রবীন্দ্রনাথের বই-বাজার

কবিতার বই পাঁচশো বিক্রি হওয়ার আশা অবশ্য আজও তরুণ কবির স্পর্ধা বলে গণ্য হয় বইপাড়ায়৷ সে দিনও ছবিটা একই ছিল৷ আর রবীন্দ্রনাথ সাধারণ পাঠক সমাজে তখনও তরুণ অখ্যাত কবিই, সে বঙ্কিমচন্দ্র যতই নিজের গলার মালা তাঁকে পরিয়ে দিন না কেন৷ লিখছেন আশিস পাঠককবিতার বই পাঁচশো বিক্রি হওয়ার আশা অবশ্য আজও তরুণ কবির স্পর্ধা বলে গণ্য হয় বইপাড়ায়৷ সে দিনও ছবিটা একই ছিল৷ আর রবীন্দ্রনাথ সাধারণ পাঠক সমাজে তখনও তরুণ অখ্যাত কবিই, সে বঙ্কিমচন্দ্র যতই নিজের গলার মালা তাঁকে পরিয়ে দিন না কেন৷ লিখছেন আশিস পাঠক

Advertisement
শেষ আপডেট: ০৯ মে ২০১৫ ০০:০০
Share:

সুনীল গাঙ্গুলির দিস্তে দিস্তে লেখায় নয়, তরুণ রবীন্দ্রনাথ সাময়িক মরেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে৷

Advertisement

বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ যে বছর বেরোল (১৮৭৮), সেই বছরই প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের প্রথম বই ‘কবি-কাহিনী’৷ বঙ্কিম বেঁচে থাকতে ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এর চারটে সংস্করণ হয়, ‘কবি-কাহিনী’র একটাও না৷ সংস্করণ তো দূরের কথা, প্রথম পাঁচশো কপিরই দশা যে কী হয়েছিল তা ‘জীবনস্মৃতি’-তেই লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ৷ মজা করে বলেছেন, ‘শুনা যায় সেই বইয়ের বোঝা সুদীর্ঘকাল দোকানের শেল্‌ফ্‌ এবং তাঁহার চিত্তকে ভারাতুর করিয়া অক্ষয় হইয়া বিরাজ করিতেছিল।’

তাঁর প্রথম বই-ই প্রকাশকের ক্ষেত্রে রীতিমতো বোঝা হয়ে উঠেছিল৷ অবশ্য, সেই প্রকাশক মোটেই বই ছেপে বাণিজ্য করতে চাননি৷ সে বই ছাপা ছিল নিছক বন্ধুকে তাক লাগিয়ে দেওয়ার জন্য৷ প্রবোধচন্দ্র ঘোষ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের বন্ধু৷ রবীন্দ্রনাথ যখন আমদাবাদে, মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে, তখন তাঁর ‘উৎসাহী বন্ধু এই বইখানা ছাপাইয়া আমার নিকট পাঠাইয়া দিয়া আমাকে বিস্মিত করিয়া দেন।’ হুটহাট বই ছাপায় রবীন্দ্রনাথের বরাবর আপত্তি ছিল, এমনকী রচনাবলীতেও সব লেখা ছাপিয়ে মেহগনির মঞ্চ-ভরানো পঞ্চ হাজার গ্রন্থের লেখক তিনি হতে চাননি, সুতরাং কাজটাকে তিনি ভাল মনে নেননি৷ স্পষ্ট লিখেছেন, ‘তিনি যে কাজটা ভালো করিয়াছিলেন তাহা আমি মনে করি না, কিন্তু তখন আমার মনে যে-ভাবোদয় হইয়াছিল, শাস্তি দিবার প্রবল ইচ্ছা তাহাকে কোনোমতেই বলা যায় না। দণ্ড তিনি পাইয়াছিলেন, কিন্তু সে বইলেখকের কাছে নহে— বই কিনিবার মালেক যাহারা তাহাদের কাছ হইতে।’

Advertisement


রবীন্দ্রনাথকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি লিট প্রদান অনুষ্ঠানে
ভারতের প্রধান বিচারপতি স্যার মরিশ গ্যয়ার প্রমুখ। ৭ অগস্ট ১৯৪০।

বই কেনার এই মালিকেরা, অন্তত নোবেল পাওয়ার আগে পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথকে বিশেষ মাথায় করে কোনও দিন রাখেননি৷ খান পঁচিশেক বই তাঁর প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের আগে৷ তার মধ্যে চারটে দ্বিতীয় সংস্করণ এবং দুটো তৃতীয় সংস্করণ পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছিল৷ বাকি উনিশটি একমেবাদ্বিতীয়ম৷ দ্বিতীয় সংস্করণ হয়েছিল ‘সন্ধ্যাসংগীত’, ‘রাজা ও রানী’, ‘কড়ি ও কোমল’ আর ‘প্রভাতসংগীত’-এর। আর ‘বউ-ঠাকুরানীর হাট’ এবং ‘বাল্মীকি-প্রতিভা’ ছুঁতে পেরেছিল তিনের কোঠার সংস্করণ৷ এই শেষ দু’টি এবং ‘রাজা ও রানী’ ছাপা হয়েছিল হাজার কপি। বাকি সব পাঁচশো করে৷

কবিতার বই পাঁচশো বিক্রি হওয়ার আশা অবশ্য আজও তরুণ কবির স্পর্ধা বলে গণ্য হয় বইপাড়ায়৷ সে দিনও ছবিটা একই ছিল৷ আর রবীন্দ্রনাথ সাধারণ পাঠক সমাজে তখনও তরুণ অখ্যাত কবিই, সে বঙ্কিমচন্দ্র যতই নিজের গলার মালা তাঁকে পরিয়ে দিন না কেন৷

অবিক্রীত বই নিয়ে বারে বারে সমস্যায় পড়েছেন রবীন্দ্রনাথ৷ এমনকী, তাঁর গানের বই ‘রবিচ্ছায়া’-কে রীতিমতো কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে দাম কমিয়ে বিক্রি করাতে হয়েছে৷ ১৮৮৫-র জুনে সে বই বেরোয়। মাস সাতেক পরে সাপ্তাহিক ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকার বেশ ক’টি সংখ্যায় বেরোল বিজ্ঞাপন,


গাড়িতে চলেছেন রবীন্দ্রনাথ। সঙ্গে মেদিনীপুরের জেলাশাসক বিনয়রঞ্জন সেন প্রমুখ।

মূল্য কমিল র বি চ্ছা য়া মূল্য কমিল

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় মুগ্ধ হন নাই এমন শিক্ষিত বাঙ্গালী বিরল৷ তিনি কবিতা লিখিয়া বঙ্গভাষায় এক যুগান্তর উপস্থিত করিয়াছেন৷ সেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীতগুলি একত্র মুদ্রিত হইয়া ‘রবিচ্ছায়া’ নামে এত দিন বিক্রীত হইতেছিল৷...এতকাল বারো আনা করিয়া ‘রবিচ্ছায়া’ বিক্রয় হইতেছিল৷ অতঃপর আট আনা মূল্য নির্ধারিত হইল৷’ শুধু এই নয়, গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় অ্যান্ড সন্স এমন বিজ্ঞাপনও দিয়েছিল যে ‘গুরুদেবের বই একত্রে সকলগুলি লইলে অর্ধমূল্যে দিই৷’

এর সঙ্গে অবশ্য রবীন্দ্রসাহিত্যের মানবিচারের কোনও সম্পর্ক নেই৷ বাজারের সমকাল কবেই বা আর যুগান্তরকে কুর্নিশ জানিয়েছে? এ কেবল এক নিজের সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে থাকা এক স্রষ্টার সৃষ্টির মূল্য নিয়ে কাঞ্চনরঙ্গ৷ তার ফলে বন্ধু প্রিয়নাথ সেনকে রবীন্দ্রনাথও লিখতে বাধ্য হন, ‘আমার বাড়ি তৈরি বাবদ লোকেনের কাছে আমি ৫০০০ টাকা ঋণী৷ ঐ সম্বন্ধে খুচরা ঋণ আরো কিছু আছে৷ আমার গ্রন্থাবলী এবং ক্ষণিকা পর্যন্ত সমস্ত কাব্যের কপিরাইট কোন ব্যক্তিকে ৬০০০ টাকায় কেনাতে পার?...আমার নিজের দৃঢ় বিশ্বাস যে লোক কিনবে সে ঠকবে না৷’

বিশ্বাসটি যে অমূলক নয় তার প্রমাণ আজ, এই কপিরাইট-উত্তর পর্বেও বাংলায় প্রকাশিত বইয়ের মোটামুটি চার আনা রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে৷

হবে না-ই বা কেন, বই-বাঙালির বারো আনাই যে গড়ে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ৷


মহিলাদের এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ। ১৯৩৯-এ মেদিনীপুরে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement