ভারতের আমের উপর বসানো হল নিষেধাজ্ঞা। ২০ বছর পর ‘সূর্যোদয়ের দেশে’ পাড়ি দেবে না ভারতের আলফানসো, কেশর, বেগুন ফুলি ও ল্যাংড়ার মতো আমের প্রজাতি। কারণ ভারতের আম আমদানি স্থগিত করল পুবের পড়শি দেশ। বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিক ভাবে জাপানের তরফে জানানো হয়েছে, এ বছর কোনও আম আমদানি করবে না দেশটি।
২০০৬ সালের পর প্রথম বার। ২০ বছর ধরে ইন্দো-জাপান আমের বাণিজ্য চলেছিল মসৃণ ভাবেই। তার আগে দু’দশকের নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছিল টোকিয়ো। ২০ বছর ধরে এই আমের আমদানি-রফতানি চালু থাকার পর চলতি গ্রীষ্মের মরসুমে তা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সানায়ে তাকাইচি সরকার।
রসালো ফলটির বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ার নেপথ্য কারণ একটি মাত্র পরিদর্শন। গত মার্চ মাসে জাপানের কোয়ারেন্টাইন আধিকারিকদের একটি দল ভারতের উত্তরপ্রদেশের রহমানপুরে কিছু ফল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। সেখানে আম জীবাণুমুক্ত করার প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু প্রযুক্তিগত ত্রুটি নজরে আসে জাপানি পরিদর্শকদের।
আমের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভয় থাকে ‘ফ্রুট ফ্লাই’ বা ফলের মাছি এবং কিছু বিশেষ পোকার আক্রমণ নিয়ে। কোনও একটি আমে যদি এই পোকার ডিম বা লার্ভা থেকে যায়, তবে তা অন্য দেশে গিয়ে সেখানকার চাষবাস ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। তাই এত কড়াকড়ি। জাপানে ভারতীয় আম রফতানি নিয়ন্ত্রণকারী দ্বিপাক্ষিক শর্তাবলির অন্যতম বাধ্যতামূলক শর্ত এটি।
আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষিপণ্য পাঠানোর আগে সেগুলিকে জীবাণমুক্ত করার প্রক্রিয়াটি বাধ্যতামূলক। প্রক্রিয়াটির পোশাকি নাম ‘ফিউমিগেশন’। গ্যাসীয় কীটনাশক বা রাসায়নিক ধোঁয়া ব্যবহার করে পণ্য থেকে ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ, উইপোকা, ব্যাক্টেরিয়া বা অন্যান্য অণুজীব সম্পূর্ণ নির্মূল করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এটি। এই পদ্ধতিতে কোনও তরল স্প্রে করা হয় না। তার বদলে এক ধরনের বিশেষ বাষ্প ব্যবহার করা হয়।
গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করে আবদ্ধ স্থানে ধোঁয়া তৈরি করা হয়। আমকে নিয়ন্ত্রিত গরম ও আর্দ্র বায়ুর সংস্পর্শে রাখা হয়। এই বাষ্পকে ১২ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত আবদ্ধ রাখতে হয়। এখানে শুধু গরম বাতাস এবং নির্দিষ্ট আর্দ্রতা ব্যবহার করে আমের ভেতরের তাপমাত্রা এমন একটি স্তরে নিয়ে যাওয়া হয়, যাতে আমের কোনও ক্ষতি না করেই ফ্রুট ফ্লাই বা ফলের মাছির ডিম ও লার্ভা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।
এই পদ্ধতিটির সবচেয়ে বড় সুবিধা হল এতে কোনও ক্ষতিকারক রাসায়নিক গ্যাস (যেমন মিথাইল ব্রোমাইড) ব্যবহার করা হয় না। ফলে আমের প্রাকৃতিক স্বাদ, গন্ধ এবং পুষ্টিগুণ একদম অটুট থাকে, যা জাপানের মানুষজনের চাহিদা ও বাজারের উচ্চ মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
জাপান ভারতের আম প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রগুলিতে এই ফিউমিগেশন বা গ্যাসীয় জীবাণুমুক্তকরণ ব্যবস্থার পদ্ধতিগত কিছু ত্রুটি খুঁজে পেয়েছে। তাদের আশঙ্কা, ত্রুটিপূর্ণ ফিউমিগেশনের কারণে আমের মাধ্যমে ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গ, বিশেষ করে মাছির লার্ভা তাদের দেশে প্রবেশ করতে পারে। আর ঠিক এই কারণেই জাপান আম আমদানিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
২০২৬ বা তার পর থেকে ভারত সরকার বা সংশ্লিষ্ট দফতরের করা কোনও পরিদর্শন সনদ থাকা আম আর জাপানে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। জাপানের সরকারি উদ্ভিদ সুরক্ষা কেন্দ্রের নির্দেশেই মূলত এই পদক্ষেপ করেছে জাপানের বাণিজ্য মন্ত্রক। গত ৩১ মার্চ ইয়োকোহামা উদ্ভিদ সুরক্ষা সমিতি একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই নিষেধাজ্ঞা করেছে বলে সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এই আমদানি নিষেধাজ্ঞা স্থায়ী নয়। ভারতের কোয়ারেন্টাইন ও ফল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রগুলির পরিচালনগত মান উন্নত হয়েছে, এই মর্মে জাপানি পরিদর্শকেরা সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হলেই আবার আমের আমদানির দরজা খুলবে জাপান। তবে ঠিক কোন কোন বিষয়ে ত্রুটি পাওয়া গেছে, তার সুনির্দিষ্ট বিবরণ জাপানি বা ভারতীয় কোনও কর্তৃপক্ষই জনসমক্ষে প্রকাশ করেননি।
ফ্রুট ফ্লাইয়ের উপদ্রবের সন্দেহে জাপান ১৯৮৬ সালে প্রথম ভারতীয় আম নিষিদ্ধ করেছিল। সেই নিষেধাজ্ঞা ২০ বছর স্থায়ী ছিল। ২০০৬ সালের ২৩ জুন জাপান আনুষ্ঠানিক ভাবে তা প্রত্যাহার করে নেয়। জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয় এই ঘোষণা করে জানায় এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে জাপান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে চায়।
তবে বিনা শর্তে আম আমদানি করতে চায়নি জাপান। বাণিজ্য পুনরায় শুরু করার শর্তগুলি সুনির্দিষ্ট ছিল। দ্বিপাক্ষিক শর্ত অনুসারে, জাপানের বাজারে পাঠানোর জন্য সমস্ত ভারতীয় আমকে নির্দিষ্ট রাজ্যগুলির অনুমোদিত কেন্দ্রগুলিতে ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুরক্ষিত করতে হবে।
নিয়ম অনুযায়ী, অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাত, উত্তরপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ এই ক’টি রাজ্যের আম জাপানে পাঠানোর আগে জাপানি কোয়ারেন্টাইন কর্মকর্তাদের সশরীরে এসে এই প্ল্যান্টগুলো পরীক্ষা করে সবুজ সঙ্কেত দিতে হয়।
রফতানির জন্য শুধুমাত্র ছ’টি জাতের আমের অনুমতি রয়েছে। আলফানসো, কেশর, বেগুন ফুলি, ল্যাংড়া, চৌসা এবং মালিকা। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত আমের প্রতি মরসুমে রফতানি শুরু হওয়ার আগে জাপানি পরিদর্শকদের ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট বা ভিএইচটি প্রক্রিয়া তদারকি করতে হয়। জাপানের শর্ত মেনে ভারত ভিএইচটি পরিকাঠামো তৈরি করে। ২০০৭ সালে তিরুপতিতে প্রথম সরকারি ভাবে প্রতিষ্ঠিত ভিএইচটি প্ল্যান্টটি চালু হয়। ২০০৬ সাল থেকে বর্তমান স্থগিতাদেশের আগে পর্যন্ত প্রতি মরসুমে পরিদর্শন ও পরিশোধন শর্তটি অব্যাহত ছিল।
যদিও আম নিয়ে জাপানের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ভারতের চিন্তা করার তেমন কারণ নেই। কারণ পরিমাণের দিক থেকে ভারতের তাজা আম আমদানিকারক রাষ্ট্রগুলির মধ্যে শীর্ষে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, কুয়েত এবং কাতার। বাণিজ্যিক প্রতিবেদন অনুসারে ভারত ২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষে বিশ্বব্যাপী প্রায় ২৯,৯৩৮ মেট্রিক টন আম রফতানি করেছে, যার মূল্য ছিল প্রায় ৫.৬ কোটি ডলার।
জাপানের রফতানির ভাগ সীমিত হলেও নগণ্য নয়। ২০২৫-’২৬ সালে জাপানে তাজা ও প্রক্রিয়াজাত আমের পণ্যের রফতানির মূল্য ছিল ১ কোটি ৫৪ লক্ষ ডলার। এর মধ্যে গুজরাতের কেশর জাতের আমই জাপানের বাজারে পাঠানো পণ্যের বৃহত্তম অংশ দখল করেছিল।
আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় আমের জাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে মহারাষ্ট্রের আলফানসোর। কোঙ্কন অঞ্চল জুড়ে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের কারণে সেই আমের ফলন ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। সেই কারণেও ২০২৫-’২৬ অর্থবর্ষে ভারতের তাজা আম রফতানি কিছুটা চাপের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন রফতানি ব্যবসায়ীরা।