Plague Outbreak

‘ব্ল্যাক ডেথের’ প্রায় ৫০০০ বছর আগে ছড়িয়েছিল প্লেগ! মানবদেহে সংক্রমণের প্রাচীনতম উদাহরণ মিলল কবর খুঁড়ে

গবেষণা শুরু হয়েছিল প্রায় এক দশক আগে। ওই সময় সাইবেরিয়ার এক প্রাচীন সমাধিক্ষেত্রে কবর খুঁড়ে প্রচুর শিশু এবং কিশোর-কিশোরীর কঙ্কাল উদ্ধার হয়। সেই কঙ্কালই এ বার ভেঙে দিল প্রচলিত ধারণা।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬ ০৮:৫৬
Share:

— প্রতীকী চিত্র।

১৩৪৬–১৩৫৩ সাল। মানব ইতিহাসে প্লেগের সবচেয়ে মারাত্মক প্রকোপ পড়েছিল এই সময়েই। মাত্র সাত বছরে আড়াই কোটিরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল ইউরোপে, যা ‘ব্ল্যাক ডেথ’ নামে পরিচিত। তারও প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে প্লেগের ভয়াবহ প্রভাব পড়েছিল মানব সভ্যতায়। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় সেই আভাস মিলেছে। গবেষকদের দাবি, সম্ভবত এটিই মানবদেহে প্লেগের প্রকোপের প্রাচীনতম উদাহরণ।

Advertisement

প্লেগ একটি ব্যাকটেরিয়াঘটিত রোগ। এর বিভিন্ন ধরনও রয়েছে। তার মধ্যে বিউবনিক প্লেগের সংক্রমণের খবরই সবচেয়ে বেশি। এর জন্য মূলত দায়ী ‘ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস’ নামে এক ব্যাকটেরিয়া। বর্তমানে ইঁদুর জাতীয় প্রাণীর শরীরে এটি পাওয়া যায়। মাছি বা ছাড়পোকার মতো পতঙ্গদের মাধ্যমে তা অন্য প্রাণীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। প্লেগের প্রসঙ্গে ‘ব্ল্যাক ডেথ’-এর কথাই সবচেয়ে বেশি আলোচিত। তবে তারও আগে থেকে মানবদেহে প্লেগের সংক্রমণ হয়ে আসছে। বেশ কয়েক দফা তা মহামারির আকারও নিয়েছিল। প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যেও প্লেগের সংক্রমণের কথা লিপিবদ্ধ আছে। গত কয়েক দশকে এই ব্যাকটেরিয়া নিয়ে বিস্তর গবেষণাও হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় যা তথ্য উঠে এসেছে, তাতে কিছুটা বিস্মিত বিজ্ঞানীরাও।

এত দিন বিজ্ঞানী মহলে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, এই জীবাণুর প্রাচীনতম স্ট্রেনগুলিতে রোগ ছড়ানোর মতো জেনেটিক বৈশিষ্ট ছিল না। ফলে শুরুর দিকের প্লেগ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারত না। সেই ধারণাকেই এ বার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিল নতুন গবেষণা। এখন দেখা গেল, শুরু থেকেই এই ব্যাকটেরিয়া মানব সভ্যতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলার ক্ষমতা রাখত। গবেষকদলের অন্যতম সদস্য তথা কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনগবেষক এসকে উইলারস্লেভের কথায়, “এটা এত দিনের মডেলের সঙ্গে মিলছে না। কিন্তু এই তথ্যগুলো আমাদের মেনে নিতেই হবে।”

Advertisement

উইলারস্লেভ এবং তাঁর সঙ্গীরা দক্ষিণ-পূর্ব সাইবেরিয়ায় সম্প্রতি প্লেগের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পেয়েছেন। সেখানে বৈকাল হ্রদ সংলগ্ন অঞ্চলে এক সমাধিস্থলে খননকার্য চলছিল। সেখানেই পাওয়া যায় এই স্ট্রেন। গত সপ্তাহে ‘নেচার’ জার্নালে এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়। এত বছর আগেও যে প্লেগের প্রকোপ দেখা যেতে পারে, তা নিয়ে এত দিন কোনও ধারণাই ছিল গবেষকদের। ফলে ওই প্রাচীন সমাধি খুঁড়ে প্লেগের জীবাণুর সন্ধান পাওয়ায় কিছুটা বিস্মিত তাঁরাও।

বর্তমানে গোটা বিশ্বে বছরে প্রায় কয়েকশো মানুষ প্লেগে আক্রান্ত হন। তবে শুরুর দিকে কী ভাবে এই ব্যাকটেরিয়া মানবদেহে সংক্রমণ হয়েছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, কৃষি ও নগর সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছিল। কারণ ওই সময়ে মজুত শস্য এবং অন্য খাবারের দিকে ইঁদুর আকৃষ্ট হত। ইঁদুরের শরীর থেকে মাছির মাধ্যমে মানবদেহে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেশি ছিল। তবে নতুন গবেষণায় যে মানবগোষ্ঠীর মধ্যে প্লেগের ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান মিলেছে, সেই মানবগোষ্ঠী কৃষিকাজ জানত না। শিকারি-সংগ্রাহক এক যাযাবর গোষ্ঠীর মধ্যে ওই ব্যাকটেরিয়া মিলিয়ে। এটিই অবাক করে দিয়েছে গবেষকদের।

প্লেগের সংক্রমণ নিয়ে এই গবেষণার সূত্রপাত হয় ২০১৫ সালে। ওই সময় উইলারস্লেভ এবং তাঁর সঙ্গীরা দক্ষিণ-পূর্ব সাইবেরিয়ার বৈকাল হ্রদ অঞ্চল একটি প্রাচীন সমাধিক্ষেত্রে খননকার্য চালাচ্ছিলেন। সেখানে প্রচুর শিশু ও অল্পবয়সি কিশোর-কিশোরীর কবর পাওয়া যায়। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে তাদের শরীরে কোনও আঘাতের চিহ্ন ছিল না, যা প্রাথমিক ভাবে বেশ অস্বাভাবিক বলে মনে করেন গবেষকেরা। ফলে কবর খুঁড়ে পাওয়া মানব কঙ্কালগুলি নিয়ে আরও গবেষণার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। মোট ৪৬টি কঙ্কাল নিয়ে পরীক্ষানিরিক্ষা করা হয়। তাতে দেখা যায়, ১৮টির মধ্যেই প্লেগের ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন নমুনাটি ৫,৫০০ বছরেরও বেশি পুরনো।

ব্যাকটেরিয়ার স্ট্রেনটি কতটা পুরনো, তার চেয়েও বড় বিষয় ছিল এর ‘ক্ষমতা’। যতগুলি মানব কঙ্কালের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল, তার ৩৯ শতাংশের দাঁতেই ডিএনএ-র হদিস মিলেছে। গবেষকদের দাবি, এই সংক্রমণের হার প্লেগের ‘ব্ল্যাক ডেথ’ মহামারির সময়ে সংক্রমণের হারের প্রায় সমান। উইলারস্লেভের কথায়, “প্লেগের প্রাচীন স্ট্রেনগুলিও যে প্রাণঘাতী ছিল, এটিই তার প্রথম প্রমাণ। এটি সত্যিই বিপজ্জনক ছিল।” বিজ্ঞানীরা খুব স্বল্পসংখ্যক মানব কঙ্কালের উপরেও গবেষণা করেছেন। তবে প্লেগের প্রকোপ যে শুধু অঞ্চলেই সীমিত ছিল, তা-ও নিশ্চিত ভাবে বলা যায় না।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement