনক্ষমতা চিরতরে কমে যেতে পারে।

১৬ ১৯

রফতানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইরানকে অপরিশোধিত তেল দেশের অভ্যন্তরের সংরক্ষণ ট্যাঙ্কে জমা করতে হচ্ছে। সেই ট্যাঙ্কগুলি ভরে গেলে ওপেক সদস্য এই দেশটিকে তেল উত্তোলনের পরিমাণ কমাতে হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞমহলের ধারণা। এনার্জি অ্যাসপেক্টস-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ব্রোঞ্জের মতে, এপ্রিলে ইরানের উৎপাদনের উপর এই অবরোধের তেমন কোনও উল্লেখযোগ্য প্রভাব না পড়লেও এই অবস্থা মে মাস পর্যন্ত অব্যাহত থাকলে উৎপাদন ব্যাপক ভাবে কমাতে হবে।

১৭ ১৯

এ বিষয়ে জ্বালানি বিষয়ক একটি শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক পরামর্শদাতা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এফজিই নেক্সট্যান্টইসিএ-র অনুমান, ইরানের মোট প্রায় ১২ কোটি ২০ লক্ষ ব্যারেল ধারণক্ষমতার মধ্যে প্রায় নয় কোটি ব্যারেল স্থলভাগে সংরক্ষণের ক্ষমতা রয়েছে।

১৮ ১৯

এফজিই নেক্সট্যান্টইসিএ একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরান রফতানি ছাড়াই প্রায় দু’মাস ধরে দৈনিক প্রায় ৩৫ লক্ষ ব্যারেলের উৎপাদন বজায় রাখতে পারে। দৈনিক ৫ লক্ষ ব্যারেল উৎপাদন কমিয়ে তা প্রায় তিন মাস পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। তেলকূপ পরিচালনকারীরা তাৎক্ষণিক ভাবে উৎপাদন বন্ধ করতে অপারগ। আকস্মিক চাপের পরিবর্তন এড়ানোর জন্য প্রবাহের হার ধীরে ধীরে কমানো হতে পারে।

১৯ ১৯

ইরানের স্থলভাগে মজুত ব্যবস্থা সীমিত। এর পরিমাণ প্রায় ৫০-৫৫ কোটি ব্যারেল। এক বার সেই ক্ষমতা পেরিয়ে গেলে উৎপাদিত তেল সরানোর আর কোনও জায়গা থাকে না। সেই মুহূর্তে, ঝুঁকি উপেক্ষা করেই কূপগুলি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে তেহরান সরকার। সূত্রের মতে, ইরান তাদের উত্তোলিত তেল বিশাল বিশাল ট্যাঙ্কার এবং স্টোরেজগুলোতে জমিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। ইরান বর্তমানে তাদের বিশাল নৌবহরকেও ভাসমান গুদাম হিসাবে ব্যবহার করছে।

ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement