Ancient Humans

তিরের ফলায় বিষ মাখিয়ে শিকারের কৌশল রপ্ত হয়েছিল ৬০,০০০ বছর আগেই! ধরিয়ে দিল দুই বিষাক্ত যৌগ

দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রুগার গুহা থেকে অতীতে পাওয়া গিয়েছিল বিষ মাখানো তিরের ফলা। সেগুলি ছিল আনুমানিক সাত হাজার বছরের পুরনো। এ বার সেই দক্ষিণ আফ্রিকাতেই মিলল আরও হাজার হাজার বছরের পুরনো বিষ মাখানো তিরের ফলার নমুনা।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৭
Share:

ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।

খোঁজ মিলেছিল ৪০ বছর আগেই। প্রাচীন কালের কিছু তিরের ফলা। এত দিন শুধু জাদুঘরেই পড়ে ছিল সেগুলি। সংরক্ষিত ছিল বটে, কিন্তু একপ্রকার ‘অবহেলা’তেই পড়ে ছিল। বিশেষ গবেষণা হয়নি এত দিন। গবেষণা হতেই যা দেখা গেল, তা এত দিনের ধারণাকে ‘ভুল’ প্রমাণ করে দিল।

Advertisement

এত দিন মনে করা হত, শিকার ধরার আধুনিক কৌশল খুব বেশি পুরনো নয়। বিশেষ করে তিরের ফলায় বিষ মাখিয়ে তা ব্যবহার করার কৌশল মানুষ মাত্র কয়েক হাজার বছর আগেই রপ্ত করেছিল বলে মনে করা হত। এখন দেখা যাচ্ছে, যা অনুমান করা হত, তার চেয়েও বহু আগে তিরের ফলায় বিষ মাখিয়ে শিকার ধরার এই কৌশল শিখে নিয়েছিল মানব প্রজাতি।

এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রুগার গুহা থেকে পাওয়া গিয়েছিল বিষ মাখানো তিরের ফলা। সেগুলি ছিল আনুমানিক সাত হাজার বছরের পুরনো। এত দিন পর্যন্ত সেটিই ছিল বিষ মাখানো তিরের ফলার প্রাচীনতম উদাহরণ। সম্প্রতি আরও প্রাচীন এমন উদাহরণ মিলেছে। এগুলিও পাওয়া গিয়েছে সেই দক্ষিণ আফ্রিকা থেকেই। বিষ মাখানো এই তীরের ফলাগুলির বয়স প্রায় ৬০ হাজার বছর। সাম্প্রতিক গবেষণায় এমনটাই দাবি করেছেন সুইডেনের স্টকহোলম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেভ্‌ন ইসাকসন।

Advertisement

এই বিষ মাখানো তিরের ফলাগুলি যে সময়ের, তার অনেক আগেই পৃথিবীতে আধুনিক মানুষের (হোমো সেপিয়েন্স) আবির্ভাব হয়ে গিয়েছে। আফ্রিকা মহাদেশে প্রায় তিন লক্ষ বছর আগে আধুনিক মানুষের আবির্ভাব হয়। গবেষকদের অনুমান, এই তিরের ফলাগুলি আধুনিক মানুষেরই তৈরি। তবে বিষয়টি নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত নন তাঁরা।

প্রাচীন এই তিরের ফলাগুলি খুঁজে পাওয়া যায় ১৯৮৫ সালে। দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার উত্তরে রয়েছে উমহলাতুজ়ানা রক শেল্টার। ৪০ বছর আগে এখান থেকেই পাওয়া যায় তিরের ফলার মতো ১০টি পাথরের টুকরো। তবে কয়েক দশক ধরে এগুলি শুধু জাদুঘরেরই শোভা বৃদ্ধি করেছে। সম্প্রতি ইসাকসনের নেতৃত্বে স্টকহোলম বিশ্ববিদ্যালয়, লিনিয়াস বিশ্ববিদ্যালয় এবং দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এই তিরের ফলাগুলি নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চালান। তাতে তিরের ফলাগুলির গায়ে কিছু বিষাক্ত যৌগ পাওয়া যায়। এই বিষাক্ত যৌগটি মূলত গাছ থেকে পাওয়া যায়।

গবেষকদলের অনুমান, বুফোন ডিস্টিচা নামে এক গুল্মজাতীয় গাছের বিষাক্ত যৌগ মাখানো হত ওই তিরের ফলাগুলিতে। স্থানীয় উপজাতির মধ্যে এখনও শিকারের জন্য তিরে এই জাতীয় গাছের বিষ ব্যবহারের চল রয়েছে। গবেষকদলের প্রধান ইসাকসনের মতে, প্রাচীন ওই তিরের ফলায় যে বিষ ব্যবহার করা হত, তা এতটাও তীব্র নয় যে শিকারকে সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেলবে। বরং, এই বিষ জখম শিকারকে খুঁজে বার করতে সাহায্য করত। বিষ মাখানো এই তির ব্যবহারের ফলে শিকারকে ধরার জন্য কম কষ্ট করতে হত।

প্রায় ৬০ হাজার বছরের পুরনো এই বিষাক্ত ফলা বুঝিয়ে দেয়, ওই সময়েও মানুষ জানত কোন গাছের কোন উপাদান এই কাজে লাগবে। শুধু তা-ই নয়, ওই বিষ শিকারের শরীরে প্রভাব ফেলতে কত সময় নেবে, তারও ধারণা ছিল ওই প্রাচীন কালে। ইসাকসনের কথায়, ‘‘তিরের ফলা শরীরে গেঁথে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরে তা কাজ করা শুরু করত। শিকারকে দুর্বল করে দিত। কত ক্ষণ পরে বিষ কাজ দেখানো শুরু করবে, তা বোঝার ক্ষমতা সেই সময়ে ছিল। এই প্রমাণগুলিই আভাস দেয় প্রাচীনকালেও মানুষের মধ্যে শিকার-জ্ঞানের বিকাশ হয়ে গিয়েছিল।’’

প্রাচীন এই ১০টি তিরের ফলার মধ্যে পাঁচটিতে পাওয়া গিয়েছে ‘বুফ্যান্ড্রিন’ নামে একটি যৌগের চিহ্ন। এটি এক ধরনের বিষাক্ত যৌগ, যা মূলত গাছেই পাওয়া যায়। অতীতে ২৫০ বছরের পুরনো এক বিষাক্ত তিরের ফলাতেও এই একই যৌগ পাওয়া গিয়েছে। আবার ওই ১০টি ফলার মধ্যে একটিতে পাওয়া গিয়েছে ‘এপিবুফানিসিন’ নামে অপর এক বিষাক্ত যৌগ। এটিও গাছেই পাওয়া যায়। গবেষকদলের মতে, একই জায়গা থেকে পাওয়া তিরের ফলায় দু’ধরনের বিষাক্ত যৌগের উপস্থিতি কাকতালীয় হতে পারে না। শিকারের জন্যই তিরের ফলায় এই বিষ মাখানো হয়েছিল। ঘটনাচক্রে, এই দুই বিষাক্ত যৌগই পাওয়া যায় বুফোন ডিস্টিচা নামে স্থানীয় এক গাছে। গুল্মজাতীয় এই গাছ দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়।

গবেষকদের দাবি, এই বিষাক্ত উদ্ভিদ যৌগের সামান্য পরিমাণও ২০-৩০ মিনিটের মধ্যে একটি ইঁদুরকে মেরে ফেলতে পারে। তবে বড় প্রাণীর ক্ষেত্রে এই বিষ কাজ দেখাতে আরও সময় নেবে। মানুষের ক্ষেত্রে বমি বমি ভাব, শ্বাসযন্ত্র এবং ফুসফুসের সমস্যা তৈরি করতে পারে এই বিষ। গবেষকদলের অন্যতম সদস্য জোহানেসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্লিজ় লম্বার্ডের কথায়, ‘‘তিরের ফলায় বিষ ব্যবহার করার এটিই এখনও পর্যন্ত প্রাচীনতম প্রমাণ। এটি প্রমাণ করে যে আমরা যা অনুমান করতাম, তার চেয়েও বহু আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসকারী আমাদের পূর্বসূরিরা তিরের ফলায় বিষ ব্যবহার করতেন। কী ভাবে তা কাজ করে, তা-ও বুঝতেন।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement