Predator and Prey

বাঘে-মানুষে

মানুষের উপর বাঘের হামলা বাড়ছে। কিছু ঐতিহাসিক এবং সাম্প্রতিক ঘটনা থেকে বোঝা যায়, মানুষ নিজের ভুল বা অন্যায়ের জন্যই বিপদে পড়েছে। জঙ্গলের হাওয়ায় ঘুরে বেড়ানো নানা লোকবিশ্বাস আসলে মানুষকে সচেতনতার পাঠ দেয়। আমরা বুঝতে না পেরে আহ্বান করে ফেলি বিপর্যয়কে। 

চিরশ্রী মজুমদার 

শেষ আপডেট: ২২ মার্চ ২০২৬ ০৮:২৯
Share:

নজর: ধামোকর (পুরুষ বাঘ)। বান্ধবগড় জাতীয় উদ্যানে। ছবি: নীলাঞ্জন গঙ্গোপাধ্যায়

জঙ্গল এলাকায় সবচেয়ে হিংস্র ডাক নাকি চিত্রা খুঁডুলে পেঁচার। ইংরেজিতে ‘মটলড উড আউল’। গ্রাম লাগোয়া ঘেসোজমির কিনারে খয়াটে গাছের কোটরে বাসা বাঁধে। আকাশের আলো ফিকে হলে ডালপাতার আড়াল থেকে শব্দ করে। কাঁপা গলায় হুহহুহহুম-হ্হুহুম ধরনের রক্ত জল-করা সেই ডাক, নিজ কানে না শুনলে তার শিহরন মেলে ধরা সম্ভব নয়। মুখের গড়নে বুড়ো মানুষের আদলও কেমন অস্বস্তিকর। মধ্যপ্রদেশের উমরিয়ার বামেরা গ্রামে যে স্থানীয় মানুষটি আমাদের এই পেঁচাটার বাসার কাছে নিয়ে গেলেন, তিনি তাড়া দিচ্ছিলেন— দেখতে পাচ্ছেন না যখন, ফিরে যান। কিন্তু, আমাদের তো দরকার পেঁচার ভয়াল ডাকের রেকর্ডিং, আর দিনের আলো আরও একটু না কমলে সে তো ডাকবে না। এই দাবি শুনে তিনি যে কথাগুলো শুনিয়েছিলেন, তার পর সেখানে থাকার আর প্রশ্ন ওঠে না। বিভিন্ন জনের মুখে বিভিন্ন রঙে সেই কাহিনি আগেও পেয়েছি, কিন্তু সবচেয়ে ভয়াল বর্ণনাটি বোধ করি সেই প্রত্যন্ত গ্রামেই শুনেছিলাম। এই পেঁচা বহু দূর থেকে বিপদ দেখে, ডাকের মাধ্যমে অশুভ সঙ্কেত দেয়। প্রথম ডাকে বলে— ফিরে যাও। ভোপাল থেকে একটু দূরে যে সিভিল ফরেস্ট, সেখানে নাকি এক ব্যক্তির ক্ষতবিক্ষত কবন্ধ মেলে। পাশে বাঘের পায়ের ছাপ। শবের মাথা মেলেনি। সাধারণত ভারতের মূল ভূখণ্ডের বাঘের মানুষের মাথার প্রতি রুচি নেই। তাই, প্রচুর খোঁজার পর সকলে বলল, লোকটা চিত্রা পেঁচার কথা শোনেনি, জঙ্গল ওর মাথা নিয়েছে।

শহরে বসে শুনলে একেবারে গাঁজাখুরি, অবৈজ্ঞানিক মনে হয়। কিন্তু জঙ্গলের লতাপাতা বিভিন্ন ঘটনাকে একেবারে অন্য অবয়ব দেয়। এক প্রকৃতিবিদের বক্তব্য, ২০১৯ সালে এই কাণ্ডটি ঘটেছিল বেরসিয়া জেলায়। লোকটি বাঘ দেখে পালাচ্ছিল। থাবার আঘাতে তার খুলিটি গুঁড়িয়ে টুকরো টুকরো হয়ে ছিটিয়ে যায়। যারা উদ্ধার করেছিল, তারা নাকি শ্বাপদের ভয়ে ঠিক ভাবে খোঁজেইনি। তার পর নানা রূপে ডালপালা মেলে উঠে দাঁড়ায় লোকবিশ্বাস। স্থানীয় সংবাদপত্র আবার লিখেছিল, ময়নাতদন্তে মাথাটা মিলেছে, লোকটার বক্ষপিঞ্জরের মধ্যে! বাঘ নাকি থাবা মেরে পেরেকের মতো মাথাটা দেহেই ঢুকিয়ে দিয়েছিল!

গল্পটা থেকে দুটো সত্যি কথা বোঝার। প্রথমত, বাঘের তাগত আমাদের কল্পনার বাইরে। দ্বিতীয়ত, পেঁচাটা কখন ডাকে? সন্ধ্যা আর ভোরে। এই সময়টুকুর মধ্যে জঙ্গলে যেয়ো না। প্রাণটি যাবে।

অনেকেই বলেছেন, ২০২৫ ছিল জঙ্গলজীবনের ‘সন্ত্রাসকাল’। কারণ, ভয়ঙ্কর সব বাঘ-মানুষ সংঘাতের খবর মিলেছে গত বছর। বহু এলাকায় শত সহস্র বছর পরে আবার বাঘ এসেছে। নিয়মিত অরণ্যচারীদের মত ভিন্ন। ভারতের জঙ্গলে চিরকালই মানব-পশু সংঘাত ছিল, কিন্তু জানা যেত কম। তখন মানুষও তো অল্প। ফলে, পশু ও মানুষের এলাকা ভাগ করা ছিল। কিন্তু এখন জনসংখ্যার বিস্ফোরণ হয়েছে, জঙ্গল কমেছে, তারই মধ্যে বাঘ বাড়ছে। অথচ থাকার জায়গা পাচ্ছে না। ফলে, মানুষ ও পশুর এলাকা একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে যাচ্ছে। এই সমস্যা আরও বাড়বে। মানুষ ও পশুর এলাকা পৃথক করতে যে পরিকাঠামো প্রয়োজন তা গড়ে তুলতে বহু বছর লাগবে, তাই আশু সমাধান সতর্কতা, মানব-পশু সহাবস্থানের চেষ্টা। তার জন্য জানা দরকার, বাঘ কেন মানুষের শত্রু হয়। বিপদের কারণগুলি চিনে রাখলে পরিত্রাণের একটা পথ পাওয়া যাবে। অতএব, স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে সংরক্ষণের চেষ্টা শুরু হওয়ার পর যে সব বাঘ বা বাঘিনি ত্রাসের রাজত্ব চালিয়েছে, আজ তাদের পর্ব।

মিঠির ফিরে আসা

হিমালয়ের পাদদেশ থেকে গঙ্গার অববাহিকা পর্যন্ত এলাকা হল প্রকৃতির খাসমহল। শালের বড় বড় গাছ, সবুজ ঘন গুল্মরাজ্য, নরম মাটিতে পুষ্ট শরঘাস, প্রচুর জল। এখানে ঘোরে বুনো শূকর, বারাশিঙা, চিতল, কাকর হরিণ। তাই বাঘের প্রিয় আবাসভূমি। এই তরাই এলাকার ভূ-বৈচিত্র মানুষের পক্ষেও আকর্ষক। রসালো উৎকৃষ্ট মাটির সুবাদে গঙ্গার পশ্চিমে আখচাষ তো খুবই লাভজনক। গভীর জঙ্গলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে যে বাঘের জায়গা হচ্ছে না, ইদানীং এই প্রায় পনেরো ফুট লম্বা গাছে ছাওয়া আখখেতগুলি তাদের গা-ঢাকা দেওয়ার মোক্ষম জায়গা হয়েছে। পীলীভীত বনাঞ্চলের সীমানার বাইরের আখখেতে এমন অন্তত এক ডজন বাঘ রয়েছে। এদেরই নাম ‘শুগারকেন টাইগারস’।

২০২৫-এর শুরুতে, কনকনে শীতে হরিপুরা রেঞ্জে এক চাষি আখ কাটতে গিয়ে থকথকে কুয়াশার মধ্যে আড়াই-তিন বছরের এক তরুণী বাঘিনিকে দেখেন। তার পর বারবারই দেখা যায় তাকে, ক্রমশ মানুষের আরও কাছে আসতে থাকে। কৌতূহলী দৃষ্টিতে মানুষকে দেখত সে। নিরীহ স্বভাব, শান্ত আচরণ। নাম হয় মিঠি।

এ সময়ের অনেক ভিডিয়োতে দেখা গিয়েছে (তখনও এআই ঢোকেনি, ফলে কৃত্রিম নয়) খেতের মাঝে দাঁড়িয়ে মোবাইলে মিঠির ছবি তুলছে তরুণরা। লাঠি তুলে রে রে করে ছুটছে, হাসছে, যেমন কুকুরকে খেপানো হয়। ঢিল ছোড়ারও অভিযোগ।

মে মাসের ঘটনা। নাজ়িরগঞ্জের হংসরাজ রাতে আখখেতে জল দিতে গিয়েছিলেন। পাম্পের খুব চাহিদা, লোকে পালা করে ভাড়া নেন। রাতে পাম্পের আওয়াজ শুনলে জীবজন্তুরা খেত থেকে ছুটে পালায়। মিঠি আসে ঠিকই, কিন্তু তাকে আবার ভয় কী। সে তো পোষ মেনে গিয়েছে এক রকম।

রাত বাড়ল কিন্তু হংসরাজ বাড়ি ফিরলেন না, খেতের দিক থেকে ফেউ ডাকছিল। হংসরাজের ছেলেরা বাইরে বেরিয়ে নখের মতো বাঁকা এক ফালি চাঁদের আলোয় দেখলেন, কয়েকটা শেয়াল এক দিকে ত্রস্ত ভাবে তাকিয়ে কাঁদছে। প্রথমে হংসরাজের সাদা পাগড়িটা মিলল, রক্তে ভিজে জবজবে, একটু দূরে পড়েছিল তাঁর বড় টর্চটা, তখনও জ্বলছে। সেটা তুলে দুরুদুরু বুকে একটু এগোতেই ছেলেদের মনটা চুরমার হয়ে গেল। হংসরাজের শরীর নড়ছে, কারণ নীচের অংশটা খাচ্ছে এক বাঘিনি। টর্চের আলোয় তার রক্তমাখা বীভৎস মুখের সঙ্গে দেখা গেল সেই অপার বিস্ময়মাখা দু’টি চোখ।

মানুষ সাবধান হলেও অপারগ, এ সময়ে জল না দিলে ফসল শুকিয়ে যাবে, পোকায় নষ্ট করবে। তিন দিন বাদেই কিষাণপুর অভয়ারণ্য লাগোয়া ছতিপুরা গ্রামের রামপ্রসাদ সন্ধে নামছে দেখে শিউরে উঠে দ্রুত আলপথ ধরে ফিরছিলেন। খেতের এক মুনিশ কিছু আন্দাজ করে মাথা তুলেই গোঁ-গোঁ করে উঠল। রামপ্রসাদ পা চালিয়ে আসছেন, পাশের আখের ঝাড় থেকে গুঁড়ি মেরে বেরিয়ে তাঁর পিছে চলেছে শ্বাপদ। ‘বাঘ’ চিৎকারের প্রায় সঙ্গে সঙ্গে, রামপ্রসাদ সতর্ক হওয়ার আগেই সে লাফিয়ে তাঁকে ধরে নিয়ে খেতে ঢুকে গেল।

এ বারে মিঠি রামপ্রসাদের দেহে থাবা মারছিল আক্রোশে, আর হুঙ্কার দিচ্ছিল। রক্তের স্বাদ পাওয়ার পর এ ভাবে অনুসরণ মানেই সে মানুষখেকো হয়ে ওঠার পথে। বন দফতরের তৎপরতায় সে মাসের শেষেই মিঠিকে ধরা হয়। তার পরই বিরাট ভুল। তাকে পীলীভীতের মাহোফ এলাকায় ছাড়া হয়। তার পাশেও গ্রাম আর আখখেত।

জঙ্গলের প্রান্তে শান্তিনগর গ্রাম। রাতের বাড়ির উঠোনে বাসন ধুচ্ছিলেন রেশমা। জানতেনই না, অন্ধকার থেকে একজোড়া জ্বলন্ত চোখ তাঁকে দেখছে। সে রাতে রেশমার আর্তনাদ ছাড়া আর কোনও শব্দও হয়নি। একেবারে পাকা মানুষখেকোর কাজ। কিন্তু মিঠি তো চলে গিয়েছে। এ নরখাদকের পায়ের ছাপ পূর্ণবয়স্ক শক্তিশালী পুরুষ বাঘের।

তবে জুন মাসেই মাহোফ রেঞ্জের পাশের খেতে মিঠির শিকার হলেন রমেশ। মিঠি প্রকাশ্য দিবালোকে মানুষ মারতে শুরু করল। একই দিনে মিঠির নিশানা হয়েছেন দু’জন, হাসপাতালের লোকেরা পর্যন্ত দিশাহারা। মানুষের রক্তের নেশা লাগল নাকি? দু’মাসের মধ্যে পাঁচ জন গ্রামবাসীকে মিঠি মেরেছিল বলে সন্দেহ। পীলীভীত লাগোয়া ২২টা গ্রামে চালু হয়েছিল সূর্যাস্ত আইন। লাউডস্পিকারে চলত প্রচার। ‘বাঘিন দিখি হ্যায়... সুরজ ঢলনে কে বাদ না নিকলে।’

শোনা যায়, বাঘ মানুষখেকো হয় রোগে বা বয়সের কারণে অক্ষম হলে। মিঠির ক্ষেত্রে তা হয়নি। মা-হারা, তাই তৃণভোজীর শিকার করতেই শেখেনি। মানুষ যখন তাকে জ্বালাচ্ছিল তখন তাকে একটি বিশালকায় পুরুষ বাঘের সঙ্গে দেখা যেত। পায়ের ছাপ জানাচ্ছে, এই বাঘই শান্তিনগরের রেশমার হত্যাকারী। পীলীভীতের এক নেশাড়ু, অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় বাঘের মুখে পড়ে। সেখান থেকেই এই বাঘটির নতুন খাবারের লোভ লাগে। মিঠিকেও মানুষের মাংসের ভাগ দিত সে। মিঠি নিশ্চয়ই ভেবেছিল, আমাকে যারা তাড়া করে তারা তবে খাবার? সে কি প্রতিশোধ নিতে ফিরেছিল?

জুলাই মাসে, ১১ ঘণ্টা চেষ্টার পর মিঠিকে ঘুম পাড়িয়ে খাঁচায় পোরা হয়। এখনও সে কানপুরের চিড়িয়াখানায় বন্দি। যাঁরা খাবার দেন, তাঁরা পর্যন্ত তাকে চরম ভয় পান।

কিন্তু মিঠিকে মানুষখেকো বানাল কে?

রাজনন্দিনীর রোষানল

রণথম্ভোরের মাটিতেও রক্তের দাগ শুকোচ্ছে না। রাজস্থানের কিংবদন্তি বাঘিনি মছলির জন্য সাজানো গোলাপের সুগন্ধি পাপড়ি সরালে দেখা যাবে, ওদের বংশলতিকাতেও কাঁটা।

উস্তাদ (টি-২৪) মছলিরই এক নাতি। অমিত শক্তিশালী, জিপসি দেখে নির্লিপ্ত, পর্যটকদের পছন্দের। চল্লিশ বর্গকিলোমিটারে একা রাজত্ব করছিল, মছলি পর্যন্ত বিরক্তিতে সরে গিয়েছিল জঙ্গলের কিনারে। রণথম্ভোর থেকে সরিষ্কায় কিছু বাঘকে সরিয়ে নিয়ে গেলে আরও অনেকের সঙ্গে উস্তাদেরও মেজাজটা বিগড়ে গেল। তার উপরে বন দফতর তার প্রতি অতিরিক্ত যত্নশীল। পায়ের চোটে খোঁড়াচ্ছে উস্তাদ। তাকে অজ্ঞান করার ওষুধ ছুড়ে তুলে এনে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হল। আবার নজরে রাখতে ঘুম পাড়িয়ে ধরে এনে রেডিয়ো কলার পরানো হল। কলার খারাপ হয়েছে, ফের তাকে তুলে আনা হল। প্রকৃতির দুর্দম সন্তান, মানুষের এই বাড়াবাড়ি সইবে কেন?

বল্মীক থাপর তার বিষয়ে বলেছেন, হিমশীতল খুনে দৃষ্টি। যেন এক তুফান ফুঁসছে। ২০১০-এ রণথম্ভোরের প্রাণপুরুষ ফতেহ সিংহ রাঠৌর অসুস্থ শরীরেই ছটফট শুরু করেন, কারণ উস্তাদ এক কাঠুরেকে ধরে খেতে শুরু করেছিল। একই জায়গায় দ্বিতীয় শিকার হন পশুপালক আসফাক। বল্মীক এ সময়ই উস্তাদকে জঙ্গল থেকে সরানোর কথা বলে পশুপ্রেমীদের অধিকাংশের চক্ষুশূল হন।তবুও একাই লড়ছিলেন ব্যাঘ্রপুরুষ, কারণ, ফতেহ মারা গিয়েছেন।

পরের শিকারটি ধরার সঙ্গে সঙ্গে বন দফতরের স্নেহের পট্টিটি খুলে পড়ে। জিপসি-যাত্রীরা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আক্ষেপ করছিলেন, বাঘ দেখা হয়নি। বৃষ্টির পরে রাস্তা সারাইয়ের তদারকিতে ছিলেন ফরেস্ট অফিসার ঘিসু সিংহ। শুনতে পেয়ে ভারী বুটের শব্দ তুলে এগিয়ে এলেন, ‘টাইগার দেখোগে? উয়ো রহা।’ বলে বুক চিতিয়ে জিপসির পিছনে ঝোপের দিকে গেলেন। উস্তাদ তাঁকে মাটিতে পিষে দিল। প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, প্রায় পুরো বন দফতর জিপ নিয়ে ছুটে এসেছিল। কিন্তু উস্তাদ ঘিসু সিংহকে সকলের সামনে খাবেই। তার পরের শিকার এক বনরক্ষী, রাম সিংহ সাইনি। আর কোনও রক্ষী উস্তাদের এলাকায় কাজ করতে চাইছিলেন না। পথচলতি মানুষ দেখলেই পিছনে হাঁটত। গ্রামবাসীরা বলেছিলেন, জঙ্গল জ্বালিয়ে দেবেন। উস্তাদকে সজ্জনগড়ের চিড়িয়াখানায় পাঠানো হল। অন্ত্রের ক্যানসারে তার জীবনাবসান ঘটে ২০২২-এ।

বন দফতর তবু অবিচল। মছলির পৌত্রী অ্যারোহেড-এর ক্যানসার ধরা পড়তে বিশ্ব জুড়ে হাহাকারের আবহে সিদ্ধান্ত হয়, অ্যারোহেডকেও খাবার দেওয়া হবে। জঙ্গলের রানি অ্যারোহেড শেষে গণেশের রূপে মজেছিল। গণেশ মছলিরই বংশধর, তবে তারও ভাবগতিক গোলমেলে। লেপার্ড, ভালুক মেরে খেত। অ্যারোহেডের শেষ পক্ষের সন্তান কানকাটি ও বাকি দুই শাবকের মধ্যে গণেশের জিন প্রকট, তবু বন দফতর পুরো পরিবারের জন্য শিকার বেঁধে রাখছিল, পর্যটক চলাচলের রাস্তার ধারে। এক দিন গণেশমন্দিরের সেই পথে চলার সময় ঠাকুমার হাত ছাড়তেই সাত বছরের হতভাগ্য বালককে ডেকে নিয়ে গেল ওর পূর্বপুরুষেরা। রক্তের ছিটে পড়ল যোগীমহলের রাস্তাতেও। কর্তব্যরত যুবা রেঞ্জারকে মারল কানকাটি। মানুষকে খাবারের সঙ্গে দেখত, ফলে মানুষের সঙ্গে খাবারের তফাত করতে পারেনি হয়তো।

অ্যারোহেডের এক পুরুষ শাবকও জৈন মন্দিরের পুরোহিতের প্রাণ কেড়েছে। এর পরে বন দফতর নিয়তির রাস্তা থেকে সরে দাঁড়াল, শাবকদের অপেক্ষাকৃত মনুষ্যবিরল অন্য অরণ্যে পাঠাল, প্রতিবাদের মুখে অ্যারাহেডেরও খাবার সরবরাহ বন্ধ হয়। তারই ফলাফল জীবনের দীপ নিবে যাওয়ার দিন কয়েক আগে শীর্ণকায় রানির সেই ভাইরাল হয়ে যাওয়া অবিশ্বাস্য কুমির শিকার।

মৃত্যুর পথরোধ করলে শাস্তি কিন্তু পাবেই।

মনোযোগী: জল থেকে মুখ তুলে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে পুরুষ বাঘ জামহোল। ছবি: নীলাঞ্জন গঙ্গোপাধ্যায়

শব্দ কোরো না

হুমহুনা রে হুমহুনা/ পাল্কি চলে.../ দুলকি চালে/—

ব্রিটিশ আমলের বাংলা। শ্বেতাঙ্গ শিকারিদের বিবরণে পাচ্ছি পাল্কিতে বাঘ পড়ার ঘটনা। এরা সব দুঁদে মানুষখেকো। তাই মানুষের গতিবিধি নজর করত। পাল্কির শব্দ শুনে বেহারা ধরার চেষ্টা করত, তুলে নিয়ে যেত নববধূকেও। তাই নিয়েও অবশ্য আলাদা লোকগাথা আছে। আবার গরুর গাড়ির শব্দেও নাকি বাঘ আসত। মধ্য ভারতে গিয়ে শুনলাম, এক বাঘিনি ঝুমঝুমঝুম ঘণ্টা শুনে ডাকহরকরা খুঁজে মারত। শেষে এক শিকারি নাকি রানারের ঘণ্টা বাজিয়ে তাকে আকৃষ্ট করে শেষ করেন।

শুনছি, উত্তর ভারতে মোবাইলের শব্দ, রিলের কর্কশ ধ্বনি থেকে মানুষের সন্ধান পাচ্ছে ধূর্ত বাঘেরা। তবে, এই শতাব্দীতে কিন্তু শব্দই হতে পারে রক্ষাকবচ। কারণ, আগের চেয়ে মানুষখেকোর সংখ্যা কমেছে। সাধারণ বাঘ ‘স্টেলথ হান্টার’। চুপিচুপি শিকারই তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। শব্দ শুনলে, দলবদ্ধ মানুষ দেখলে সে সরে যায়। তবে বনের জীব, নিশ্চিত কিছু বলা যায় না। বান্ধবগড়ের পাহাড়ের উপর যে রুদ্রমন্দির, তার পথেই চক্রধারা বাঘিনি ও তার শাবকদের এলাকা। মানুষ দেখলে তেড়ে আসে। কিন্তু, পূজারিকে কিছু বলে না। তার একটা যুক্তিগ্রাহ্য কারণ নাকি তিনি একা যান না এবং ঘণ্টা বাজাতে থাকেন।

প্রলয় আসবেই শিকারে চোখ দিলে। কিষাণপুর এলাকায় একটি বাঘ বুনো শুয়োর মেরেছিল। এক দল তরুণ সেই শিকার তুলে এনে ভোজ করেছে। তার পর শিকার নিতে বাঘ গ্রামের দিকে এসে গবাদি পশুকে মেরে খেয়ে নিয়েছে। এ বার সে গরু-ছাগলের লোভে বারে বারে গ্রামে ঢুকছে। ক্ষুধার্ত বাঘের খাবার সরালে সামনে যা পাবে, তা-ই নেবে। সে কিন্তু মানুষও হতে পারে। বান্ধবগড়ের এই গ্রামে যেমন। বাঘ এক গ্রামবাসীকে নিয়ে গিয়েছিল। দেহ উদ্ধার করে আনলে পিছনে আসে সেই চণ্ডমূর্তি দানব। সৎকার না হওয়া পর্যন্ত গ্রামে ঢুকে ঝোপে বসে ছিল সে। তিন রাত পর পর চক্কর কেটে গিয়েছে। শেষে বন দফতর সরিয়ে নিয়ে যায়।

অবনীর রক্তবীজ

নব-ভারতের ভয়াল মানুষখেকোর তালিকায় অবনীই হয়তো প্রথমে আসবে। মহারাষ্ট্রের ইয়বতমাল জেলার সেই দুর্দান্ত বাঘিনি, যাকে মানুষখেকো ঘোষণা করে পেশাদার শিকারিকে ডাকা হয়। ঘুমপাড়ানি ডার্ট ছোড়ার বদলে শিকারি গুলি করলেন কেন, অবনী আদৌ একাই তেরো জনকে খেয়েছে নাকি চক্রান্তের শিকার— তা নিয়ে আজও বিতর্ক ও মামলা চলছে। টিপেশ্বর বাঘবনের এক সূত্রের দাবি, একে তো ক্ষতিপূরণ দিতে হচ্ছিল, তায় ওই এলাকায় অরণ্যের অধিকার টেনে এনে শিল্পক্ষেত্রের আকাঙ্ক্ষায় বাধা দিচ্ছিল অবনী। ফলে ‘মারতে’ প্রায় সেনা-অভিযান চালানো হয়েছিল।

কিন্তু জঙ্গলের বিচার কী বলে? মহারাষ্ট্র জুড়ে ফিসফাস, অবনীর সঙ্গে অন্যায় হয়েছে, বাঘোবা জেগে গিয়েছেন। মরাঠিরা বাঘোবাকে মনে করেন প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে সমতার রক্ষী। যখন গরিব মানুষকে গাছে টোপ বেঁধে শ্বেতাঙ্গ শয়তান মাচার উপর উঠে বসত, তখন ছলনাময়ী নারীর রূপে তাঁকে মারতে আসতেন বাঘোবা-ভগবান। অনেকে তো তাঁর পিঠে গোন্দরাজ তাড়ুকে দেখারও গল্প বলেন। হয়তো নিছক কুসংস্কার নয়। লোকবিশ্বাসের মধ্যেই জঙ্গল ও মানববসতির মধ্যের সুরক্ষার বেড়াটা পুঁতে দেওয়া থাকে। এর মাধ্যমে বলা হচ্ছে যে, জঙ্গলের প্রতি, জঙ্গলবাসীদের প্রতি অন্যায় বরদাস্ত করা হবে না।

মহারাষ্ট্র জুড়ে, বিশেষত চন্দ্রপুর জেলায় বাঘের হামলায় মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। বাঘের বৃদ্ধি ও বাসস্থান সঙ্কোচনের ফলাফল। গ্রামবাসীদের ধারণা, অবনী বাঘিনির হয়ে শিক্ষা দিচ্ছেন বাঘোবা। নাগপুর থেকে বনের পথ ধরলে জায়গায় জায়গায় বাঘোবার ছোট ছোট মূর্তি বসিয়ে পূজা চলছে। কিছুটা আমাদের দক্ষিণ রায়ের মতোই অবয়ব। যেখানে যেখানে বাঘ ঝাঁপিয়েছে, সেখানেই মূর্তি। অর্থাৎ, এ ধারে আসিয়ো না।

লোকবিশ্বাস না বিজ্ঞান— কার কথা যে শুনব, জঙ্গলে ঢুকলে সব যুক্তিবুদ্ধিকে বাঘে টেনে নিয়ে যায়।

বাঘেসুরের গুহা

প্রশ্ন উঠবে, নতুন ভারতের নরখাদকদের গল্পে দুধওয়ার তারা বাঘিনি নেই কেন। আসলে এই বর্ণনায় সেই কাহিনিগুলি উঠে এসেছে যার সাক্ষ্যপ্রমাণ স্বচক্ষে দেখা, একমাত্র পীলীভীত ছাড়া। পীলীভীতের ঘটনা তাজা, অনেকেরই পুঙ্খানুপুঙ্খ জানা। উস্তাদের চলার পথে আমি নিজে গিয়ে তথ্য কুড়িয়ে এনেছি আর তার পরে সেই রাস্তা দিয়েই হেঁটে গিয়েছে কানকাটিরা। অবনীর চোখের জলের রং দেখেছি মহারাষ্ট্রের জঙ্গলের রাস্তার ধারে, ওয়ারলিদের দেওয়ালচিত্রে। আর, সেই যে গ্রামে মৃতদেহের খোঁজে হানা দিয়েছিল হিংস্র শ্বাপদ, সেখানেই তো চিত্রা পেঁচার ছবি তুলতে গিয়েছিলাম, না জেনে, বনের টানে…

সেখান থেকে যে স্থানীয় মানুষটি আমাদের ফিরে যেতে বলছিলেন, তিনিই বলেছেন, “পর্যটকরা টুরিজ়ম জ়োনের বাঘেদের দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু নন-ট্যুরিজ়ম বাঘেরা আরও খতরনাক। সন্ধের অপেক্ষা করে না। রোদের ঝাঁজ কমলেই গ্রামের রাস্তায় ঘোরে। রাতে আমরা কেউ শৌচালয় ব্যবহার করতে পারি না। কারণ আলো নেই। চার পাশে বেড়া নেই। আমাদের কথা কেউ ভাবে না।”

সেই শুনে যখন হাঁটার গতি বাড়িয়ে জিপসির দিকে যাচ্ছি, পা যেন ভারী হয়ে উঠেছিল। অন্ধকারে গাড়ি চলছিল ধীরে, জঙ্গলের গতিসীমা মেনে। জায়গাটা মানুষখেকোর আড্ডা শোনা-ইস্তক রাস্তার দিকে পিছন ঘুরে বসেছিলাম। যদি কেউ পিঠে হাত দেয়, সেই আতঙ্কে।

আমাদের অরণ্যাবাসটাও তো বাঘের জঙ্গলের মাঝমধ্যিখানেই। কিন্তু শক্ত দরজা, সুইচবোর্ড, চার পাশে কাঁটাতার। জানলা দিয়ে গ্রামের দিকের নিকষ আঁধার দেখে মনে হচ্ছিল, আমি কোনও অন্যায় করছি?

বনকর্মীরা বলেছিলেন, গ্রামবাসীরা সতর্কবার্তা শোনেন না। কিছু বোঝাতে গেলে ঘিরে ধরে ক্ষোভ দেখান। আমাদের জিপ-চালকের বিশ্লেষণ, বন দফতরে এত সমস্যা, সামলানোর লোকবল নেই। নিচু স্বরে কথা হচ্ছিল ঝোপের পিছনে লুকিয়ে, কয়েক হাত দূরে ধামোকর বাঘ ঘুমোচ্ছিল। হঠাৎ আমাদের উপস্থিতি বুঝে রেগেমেগে উঠে দাঁড়াতে গেল, জিপ পিছোনোরও সময় নেই। আঁতকে জিপের ভিতর পড়ে গেলাম। বাঘ অবশ্য বসে পড়ল। গাইড বললেন পেটটা ভরা, আলসে ব্যাটা। মনে ভয় জমল, নিয়ম ভাঙলাম?

এত বার ভিতরে গিয়েছি, কোনও দিন কিন্তু এত বয়স্ক গাইড দেখিনি জঙ্গলে। যে জ়োনে গত সাত দিন কোনও সাইটিং নেই, সেই জ়োনে গাড়ি ঢোকার পাঁচ মিনিটের ভিতরে জলাশয়ের মধ্যে বাঘ খুঁজে দিলেন। সেও কি শুধুই অভিজ্ঞতার জোর? তায় সে বাঘ খোদ জামহোল মেল, তরুণ দস্যু। পাক্কা আড়াই ঘণ্টা ক্যামেরায় চোখ রেখে অপেক্ষা করছিলাম কখন জল থেকে ওঠে। সেও এ দিকে ঠায় তাকিয়ে। দূরবিনে দেখলাম, তার নিষ্পলক নীল চোখের তারায় নিষ্ঠুর হুমকি— ‘এক বার নাম জিপ থেকে, তিন সেকেন্ডে ধরব।’

অন্য বাঘের ছবি তুলে একটু পরে আবার সেখানে এলাম, জামহোল তখন জলাশয়ে নেই। ফেরার রাস্তায় দেখি, যে পথে আমাদের জিপসি যাচ্ছে, তার পাশে পাশে কোথাও কোথাও বাঘের থাবার টাটকা ছাপ। দরদর করে ঘাম পড়ছিল, ও কি আমাদের সঙ্গে চলেছে?

বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নামল। ফলে, বাঘের তল্লাটে আবছায়া আলোর মধ্যেই দাঁড়াতে হল, গাড়ির হুড টানতে। গাইড চলে যাওয়ার আগে বলে দিলেন, সাবধান। জামহোল পিছু নেয়।

দশ মিনিটের পথে রিসর্ট। একটি কথা ফুটছিল না মুখে। কারণ, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানতাম, বাঘ জঙ্গলের শর্টকাট জানে। যদি আমাদের ভীতির গন্ধ ওকে টানে? যদি কে কোথা দিয়ে যাবে তা বুঝে ওত পেতে থাকে?

রিসর্টেও শান্তি নেই। সেখানকার প্রকৃতিবিদ বললেন, জামহোল ঢুকতে পারবে না। কারণ এটা টালা জ়োন। এখানেই বান্ধবগড় দুর্গ। লক্ষ্মণকে এ দুর্গ উপহার দেন রামচন্দ্র। রামানুজের নিরাপত্তার জন্য টালা গ্রাম রক্ষা করেন মহাদেবের বশংবদ বাঘেসুর। বান্ধবগড়ের রাজা বজরং খোদ এই রিসর্টের বাইরেই বসে থাকে। অঘটন ঘটে না।

এক বিশালাকার বাঘ আমাকে অনুসরণ করছে, আর তাকে বাধা দিচ্ছে আরও ভয়াবহ এক বাঘ। যে নাকি পুরাণের পাতা থেকে উঠে এসেছে। সন্ধ্যায় কেউ বাইরে যায় না, কারণ সীতাকুণ্ডে বাঘেসুরের সেবা হয়। সেই সেবা দেখলে তুমি ব্যাঘ্রযোনিতে আজীবন আটকে থাকবে। গুহার দেওয়ালে লেখা আদিম মন্ত্রোচ্চারণ শুনলে তবে মুক্তি। মনে হচ্ছিল, ছোটবেলায় দেখা ‘জুনুন’ সিনেমার ভয়ঙ্করের এলাকায় এসে পড়েছি। এত চাপ আমার অবিশ্বাসী স্নায়ু নিতে পারল না। জ্বর এল। পরের দিনের জঙ্গলভ্রমণের পরিকল্পনা বাতিল হল। হৃৎকম্প বাড়িয়ে প্রকৃতিবিদ বললেন, বজরং চায়, আপনি ঘরে থাকুন। কুছ গলত হোনেওয়ালা হ্যায়…

এই কারণেই বলছিলাম, লোকবিশ্বাসের জাদু-বাস্তবতা ছাড়া জঙ্গলের আখ্যান কখনও সম্পূর্ণ হয় না। আর সেটা লুকানো থাকে সাপ-বাঘ-কুমির দিয়ে ঘেরা জঙ্গলের গুপ্তকক্ষে। তাই তরাইয়ের বাঘ-হামলা, দক্ষিণ ভারতে বাঘকে বিষ দিতে উদ্যত মানুষ— সব পক্ষের যন্ত্রণা জানতে নিজেকেই নামতে হবে সেই গভীর অন্তঃস্থলে। মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে।

সে সব উত্তর নিয়ে আসব আবার কখনও, যদি রক্ষা করেন মহাকাল।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন