জ়াম্বিয়ার কাসাঙ্কা জাতীয় উদ্যানে বাদুড় পরিযান। ছবি: সংগৃহীত।
মাসাইমারা। তানজ়ানিয়া সীমান্ত লাগোয়া কেনিয়ার এই অভয়ারণ্য গোটা বিশ্বে নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তুলেছে। সৌজন্যে বন্যপ্রাণীদের পরিযান (খাবারের সন্ধানে বা অন্য কোনও কারণে বন্যপ্রাণীদের এক স্থান থেকে অন্য যাওয়া)। প্রতি বছর এই পরিযান দেখতে প্রচুর পর্যটক ভিড় করেন মাসাইমারায়। কিন্তু স্তন্যপায়ীদের সবচেয়ে বড় পরিযান মাসাইমারায় নয়, চলে আফ্রিকার অন্য এক প্রান্তে।
আফ্রিকা মহাদেশের কেনিয়ার একেবারে দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে মাসইমারা। কেনিয়ার সীমান্ত পেরিয়ে তানজ়ানিয়ায় রয়েছে সেরেঙ্গেটি অভয়ারণ্য। প্রতি বছর জুলাই-অক্টোবর মাসে সেরেঙ্গেটি থেকে হাজারে হাজারে সিংহ, চিতাবাঘ, হাতি, গন্ডার, মহিষ-সহ বিভিন্ন প্রাণী মাসাইমারায় আসে। যা ‘গ্রেট মাইগ্রেশন’ নামে অধিক পরিচিত। তবে এর চেয়েও আট গুণ বড় পরিযান চলে মাসাইমারা থেকে প্রায় ২০০০ কিলোমিটার দূরে, আফ্রিকারই অন্য এক দেশে। কেনিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমে রয়েছে তানজ়ানিয়া। তারও দক্ষিণ-পশ্চিমে জ়াম্বিয়া। সেই জ়াম্বিয়ার কাসাঙ্কা জাতীয় উদ্যানে চলে স্তন্যপায়ীদের সবচেয়ে বড় পরিযান।
জ়াম্বিয়ার অন্যতম ছোট একটি জাতীয় উদ্যান হল কাসাঙ্কা। আফ্রিকা মহাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বড় এবং অধিক পরিচিত অভয়ারণ্যগুলির মাঝে এটি প্রায়শই আড়াল হয়ে যায়। আয়তনে মাত্র ৩৯০ বর্গকিলোমিটার (যেখানে মাসাইমারা আয়তনে ১৫০০ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি)। কঙ্গো সীমান্তের কাছে অবস্থিত এই জাতীয় উদ্যানে মাসাইমারার মতো বিস্তীর্ণ খোলা সমভূমি নেই। সিংহের দল নেই। খুব বেশি সাফারি জিপের বহরও নেই। কাসাঙ্কা মহাদেশের অন্য অভয়ারণ্যগুলির তুলনায় অনেক শান্ত। তবে এই জাতীয় উদ্যানেই চলে ঝাঁকে ঝাঁকে বাদুড়ের পরিযান। খড়ের মতো রঙের লক্ষ লক্ষ বাদুড় (স্ট্র-কালার্ড ফ্রুট ব্যাট, বৈজ্ঞানিক নাম এইডোলন হেলভাম) প্রতি বছর উড়ে আসে কাসাঙ্কায়। সন্ধ্যা নামলেই আকাশ ভরে যায় বাদুড়ে। চারদিক থেকে ভেসে আসে কিচিরমিচির শব্দ এবং বাদুড়ের তীক্ষ্ণ ডাক।
গোটা বছরে মাত্র দু’মাসের জন্য এই দৃশ্য দেখা যায়। অক্টোবরের শেষ দিক থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত। মধ্য আফ্রিকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাদুড়েরা এসে ভিড় করে এখানে। তার পরে জানুয়ারিতে আবার ফিরে যায়। মরসুমি ফলের টানে প্রায় ৮০ লক্ষ থেকে ১ কোটি বাদুড় ভিড় জমায় এই জাতীয় উদ্যানে। কিন্তু নির্দিষ্ট ভাবে কোথা থেকে এরা আসে, আবার কোথায় চলে যায়— তা এখনও রহস্যই রয়ে গিয়েছে গবেষকদের কাছে।
ফলভুক এই বাদুড়দের ওজন প্রায় ২৫০ গ্রাম। দৈর্ঘ্যে আনুমানিক ৩০ সেন্টিমিটার। তবে এদের ডানা প্রায় এক মিটার পর্যন্ত ছড়াতে পারে। দূরপাল্লার উড়ানে বেশ পটু এরা। এক এক রাতেই এই বাদুড়েরা প্রায় ৯৬ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে পারে এবং ভোরের আলো ফোটার আগেই নিজেদের শরীরের ওজনের সমান ফল খেয়ে সাবাড় করার ক্ষমতা রাখে। এই বাদুড়েরা কত দূর উড়তে পারে, তা নিয়ে ২০০৫ সালে একটি পরীক্ষা হয়েছিল। জীববিজ্ঞানী হাইডি রিখটার পরীক্ষামূলক ভাবে চারটি বাদুড়ের শরীরে সৌরশক্তিচালিত ট্রান্সমিটার লাগিয়ে দেন। উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে জানা যায়, প্রত্যেকটি বাদুড় অন্তত ১০০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছিল। তার মধ্যে একটি উড়েছিল ২৪০০ কিলোমিটার পথ।
তবে গবেষকেরা এখনও নিশ্চিত ভাবে জানেন না যে এই বাদুড়েরা কোথা থেকে আসে, বা কাসাঙ্কা থেকে ফেরার পর কোথায় চলে যায়। জাম্বিয়ার বাদুড় বিশেষজ্ঞ এবং কাসাঙ্কা ট্রাস্টের বোর্ড সদস্য হেলেন টেলর-বয়েড বলেন, “ এ বিষয়ে হাতে গোনা কয়েকটি ট্র্যাকিং গবেষণা হয়েছে। তা-ও খুব স্বল্প সংখ্যক বাদুড়ের উপরে। এই পরিযায়ী বাদুড়দের যাতায়াতের পথ আমরা সবে বুঝতে শুরু করেছি।”
কাসাঙ্কার এই বাদুড় পরিযান বনভূমির বিস্তার এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্য স্তন্যপায়ীদের তুলনায় অনেক বেশি এলাকা জুড়ে ফলের বীজ ছড়িয়ে দিতে পারে এরা। কাসাঙ্কা জাতীয় উদ্যানের প্রাক্তন প্রধান পরিবেশবিদ ফ্রাঙ্ক উইলিয়ামের মতে, ৮০ লক্ষ থেকে ১ কোটি বাদুড় মিলে এক রাতের মধ্যে প্রায় ২৩০-২৫০ টন ফল খেয়ে ফেলতে পারে। এরা মূলত খায় বুনো লোকোয়াট (নাশপাতির মতো দেখতে এক ধরনের ফল), রেড মিল্ক উড বেরি এবং ওয়াটার বেরি। তবে কাসাঙ্কায় থাকাকালীন এরা কতটা ফল খায়, তা সঠিক ভাবে বলা কঠিন। তবে পরিবেশবিদদের অনুমান, এই সময়ের মধ্যে তারা প্রায় ৩ লক্ষ ৩০ হাজার টন ফল খেয়ে ফেলে। জাতীয় উদ্যানের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য টেলর-বয়েডের কথায়, “এইডোলন হেলভাম কাছাকাছি এলাকায় তো বটেই, এমনকি দূরবর্তী এলাকাতেও বীজ ছড়ায়। হাতি বা অন্য অনেক মেরুদণ্ডী প্রাণীর চেয়েও বেশি দূরত্বে ফলের বীজ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম এরা।”
তবে এই বাদুড়দের পরিযানপথ এখনও পুরোপুরি বিশ্লেষণ করে ওঠা সম্ভব হয়নি। তা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে। কাসাঙ্কা জাতীয় উদ্যানের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, ২০১৯ সালে জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের সাত গবেষকের একটি দল এ বিষয়ে নতুন করে পরীক্ষানিরিক্ষা শুরু করেছে। জ়াম্বিয়ার এই বাদুড়দের পরিযানপথ স্পষ্ট হলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তাঁদের ভূমিকাও আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।