কমলালেবু, রোদে

এখন সব কিছুর ওপরেই ছড়ি ঘোরায় রোদ। গাড়িগুলো গিলে ফেলে গোটা রাস্তাটাকে, ধাতব দাঁতগুলো কড়মড়িয়ে ধেয়ে যায় রাস্তার কোণে দাঁড়ানো আনমনা খোঁড়া লোকটার দিকে। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জরিপ করে সামনের প্রশস্ত কালোপানা পথটাকে, অনুভব করে গরম, মনমরা ফুটপাত থেকে ওঠা ভাপটাকে।

Advertisement

ইয়াহিয়া বিন সালাম আল-মুন্ধ্রি

শেষ আপডেট: ১৫ জুন ২০১৪ ০০:০০
Share:

ছবি: সায়ন চক্রবর্তী।

এখন সব কিছুর ওপরেই ছড়ি ঘোরায় রোদ।

Advertisement

গাড়িগুলো গিলে ফেলে গোটা রাস্তাটাকে, ধাতব দাঁতগুলো কড়মড়িয়ে ধেয়ে যায় রাস্তার কোণে দাঁড়ানো আনমনা খোঁড়া লোকটার দিকে। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জরিপ করে সামনের প্রশস্ত কালোপানা পথটাকে, অনুভব করে গরম, মনমরা ফুটপাত থেকে ওঠা ভাপটাকে।

সে তার কমলালেবুর ঠোঙাটাকে আঁকড়ে ধরে, একটু আগেই যেগুলো সে কিনেছে ফলওয়ালার কাছ থেকে, সময় নিয়ে, একটা একটা করে বেছে। সে ভাবে, ঘরে গিয়ে যখন ওর বাচ্চাদের হাতে কমলালেবুগুলো দেবে, ওরা কত খুশিই না হবে! ওরা ঘুরে ঘুরে নাচবে, ওদের বাবাকে আলতো গরম চুমুতে ভরিয়ে দিতে হুটোপাটি করবে। ঠোঙাটা সবার হাতে হাতে ঘুরবে, আর প্রত্যেকে একটা করে লেবু তুলে নেবে, খোসা ছাড়াবে।

Advertisement

এখন আপাতত সে রাস্তা পেরনোর অপেক্ষায়।

ঝলসানো রোদ ওর মাথা আর ঘাড়ে আছড়ে পড়ছে। ও ঘামছে। ওর চোখদুটো পুড়ছে যেন। যাচ্ছেতাই রোদটার থেকে মুখটাকে আড়াল করতে সে তার হাতের পাতাটা ভুরুর কাছে তুলে ধরে। চড়া হলুদ রোদটাকে তাতে সামান্যও দমানো যায় না অবশ্য।

যখন...

যখন গোটা ফুটপাতটা...

যখন গোটা ফুটপাতটাই গনগনে গরম আর ভীষণ মনমরা...

গাড়িগুলো গোটা রাস্তাটাকে গিলে ফেলে, গরম হাওয়াটাকে চিবিয়ে থু থু করে ফেলে দিচ্ছে কালো ধোঁয়ার ছিবড়ে। খোঁড়া লোকটা রাস্তা পার হওয়ার জন্য এক পা বাড়িয়েই আবার পিছিয়ে আসে।

ঠিক সেই সময়, লোকটার বউ রান্নাঘরের জং-ধরা কলটার সামনে দাঁড়িয়ে, কল থেকে ফোঁটা ফোঁটা জলের ফোঁপানি দেখছিল। সে আসলে চাল ধুচ্ছিল, আর ওড়নাটা দিয়ে কপালের ঘামও মুছছিল। জানলার বাইরে তাকিয়ে সে দেখল তার দুই ছেলে একটা বল নিয়ে খেলছে। ওরা একসঙ্গে হাসছে, চিত্‌কার করছে, দেখে তার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে বাকি বাচ্চারা একটা মন্থর পাখার নীচে একটা গালচে পেতে তার ওপর হোমওয়ার্ক সারছে, পড়া তৈরি করছে কালকের স্কুলের।

উঠোনে খেলা বাচ্চাদুটোর চিত্‌কার আরও বাড়ছিল।

সেই সময়, ওদের বাবা রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছিল। সে তাদেরকে কমলালেবু খাওয়াবে বলে কথা দিয়েছে, মরশুমি ফল বলে কথা। পরের মাসে সে হয়তো ওদের লাল টুকটুকে আপেল কিনে দেবে। কল্পনায় সে দেখছিল, ওরা প্রত্যেকে কেমন আপেলে কামড় বসাচ্ছে।

ফুটপাতটা লোকটাকে হুল ফোটাতে থাকে।

গনগনে, মনমরা ফুটপাত।

কান ঝালাপালা করা হর্ন। মা’র স্মৃতি, দুর্ঘটনায় ওর বাঁ পা-টা খোঁড়া হয়ে যাওয়ার স্মৃতি লোকটার চোখের সামনে পর পর ভেসে উঠল। মা তখন ওর মেয়েটাকে সেলাই শেখাচ্ছিল, আর ওর মেয়ে ঠাকুমাকে শেখাচ্ছিল, কী ভাবে লিখতে হয়। মা পরে ছেলেকে বলেছিল, ওর যে দুর্ঘটনা হয়েছে তা জানার আগে থেকেই তাঁর মনটা কেমন যেন কু গাইছিল। তার পরেই তিনি জ্ঞান হারান।

সে চেষ্টা করছে তার ভাবনা থেকে এই স্মৃতিটাকে মুছে ফেলতে। রাস্তাটা ওকে পার হতেই হবে, কিন্তু ও কিছুতেই পারছে না। চারদিকে শুধু হর্নের হুংকার, গাড়িচালকদের খিস্তির পিচকিরি।

যখন...

যখন গোটা ফুটপাতটা...

যখন গোটা ফুটপাতটাই গনগনে আর মনমরা। আর সব কিছুর ওপরেই রোদের ছড়ি ঘোরানো।

গাড়ির জানলাগুলো সব রঙিন মুখের ঝাপসা ছবিতে ভরা। ভেসে ওঠা মুখগুলোর কোনও কোনওটা কখনও রাগী, আবার কখনও খুশিয়াল। আবার কখনও মুখগুলো দেখে মনে হয় পুরনো বন্ধুদের ছবির মতো, সময়ের স্রোতে আবছা হয়ে গিয়েও ফের জেগে-ওঠা। এই গনগনে সূর্যের নীচে দাঁড়িয়ে ক্ষয়াটে স্মৃতিগুলো উজলে ওঠে।

মুখগুলো এই ভাবে ফিরে ফিরে আসে আর লোকটার থরথরে হৃত্‌পিণ্ডটাকে আরও ঝাঁকিয়ে দিয়ে যায়, জাগিয়ে দিয়ে যায় সেই সব মুহূর্তগুলো, যাদের সুখ-দুঃখ ছিল ওর নিত্য সঙ্গী।

স্মৃতিগুলো এখন শুধু গাড়ির ভেতরে বয়ে চলা কিছু ছুটন্ত ছবি। আর সে দাঁড়িয়ে আছে আর একটা গনগনে মনমরা ফুটপাতের ওপর, আরও একটা রাস্তার সামনে, যেটা ওকে পেরোতেই হবে।

একটু দোনামোনা করে সে ফুটপাত থেকে রাস্তার কোনার দিকে তার ডান পা-টা বাড়াল। আবার গুটিয়েও নিল সঙ্গে সঙ্গে, কেননা বিকট হর্ন বাজিয়ে একটা গাড়ি আসছিল সে পথেই। আচমকা সামনে এসে পড়া এক গাড়ির তীব্র আওয়াজে কোনও রকমে পিছিয়ে এল। যেন ও ফুটন্ত জলে পা দিয়ে ফেলেছিল, তাই যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল।

আবার একটা সুযোগ। আবার একটা পরীক্ষা।

রাস্তায় ট্রাফিক কমে আসে মুহূর্তের জন্য। যে গাড়িগুলো আছে, সেগুলোও এখন বেশ খানিকটা দূরে। রোগাভোগা শরীরের সব পেশিগুলোকে একজোট করে সে নেমে পড়ল রাস্তার কোনাটায়। তার পর খোঁড়াতে খোঁড়াতে যত দ্রুত সম্ভব এগিয়ে চলল মোটকা রাস্তাটার ও পারের দিকে।

পারলও, অবশেষে।

শরীরে যেন প্রাণ ফিরে এল ওর। চোখগুলো কচলাল, বসল আরাম করে, আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাল। শ্বাসপ্রশ্বাস আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হল।

আর হঠাত্‌, ওর জয়ের আনন্দটা নিভে গেল। মনে পড়ে গেল কমলালেবুর ঠোঙাটার কথা।

কিন্তু...

ওর হাতে তো কিছু নেই! হাত বেয়ে শুধু দরদর নেমে আসছে ঘামের ধারা।

সে তাকাল ফুটপাতটার দিকে, যেখানে একটু আগেই দাঁড়িয়ে ছিল। কমলালেবু-সুদ্ধ ঠোঙাটা পড়ে আছে, গনগনে সূর্যের নীচে।

একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ওর ভেতর থেকে, দুঃখে।

রাস্তা, গাড়ি, সূর্য, দূরের কমলালেবুর ঠোঙা, সব কিছুর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল ও। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলল বাড়ির দিকে। মাথা নিচু, শরীর থরথর, চোখদুটো ঝাপসা। আর দু’হাত ফাঁকা।

অনুবাদ বিশ্বদীপ চক্রবর্তী।

biswadeepchakraborty@rocketmail.com

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement
Advertisement