গ্রামের নাম গহমর। কিন্তু উত্তরপ্রদেশের এই গ্রামটিকে লোকজন বলেন— সেনা-গ্রাম! যে গ্রামে গঙ্গার উপর দিয়ে সূর্য উঠতেই না উঠতেই সকালের নীরবতা ভেঙে দেয় ধুলোমাখা রাস্তায় বুটের আওয়াজ।
দেশের বেশির ভাগ গ্রামীণ এলাকায় ভোরবেলা থেকে কাজ শুরু করেন কৃষকেরা। নির্দিষ্ট সরঞ্জাম নিয়ে জমিতে যান তাঁরা। কিন্তু ‘সৈনিকদের গ্রাম’ গহমরে সকাল শুরু হয় তরুণদের দৌড়োনোর শব্দে।
সেই তরুণদের দৌড়োনোর দম যেমন বেশি, তেমনই স্থির তাঁদের লক্ষ্য। যে লক্ষ্য তাঁদের ঠিক করে দিয়েছেন বাবা-মা, ঠাকুরদা-ঠাকুরমারা।
গহমরে প্রবীণেরাও বাড়ির বাইরে বসে চা খেতে খেতে পরবর্তী প্রজন্মের দৌড়োনোর দৃশ্য দেখেন। কারণ, তাঁদের বাড়ির দেওয়ালেও জলপাই সবুজ, নেভি ব্লু এবং বিমানবাহিনীর নীল পোশাক পরা কোনও না কোনও পুরুষের ছবি রয়েছে।
গাজিপুর সংসদীয় আসনের জামানিয়া বিধানসভা এলাকার অধীন গহমর গ্রামটি ১৫৩০ সালে তৈরি করেছিলেন রাজা ধামদেব রাও। গ্রামটির বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় দেড় লক্ষ। গাজিপুর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে থাকা গ্রামটিকে জনসংখ্যার নিরিখে এশিয়ার বৃহত্তম গ্রাম বলেও গণ্য করা হয়।
মনে করা হয়, উত্তরপ্রদেশের গাজিপুর জেলার এই শান্ত গ্রামটিতে ৫,০০০-এরও বেশি পুরুষ ভারতীয় সেনা, আধাসামরিক বাহিনী, বায়ু বা নৌসেনাতে হয় একসময় কাজ করেছেন বা কর্মরত রয়েছেন, যা ভারতের যে কোনও একটি গ্রামের হিসাবে সর্বাধিক।
এমনকি, গহমরের প্রতিটি পরিবারেই কমপক্ষে এমন এক জন রয়েছেন, যিনি হয় ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত অথবা অবসরপ্রাপ্ত। যেন গহমরের মায়েরা তাঁদের সন্তানদের সেনা জওয়ান হিসাবে গড়ে তোলার শপথ নিয়েছেন।
গহমর গ্রামটি ২২টি ছোট ছোট এলাকায় বিভক্ত। প্রতিটি এলাকা এক জন করে সৈনিকের নামে নামকরণ করা হয়েছে।
গহমর গ্রামে ৫০ জনেরও বেশি প্রাক্তন সেনা রয়েছেন, যাঁরা ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধ পর্যন্ত ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষের সময় সীমান্ত পাহারা দেওয়ার এবং শত্রুদের প্রতিহত করার দায়িত্ব সামলেছেন।
গহমরের বাসিন্দাদের জন্য ভারতীয় সেনায় যোগদান কোনও পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়, এটি তাঁদের ঐতিহ্য এবং উত্তরাধিকার। প্রচলিত রয়েছে, গহমর গ্রামে শিশুপুত্রেরা নাকি খেলনা হিসাবে প্রথমে কাঠের রাইফেল হাতে তুলে নেয়। ছোট থেকেই নাকি দেশসেবার পাঠ পড়ানো হয় তাদের। গহমরের অনেক পরিবারের কাছে সন্তানের ভারতীয় সেনায় যোগদান এক অভাবনীয় গর্বের বিষয়। সম্মান এবং শান্তির জায়গাও বটে।
গহমরের বাসিন্দা ৫৬ বছর বয়সি দীনেশ সিংহের পুত্রও সেনায় কাজ করেন। সংবাদমাধ্যমে তিনি বলেছেন, “আমার ছেলে নীরজ বর্তমানে জম্মু ও কাশ্মীরের উরি সীমান্তে কর্মরত। ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীন ও আমায় ফোন করে বলে যে সীমান্তসংঘাত তীব্র হয়ে উঠেছে। গোলাগুলি চলছে। আগামী তিন-চার দিন ওকে ফোনে পাওয়া যাবে না বলেও জানিয়েছিল। ঠিক তিন দিন পর আবার ফোন আসে। নীরজ জানায়, পরিস্থিতি খানিকটা শান্ত। আমাদের স্বস্তি ফেরে।’’
পুত্রের সেনাবাহিনীতে থাকার জন্য গর্বিত পিতা দীনেশের দাবি, বর্তমানে গ্রামের ৯০টি পরিবারের ২০০ জনেরও বেশি সন্তান ভারতীয় সেনা হিসাবে জম্মু এবং কাশ্মীরে নিযুক্ত রয়েছেন।
সেনায় যোগ দিয়ে দেশের জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে, এমন যোদ্ধাদের নাম লেখা একটি বিশাল স্মৃতিস্তম্ভও রয়েছে গহমরে। বীরত্বের গাথা সেই স্তম্ভ গ্রামের গর্ব।
১৯৭১ সালের যুদ্ধে লড়েছিলেন বলে জানান গ্রামের বাসিন্দা বংশীধর সিংহ। ৯০ বছর বয়সি বৃদ্ধের দাবি, ‘‘সরকার যদি অনুমতি দেয়, আমি এখনও সীমান্তে গিয়ে লড়াই করতে পারি।”
১৯৭৭ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ভারতীয় সেনায় কর্মরত প্রাক্তন সুবেদার মেজর বীর বাহাদুর সিংহ আবার বলেছেন, “আমরা যদি তখন পাক অধিকৃত কাশ্মীর পুনরুদ্ধারের জন্য অগ্রসর হতাম, তা হলে সীমান্ত সন্ত্রাসবাদের অবসান ঘটতে পারত। আজকের সেনাবাহিনী আরও শক্তিশালী। উন্নত অস্ত্র এবং প্রযুক্তি রয়েছে ওদের সঙ্গে। আমাদের জওয়ানদের দৃঢ় ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।”
সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, গহমর এখনও পর্যন্ত ৪২ জন লেফটেন্যান্ট, ২৩ জন ব্রিগেডিয়ার উপহার দিয়েছে। বর্তমানে নাকি ৪৫ জন কর্নেল বাহিনীতে কর্মরত রয়েছেন যাঁরা গহমরের বাসিন্দা।
গহমর গ্রামে একটি প্রাক্তন সেনা পরিষেবা কমিটির অফিসও রয়েছে, যা তরুণ সমাজকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগের পরীক্ষায় পাশ করার জন্য প্রশিক্ষণ দেয় এবং অনুপ্রেরণা জোগায়। অবসরপ্রাপ্ত সেনারা সামরিক স্কুলের প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্য শিশুদের প্রশিক্ষণ দিতে ‘রাফাল অ্যাকাডেমি’ও চালু করেছেন গহমরে।
গহমর গ্রামে ‘মাথিয়া’ নামে একটি সেনা প্রশিক্ষণক্ষেত্র রয়েছে। প্রাক্তন সেনা জওয়ান এবং আধিকারিকদের তৈরি সেই ক্ষেত্রটিতে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণের সমস্ত ব্যবস্থা রয়েছে। দৌড়োনোর পর সেখানেই নিয়মিত প্রশিক্ষণ নেয় সেনায় যোগ দিতে চাওয়া তরুণ সমাজ।
দেশের সেনা-গ্রাম হওয়ার সুবাদে অনেক উন্নতিও হয়েছে গহমরের। গ্রাম বলতে যে ছবি সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে, গহমর ঠিক তেমনটা নয়। কলেজ, স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র এবং নিজস্ব রেলওয়ে স্টেশন থাকা গ্রামটি একটি ছোটখাটো শহরে পরিণত হয়েছে। প্রতি দিন বিহার, বাংলা এবং উত্তরপ্রদেশ থেকে বহু ট্রেন থামে সেই গ্রামে।