অণুগল্প
Bengali Literature

পুঁটলির ঠাকুমা

বাগীশ্বরী রেগে ঠোনা মারে। বলে, “খালি বাজে কতা। পড়তি বস! পড়াশোনা না শিখে বোকা গাধা হয়ে থাকলি চলবে? হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র পড়তি হবে। মধুসূদন পুরোটা মুখস্থ করতি হবে।”

সেবন্তী ঘোষ

শেষ আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২৬ ০৫:০৭
Share:

ছবি: কুনাল বর্মণ।

পুঁটলি গুটলি হয়ে ঠাকুমার মোটাসোটা ফর্সাপানা শরীরে লেপ্টে ছিল। ঠাকুমা যে এমন আদর-আহ্লাদ পছন্দ করেন,এমনটা মোটেই নয়। বাড়ির সবচেয়ে বড় এবং আলো-হাওয়াযুক্ত মাঝের ঘরটিতে আলাদা খাটে শোয়। ঠাকুরদার খাটের পাশে জানলা একটাই। চাপা ওদিকটা। মা আড়ালে বলে, একেশ্বরী।

পুঁটলি বলে, “বলো না, বিয়ের আগে তোমাকে ওই যে গ্রামের বাড়ির খিড়কি-পুকুরে এক জন প্রোপোজ় করেছিল, ওই গল্পটা...”

বাগীশ্বরী রেগে ঠোনা মারে। বলে, “খালি বাজে কতা। পড়তি বস! পড়াশোনা না শিখে বোকা গাধা হয়ে থাকলি চলবে? হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র পড়তি হবে। মধুসূদন পুরোটা মুখস্থ করতি হবে।”

পুঁটলি ওই ফাঁদে পড়ে না। এখন সে পড়ার মুডে নেই। ঠাকুমা কথা ঘোরাচ্ছে। জানা গল্পটা নিজেই আবার বলে, “তুমি খিড়কি-পুকুরে স্নান করতে গেলে। সেদিন একাই ছিলে। জল থেকে উঠেছ আর অমনি সেই নায়ক ঘাটে দাঁড়িয়ে বলছে, ‘ও বাগী, আমারে বিয়ে করবি?’ হি হি হি! কী আনরোম্যান্টিক! কাদামাখা পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে স্ট্রেট বিয়ের প্রস্তাব! কিন্তু তার পরের ঘটনাটাই হল আসল। জমিদারের মেয়েকে সাধারণ ঘরের ছেলে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে। কোনও দিন তার নাম বললে না তুমি? মার্ডার হয়ে যায়নিতো ছেলেটা?”

বাগীশ্বরীর মনোভাব বোঝা যায় না। কারণ যত ক্ষণ জেগে থাকে, চবর চবর পান চিবোয়। পানের টোপলা মুখের এক দিকে সরিয়ে বিরক্ত গলায় বলে, “অত মনে রাখতি পারি নাকি?”

বাগীশ্বরীর জীবিত সাত ছেলেমেয়ে। মৃত আরও গোটা পাঁচেক। সব ঘরে কম করে দুটো নাতি-নাতনি নিয়ে ভরা সংসার। পুঁটলির বাবা আর ছোট কাকা এক সঙ্গে থাকে। বাদবাকি ছেলেমেয়ে অন্য বাড়িতে, অন্য শহরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। অন্য ছেলে-মেয়ের ঘরে নাতি আছে বলে, তাদের নিয়ে আলাদা করে কোনও আদিখ্যেতা নেই। পুঁটলিরা দুই বোন। ভাই নেই বলে ঠাকুরদা-ঠাকুমার কোন হেলদোল নেই। সময় পেলেই সে দু’জনের কাছেই ঘ্যানঘ্যান করে। বিরক্ত করে।

পুঁটলি বাগীশ্বরীর এই আশি বছরের শরীরটার সঙ্গে এগারো বছরের বালিকাটিকে মেলাতে গিয়ে হেসে ফেলে। মাঝারি জমিদারবাড়ির মেয়ে বাগীশ্বরী, তার বড় দুই দাদার সঙ্গে তাদেরই মতো খাকি হাফ প্যান্ট, শার্ট পরে হাটে চলে যেত। তার দুই দাদা প্রায় হপ্তা-তোলা জমিদারপুত্রের মতোই মেজাজি ছিল।

পুঁটলি জানতে চায়, “গিয়ে করতে কী?”

“জিনিসপত্তর লেথোতি লেথোতি যাতাম। ওরা যেমনটা করত।” অম্লানবদনে বলে ঠাকুমা।

“যা তা! কী খারাপ! ওই উনিশশো আঠারো-উনিশ সালে মেয়ে হয়ে তুমি হাটের জিনিসে লাথি মারতে মারতে যাচ্ছ? অবিশ্বাস্য ঘটনা! বাংলা সিনেমায় এ রকম অত্যাচারী জমিদারদের দেখায়। তুমি তো আবার সেটা খুব মন দিয়ে দেখো।”

বাগীশ্বরীকে এক দিনের জন্যেও জমিয়ে ঘরকন্না, রান্নাবান্না করতে দেখেনি পুঁটলি। ওর ছোটবেলায় যখন বাড়িতে গ্যাস আসেনি, সামনে তোলা উনুন সাজিয়ে, মোড়া পেতে সব কিছু গুছিয়ে দিলে ছেলেপুলেদের জন্মদিনে পায়েসটুকু করে, তাতে তিল ছিটিয়ে দিত। ব্যস! তার পর পরিপাটি চওড়া-পাড় সাদা শাড়ি, কানে কানপাশা, হাতে ভারী সোনার বালা পরে একপ্রস্ত গল্পের বই নিয়ে বসে পড়া। মেঘনাদবধ-এর চতুর্থ সর্গ এখনও মুখস্থ। তবে ইদানীং যুক্ত হয়েছে সাদা-কালো টিভি। বাবা যেই ঠাকুমার ঘরে টিভি এনে রাখল, ঠাকুমা অমনি বেশ সেজেগুজে টিভির সামনে বসেছে। খবর শুরু হল। ঠাকুমা বাবাকে জিজ্ঞেস করল, “অ বালু, ওরা কি আমাদের দেখতি পায়?”

আড়ালে হাসাহাসি শুরু হল। কারণ মহারানির সামনে তো হাসা যাবে না!

ঠাকুমার জন্য ঘন দুধ আসে। না হলে এক বাটি থেকে আর এক বাটিতে দুধ ঢালতে ঢালতে বলে, “বৌমা, এ তো জলবৎ তরলং।”

দুধে যে জল না মিশিয়ে খেতে নেই, সে ওঁকে কে বোঝাবে!

ঠাকুরদা সারা দিন মা-কে নিয়ে বাড়ির কাজ, কাজের লোকেদের দেখাশোনা করে। আর ঠাকুমা বই পড়ে, বাগান করে। ঠাকুমার কাছে এর-ওর নামে কোনও গল্প করে সুখ নেই। কিন্তু পুঁটলির খুব ইচ্ছে করে কান পেতে সব শোনে। মণিকাকিমা নাকি মায়ের জিনিস, বাবার রেকর্ড চুরি করেছে। ঠাকুমা রেগে বলল, “ছেলেপুলের ওতে কান দিতি হবে না।”

পাশের বাড়ির জবাদির মা, ছুটির দিন জবাকে হলুদ আর সরবাটা মাখায়। এ বাড়িতে সে-সব মুখে মাখার নয়। সব খাদ্য। যেমন মা, তেমন ঠাকুমা। খালি খাও এবং পড়ো। মা দু’বেলার মাছদেখিয়ে ঠাকুমাকে জিজ্ঞেস করল, “এ-বেলাকোনটা খাবেন?”

ঠাকুমা বলল, “দুটোই দাও। দিলি তো আর পড়ে থাকপে না নে।”

ঠাকুমার বোন সোমেশ্বরী দিদা বলে, “দিদির চেরটাকাল অমন। তিনধারিয়ার বাড়িতে গেলাম। দাদাবাবু সকালবেলা সবার জন্য চিঁড়ে-দুধ তৈরি করে আপিস গেলেন। ও মা! দিদি দেরিতে উঠে বললেন, ‘সব ফেলে দিতি বল।’ সাইলাকে ময়দা মাখতি বললেন। সঙ্গে ইশকুশ ভাজা। আমরা তো ভয়ে মরি, বাড়ির পুরুষমানুষের উপর কতা!”

ইশকুশ মানে স্কোয়াশ, জানে পুঁটলি। তার পর বলে, “হুঁ, তার পর কী হল?”

দিদা বলেন, “কী আর হবে, লুচি-টুচি খায়ে বেড়াতে চললেন। আমরা সবাই মিলে ঝর্না দেখতি গেলাম। দাদাবাবু ফেরলেন। রাগের বালাই নাই।”

পুঁটলি হৃষ্টমুখে বলে, “করত কী ঠাকুমা? চাকরিজীবীর গিন্নি, নো সংসারের কাজ?”

সোমেশ্বরী বলে, “যা আমরা অবসরে করতাম, দিদি খেয়াল মতো তা-ই করত। খেলনা টেরেনে করে শিলিগুড়ি থেকে মাছপাহাড়ে চলে আইসত। দিদি তো এক বেলাও মাছ ছাড়া থাকতি পারেন না। ওই মাছের আঁশ ইয়া বড়। আইনতেন দাদাবাবু। রোদে ধুয়ে শুকোনো, সেগুলো রং করা, ফুটো করে তার ঢুকিয়ে ফুলের ঝাড় তৈরি। দিদির হাতের কাজ অপূর্ব! তার পর সব সেলাই। দাদাবাবুই বাঁধিয়ে আনতেন। মাছের আঁশির আঙুরলতা, বনের ফুল, এলাহি কাণ্ড। সে সব তোদের সব জেঠা-কাকারা ভাগ করে নেছে। তাও তো ভাল, ভায়ে-ভায়ে ভাব আছে একনো। চাদ্দিকে যা দেখি!”

পুঁটলি দেখেছে, মা ঠাকুমার মতো মাছের আঁশের কাজের চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাকে সাহায্যটা করবে কে? বাবার এ-সবে মন নেই। চেষ্টা করলেও ঠাকুমার মতো অমন নিখুঁত কাজ মায়ের হাতে খেলে না। আর ঠাকুমার সেলাই? যেন ছবি আঁকা। পুঁটলির ঠাকুমার আবার বোন সোমেশ্বরীকে পছন্দ নয়, কারণ আড়ালে তাকে জিজ্ঞেস করে, তাদের তো দুটো বোন, বাবার বংশরক্ষা হবে না, আর কি তাদের ভাই-টাই হবে না! কিন্তু এই সোমেশ্বরী বুড়ির সঙ্গে গল্প করে সুখ আছে। সবার হাঁড়ির-নাড়ির খবর রাখে। একেবারে চোখ ঘুরিয়ে গোল-গোল করে গল্প বলে। পুঁটলি সেই কথাগুলো একেবারে স্পঞ্জের মতো শুষে নেয়।

পুঁটলি চার দিকে তাকিয়ে একটু গলা নামিয়ে বলে, “জানো, ঠাকুরদা না, ঠাকুমার সব কাজ করে দেয়। এমনকি মুখের সামনে পানের পিকদানি ধরে। দোক্তা বানায়। আমাদের তো পান ছেঁচতে জীবন শেষ। তার পর ধরো, ঠাকুমার জন্য মাছের সবচেয়ে বড় পেটি, সেরা চা, দুটো করে মিষ্টি। ওই চামড়ার গদিমোড়া চেয়ারে একা খেতে বসবে, আর আমরা সবাই কাঠের টেবিল বেঞ্চে। উনি খাবেন সেরা ফুলকো লুচি, আর আমরা চ্যাপ্টা ট্যারা-বাঁকা। ঠাকুরদাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সুপুরি কাটতে কাটতে বলল, ‘উনি তো জমিদারের মেয়ে! ওনারে দেখতি হবে’... বোঝো! আমরা যে জমিদারের মেয়ের নাতনি, সেটা ঠাকুরদার খেয়াল নেই!”

সোমেশ্বরী দুঃখিতমুখে বলে, “দিদি চিরটা কাল ওই মেয়েই থেকে গেলেন, আর আমরা বৌ হয়ে উবদি-বাবদি খাটলাম।”

পুঁটলি ভাবে, ঠাকুরদা এত রোগা ছিপছিপে, ভাল চাকরি করেছে, রান্না বাদে বাড়ির সব কাজ করতে পারে। ঠাকুমার দাঁত নেই, যখন ছিল ইয়া উঁচু। এই মোটাসোটা। বেঁটেখাটো। ঠাকুমার জন্য ঠাকুরদার এমন জান হাজির হল কী করে? তার মধ্যে সেদিন ঠাকুমা বলে কি না, এতগুলো ছেলেপুলের, কাঁথা-কাপড়ও নাকি কাচেনি কোনও দিন! বাচ্চার হিসু-পটিও সাফ করেনি! এ কেমন মা? সংসারএঁকে রেখেছে?

পুঁটলি ওরফে শরণ্যা, যখন তাঁর প্রিয় বন্ধু সীমন্তীকে তার ঠাকুমা বাগীশ্বরীর গল্প করছিল, তার গলায় চাপা গর্ব। অত দিন আগে এমন ভিন্ন নারী! তাদের বাড়ির পুরুষরাও অন্য রকম। বাগীশ্বরী প্রিভিলেজড লেডি।

সীমন্তী বলল, “সত্যিই আশ্চর্য মানুষ, শিল্পী স্বভাব বলতে পারিস। কিন্তু এই যে স্বাধীনতা তোর ঠাকুরদা দিয়েছিল, বিনিময়ে কতগুলো বছর ভদ্রমহিলা বাড়িতে বন্দি ছিলেন, সেটা ভাব। বারোটি মৃত ও জীবিত সন্তান, মানে কত বছর ধরে সন্তান বয়েছেন, কত বছর বাচ্চারা স্তন্যপান করে গেছে। কত বছর ধরে সন্তানস্নেহ ধরে রাখতে হয়েছে। ওঁর হয়তো মেঘনাদবধ-টা আরও ভাল করে পড়তে ইচ্ছে হত তখন।”

পুঁটলি ধসে যায়। মুখে আর কথা সরে না। বাগীশ্বরীর অন্য রকম জীবনটা আর তার ঠিক অন্য রকম মনে হয় না।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন