অণুগল্প
Bengali Literature

যদি হও সুজন

সুপ্রিয়ার বুকের ভিতরটা হু হু করে উঠেছিল। উদাস গলায় বললেন, “ঘুম ভেঙে গেল, শুয়ে থাকতে আর ইচ্ছে করল না। বাড়িটা বড় ফাঁকা লাগছে। এত দিন বাড়িতে বাবলু ছিল, বৌমা ছিল। ঘরে ওদের জিনিসপত্র ছিল। সন্ধ‍্যায় ঘরে আলো জ্বলত, বিকেলবেলায় ছেলে-বৌমার বাড়িতে ফেরার অপেক্ষা থাকত।

শর্মিষ্ঠা বসু

শেষ আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২৬ ০৫:৫৬
Share:

ছবি: অসীম হালদার।

তুমি? এখানে কী করছ?”

চমকে উঠে মুখ তুলে তাকালেন সুপ্রিয়া। জবাব দিলেন না।

“রাতে ঘুম হয়নি?” সুপ্রিয়ার খুব কাছে এসে দাঁড়ালেন অপরেশ।

সুপ্রিয়ার বুকের ভিতরটা হু হু করে উঠেছিল। উদাস গলায় বললেন, “ঘুম ভেঙে গেল, শুয়ে থাকতে আর ইচ্ছে করল না। বাড়িটা বড় ফাঁকা লাগছে। এত দিন বাড়িতে বাবলু ছিল, বৌমা ছিল। ঘরে ওদের জিনিসপত্র ছিল। সন্ধ‍্যায় ঘরে আলো জ্বলত, বিকেলবেলায় ছেলে-বৌমার বাড়িতে ফেরার অপেক্ষা থাকত। গতকাল ওরা আমেরিকা চলে যাওয়ার পর থেকেই সব ফাঁকা, সব শূন্য হয়ে গেছে। জিনিসপত্র নেই,ঘরে কোনও জনমানুষ নেই, শুধু বাড়িটা অসহায়ের মতো ক্রমশ বড় হয়ে চলেছে।”

লম্বা একটা শ্বাস নিলেন অপরেশ। উত্তরের জানলাটা খুলে দিয়ে বললেন, “আর বসে থেকো না। এ বার গিয়ে শুয়ে পড়ো।”

সুপ্রিয়া গম্ভীর হয়ে গেলেন। দূরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কয়েকটা মুখ দেখতে পাচ্ছিলেন। এক যুগ আগে দেখা কিছু মুখ। স্মৃতির আড়াল ভেঙে চোখের সামনে ভেসে উঠল কিছু মূহূর্ত। এত স্পষ্ট, যেন এখনই হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেখা যায়।

সেই একান্নবর্তী পরিবার, বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের ভিড়। যত আত্মীয়স্বজন, কে কোথায় আছে, সবাই আসছে-যাচ্ছে, থাকছে। একত্র হওয়ার জন‍্য কোনও উপলক্ষ দরকার নেই। যখন খুশি চলে এলেই হল। রাতে ঘরের মেঝে জুড়ে তোশক পেতে, চাদর বিছিয়ে শোওয়ার আয়োজন চলছে, ভিতরের বারান্দায় খাওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে।

কী কষ্টের জীবন তখন! বাড়িতে নড়াচড়া, শোয়া-বসার জায়গা নেই। সিঁড়ির তলায় বাক্স-প্যাঁটরার পাহাড়, পুরনো হারমোনিয়াম, বালতি, ছেঁড়া জুতো, ভাঙা কৌটো, শিশি-বোতল সব আছে। আর ঘরের ভিতরটাও ঠিক তেমনই অগোছালো।

খাটে লেপ-তোশক-চাদরের স্তূপ। বাড়ির বড় ছেলের ফুটবলের জার্সি, মেজোর স্কুটারের হেলমেট, সেজোর বই, শ্বশুরের ওষুধ, শাশুড়ির পানের বাটা— সব ছড়ানো।

সুপ্রভার তখন কাহিল অবস্থা। হাঁপ ধরত, অসহ‍্য লাগত।

“আমার আর এই জন্মে হাত-পা ছড়িয়ে থাকা হল না। একটা বাড়িতে এত জিনিস, এতগুলো লোক, এভাবে থাকা সম্ভব? দম যেন বন্ধ হয়ে আসে!” মাঝেমধ্যে গজগজ করতেন সুপ্রিয়া।

“ইচ্ছে থাকলেই থাকা সম্ভব। যদি হও সুজন, তেঁতুল পাতায় ন’জন,” সুপ্রিয়া কথা শেষ করার আগেই তাঁকে থামিয়ে দিতেন অপরেশ।

রাগে আপাদমস্তক জ্বলত তখন।

তার পর একটা সময় মনে হয়েছিল, যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়। আর এত লোকজন সহ‍্য হচ্ছে না। এ বার কিছু একটা করা দরকার।

দোষ তো কিছু নেই। সংসারে যার যার নিজেরটা বুঝে নিতে হয়।

এত দিনের সম্পর্ক কী করে ভাঙতে হয়, সুপ্রিয়া জানতেন। একটানা দশ-দশটা বছর যাঁদের সঙ্গে এক ছাদের তলায় থেকেছেন, তাঁদের জীবন থেকে এক-এক করে ছেঁটে ফেলে দিয়েছিলেন।

একটা খোলামেলা বাড়ি, একটা হাত-পা ছড়িয়ে থাকার মতো বাড়ি, এইটুকুই তো চাওয়া। তার জন‍্য যা করার, করেছেন। ঝড় তোলেননি, শুধু নিঃশব্দে হাওয়ার মুখ ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। চালটা এমন ভাবে দিয়েছিলেন যে, বাড়ির পরিবেশটাই বদলে গিয়েছিল। অদ্ভুত একটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল সবার মধ্যে। সবাই কেমন ছাড়া-ছাড়া হয়ে গিয়েছিল। জোড় আলগা হয়ে গিয়েছিল সকলের সঙ্গে সকলের। শেষ পর্যন্ত একে একে সবাই ভিটে ছাড়লেন।

বাড়িতে তখন লোক বলতে তিন জন— অপরেশ, সুপ্রিয়া আর বাবলু। আর বেশির ভাগই চলে গেলেন ওঁদের পলাশপুরের পুরনো ভিটেয়। যাঁদের দূরে যাওয়া সম্ভব নয়, তাঁরা সাধ্যমতো ফ্ল্যাট কিনে, কিংবা ভাড়াবাড়িতে। এই বাড়ি তখন শুধু নীরব নয়, বাড়িটা তখন সুপ্রিয়ার একার, নিজের। নিরবচ্ছিন্ন স্বাধীনতার, অখণ্ড শান্তির আনন্দনিকেতন, যা বিয়ে হওয়া ইস্তক সুপ্রিয়ার প্রধান চাহিদা ছিল।

বারান্দার দিকের দরজাটা খুলে দিলেন সুপ্রিয়া। ভাবনায় ডুবে থাকতে থাকতেই হঠাৎ মনে হল, কতকালের পুরনো একটা গন্ধ যেন ঘিরে ধরছে তাঁকে। খুব পরিচিত একটা গন্ধ,খুব চেনা।

অন্ধকার যখন ফিকে হয়ে আসে, রাত যখন ধীরে ধীরে আঁধার-আঁচল গুটিয়ে নেয়, বাতাসে যখন অদেখা স্নিগ্ধতা জড়িয়ে থাকে, তখন হয়তো এভাবেই মনের সব অস্থিরতা থিতিয়ে আসে। হয়তো রাতের অবসান আর আলোর আবির্ভাবের ক্ষণে, ভাবনার ঘোলাটে জল এভাবেই ধীরে ধীরে স্বচ্ছ হয়ে যায়।

অনেক ক্ষণ ধরে ভাবতে থাকেন সুপ্রিয়া। ভাবতে ভাবতেই এক সময় আলোর রেখার মতো স্পষ্ট হয়ে যায় ভাবনা, শব্দ হয়ে যায়।

এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়ান সুপ্রিয়া। অপরেশকে বলেন, “যাবে এক বার?”

“কোথায়?” অপরেশ অবাক।

“চলো, পলাশপুরে যাই। ওদের সঙ্গে এক বার দেখা করে আসি। বড়দা, মেজদা, সেজদা, ছোট ঠাকুরপো, রাঙাদি।”

“দূর, দূর, ছাড়ো না। এ-সব ভাবনা আর না ভাবাই ভাল,” অপরেশ রাজি হন না।

“কেন? এক বার ভেবে দেখো, কথাটা কি খারাপ বলেছি? এক-এক করে ওদের সবার সঙ্গে যোগাযোগ করলে ভাল হবে না?”

“এখন এত দিন পরে কী করে যাব! কারও সঙ্গেই তো যোগাযোগ নেই কত দিন হয়ে গেল!” অপরেশ ইতস্তত করছিলেন।

“গেলে কি আর তাড়িয়ে দেবে নাকি?” বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন সুপ্রিয়া।

মুখটা আরও গম্ভীর করে অপরেশ বললেন, “তাড়িয়ে হয়তো দেবে না, তবে রাগ করবে, বিরক্ত হবে। সেটাই তো স্বাভাবিক।”

“হবে হোক, বয়েই গেল, তবু যাব। একটা ভুল করেছি বলে কি আর শুধরে নেওয়া যায় না? আমি জানি ওরা এই বাড়ির মায়া কাটাতে পারবে না। এ বার ওদের সবাইকে ফিরিয়ে আনতে হবে।”

“গিয়ে কী বলবে?” অপরেশের চোখে জিজ্ঞাসা।

“বলব, এই বাড়িটা যতখানি আমাদের, ততখানি তোমাদেরও। বলব, বাড়িটা আমি আর বড় হতে দেব না। বলব, আমি বুঝতে পেরেছি, বাড়ি বড় হতে হতে সব হারিয়ে যায়, সবাই দূরে সরে যায়,” সুপ্রিয়ার চোখে জল চিকচিক করে ওঠে।

আনন্দে, উত্তেজনায় অপরেশের মুখে হাসি ফোটে, বুকের মধ্যে জুঁইফুলের মতো টুপটুপ করে সুখ ঝরে পড়ে। কিসের এত আনন্দ, কোথা থেকে এত উচ্ছ্বাস আসে,কে জানে!

কিছু ক্ষণ পরে ভোরের পাখির ডাক শুনতে শুনতে বাইরে বেরিয়ে আসেন সুপ্রিয়া।

দিনটা মেঘলা, আকাশে থোকা থোকা শ্রাবণের মেঘ। তবু যেন চার পাশটায় এক আশ্চর্য ঝলমলে আলো। মনে হয়, চার দিকে এখন অফুরান উজ্জ্বলতা। যেন পৃথিবী জানে এ বার সময় হয়েছে, আর একটু পরেই সব কিছু বদলে যাবে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন