Bengali Short Story

মনীষা

কথাটা শুনে মনীষার বাবা এত কষ্ট পেয়েছিলেন যে, দু’দিন অন্ন-জল স্পর্শ করেননি। তিনি যে দেশভাগের ভুক্তভোগী! নারায়ণগঞ্জে তাঁর পিতৃপুরুষের ভিটে, আম-কাঁঠালের বাগান, কৈশোরের বন্ধু, শৈশবের সুখস্মৃতি সবই ফেলে এ-পারে চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন।

অরুণাভ দত্ত

শেষ আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:২৪
Share:

ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ।

ছোটবেলা থেকেই মনীষা দেখেছেন যে, তাঁর বাবা ভাঙন জিনিসটা মোটে সহ্য করতে পারতেন না। ভেঙে ভাগ হওয়া, বিচ্ছেদ, ভেদাভেদ— চোখের সামনে এ সব দেখলে খুবই বিচলিত হয়ে পড়তেন। বিশাল একান্নবর্তী পরিবার ছিল মনীষাদের। এক বার তাঁর মা আর ছোটকাকিমার মধ্যে কী এক বিষয় নিয়ে বচসা হওয়ায় মনীষার ছোটকাকা রেগেমেগে বললেন, “এর চেয়ে ভাল, হাঁড়ি আলাদা হয়ে যাক!”

কথাটা শুনে মনীষার বাবা এত কষ্ট পেয়েছিলেন যে, দু’দিন অন্ন-জল স্পর্শ করেননি। তিনি যে দেশভাগের ভুক্তভোগী! নারায়ণগঞ্জে তাঁর পিতৃপুরুষের ভিটে, আম-কাঁঠালের বাগান, কৈশোরের বন্ধু, শৈশবের সুখস্মৃতি সবই ফেলে এ-পারে চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন।

দেশের ভাঙনের জেরে ছিন্নমূল উদ্বাস্তু হয়ে অন্যের দেশে চলে আসা, দীর্ঘ দিন কলোনিতে অস্বাস্থ্যকর ভাবে বাস করার অভিজ্ঞতা কেমন, তিনি তা ভাল রকম জানতেন। অন্য কোথাও কোনও ভাঙনের আভাস পেলেই তাই দিশেহারা হয়ে পড়তেন ভিতরে ভিতরে।

শৈশব থেকে মনীষার নিজের বাড়িটাই ছিল তাঁর দেশ। যৌবনে হঠাৎ এক দিন তাঁর দেশটা প্রবাস, আর বাড়িটা পরের হয়ে গেল। বিয়ের পরদিনই মনীষাকে বরবেশী ওই অচেনা লোকটির হাত ধরে চলে আসতে হল তাঁর শ্বশুরবাড়িতে, তাঁর নতুন দেশে। সেখানে সব অচেনা লোকজন, আলাদা নিয়ম। সেদিন মনীষা বুঝতে পেরেছিলেন বাবার কষ্টটা। বুঝেছিলেন, জন্ম থেকে বেড়ে ওঠার পরিচিত পরিসর ছেড়ে চলে আসতে বুকের ভিতরটা কেমন তোলপাড় করে। যেন দেশভাগেরই যন্ত্রণা সেদিন বিদ্ধ করেছিল মনীষাকে। মনে হয়েছিল, তাঁর সত্তার মাঝখান দিয়েই টাঙানো হয়েছে কাঁটাতার, যার এক দিকে বাপের বাড়ি, অন্য দিকে শ্বশুরবাড়ি।

আবার মনীষার কোলে যখন অনিন্দ্য এল, তখন তাঁর চার পাশে ডালপালা মেলল এক নতুন জগৎ। মনীষার স্বামী সোমনাথবাবু মধ্যবয়সে স্ত্রীর নামে একটা ফ্ল্যাট কিনে তাঁদের শরিকি বাড়ি ছেড়ে সপরিবার সেখানে চলে গেলেন। মনীষা ফের খুঁজে পেলেন তাঁর একেবারে নিজস্ব একটি দেশ। সেই দেশে স্বামী, ছেলেকে নিয়ে তাঁর সুখের সংসার। আবার স্বামীর মৃত্যুর পরে অনিন্দ্যই হয়ে দাঁড়াল মনীষার একমাত্র আশ্রয়, তাঁর জগৎ। তার পর ছেলের বিয়ে দেওয়ার পরে মনীষার এক দিন মনে হল, তাঁর এই দেশটাও হয়তো ভেঙে ভাগ হয়ে গিয়েছে।

*****

অনিন্দ্যর আইবুড়োভাতের দিন মনীষার ছোট ননদ যখন ইয়ার্কি করে বলেছিলেন, “তা হলে এ বার মায়ের পালা শেষ হল। কাল থেকে ছেলে বৌয়ের জিম্মায়!”

তখন মনীষাও কথাটা হালকা ভাবেই নিয়ে উত্তর দিয়েছিলেন, “বাঁচলাম ভাই! জন্ম দিয়েছি, কষ্ট করে মানুষ করেছি, এখন বৌ এসে দায়িত্ব নিক, আর আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচি।”

কিন্তু পরে মনীষা বুঝলেন যে, যতখানি সহজে কথাটা বলেছিলেন, বাস্তবে তা মেনে নেওয়া ততখানিই কঠিন তাঁর পক্ষে। ছেলের বিয়ে দেওয়া নিয়ে তাঁর এত উৎসাহ, তা মুহূর্তে মিলিয়ে গেল বাড়িতে নববধূর আগমনে। মনীষা দেখলেন, তাঁর পুত্রবধূ সোহিনীর আলতা পায়ের ছাপ সদর দরজা পেরিয়ে চলে যাচ্ছে ছেলের ঘরে। তখন যে কথাটি রসিকতা বলে মনে হয়েছিল, সেই কথাই এখন ভিন্ন সুরে তাঁর কানে বাজতে লাগল, ‘এ বার মায়ের পালা শেষ হল!’

নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করে যখন ছেলের হাত সোহিনীর হাতে তুলে দিলেন মনীষা, তখন আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে একটা আশঙ্কাও বিঁধতে লাগল কাঁটার মতো— তবে কি সত্যিই অনিন্দ্য মায়ের জীবনবৃত্তের বাইরে চলে গেল?

তার পর এক দিন ওই আশঙ্কাই স্থির বিশ্বাসে বদলে গেল একটি সামান্য ঘটনায়। এক দিন দুপুরে বেগুনি ভেজেছিলেন মনীষা। বেগুনি অনিন্দ্যর খুব প্রিয়। সোনামুগের ডালের সঙ্গে বেগুনি, আলুনি কিংবা বকফুল-কুমড়োফুলের বড়া ভাজা পেলে অনিন্দ্যর আর কিচ্ছু চাই না।

সেদিনও খেতে বসে একটা বেগুনি শেষ করে যখন আর একটা নিতে যাচ্ছে অনিন্দ্য, তখন সোহিনী বাধা দিল। ঠান্ডা গলায় বলল, “তুমি যে প্রমিস করেছিলে, ভাজাভুজি আর ছোঁবে না!”

অনিন্দ্য জিভ কেটে বেগুনিটা নামিয়ে রাখল দেখে মনীষার একটু খারাপ লাগল, বললেন, “থাক না বৌমা, মুখের জিনিসটা খেয়ে নিক।”

শাশুড়ির কথায় সোহিনীর কোনও ভাবান্তর ঘটল না। সে কঠিন চোখের ইশারায় অনিন্দ্যকে বারণ করল। অনিন্দ্য সামান্য অধৈর্য গলায় মায়ের উদ্দেশে বলল, “তুমি এ ভাবে বললে আমি নিজেকে কন্ট্রোল করব কী ভাবে? এ সব ভাজাভুজি আমাকে আর দিয়ো না।”

ঘটনাটা আপাত ভাবে তেমন কিছু নয়, তবু সেই ঘটনার জেরেই বৃহৎ এক ভাবান্তর এল মনীষার মনে। তিনি রান্নাঘরে গিয়ে চোখের জল মুছলেন। তাঁর মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হল যে, অনিন্দ্য তার জীবনের যে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে, সেখানে মায়ের গুরুত্ব সামান্যই।

*****

অনিন্দ্যর সঙ্গে সোহিনীর আলাপ কলেজে। ওদের প্রেমপর্ব শুরু হওয়ার পর অনিন্দ্য এক দিন সোহিনীর সঙ্গে মনীষার আলাপ করিয়েছিল। সোহিনী ভাল গান গায়। স্বভাবটাও ভারী মিষ্টি। দেখার পর সোহিনীকে তাই ভাল লেগেছিল মনীষার। সোমনাথবাবু চলে যাওয়ার পর মনীষাই বিয়ের জন্য ছেলেকে জোরাজুরি করেন, “তোর বাবা যে আমাকে এক্কেবারে একলা করে দিয়ে চলে গেল। সোহিনীকে তাড়াতাড়ি নিয়ে আয়। আমরা দু’টিতে মিলে কত সুখ-দুঃখের গল্প করব।”

কিন্তু সোহিনী এলেও সে সব আর করা হয়নি মনীষার। কত সুখ-দুঃখের বৃত্তান্ত ধামাচাপা পড়ে গিয়েছে তাঁর পাহাড়প্রমাণ অভিমান আর উদ্বেগের নীচে। এখন মনীষা প্রতি মুহূর্তে দাঁড়িপাল্লার দু’দিকে অবিবাহিত অনিন্দ্য আর বিবাহিত অনিন্দ্যকে বসিয়ে ওজন করে দেখেন যে, কার কাছে মায়ের গুরুত্ব বেশি।

নিত্যদিনের নানা ঘটনায় এই সংসার ও ছেলের জীবনে নিজের অপ্রয়োজনীয়তার কথা বার বার চোখে পড়তে লাগল মনীষার। অনিন্দ্যকে যে রঙের শার্টে কখনওই ভাল লাগত না মনীষার, সোহিনীর পছন্দ অনুযায়ী সেই রঙের শার্টগুলো পরেই অফিস যায় অনিন্দ্য। সোহিনীকে অনিন্দ্যর টিফিন গুছিয়ে দিতে দেখে কেন যে কষ্ট পান মনীষা, তা নিজেও বুঝতে পারেন না। ইদানীং ঘরে পাতা দইয়ের বদলে সোহিনীর কিনে আনা লো-ফ্যাট দই ভাল লাগছে অনিন্দ্যর। এ ভাবে প্রতিনিয়ত অনিন্দ্যর জীবনে সোহিনীর ছায়া দীর্ঘ হচ্ছে দেখে মনীষার মনে ব্রাত্য হয়ে পড়ার ভীতিটা আরও জেঁকে বসে।

এ সংসারে সকলের জন্য রান্নাবান্না এখনও মনীষাই করেন। সোহিনী দু’-এক বার রান্নাঘরে টুকিটাকি এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়েছিল, কিন্তু বরাবর রান্নাটা নিজে করতেই পছন্দ করেন মনীষা। এক দিন সোহিনী অনিন্দ্যকে বলেছিল, “মামণির বয়স হয়েছে, আর কত দিন হাত পুড়িয়ে রান্না করবে। আমাকেও তো কিছু করতে দেবে না। আচ্ছা, তোমাদের এখানে ভাল রান্নার দিদি পাওয়া যাবে না?”

প্রস্তাবটা মনে ধরায় অনিন্দ্য অবিলম্বে একটা ভাল রাঁধুনির বন্দোবস্ত করেছিল। সেদিন রাতে সে কথাই মনীষাকে বলতে গেল অনিন্দ্য, “মা, নেক্সট উইক থেকে তোমার কষ্ট করে রান্না করার বিশ্রাম। আমি একটা ভাল রান্নার দিদি খুঁজে পেয়েছি।”

মায়ের হাসিমুখ দেখার আশায় ছিল অনিন্দ্য; কিন্তু ঘটল তার বিপরীত। মনীষা যে খানিক পিটপিটে স্বভাবের, যাকে-তাকে রান্নাঘরে ঢুকতে দেওয়ায় যে তাঁর বরাবর আপত্তি কিংবা অচেনা কারও হাতের রান্না খেতে যে তিনি অপছন্দ করেন, সে কথা মোটেই খেয়াল ছিল না অনিন্দ্যর। সুতরাং মায়ের সঙ্গে পরামর্শ না করেই অনিন্দ্য রাঁধুনি ঠিক করেছে ভেবে মনীষা মেজাজ হারালেন। তাঁর অনেক দিনের জমে থাকা ক্ষোভ-অভিমান এই অবসরে তীব্র বাক্যস্রোত হয়ে বেরিয়ে এল। বললেন, “চাকরি পাওয়ার পর থেকে এত দিন তো মায়ের কষ্টের কথা মনে হয়নি। এখন বিয়ের পরে কী হল তোর? মায়ের জন্য দরদ একেবারে উথলে উঠল যে!”

এই আকস্মিক প্রতিক্রিয়ার জন্য তৈরি ছিল না অনিন্দ্য। সে তো একেবারে হাঁ। বলল, “তার মানে?”

“তোর বৌকে কি হেঁশেল ঠেলতে হয়েছে আজ পর্যন্ত? তা হলে আদিখ্যেতা করে আবার রান্নার লোক রাখার কী দরকার?”

“তুমি যাকে ঠেস দিয়ে কথাগুলো বললে মা, সেই সোহিনীই কিন্তু তোমার কষ্ট লাঘব করার জন্য প্রস্তাবটা দিয়েছিল।”

“সে তো অপরাধবোধ থেকে বলেছে। একটা জোয়ান মেয়ে থাকতে এই বুড়ি মানুষ একা খেটে মরছে, এটা যাতে চোখের সামনে তাকে দেখতে না হয়, সেই জন্য।”

এ বার সোহিনীও আর চুপ থাকতে পারে না। সে বলল, “এ সব কী বলছ মামণি? তুমি তো কখনও আমাকে কিচেনে ঢুকতেই দাওনি। হেল্প করতে গেলেও উল্টে গজগজ করেছ, আমি নাকি রান্নায় তেল বেশি দিই, মশলাপাতি অপচয় করি, গ্যাসের শ্রাদ্ধ করি! আর তুমিই এখন উল্টো সুর গাইছ!”

নিজেকে কেমন যেন কোণঠাসা মনে হয় মনীষার, বলেন, “তোরা কর্তা-গিন্নি মিলে যুক্তি করে আমাকে কথা শোনাতে এসেছিস! এত গলগ্রহ হয়ে গেছি তোদের?”

অনিন্দ্য উত্তেজিত গলায় বলল, “কী কথার কী মানে করছ তুমি?”

বাগ্‌বিতণ্ডা আরও চরমে ওঠে। মা, ছেলে দু’জনেই দু’জনের রুদ্রমূর্তি দেখে একেবারে তাজ্জব বনে যায়। সেই থেকে দু’জনের মধ্যে কথাবার্তা প্রায় বন্ধ। মা, ছেলের ঘর পাশাপাশি। এখন পাশের ঘরের দেওয়াল দেখলে মনীষার মনে হয় যেন কাঁটাতার, দেশটাকে দু’ভাগ করেছে। তখনই সেই ভাঙনের যন্ত্রণা আরও তীব্র হয়ে ওঠে তাঁর বুকের ভিতর।

*****

ডিসেম্বরের ১৩ তারিখ। এক বছরের বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে অনিন্দ্য অফিস থেকে ছুটি নিয়ে সকাল-সকাল সোহিনীর সঙ্গে কালীঘাটে গিয়েছে পুজো দিতে। সেখান থেকে ওরা যাবে সোহিনীর বাবা-মাকে প্রণাম করতে। সোহিনীর বাড়িতে লাঞ্চ করে বিকেলে একটা সিনেমা দেখে বাড়ি ফিরবে। ডিনারও বাইরে সেরে নেবে কোথাও। মনীষা এ সব জানতে পেরেছেন বাড়ির কাজের মেয়েটির কাছ থেকে।

দু’দিন হল মনীষার ধুম জ্বর। সকালে যখন অনিন্দ্যরা বেরোচ্ছে, তখন মনীষা অঘোরে ঘুমোচ্ছেন। কাজ সেরে চলে যাওয়ার আগে কাজের মেয়েটি বলে গেল, “বেরোনোর আগে বৌদি তোমায় ডাকতে এসেছিল। তোমার ছেলে তাকে বলল যে, মায়ের শরীর ভাল নয়, ডেকো না। যত ক্ষণ পারে, ঘুমোক। তার পর কোথায় যাচ্ছে, কী বৃত্তান্ত সব আমায় বলে গেল।”

মনীষা ভাবলেন, ভালই হয়েছে, এমন শুভদিনে মায়ের মুখ না দেখাই ভাল। কাজের মেয়েটি চলে গেলে ফ্ল্যাট খাঁ-খাঁ করতে লাগল। মনীষার জ্বর ছেড়ে গিয়েছে। তবে শরীর এখনও দুর্বল। মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে। হৃদয় ভারী নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণায়। শুধু ভাবছেন, বাপের বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি, ছেলে-ছেলের বৌয়ের সংসার; এ সবের মধ্যে কোনখানটি তাঁর নিজের?

মনীষা কী খাবেন, সেই চিন্তা না করে বেরিয়ে গিয়েছে ওরা। অভিমানে মনীষা ঠিক করলেন আজ উপোস করে থাকবেন। ইদানীং তাঁর মনে হয়, সোমনাথবাবু তাঁর জন্য যে টাকা রেখে গিয়েছেন, সেটুকু সম্বল করেই কোনও বৃদ্ধাশ্রমে চলে যাবেন। কারণ যে সংসারকে তিনি প্রাণ দিয়ে তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন, আজ তার চৌহদ্দি থেকেই ক্রমশ তিনি মুছে যেতে বসেছেন। এ যন্ত্রণা তাঁর কাছে অসহনীয়।

হঠাৎ ফ্ল্যাটের ডোরবেল বাজল। দরজা খুলে মনীষা দেখলেন, পিসতুতো বোন শিপ্রা এসেছেন। বাড়ির কাছাকাছিই থাকেন। তবুও বহু দিন দু’জনের দেখাসাক্ষাৎ নেই। শিপ্রা তাঁর জন্য ভাত আর মাছের ঝোল রান্না করে টিফিন কেরিয়ারে ভরে এনেছেন। অনিন্দ্যই সকালে তাঁকে ফোন করে বলেছে মায়ের জন্য কিছু একটু রান্না করে আনতে। শুনেই মনীষা রেগে আগুন, “শুধু শুধু তোর ঝঞ্ঝাট বাড়াতে গেল কেন!”

শিপ্রা বলেন, “ও কী কথা দিদি! তুমি কি আমার পর?”

“আপন ভাবলে দিদি বেঁচে আছে কি না, মাঝে মাঝে সে খবর অন্তত এক বার নিয়ে যেতিস!”

শিপ্রা বোঝান, “রাগ কোরো না দিদি! জানোই তো, বাড়িতে আমার কতগুলো অবলা প্রাণী রয়েছে। ওদের নিয়ে সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকতে হয়। আমি বেশিক্ষণ বাড়ির বাইরে থাকলে, কে আর ওদের সময়ে সময়ে খেতে দেবে বলো?”

“রাস্তার কুকুর-বেড়ালগুলোকে এখনও পুষে রেখেছিস বাড়িতে? ওদের লোম-টোম পেটে যাওয়া কিন্তু ভাল নয়! ঘরদোরও নোংরা করে!”

“আমার ওসবের ভয় নেই। মানুষের শরীর থেকে কি রোগ ছড়ায় না? তা বলে রোগীকে রাস্তায় বার করে দেয় কেউ!”

“তুই পারিসও বটে!”

“জানোই তো, স্বামী চলে যাওয়ার পর একেবারে একলা হয়ে পড়েছিলাম। ভগবান ছেলেমেয়েও দিলেন না। কিন্তু ওরা এসে আমার সব দুঃখ, একাকিত্ব একেবারে দূর করে দিল। ওরাই আমার সব। ওদের ছেড়ে আমি এক দণ্ডও থাকতে পারি না। তুমিও একটা পুষে দেখো না। ওদের ভালবাসায় বাঁধা পড়ে যাবে।”

“আর আমি কারও ভালবাসায় বাঁধা পড়তে চাই না রে! আমার এ জন্মের মতো যথেষ্ট শিক্ষা হয়ে গেছে। নিজের সন্তানই ভালবাসার প্রতিদান দিতে জানে না, আর কুকুর-বেড়ালের ভালবাসা! যাকে গর্ভে ধরেছি, কষ্ট করে বড় করেছি, এখন তার কাছে মা দু’চক্ষের বিষ!” শিপ্রার কাছে মনীষা যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে থাকেন।

সব শুনে শিপ্রা বলেন, “দিদি, সব দানেরই যদি প্রতিদান আশা করো, তবে সেটাকে আর ভালবাসা বলছ কেন? আমি যে কুকুর-বেড়ালগুলোকে যত্ন করি, তার বদলে ওদের থেকে আমি কী আশা করব?”

কান্না ধরা গলায় মনীষা বলেন, “এ সব কী বলছিস! পোষা কুকুর-বেড়াল আর নিজের সন্তান কি এক হল! ইচ্ছে হয় সব ছেড়েছুড়ে চলেযাই কোথাও!”

মনীষার হাতের উপর হাত রাখেন শিপ্রা, “কেন যাবে দিদি? এখানে কেউ কি তোমার পর?”

শিপ্রার হাতখানি সরিয়ে দেন মনীষা, “সে তুই বুঝবি না।”

*****

শিপ্রা চলে গেছেন অনেক ক্ষণ। মনীষা আলমারি খুলে সেলাইয়ের বাক্স বার করছিলেন। হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল, নীচের একটা তাকে অনেক শাড়ির ভিড় থেকে উঁকি দিচ্ছে একটা পুরনো লাল শাড়ি। সঙ্গে সঙ্গে বহুকাল আগের এক দুঃখের স্মৃতি এসে মনীষাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।

বিয়ের পর মনীষার প্রথম জন্মদিনে সোমনাথবাবু মনীষাকে শাড়িটা উপহার দিয়েছিলেন আর বলেছিলেন, “এটা পরে আজ সন্ধ্যায় আমার সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাবে।”

আনন্দের আতিশয্যে চটপট তৈরি হয়ে নিলেন মনীষা। কিন্তু বিধি বাম! তাঁদের বেরোনোর মুহূর্তে সোমনাথবাবুর পিসতুতো বোন, তার স্বামী তাদের তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে আগাম খবর না দিয়ে হঠাৎ বাড়িতে এসে হাজির। সোমনাথবাবুর বিধবা মা মনীষাকে বললেন, “বৌমা, শিগগির কাপড়টা বদলে চা, ওদের জলখাবারের ব্যবস্থা করো।”

মনীষার শুকনো মুখখানি দেখে সোমনাথবাবু বলেছিলেন, “মা, আজ ওদের চা, জলখাবারটা তুমিই একটু ম্যানেজ করে দাও না?”

শুনে বৃদ্ধা গম্ভীর মুখে বললেন, “ভরসন্ধেয় অতিথিকে বসিয়ে রেখে তোরা সিনেমায় যাবি, আর এই বুড়ি মানুষটা অতগুলো লোকের জন্য চা-জলখাবার তৈরি করবে?”

সমাধান দেওয়ার একটা চেষ্টা করেছিলেন সোমনাথ, বলেছিলেন, “তা হলে চট করে বাইরে থেকে কিছু খাবার কিনে আনি?”

“থাক! দরকার নেই। ওরা আজ কিছু না খেয়েই যাবে।”

সোমনাথবাবুর অসহায় অবস্থা লক্ষ করে মনীষা চোখের জল মুছে বিনা বাক্যব্যয়ে হেঁশেলে গিয়ে ঢুকলেন। তার পর থেকে মনীষা ওই শাড়ি আর কখনও গায়ে তোলেননি। পুরনো কান্নাটা যেন এখনও মনীষার গলার কাছে দলা পাকাচ্ছে। হঠাৎ মনীষার মনে হল, সেদিনের লাল শাড়ি পরা সদ্যবিবাহিতা বধূটির মুখে সোহিনীর মুখ ভেসে উঠছে। মানুষ দু’টি আলাদা হলেও কষ্টটা এক।

চমকে উঠলেন মনীষা। তাঁর মাথা ঝিমঝিম করছে। জলের বোতল নেবেন বলে খাটের পাশে রাখা টেবিলটার কাছে গিয়েছেন, সহসা থমকে গেলেন কয়েক মুহূর্ত। কিছু দিন আগে তাঁর চশমার একটা ডাঁটি ভেঙে গিয়েছিল, সে কথা মনীষা কাউকে জানাননি। কিন্তু এখন দেখেন যে, তাঁর অগোচরে সেই চশমা কেউ মেরামত করিয়ে রেখে গিয়েছে টেবিলে। এমনকি তিনি কাউকে না বললেও তাঁর প্রেশারের ওষুধ শেষ হওয়ার আগেই নতুন ওষুধের পাতা, তালমিছরির নতুন শিশি, হাঁটুতে মালিশ করার তেল, সবই এনে রাখা আছে টেবিলে, যেমনটা আগেও থাকত, বদলায়নি কিছুই।

এ ছাড়া আরও কিছু জিনিস রাখা আছে টেবিলে— একটি চকলেট, একটি নতুন শাল আর একটি বার্থডে কার্ড। কার্ডের ভিতর আলাদা দু’টি হস্তাক্ষরে দু’টি লাইন লেখা—‘হ্যাপি বার্থডে মামণি’ এবং ‘এই বিশেষ দিনে তোমার জন্য আমাদের তরফ থেকে। শুভ জন্মদিন মা।’

মনীষার এ বার খেয়াল হয়, আজ তো তাঁর জন্মদিনও বটে! আনন্দের অশ্রুবারিপতনে প্রবল ধস নেমেছে তাঁর অভিমানের পাহাড়ে। হাতের লেখা দুটোয় চুমু দিলেন মনীষা। হঠাৎ শুনতে পেলেন, কাছেপিঠে ছেনি-হাতুড়ির দমাদ্দম শব্দ হচ্ছে। বারান্দায় এসে দেখলেন, রাস্তার ওপারে দু’টি বাড়ির মাঝখানে থাকা পুরনো উঁচু পাঁচিলটা ভেঙে ফেলছে কেউ। পাঁচিল ভাঙার শব্দটা যেন জুড়িয়ে দিচ্ছে মনীষার প্রাণ।


আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন