ধারাবাহিক উপন্যাস ।। পর্ব ১৪
Bengali Literature

দেখা হবে

অফিসের সামনে একটা উইলি’স জিপ দাঁড়িয়ে ছিল। রামপ্রিয় আর ম্যানেজারবাবু গাড়িতে বসলেন। দু’পাশে সবুজ কার্পেটের মাঝখান দিয়ে সরু পাথর-ঢালা পথ। ধূসর-নীল ভুটান পাহাড়। চা-বাগানের পথ শেষ হতেই দু’পাশে চিলোনি, বহেড়া আর জারুলের বন।

বিপুল দাস

শেষ আপডেট: ৩১ মে ২০২৬ ০৬:৩৫
Share:

ছবি: কুনাল বর্মণ।

পূর্বানুবৃত্তি: বাজারে শিবুর বন্ধু প্রকাশের দোকানে দুটো গুন্ডা টাইপের ছেলে তোলাবাজি করতে এসেছিল। তারা মাত্রছাড়া বেশি টাকা চেয়ে বসলে সবাই প্রতিবাদ করে। ছেলে দুটো কাছে ছুরি ছিল। শিবু ওদের সঙ্গে মারামারিতে জড়িয়ে পড়েছিল, ফলে তার জখম হওয়ার আশঙ্কাও ছিল। শেষ পর্যন্ত বাড়াবাড়ি কিছু না হলেও ঘটনাটা শিবুর মন থেকে বেরোতে চাইছে না। নন্দা সবটা শুনে অবাক হয়, সাধ্যমতো শিবুকে স্বাভাবিক হতে সাহায্য করে। বাড়ির চাপে ডাক্তার হয়েছিলেন রামপ্রিয় সান্যাল। গান শেখা বা জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে পড়ার মতো অনেক আশাই পূর্ণ হয়নি তাঁর। অভিমানে বাড়ি থেকে দূরে চলে যেতে চেয়েছিলেন। সে কারণেই পুরনো চা-বাগান নিউ গ্রাহাম টি এস্টেটে চাকরি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন শেষ অবধি।

জাঙ্গল শু, খাকি হাফশার্ট আর সাদা হাফপ্যান্ট পরা ম্যানেজারের পদবি পাণ্ডে। ‘পাণ্ডে’ শুনে একটু অবাক হয়েছিল রামপ্রিয়। অবাঙালি, কিন্তু কথা শুনে কিচ্ছু বোঝার উপায় নেই। তার অবাক হওয়া বোধহয় বুঝতে পেরেছিলেন ম্যানেজারবাবু। হাসলেন। বেশ আত্মতুষ্টির হাসি।

“আমি বিহারি। প্রায় তিন জেনারেশন ডুয়ার্সে আছি। আমি টোকলাই থেকে ট্রেনড। আমার ভাই আছে হ্যামিল্টনগঞ্জে। দুই বোনের বিয়ে বাঙালি ফ্যামিলিতে দিয়েছি। এক জন আলিপুরদুয়ার, এক জন বীরপাড়া। বাঙালিই হয়ে গেছি, বুঝলেন, সারনেম তো আর পাল্টাতে পারি না। বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি, নেপালি, সাদরি— সব বলতে পারি। আর দেরি করবেন না, লাস্ট বাস মিস করবেন নইলে। চলুন, আপনাকে বাসে তুলে দিয়ে আসি।”

অফিসের সামনে একটা উইলি’স জিপ দাঁড়িয়ে ছিল। রামপ্রিয় আর ম্যানেজারবাবু গাড়িতে বসলেন। দু’পাশে সবুজ কার্পেটের মাঝখান দিয়ে সরু পাথর-ঢালা পথ। ধূসর-নীল ভুটান পাহাড়। চা-বাগানের পথ শেষ হতেই দু’পাশে চিলোনি, বহেড়া আর জারুলের বন। চোখ জুড়িয়ে গেল, মন ভরে গেল রামপ্রিয় ডাক্তারের। চাকরিটা হলে এখানেই সে বাকি জীবন কাটিয়ে দেবে। বাসস্ট্যান্ডে তাকে নামিয়ে দিয়ে টা-টা করে ম্যানেজারবাবুচলে গেলেন।

রামপ্রিয় ফাইনাল ডিসিশন নিয়ে ফেললেন।

সে রাতে ঘন কুয়াশা ছিল। কড়া করে বোরোলি মাছ ভেজেছিল মনমায়া। খুব ঠান্ডা ছিল সেদিন। হাত-পা অসাড় হয়ে আসছিল, খাটের উপর বিছানায় মনে হচ্ছিল কেউ ঠান্ডা জল ঢেলে রেখেছে। খাওয়ার জন্য গরম জল ফ্লাস্কে ভরে রেখেছে মনমায়া। সামান্য ঠান্ডা মিশিয়ে খেতে অসুবিধে হয় না।

মাছভাজাগুলো খেতে চমৎকার হয়েছিল। বেশ মুচমুচে। দোকানি বলছিল, তিস্তার বোরোলি। মনে মনে হেসেছিলেন ডাক্তারবাবু। কোথায় তিস্তা, আর কোথায় বা নিউ গ্রাহাম টি-এস্টেট। কিছু বলেননি। হাফ কেজি নিয়েছিলেন। যথেষ্ট। হুইস্কির সঙ্গে মাঝে মাঝে মুখে ফেলবেন। রাতে দুটো রুটি আর তরকারি খেয়ে শুয়ে পড়বেন।

আজ মনমায়াকে গাইতে বলবেন। আর কী চঞ্চল! সামনের লনে দৌড়চ্ছে, মালির সঙ্গে ফুলগাছের পরিচর্যা করছে, হঠাৎ এক পাক ঘুরে গেয়ে উঠছে— ‘লালিগুরস সাজাই ভরি চুলটি সাজাউঞ্ছ’। মনমায়াই প্রথম তাকে শিখিয়েছিল, লালিগুরস-ই রডোডেন্ড্রন। লীলাময়ী মনমায়াকে দেখে মনে হয় ওকে সঙ্গিনী করার সিদ্ধান্ত নিয়ে কিছু ভুল করেননি। তার পলাশগুড়ির বৌ চন্দ্রা একটা ছেলে দিয়েছে তাঁকে, শিবনাথ। সেও মায়ের প্রশ্রয়ে লাইনের বাইরে চলে গেল। তেমন কিছু করে উঠতে পারল না। শিবুকে শাসন করলে তার মা না খেয়ে থাকত। ধর্মকর্ম নিয়ে তার বাতিক বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। সারা দিন সব জায়গায় ধুলো দেখছে। হাতে একটা ভিজে কাপড় নিয়ে জানালা-দরজা মুছেই যাচ্ছে। বাইরে থেকে এসে ঘরে ঢোকার আগে জামাকাপড় ছাড়তে হত। সেগুলো চন্দ্রা তখনই ধুয়ে দিত। সবচেয়ে খারাপ লাগত, শরীরের জন্য কখনও আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়ে উঠলে প্রায়ই চন্দ্রা বার-তিথি দেখিয়ে তাঁকে সরিয়ে দিত। রিপুদমন করে তাঁকে ঘুমিয়ে পড়তে হত। আস্তে আস্তে বাগান থেকে পলাশগুড়ির বাড়িতে আসাকমিয়ে দিয়েছিলেন।

সেদিন সন্ধে নেমেছে। মনমায়া এখনই তার রাতের রান্না সেরে ফিরবে, তিনি তাঁর গ্রামোফোনে গান শুনছেন— ‘তুঝে জীবন কি ডোর সে বাঁধ লিয়া হ্যায় বাঁধ লিয়া হ্যায়...’ দেব আনন্দ-সাধনা, ফিল্ম ‘আসলি নকলি’। তাঁর প্রিয় গান। হঠাৎ কী মনে হতে রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে দেখলেন, গানের সঙ্গে নাচছে মনমায়া। কী আশ্চর্য সুন্দর দেখাচ্ছে নেপালি মেয়েটাকে! আজ যেন তাকে অন্য চোখে দেখলেন ডাক্তারবাবু। কী অপূর্ব লীলাচঞ্চল ওর নাচের ছন্দ। মেয়েটার হাত ধরে নাচতে ইচ্ছে করছিল তাঁর। তা হয় না। বাগানের ডাক্তারবাবু ইচ্ছে থাকলেও তাঁর নেপালি রাঁধুনির সঙ্গে নাচতে পারেন না। এর পর যখনই তিনি রেকর্ড চালিয়েছেন, মেয়েটা দরজার পাশে এসে দাঁড়িয়ে তন্ময় হয়ে গান শুনেছে।

এক দিন ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “তিমি গাউছউ? গান জানিস তুই?”

“আলি আলি সখছ। অল্প অল্প পারি।”

“নাচতেও তো পারিস ভাল। এক দিন একটা গান শোনাবি তো। পুরনো হিন্দি গান।”

গাইত মনমায়া। এক দিন লজ্জা ভেঙে নেচেছিল। ওদের একটা নেপালি গানের সঙ্গে।মনে আছে ডাক্তারের। ‘ম প্যার বেচি দিঞ্ছু, বাহার বেচি দিঞ্ছু...’

ক্রমশ পলাশগুড়ি আরও দূরে চলে যাচ্ছিল। নিউ গ্রাহাম অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল। মনমায়া কাছে আসছিল। বাড়িতে রাধামাধবের মন্দিরে অনুষ্ঠান থাকলে যেতেন। চন্দ্রা কেমন কুঁজো হয়ে গেছে অল্পবয়সেই। তার হাত-পায়ের আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে অতিরিক্ত জল ঘাঁটার ফলে বিজবিজে ঘা। সোর কজ়ড বাই ওয়াটার। ওষুধের কথা বলে লাভ নেই। জল ঘাঁটা তো আর কমবে না। আর, চন্দ্রাকে কেমন যেন দূরের মানুষ মনে হচ্ছিল। এই মহিলা তাঁর বিবাহিত স্ত্রী, এর সঙ্গে ফুলশয্যা হয়েছিল। এই শরীর তাঁর চেনা, মিলনের চূড়ান্ত মুহূর্তে চন্দ্রার শারীরিক, মানসিক নিস্পৃহতা এখনও মনে পড়ে। মনে পড়ে না চন্দ্রা কোনও দিন মিলনের জন্য আগ্রহ দেখিয়েছে। রামপ্রিয়র মনে হত, একটা কাঠের পুতুলের সঙ্গে তাঁর সঙ্গম। মিলনের সময়েও চন্দ্রা মনে মনে বার-তিথি গুনত। আজ কী বার, আজ কি পঞ্জিকায় সহবাস নিষিদ্ধ!

বাড়ির অনুষ্ঠান শেষ হলে, দেরি হলেও বাগানের গাড়ি নিয়ে ফিরতেন। কোনও দিন চন্দ্রা বলেনি, ‘রাত হয়েছে, এত রাতে অত দূরে গাড়ি নিয়ে যেয়ো না।’ হয়তো ভয় পেত, এক সঙ্গে শুতে হবে। যদি শরীর চায় তার বর! বরং শিবু বলত, “বাবা, বাবা, আজ থাক না। লেপার্ডের গল্প শুনব। বাবা, তুমি হাতি দেখেছ?”

সে রাতে কুয়াশা ছিল ঘন। কুয়াশা দেখার জন্যই এক বার জানালা খুলেছিলেন। মাছভাজা খেতে চমৎকার হয়েছিল। তখনও মাথায় একটু আগে শোনা গানের রেশ রিনরিন করে বাজছিল। ‘যমুনা কে তীর কানহা আওও...’। গীতা দত্ত। সাধারণত মনমায়া ড্রিঙ্কস নেয় না, আজ তাকে এক পেগ খাইয়েছেন তিনি। আহা, আজ যদি আকাশ পরিষ্কার থাকত, মনমায়াকে তিনি সপ্তর্ষিমণ্ডল দেখাতেন। অনেকে মনে করে ধ্রুবতারা বোধহয় আকাশের খুব উজ্জ্বল নক্ষত্র। উত্তর অক্ষাংশের অনেক উঁচুতে ধ্রুবতারা। অনুজ্জ্বল। উত্তর মেরুতে একদম মাথার উপরে। কিন্তু আমরা দেখি উত্তর আকাশের অনেক নিচুতে। আমরা আর একটু দক্ষিণে থাকলে দেখতেই পেতাম না। থাক, মনমায়া এ-সব বুঝবে না। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিরহস্য এক বার মাথায় ঢুকলে বড় বিপদ। তখন খুব পাগল-পাগল লাগে। নিজেকে খুব হরিদাস পাল মনে হয়।

সে রাতে তিনটে হাতি বাগানে ঢুকেছিল। একটা ছিল ভুটান পাহাড়ের ধূমল পাহাড়ের মতো, দাঁতাল। তার সঙ্গী ছিল দু’টো মাদি। ওরা কুলি লাইন ভাঙচুর করে ফ্যাক্টরির গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। কুকুরগুলো খুব ডাকছিল। টিন পেটানোর আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। অনেক লোকের চিৎকার। “হাথি”— মনমায়া বললে তিনি জানালা খুলে সামনে দাঁড়ালেন।

“শুনো, বাইরে যাবে না কিন্তু।”

তিনি স্নিগ্ধ চোখে মনমায়ার দিকে তাকালেন। এই মেয়েটার জন্য তার বুকের ভিতরে ভালবাসা উপচে পড়ে। ওকে অরুন্ধতী চেনাতে ইচ্ছে করে। ওকে ‘বরসাত’, ‘কালাবাজার’, ‘সি আই ডি’, ‘বোম্বাই কা বাবু’র গান শোনাতে ইচ্ছে করে। বলতে ইচ্ছে করে, ছায়াপথের কোথায় আমাদের এই সূর্য। ‘গাও মনমায়া, আমার সঙ্গে গাও— আকাশভরা সূর্যতারা’... তাঁকে কানায় কানায় ভরে দিয়েছে এই মেয়েটা। বিধাতা ওকে যেন প্রাণ-লাবণ্যে ভরপুর করে তৈরি করেছে। মনমায়ার জন্য তাঁর খুব ভালবাসা পেল।

জানালায় তার পাশে এসে দাঁড়াল মনমায়া। দু’জনে তাকিয়ে আছে দূরে কুয়াশায় মোড়া চা-বাগানের দিকে। এই বাগান তাঁদের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে। নিউ গ্রাহাম টি-এস্টেট, দূরের ওই ভুটান পাহাড়, ডায়না নদী, দিগন্তজোড়া অরণ্য, আর মনমায়ার মতো এক নারী— এক জীবনে আর কী চাওয়ার থাকে মানুষের! সঙ্গে রইল পালুসকর, পঙ্কজ মল্লিক, গীতা দত্ত। চমৎকার হুইস্কি। আর কিছু কি চেয়েছিলেন রামপ্রিয় সান্যাল? জীবনের সব চাওয়া কি পাওয়া হয়! কিছু না-পাওয়ার বেদনা না থাকলে পাওয়ার সুখ যেন একটু কম থাকে।

জিজ্ঞেস করেছিলেন, “মনু, আমাকে ভালবাস? কে তিমি মলাই প্রেম গরছো?”

হাসল মনমায়া। তার সাহাবের আরও একটু কাছে ঘেঁষে এল। ডাক্তারবাবুর মনে হল পৃথিবীতে শীত নেই। তুঝে জীবন কি ডোর সে বাঁধ লিয়া হ্যায়— মৃদু স্বরে গাইল মনমায়া। দূরে ভুটান পাহাড়ের এখানে-ওখানে আলোর বিন্দু। সামনে কুয়াশা-ঢাকা নিউ গ্রাহাম টি-এস্টেট, বুকের কাছে প্রিয়তমা নারী। চোখে জল এল রামপ্রিয় সান্যালের।

সে রাত যেন তাঁদের মধুচন্দ্রিমার রাত। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে মনমায়ার গান যেন ডায়না নদীর স্নিগ্ধ স্রোতের মতো তাঁকে স্নান করিয়ে দিচ্ছিল। মেয়েটা কী ভাবে তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেল! মাঝে মাঝে মনে হয়, তাঁর জন্যই ঈশ্বর এই মেয়েটাকে এই অরণ্যের মাঝে তৈরি করে রেখেছিলেন। মনমায়া যত কাছে আসছিল, ততই অতীত দূরে সরে যাচ্ছিল।

আইনত চন্দ্রা এখনও তাঁর স্ত্রী। সেই সংসারের দায় তারই কাঁধে। কম্পাউন্ডার জীবনকে পাঠিয়ে দেন। নিজে ন’মাসে-ছ’মাসে এক বার যান। পলাশগুড়ি থেকে দরকারি জিনিস কিনতে হয়। কখনও শিলিগুড়িতেও যেতে হয়। পুরনো গ্রামোফোন রয়েছে, আর একটা রেকর্ডপ্লেয়ার কিনেছেন। তাঁর আর মনমায়ার সম্পর্ক নিয়ে বাগানে সামান্য ঢেউ উঠেছিল, মিলিয়েও গেছে। খুব স্বাভাবিক যেন রাঁধুনি মনমায়ার সঙ্গে ডাক্তারবাবুর এই সম্পর্ক। হতেই পারে। একটা শহুরে মানুষ যখন শহর থেকে অনেক দূরে ছোট একটা বৃত্তে বন্দি হয়ে পড়ে, পরিচিত কয়েকটি মুখ আর দিনযাপনের সেই একঘেয়ে পুনরাবৃত্তি চলতে থাকে, তখন সেখানে শহুরে নিয়মকানুনের বাইরে অনেক কিছু ঘটে যায়।

রামপ্রিয় সান্যাল জানেন, মনমায়াকে নিয়ে তাঁর এই সহবাসের কথা ঢেউ হয়ে হয়ে পলাশগুড়িতে এত দিনে পৌঁছে গেছে। লোকজন মুচকি হেসেছে। সান্যালডাক্তার চা-বাগানে একটা নেপালি মেয়েকে নিয়ে থাকে। চন্দ্রার কানেও কেউ নিশ্চয়ই কায়দা করে তুলে দিয়েছে। যখন ও-বাড়িতে যান, চন্দ্রা তাঁর সামনে আসে না। ঠাকুরঘরে তার পুজো নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আর একটা কথা শুনে তিনি বুঝেছিলেন, চন্দ্রা পুরো সাইকিক পেশেন্ট হয়ে গেছে। বেশি শুচিবাই যাদের, তারা এক সময় এরকমই হয়ে যায়। ডাক্তার হিসেবে তাঁর জানা আছে। সে নাকি তার আঁচলের গিঁটে সব সময় একটা ছোট্ট কালো পাথরের গোপাল বেঁধে রাখে। রাতে শোওয়ার সময় গিঁট খুলে তার পাশে বিছানায় শুইয়ে দেয়।

শিবুর জন্য অনেক খেলনা নিয়ে যান। শেষ বার শিবু একটা আশ্চর্য কথা বলেছিল। সে তার বাবার সঙ্গে আসতে চেয়েছিল। সে জানে, বাগানে তার আর একটা মা আছে। শিবু তার কাছে থাকবে। আর জানতে চেয়েছিল ওখানে নদী আছে কি না, পুকুর আছে কি না! সেখানে কি মাছ পাওয়া যায়! জীবন বলেছিল, শিবুর নাকি ভীষণ মাছ ধরার নেশা। বাড়িতে যে-সব আলোচনা হয়, ছোটদের কানে ঠিকই পৌঁছয়। শিবুর কানেও পৌঁছেছে। ও-বাড়িতে থাকলে শিবুর পড়াশোনা হবে না। জলপাইগুড়ির কোনও ভাল স্কুলে ভর্তি করে হস্টেলে রাখা দরকার। তাই হয়েছিল। ক্লাস সিক্সে উঠলে তাকে জেলা স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। হস্টেলে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ছেলেকে। চন্দ্রা কয়েক দিন নাওয়াখাওয়া ছেড়ে বিছানা নিয়েছিল। আর তাকে নাকি খুব নোংরা ভাষায় অভিশাপ দিয়েছিল। তা দিক, ওখানে থাকলে লেখাপড়া লাটে তুলে হয় এক জন সাধু-মহারাজ হত, নয় তো পাকা মেছুড়ে। ছেলে কাছছাড়া হতে তার মায়ের প্রাণে যেন শেল বিঁধেছিল। গালাগালি দেওয়া আশ্চর্য কিছু নয়। কিন্তু তিনি আশ্চর্য হয়েছিলেন অন্য কথা ভেবে। চন্দ্রার মতো মেয়ের মুখে কী করে অশ্রাব্য, নোংরা কথা আসে, যেখানে তার আঁচলে গোপাল বাঁধা!

বিছানায় শুয়ে শুয়ে হাতির ডাক শুনতে পাচ্ছিল ওরা। টিন পেটানোর আওয়াজ বন্ধ হয়েছে। চা-বাগান শেষ হলেই রাস্তার বাঁ দিকে শুরু হয়েছে ধানখেত, ডান দিকে মকাইয়ের খেত। এই দুটোর লোভেই হাতি আসে। ধানের খেত লন্ডভন্ড করে দেয়। মকাই খায়, নষ্ট করে। আজকাল আর পটকা ফাটালেও যেতে চায় না। খিদের সময় ভয় চলে যায়। একমাত্র মশাল নিয়ে সামনে গেলে পিছিয়ে যায়। আগুনের রহস্য ওরা এখনও জানে না। ওরা পড়তে পারে না, ওরা চাকার ব্যবহার শেখেনি। বনে দাবানল শুরু হলে প্রাণভয়ে ওরা দিগ্বিদিকে ছুটে পালায়। আগুনকে ওরা জয় করতে পারেনি। আগুন আবিষ্কারের পর থেকে আগুনই হয়ে উঠেছে মানুষের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

দূরাগত ওই বৃংহণ শুনতে শুনতে রামপ্রিয় ডাক্তার ক্রমশ একটা মদমত্ত হাতি হয়ে যাচ্ছিলেন। সঙ্গিনীর জন্য মদস্রাবী এক দাঁতাল উন্মাদ হয়ে উঠছিল। ‘মনমায়া’ বলে তাঁর অবিকল ওই হাতির মতো ডেকে উঠতে ইচ্ছে করছিল। মত্তমাতঙ্গের মতো আজ তিনি তছনছ করে দেবেন ধানখেত, মকাইখেত। মাথায় হুইস্কির রেশ ছিল, মনমায়া শুনিয়েছিল ‘তুঝে জীবন কি ডোর সে বাঁধ লিয়া হ্যায়’, আর ওই হাতির ডাক। সব মিলেমিশে মনমায়ার শরীর পাকাধানে ভরপুর সোনালি খেত হয়ে উঠল। আবার কখনও মনমায়ার শরীর চুল থেকে পায়ে নখ পর্যন্ত যেন এক আশ্চর্য রাগমালা হয়ে বাজল। মনমায়া খুব আদর করছিল তাঁকে, তিনিও খুব ভালবাসছিলেন মনমায়াকে। শেষের দিকে তিনি “মনমায়া.. মনু...” বলে কয়েক বার ভয়ঙ্কর চিৎকার করে উঠেছিলেন। আসঙ্গলিপ্সায় কাতর বাঘ অথবা মত্ত হাতির মতো জান্তব গর্জন।

ক্রমশ

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন