Albania Flamingo Revolution

পবিত্র স্থানে ‘অপবিত্র’ প্রকল্প! ট্রাম্পের জামাইয়ের বিরুদ্ধে ‘রাজহাঁস বিপ্লব’, কেন ক্ষোভে ফুঁসছে নেটোর আলবেনিয়া?

দক্ষিণ ইউরোপের দেশ আলবেনিয়ায় পর্যটনের মেগা প্রকল্প শুরু করেছেন ট্রাম্পের জামাই জ্যারেড কুশনার। কিন্তু, সেই কাজকে কেন্দ্র করেই প্রবল গণ আন্দোলনের মুখে পড়েছে গ্রিস এবং রোমের ওই পড়শি দেশটি।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬ ০৮:২৩
Share:
০১ ২০

পশ্চিমে রোম আর দক্ষিণে গ্রিস। ইউরোপের দুই প্রাচীন সভ্যতার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে আলবেনিয়া। চোখধাঁধানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য সেখানে ফি বছর পা রাখেন কয়েক লাখ পর্যটক। অ্যাড্রিয়াটিক সাগরতীরের ছোট্ট সেই দেশে রাজহাঁসকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে ভয়ঙ্কর এক গণ আন্দোলন! তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে তাতে প্রতিনিয়ত বিদ্ধ হচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর জামাই জ্যারেড কুশনার।

০২ ২০

আলবেনিয়ার এই গণ আন্দোলনের পোশাকি নাম ‘ফ্লেমিংগো বিপ্লব’। দক্ষিণ ইউরোপের দেশটির রাজধানী তিরানাতে এর সর্বাধিক প্রভাব দেখা গিয়েছে। সেখানে টানা ৩০ দিন প্রধানমন্ত্রী ইদি রামার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখিয়েও শান্ত হয়নি আমজনতা। প্ল্যাকার্ড হাতে লাগাতার স্লোগান দিতে দেখা গিয়েছে তাঁদের। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, ট্রাম্পের জামাই কুশনারের হাতে দেশকে তুলে দিয়েছেন রামা। কিন্তু, আলবেনিয়া বিক্রি হবে না।

Advertisement
০৩ ২০

১৯১২ সালে তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীনতা লাভ করে আলবেনিয়া। তিরানার মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশই সুন্নি মুসলমান। বাকিরা অন্য ধর্মাবলম্বী। তার পরেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য দক্ষিণ ইউরোপের এই দেশটির বেশ সুখ্যাতি রয়েছে। বর্তমানে ২৪ লাখ মানুষ বাস করেন সেখানে। ২০০৯ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট নেটোর (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন) সদস্যপদ পায় তারা।

০৪ ২০

গত কয়েক বছর ধরেই আর্থিক উন্নতির জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ঢোকার চেষ্টা করছে আলবেনিয়া। নেটো সদস্য হওয়ার পর ২০০৯ সালে এ ব্যাপারে আবেদন জানায় তিরানা। যদিও ইইউ সংসদ এখনও তাতে সবুজ সঙ্কেত দেয়নি। দক্ষিণ ইউরোপের দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের মূল জায়গা হল পর্যটন। সেটা অনেকাংশেই ভাজ়োসা নদী এবং ফ্লেমিংগো নামের এক ধরনের রাজহাঁসের উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।

০৫ ২০

গ্রিসের পিন্ডাস পাহাড় থেকে বেরিয়ে লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে আলবেনিয়ার মধ্যে দিয়ে অ্যাড্রিয়াটিক সাগরে পড়েছে ভাজ়োসা নদী। এর ২৭০ কিলোমিটার যাত্রাপথের দু’পারে কোথাও হয়নি কোনও নগরায়ন। ফলে ব্যতিক্রমী বাস্তুতন্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এই নদী অববাহিকা। আর তাই সেখানে গেলে বিভিন্ন ধরনের বন্যপ্রাণ চাক্ষুষ করার সুযোগ পান পর্যটকেরা। গত বছর (২০২৫ সাল) এই নদী অববাহিকাকে ‘বায়োস্ফিয়ার রিজ়ার্ভ’-এর মর্যাদা দেয় ইউনেস্কো।

০৬ ২০

২০২১ সালে আলবেনিয়া সফর করেন ট্রাম্পের জামাই কুশনার। প্রধানমন্ত্রী রামার সঙ্গে বিশেষ বৈঠক হয় তাঁর। ওই সময় পর্যটন ব্যবসায় আরও লাভের জন্য বিপুল লগ্নির প্রস্তাব দেন তিনি। ঠিক হয়, দক্ষিণ ইউরোপের দেশটির সাজানো দ্বীপে হাজার ঘরের বিলাসবহুল হোটেল গড়ে তুলবেন জ্যারেড। তাঁর টোপ সঙ্গে সঙ্গে গেলে তিরানা সরকার। ২০২৩ সালে দীর্ঘ দিনের লিজ়ে ওই দ্বীপ ট্রাম্পের জামাইয়ের হাতে তুলে দেয় তাঁরা।

০৭ ২০

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ধনকুবের ব্যবসায়ী হিসাবে ট্রাম্প-কন্যা ইভাঙ্কার স্বামী কুশনারের যথেষ্ট খ্যাতি রয়েছে। তাঁর সংস্থা ‘অ্যাফিনিটি পার্টনার্স’-এর সদর দফতর আছে মিয়ামিতে। শ্বশুর দ্বিতীয় বারের জন্য প্রেসিডেন্টের কুর্সি পাওয়ার পর থেকে তার বাজারমূল্য হু-হু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে বললে অত্যুক্তি হবে না। জ্যারেড বর্তমানে জমি, রিয়্যাল এস্টেট এবং কৃত্রিম মেধা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) প্রযুক্তিতে লাগাতার লগ্নি করে চলেছেন।

০৮ ২০

২০২৩ সালে সাজ়ান দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ হাতে পেলেও সেখানে প্রকল্পের কাজ শুরু করতে পারেননি কুশনার। পরে ঠিক হয় দ্বীপ সংলগ্ন আলবেনিয়ার মূল ভূখণ্ড জ়ভেরনেচ এলাকায় একটি রিসর্ট তৈরি করবেন তিনি। এর জন্য প্রায় ৫৬৫ একর জমি তাঁর সংস্থাকে হস্তান্তরিত করেন প্রধানমন্ত্রী রামা। এর মধ্যে ৪৫ একরের বিলাসবহুল রিসর্ট তৈরির কথা রয়েছে। বাকি এলাকায় পর্যটন পরিকাঠামোর অন্য ধরনের কাজ করা হবে বলে জানা গিয়েছে।

০৯ ২০

এই প্রকল্পে ১৫০ কোটি ডলার লগ্নির সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্পের জামাই। কিন্তু, তাঁর ওই ঘোষণার পরই জটিল হয় পরিস্থিতি। কারণ, আলবেনিয়ার জ়ভেরনেচ সংলগ্ন এলাকায় রয়েছে ভাজ়োসা নদী অববাহিকার নার্টা উপহ্রদ। সেখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় তিরানা প্রশাসন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ফলে বিপাকে পড়েন প্রধান রামা। এ-হেন পরিস্থিতিতে কুশনারকে খুশি করতে রাতারাতি দেশের আইন বদলে ফেলেন তিনি।

১০ ২০

শুধু তা-ই নয়, ২০২৪ সালে জানা যায়, নার্টা উপহ্রদ সংলগ্ন এলাকায় একটি ছোট বিমানবন্দর তৈরি করবেন রামা। সেখানে থাকবে চার্টার্ড বিমান এবং কপ্টার ওঠানামার সুবিধা। ওই বিমানবন্দর থেকে ধনকুবের পর্যটকেরা চলে যাবেন জ়ভেরনেচে কুশনারের রিসর্টে। সব শেষে অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের বুকে সাজ়ান দ্বীপ পড়বে তাঁদের পা। গোটা পরিকল্পনাটাই ট্রাম্পের জামাইয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সেরে ফেলেন দক্ষিণ ইউরোপের দেশটির প্রধানমন্ত্রী।

১১ ২০

রামার এই কুকীর্তি অবশ্য বেশি দিন চাপা থাকেনি। প্রকল্পের কথা জানাজানি হতেই আন্দোলনে নামেন স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা। পরে তাতে যোগ দেয় আলবেনিয়ার আপামর আমজনতা। তিরানার নার্টা উপহ্রদের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সেটা হল, ইউরোপ থেকে আফ্রিকায় যাতায়াতের পথে সেখানেই বিশ্রাম নেয় হাজার হাজার ফ্লেমিংগো, যা প্রকৃতপক্ষে রাজহাঁস প্রজাতির বিশেষ ধরনের একটি পাখি।

১২ ২০

পরিবেশকর্মী থেকে শুরু করে আলবেনিয়ার আমজনতার অভিযোগ, জ়ভেরনেচে রিসর্ট ও নার্টা উপহ্রদ সংলগ্ন এলাকায় বিমানবন্দর গড়ে উঠলে ধ্বংস হবে প্রকৃতি। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ওই জলাভূমির বাস্তুতন্ত্রে। সে ক্ষেত্রে কয়েক বছরের মধ্যে নার্টায় চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে ফ্লেমিংগো। আর তাই রাজহাঁসদের প্রজাতি বাঁচাতে রাস্তায় নেমে রামা, ট্রাম্প ও কুশনারের বিরুদ্ধে গলা ফাটাচ্ছেন তাঁরা।

১৩ ২০

মার্কিন প্রেসিডেন্টের জামাই অবশ্য গোড়ার দিকে এই গণবিক্ষোভকে তেমন পাত্তা দেননি। প্রধানমন্ত্রী রামার পূর্ণ সমর্থন থাকার জেরে জ়ভেরনেচে রিসর্ট নির্মাণের কাজ শুরু করে তাঁর সংস্থা। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান আন্দোলনকারীদের একাংশ। জোর করে প্রকল্প এলাকায় ঢোকার চেষ্টা করেন তাঁরা। তখনই নিরাপত্তারক্ষীদের দিয়ে তাঁদের মার খাওয়ানোর অভিযোগ ওঠে কুশনারের বিরুদ্ধে।

১৪ ২০

এই ঘটনায় বিক্ষোভের আগুনে ঘি পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে আরও তীব্র আকার ধারণ করে আন্দোলন। প্রধানমন্ত্রী রামার পদত্যাগ চেয়ে সরব হন আলবেনিয়াবাসীদের একাংশ। এর জেরে কিছুটা বাধ্য হয়েই প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখেন কুশনার। ২০১৩ সাল থেকে তিরানার প্রশাসনিক প্রধানের দায়িত্বভার সামলাচ্ছেন রামা। গণবিক্ষোভে তাঁর কুর্সি হারানোর আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউই।

১৫ ২০

আর তাই তড়িঘড়ি বিদেশি শক্তির হাত থাকার কথা বলে আন্দোলন ভাঙার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন রামা। একটি বিবৃতিতে তাঁর প্রশাসনের তরফে বলা হয়েছে, জ়ভেরনেচ নিয়ে অশান্তিতে উস্কানি দিচ্ছে শিয়া ধর্মাবলম্বী ইরান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত চলার কারণে ট্রাম্পের পরিবারকে যেনতেন প্রকারে হেনস্থা করাই এখন তেহরানের মূল উদ্দেশ্য। এর আঁচ এসে পড়েছে তিরানায়।

১৬ ২০

রামা প্রশাসনের এ-হেন মন্তব্যের পর চুপ করে বসে নেই ইরানও। তেহরানের বিদেশ মন্ত্রকের তরফে বলা হয়েছে, ‘‘কোনও বিদেশি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে আমরা কখনওই হস্তক্ষেপ করি না। ঘরোয়া কোন্দল সামলাতে না পেরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে আমাদের গায়ে কালি ছেটানো হচ্ছে।’’

১৭ ২০

অন্য দিকে এই গণ আন্দোলনের জেরে আরও একটি দিক থেকে সমস্যার মুখে পড়েছে আলবেনিয়া। ইইউ জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ রক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। সেটাকে এক পাশে সরিয়ে রেখে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর সদস্যপদ পাওয়ার স্বপ্ন যেন কখনওই না দেখে তিরানা। ফলে ট্রাম্প পরিবারকে খুশি করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী রামা যে ঘরে-বাইরে মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছেন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

১৮ ২০

১৯৪৪ সালে কমিউনিস্ট শাসনের আওতায় আসে আলবেনিয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-’৪৫ সাল) শেষ হলে পুরোপুরি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে দক্ষিণ ইউরোপের ওই দেশ। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিরানার উপর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব ছিল সর্বাধিক। তার পরই গণ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে পরিসমাপ্তি ঘটে সেখানকার সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার।

১৯ ২০

বিশ্লেষকদের দাবি, সাড়ে তিন দশক পর ফের এক বার সেই ধরনের গণ আন্দোলনে জেগে উঠেছে আলবেনিয়া। এ বার পরিবেশরক্ষা এবং ফ্লেমিংগোদের বাঁচাতে তিরানায় রাস্তায় প্রবল বিক্ষোভে শামিল হতে দেখা যাচ্ছে সেখানকার বাসিন্দাদের। এর জেরে ইউরোপের রাশ আলগা হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। উঠে গিয়েছে সেই প্রশ্নও।

২০ ২০

দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বার বার ইউরোপের সঙ্গে বিবাদে জড়াচ্ছেন ট্রাম্প। প্রথমেই গ্রিনল্যান্ড দখলের কথা বলতে শোনা যায় তাঁকে। তাতে ফুঁসে ওঠে ডেনমার্ক। এর পর কখনও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ, কখনও আবার ইটালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে করা আচরণ নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন তিনি। সেই তালিকায় এ বার যুক্ত হল নেটোভুক্ত আলবেনিয়াও।

ছবি: রয়টার্স, সংগৃহীত, প্রতীকী ও এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement