ছবি: রৌদ্র মিত্র।
ফাল্গুন মাসের প্রথম দিক। আজ মোট তিনটে বিয়ের নেমন্তন্ন পেলেন শ্যামলবাবু। বিকেল পাঁচটায় এসেছিলেন আশুতোষ মুখার্জি। তাঁর ছেলে নক্ষত্রের বিয়ে।
তার পর সাড়ে পাঁচটায় ডোরবেল বাজালেন মধুসূদন তপাদার। তাঁর মেয়ে সুরঙ্গনা বেশ কয়েক বারের চেষ্টায় উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছে এই বছর। আর অপেক্ষা করা সমীচীন মনে করেননি মধুবাবু।
আর সন্ধে ছ’টার সময়ে এলেন জিতেন সরকার। তাঁর মেয়ে বুল্টির বিয়ে পরের সপ্তাহে। বাবার সঙ্গে এসেছিল বুল্টিও, আর তার বান্ধবী দত্তা। খুব হাসিখুশি মেয়েটি। আগের বছর জিতেনবাবুর একটা মাইল্ড হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। তাই বাবাকে একা ছাড়বে না বুল্টি।
ওদের সঙ্গে কথা বলতে-বলতেই বেজে গেল প্রায় পৌনে সাতটা।
সন্ধে সাতটার সময় বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়েন শ্যামলবাবু। একা থাকেন, ফলে রান্নাবান্নার ঝামেলা আছে। যদিও তিনি মূলত নিরামিষাশী। তেমন তরিবতের কিছু করা হয়ে ওঠে না বাড়িতে। তবে আজ একটা নতুন আইটেম ট্রাই করছিলেন। একটু অভিনব। কাঁচকলার বিরিয়ানি।
আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। যদি আলু বিরিয়ানি হয়, আন্ডা বিরিয়ানি হয়, চিকেন বা মাটন বিরিয়ানিও হতে পারে, তবে কাঁচকলার বিরিয়ানিই বা হবে না কেন! আজকাল এ দিকটায় প্লটিং হচ্ছে খুব। মানে ফাঁকা জমিতে ছোট-ছোট প্লট করে বিক্রি, আর সে জমিতে বাড়ি তৈরি। বাইরে থেকে প্রচুর মানুষ এ দিকে বসতি তৈরি করছেন। এঁদের বেশিরভাগই পূর্ববঙ্গীয়। আর কে না জানে, তাঁদের বিরিয়ানির প্রতি একটা আলাদা আকর্ষণ থাকে! সে কারণেই এলাকায় নতুন দু’-দুটো বিরিয়ানির দোকান গজিয়ে উঠেছে। বিকেলবেলায় বাজারের পাশটা দিয়ে আসার সময় সে-সবের গন্ধ পান শ্যামল। উগ্র গন্ধ। তাঁর তেমন মন-লোভনিয়া লাগে না। তাঁর নিরামিষই ভাল। তবে একটু অন্য ভাবে চেষ্টা করতে ক্ষতি কী!
এ-সব ভেবেই সুগন্ধি চাল ভিজিয়েছেন বাটিতে। তার পর লম্বা-লম্বা করে দুটো পুরুষ্টু কাঁচকলার ফালি করছিলেন মেঝেতে বসে, তক্ষুনি ডোরবেলটা বেজে উঠল।
সাতটার পরে লোকজন তেমন আসে না তাঁর বাড়িতে। তাই একটু অবাক হলেন শ্যামলবাবু। উঠে দরজাটা খুলে দেখলেন, ঋত্বিক দাঁড়িয়ে আছে।
ঋত্বিক দাশগুপ্ত স্থানীয় লালগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের অঙ্কের শিক্ষক। বয়স বছর সাতাশ। এখানকারই ছেলে। লালগঞ্জের সবেধন নীলমণি ব্যাঙ্কটার সামনেই তাদের বাড়ি। বিয়েহয়নি এখনও।
মাঝেমধ্যে শ্যামলবাবুর সঙ্গে দেখা হয় তার। কথাবার্তাও হয়, তবে তেমন বেশি নয়। ঋত্বিক একটু অন্তর্মুখী। কবিতা লেখে বলে শুনেছেন শ্যামল। তিনিও বিশেষ কথা বলেন না কারও সঙ্গে। তবে মৃদু হাসি বিনিময় হয় উভয় পক্ষেই।
এই অসময়ে ঋত্বিকের আগমনে বিরক্ত হলেও সেটা প্রকাশ করলেন না শ্যামল। মুখে একটা হাসি ঝুলিয়ে বললেন, “এসো!”
একটু অগোছালো লাগছিল ঋত্বিককে। এমনিতে ছেলেটি সুপুরুষ। বেশ লম্বা, ফর্সা, এক মাথা চুল। কিন্তু আজ যেন একটু অবসন্ন। ধপ করে বাইরের ঘরের বেতের চেয়ারটিতে বসে পড়ল সে।
“কোনও অসুবিধে হয়েছে, ঋত্বিক?” স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করলেন তিনি। কারণ ছাড়া তাঁরকাছে কেউ আসবেই বা কেন! অবশ্য তিনি কার কোন উপকারটাই বা করতে পারবেন!
দু’বার মাথার চুলে হাত চালাল ঋত্বিক। একটা বেমানান হাসি মুখে ফুটিয়ে বলল, “না, না! এমনিই এলাম। বিরক্ত হলেন না তো?”
“দূর! কী যে বলো! বিরক্ত হওয়ার কী আছে। একটু চা খাবে নাকি?” শ্যামল বললেন।
“চা? আপনার অসুবিধে হবে। অসময়ে চলে এলাম।”
“কিচ্ছু অসুবিধে হবে না। আমি নিজেই ভাবছিলাম, একটু খাব।”
দুধ শেষ হয়ে গেছে। মনেই থাকে না কখন কোন জিনিসটা আনতে হবে! তবে এক বন্ধু ক’দিন আগে দার্জিলিং থেকে চা-পাতা এনে দিয়েছিল, সেটাই ব্যবহার করলেন শ্যামল। চমৎকার গন্ধ উঠছিল। আর স্থানীয় বেকারির বিস্কুট আছে।
আরও মিনিট পনেরো পরে, ঋত্বিকের মুখোমুখি একটা মোড়ায় বসে চায়ে চুমুক দিয়ে তিনি বললেন, “বলো ঋত্বিক, কী বলতে এসেছ!”
ঋত্বিক হাসল না। ভুরুটা কুঁচকে রেখেই হাতের কাপটা পাশের টেবিলে নামিয়ে বলল, “কী আর বলি! দরকারেই এসেছি একটা, সে তো বুঝতেই পেরেছেন। তবে কী ভাবে বলব সেটা ভেবে পাচ্ছি না।”
শ্যামল অপেক্ষা করলেন একটু। ঋত্বিকও বেশিক্ষণ সময় নিল না। ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “একটা রহস্যের সমাধান করে দিতে হবে শ্যামলদা!”
“রহস্য!” ভুরু কোঁচকালেন শ্যামল। তার পর অল্প হেসে বললেন, “রহস্য সমাধান তো পুলিশের কাজ! তাই না?”
“সঞ্জয়দার কাছে আপনার গল্প শুনেছি খুব। তা ছাড়া এ রহস্য ঠিক পুলিশের কাছে যাওয়ার মতো নয়।” ম্লানমুখে মাথা নাড়ল ঋত্বিক, “সে কারণেই আপনার কাছে আসা।”
সঞ্জয় মানে, সঞ্জয় বসু। শ্যামলের বন্ধু লোক। সে আবার তাঁর সম্পর্কে খুব উঁচু ধারণা পোষণ করে। বুঝে গেলেন শ্যামল। মাথা নেড়ে বললেন, “বুঝেছি। বলো, কী করতে পারি।”
“কাল দুপুরে আমার কাছে একটা কুরিয়ার এসেছে। তখন আমিস্কুলে, মা-ই রিসিভ করেছিলেন,” বলল ঋত্বিক, “পরে বাড়িতে এসে দেখলাম জিনিসটা।”
“সেটা নিয়েই রহস্য নাকি? কী ছিল বাক্সর ভিতরে?” জিজ্ঞেস করলেন শ্যামল।
“একটা কাঠের বাক্স। ছোট্ট। যেমনটা হস্তশিল্প মেলা-টেলায় পাওয়া যায়। বাইরে তালা দেওয়া। ছোট্ট চাবিটা অবশ্য সেটার সঙ্গেই সুতো দিয়ে বাঁধা। প্রথমে একটু ভয় পাচ্ছিলাম। বোমা-টোমা নয় তো! তার পর মনে হল, আমাকে কে-ই বা বোমা পাঠাতে যাবে! তাও বাড়ির বাইরে নিয়ে গিয়ে সাবধানে খুললাম। গুচ্ছের হাবিজাবি জিনিস ভরা।”
“কী রকম হাবিজাবি জিনিস?”
“পাতা সমেত একটা নিমের ডাল, ছোট্ট একটা টেবিল টেনিস খেলার বল, একটা বই— ‘সহজ পাঠ’,” একটু ইতস্তত করল ঋত্বিক।
“আর কিছু?”
“আর… না তেমন কিছু নয়। হ্যাঁ! একটা কাঠের টুকরো ছিল।”
“নিমের ডাল। বলেছ।”
“না, না! ওটা নয়। আর একটা চ্যাপ্টা, চৌকো মতো দেখতে কাঠের তক্তার টুকরো।”
একটু ভাবলেন শ্যামল। বললেন, “কে পাঠিয়েছে, কেন পাঠিয়েছে, সেটাই ভাবছ। তাই তো?”
“হুঁ!” ম্লান হাসল ঋত্বিক। তার পরেই চোখ বড় করে বলল, “আর একটা জিনিস। আশ্চর্য! বলাই হয়নি। একটা ছোট্ট চিরকুট। তাতে লেখা, ‘আজও বুঝলে না?’ ব্যস, এটুকুই!”
শ্যামল লক্ষ করলেন, ঋত্বিকের ফর্সা গাল দুটো লাল হয়ে গেছে। বেচারি লজ্জা পাচ্ছে নিশ্চয়ই। একটু হাসলেন তিনি। বললেন, “লেখাটা কি টাইপ করা কাগজের অংশ?”
“এগজ্যাক্টলি! এই যে, সেটা আমি নিয়ে এসেছি।”
ওর বাড়িয়ে দেওয়া কাগজের টুকরোটা নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করে দেখলেন শ্যামল। তার পর ভুরু তুলে বললেন, “সত্যি করে বলো তো ঋত্বিক, এ বারই প্রথম, নাকি আগেও এমন অদ্ভুত জিনিস পেয়েছ?”
বেশি সময় নিল না ঋত্বিক। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই বলল, “আমি ব্যাপারটা নিয়ে ভেবেছি। একটা ঘটনার কথাই মনে পড়ছে। আপনি আবার মনে-মনে হাসছেন না তো?”
“একদম না। বলে ফেলো।”
চোখ বন্ধ করল ঋত্বিক। যেন ব্যাপারটা এক বার ঝালিয়ে নিচ্ছে। তার পর চোখ খুলে ধীরে ধীরে বলল, “তখন আমার বয়স বোধহয় পনেরো-ষোলো। খুব ক্রিকেটের নেশা ছিল, বুঝলেন! পাড়ার মাঠে ক্রিকেট খেলছি, সামান্য কারণে বাবনের সঙ্গে ঝগড়া হয়ে গেল। বাবন মানে ওই…”
“বুঝেছি। সেনগুপ্ত বাড়ির ছেলে। সাগ্নিক। তোমারই বয়সি তো।”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ! ও-ই। ব্যাটটা ওরই ছিল। তা সে বলল, আমাকে আর খেলতে নেবে না। ওই বয়সে যা হয় আর কী!”
“তার পর?”
“আমি তো রেগেমেগে মাঠ থেকে বেরিয়ে এলাম। ভেবেছিলাম, নিজের ব্যাট না হলে আর কোনও দিন খেলতেই যাব না। দিন দুয়েক বাড়িতেই ছিলাম। সেখান থেকেই শুনতে পাচ্ছি, মাঠে হইহই করে খেলা চলছে। খুব মনখারাপ হয়ে যেত। এদিকে তখন আমাদের অবস্থা বেশ খারাপ। বাবা সাইকেলের ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন। কোম্পানিটা তখন জাস্ট উঠে গেছে। বকেয়াও দেওয়া হয়নি। কাজেই বাড়িতে ব্যাট কেনার আবদার করাটাও উচিত কাজ নয়।”
“কেউ কি তোমাকে ব্যাট কিনে দিয়েছিল ঋত্বিক? পরিচয় না দিয়ে?”
“এগজ়্যাক্টলি! একটা ছুটির দিন, দুপুরে ঘুম আসছিল না বলে বাইরের বাগানে গিয়ে দেখি, পাঁচিলের উপরে একটা আনকোরা নতুন ব্যাট আর ক্যাম্বিস বল রাখা! বুঝতেই পারছেন, আমার মনের অবস্থা!”
“একদম!” ঘাড় নাড়লেন শ্যামল, “আর কিছু মনে পড়ছে?”
মাথাটা নিচু করল সে। ঘাড় নেড়ে বলল, “আপনার কাছে এসেছি যখন, কিছু লুকোব না। দু’বার আমার জন্মদিনে উইশ পেয়েছি। উইশ মানে এই ধরুন চকোলেট আর ফুল। এক বার একটা কবিতার বই। অভিনব ভট্টাচার্যের নির্বাচিত কবিতা। আপনি জানেন না হয়তো, আমার আবার ও-সবে... আর উনি বর্তমানে বেশ বিখ্যাত কবি। বইটার দামও অনেক। নামী প্রকাশনার বই। বইমেলায় গিয়ে নাড়াচাড়া করে দেখেছি। কিনতে পারিনি। চাকরিটা হয়নি তখনও। তা সেটাই মাসদুয়েক পরে আমার জন্মদিনে কুরিয়ারে এল।”
অভিনব ভট্টাচার্যের নাম জানেন শ্যামল রায়। তিনি নিজেও কবিতা লিখতেন এক কালে। সে-সব নামী পত্রিকায় ছাপাও হত। অভিনব তখন উঠতি। শ্যামল রায় আরও নামী কবি ছিলেন। তবে সে-সব কথা তিনি আর তুললেন না। নিজে কবিতা লেখা ছেড়েছেন বহু দিন। চেপে রাখা একটা শ্বাস ধীরে ধীরে ছেড়ে সোজা হয়ে বসলেন তিনি। পুরনো কথা মনে পড়ে গেল। বিষাদটা লুকিয়ে রাখতে-রাখতে বললেন, “পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, তোমার সন্ধান করা ব্যক্তিটি একটি মেয়ে। সে অবিবাহিতা। এবং তোমার আশপাশেই আছে। খোঁজখবর রাখে।”
“সে তো আমিও বুঝতে পারছি!” অসহায় ভাবে মাথা নাড়ল ঋত্বিক, “কিন্তু কে? আমাদের পাড়ায় মেয়ে অনেক। ছোটবেলায় বিরাট ব্যাচ ছিল আমাদের। ছেলেমেয়ে মিলিয়ে প্রায় জনা কুড়ি। তাদের মধ্যে মেয়েই আট জন। দু’জনের বিয়ে হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। আর দু’জনের বিয়ের সব ঠিকঠাক। তাদের বাড়ির কার্ডও আপনার টেবিলের উপরেই রাখা আছে দেখছি।”
“হুঁ!” অল্প মাথা নাড়লেন শ্যামল, “বোঝা-ই যাচ্ছে, এ-সব নিয়ে তুমি মাথা ঘামিয়েছ এর মধ্যে। খুঁজে পাওনি মানে, সরাসরি এদের মধ্যে কেউ তোমাকে ইঙ্গিত দেয়নি। আর যদি এই আট জনের মধ্যেই কেউ হয়, তবে হিসাব মতো বিয়ে হয়ে যাওয়া দু’জনকে বাদ দেওয়া যায়। অবশ্য পাকাপাকি বলা যায় না যে, সে বিবাহিতা নয় বা পাড়ারই কেউ।”
তার পর কী যেন ভেবে তিনি ভুরু তুলে বললেন, “আচ্ছা, যে বইমেলার কথাটা তুমি বলছিলে…”
“ওভাবে হবে না...” দুঃখিত ভাবে মাথা নাড়ল ঋত্বিক, “বইমেলা তো আর আমাদের এখানে হয় না। সেই শহরে। পোলো গ্রাউন্ডে। সেখানে আমার আশপাশে পরিচিত কেউ ছিল না।”
কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইলেন দু’জন। ঋত্বিককে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, সে নিরাশ। আর একটু চিন্তিতও বটে। এই বয়সে আসলে বোঝা যায় না, এ-সব তেমন গাঢ় ভাবনার বিষয়ই নয়।
একটা শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল ঋত্বিক। হতাশ গলায় বলল, “আচ্ছা, আসি তাহলে শ্যামলদা। কাউকে বলবেন না প্লিজ়। আমি সঞ্জয়দাকেও ভেঙে বলিনি কিছু।”
তার গলার মধ্যে সামান্য বিরক্তি আর একই সঙ্গে মিনতির সুর লক্ষ করলেন শ্যামল। কিছু বললেন না। ঘাড় নাড়লেন মাত্র।
বাইরে বেরোনোর জন্য দরজার হাতলে সে হাত দিয়েছে, শ্যামল অনুচ্চস্বরে হেসে উঠে বললেন, “তোমার সঙ্গে সাগ্নিক, মানে বাবনের সম্পর্ক এখন কেমন ঋত্বিক?”
একটু অবাক হয়েই ঘুরে দাঁড়াল সে। ভুরু কুঁচকে বলল, “কেমন আবার! ভালই। ও-সব ছোটবেলার ঝগড়াঝাঁটি কে আর মনে রাখে!”
“বেশ, বেশ! ওদের বাড়িটা মাঠের পাশেই। তাই না?”
ঋত্বিকের কোঁচকানো ভুরু এ বার কপালে উঠছিল। নাকের ডগায় বিন্দু-বিন্দু ঘাম। সে একটু তোতলানো গলায় বলল, “তা-তার ম্-মানে…”
“দত্তা, বাসবদত্তা! তোমার বন্ধু সাগ্নিকের বোন! বাংলায় এমএ করছে না সে? চমৎকার মেয়েটি!” একগাল হেসে বললেন শ্যামল।
প্রায় হনুমানের মতো লাফ দিয়ে শ্যামলের পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ল ঋত্বিক। তার তোতলানো তখনও শেষ হয়নি। হেঁচকি তুলে প্রায় কাঁদো-কাঁদো স্বরে সে বলল, “ক্কী-কী করে বুঝলেন শ্যামলদা?”
“আহা!” হৃষ্টস্বরে শ্যামল বললেন, “একের পর এক তার বন্ধুদের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। এ দিকে তুমি কিছুই বুঝছ না! উপায় না দেখে সে তো নিজের নাম পর্যন্ত ইঙ্গিতে বলে দিয়েছে।”
“ওহ্, ও-ওই লা-লাইনেও ভেবেছি দাদা!” এক হাতে শ্যামলকে প্রণাম করে অন্য হাতে নিজের নাকের ডগা মুছে নিল ঋত্বিক, “কিন্তু ওই কাঠের কা, আর নিমের ডালের নি-টাই মাটি করে দিল! এমনকি কাঠের জায়গায় লকড়ি বা উড পর্যন্ত ভেবেছি! তাও হয়নি।”
ঋত্বিকের কাঁধ দুটো ধরে তাকে তুলে পাশের চেয়ারে বসিয়ে দিলেন শ্যামল, “তুমি ভুলে যাচ্ছ, মেয়েটি সাহিত্যে মাস্টার্স করছে। নিমের ডাল মানে হল দাঁতন, অর্থাৎ দন্তধাবক!”
“তা হলে ব্যাপারটা শেষমেশ কী দাঁড়াল দাদা?”
“বাক্সের বা, সহজ পাঠ-এর স, বলের ব, দন্তধাবনের দ, তক্তার ত, আর তালার তা! একটু গুরুচণ্ডালী হচ্ছে বটে। তবে তাতে অতটা দোষ নেই।” মৃদু হাসলেন শ্যামল, “শরদিন্দুর লেখায় আছে। এমনকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও তো লিখে গেছেন, ‘ওগো আমার প্রিয়, তোমাররঙিন উত্তরীয়’।”
“তা হলে এখন আমি কী করব দাদা?” জানতে চায় ঋত্বিক।
“কী আবার করবে! এক্ষুনি যাও। সাগ্নিকের সঙ্গে দেখা করার অছিলায় তাকে জানিয়ে দিয়ে এসো যে, ব্যাপারটা তুমি বুঝে গেছ। এমনিতেই আজ বুল্টির কাছে শুনছিলাম, বাসবদত্তার বিয়ের কথাও হচ্ছে তাদের বাড়িতে!”
তড়াক করে উঠে দাঁড়াল ঋত্বিক। দরজা পর্যন্ত গিয়েও এক লাফে আবার ফিরে এসে শ্যামলকে ফের প্রণাম ঠুকল একটা। ফিসফিস করে বলল, “দাদা, ব্যাপারটা তা হলে আপনি আর কাউকে…”
“মাথা খারাপ নাকি! পেটে বোমা মারলেও বলব না!”
তিরবেগে ঋত্বিক বেরিয়ে যাওয়ার পর চেয়ার ছেড়ে উঠলেন শ্যামল। কাঁচকলার বিরিয়ানি রান্নাটা বাকি রয়েছে এখনও।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে