গাছের ছায়া ঘেরা শহর কতটা আরামদায়ক? —প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
উষ্ণায়নের হাত থেকে রক্ষা পেতে বিশ্বেব বিভিন্ন বড় শহরে আরও বেশি করে গাছ লাগানো হচ্ছে। কিন্তু গবেষণা বলছে, শুধু প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগিয়ে গরম থেকে রেহাই মিলবে না। পরিকল্পনা করে সঠিক ধরনের গাছ লাগানোর প্রয়োজন। কিছু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, কিছু গাছ খুব গরমের দিনে অস্বস্তি আরও বৃদ্ধি করতে পারে। আবার কিছু গাছ বসালে তাপমাত্রা কমতে পারে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত।
‘দ্য কনভার্সেশন’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন এবং জার্মানির মিউনিখ, হংকং শহরে একটি পরীক্ষা চালিয়েছিলেন গবেষকেরা। দেখার চেষ্টা করেছিলেন, সেখানকার গাছপালা তাপমাত্রার উপর কেমন প্রভাব ফেলে। মোদ্দা কথা, ওই তিন শহরে বাসিন্দারা বাড়ির বাইরে বেরোলে কেমন গরম বোধ করেন, তার নেপথ্যে গাছপালার কী ভূমিকা রয়েছে, তা পরীক্ষা করে দেখেন গবেষকেরা।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যে শহরে বড় গাছের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রয়েছে ঝোপ, ছোট গাছ, সেই শহরে গরমকালেও অস্বস্তি অনেকটাই কম। যে শহরে শুধুই বড় বড় গাছ রয়েছে, সেখানে কিন্তু গরমকালে আবহাওয়া তুলনায় অস্বস্তিকর। অর্থাৎ শুধু সারি সারি বড় গাছ প্রকৃতিকে শীতল করতে পারে না। এই গবেষণা গুরুত্বপূ্র্ণ কারণ, এখন শুধু সাজানোর জন্য শহরে বৃক্ষরোপণ করা হয় না। কী ভাবে পরিকল্পনা করে বৃক্ষরোপণ করলে শহরের তাপমাত্রা কিছুটা কমতে পারে, সেটাই লক্ষ্য প্রশাসনের। সে ক্ষেত্রে এই গবেষণা অনেক বেশি সাহায্য করতে পারে বলে মনে করেন অনেকে।
দিনের বেলা শহরের রাস্তা, পাকা বাড়িঘর, ইমারত সূর্যের তাপ শোষণ করে। রাতে তা বিকিরণ করে দেয়। সে কারণে উষ্ণায়নের যুগে ইট-কাট-পাথরের ইমারত ঠাসা শহরগুলিতে গরম আরও বাড়ছে। তাপপ্রবাহের সম্ভাবনাও বাড়ছে। এই পরিবেশে একটু আরাম দেয় গাছ। তবে বাইরের আবহাওয়া কতটা আরামদায়ক হবে, তা শুধু তাপমাত্রার উপরে নির্ভর করে না। আর্দ্রতা বেশি হলে, হাওয়া চলাচল বাধা পেলে গাছের ছায়া-ঘেরা রাস্তাতেও অস্বস্তি হতে পারে।
বাড়ির বাইরে সেই অস্বস্তি কতটা, তা পৃথিবীর তিন শহরে ঘুরে বোঝার চেষ্টা করেছেন বিজ্ঞানীরা। শুধু তাপমাত্রা বা আর্দ্রতার পরিসংখ্যান গ্রহণেই গবেষণা সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাস্তায় ঘুরে ‘রেডিয়ান্ট হিট’ (বিকিরণ তাপ) গ্রহণের চেষ্টা করেছেন গবেষকেরা। বাতাস ছাড়াও ইট, কাঠ, রাস্তা, বাড়ি থেকে বিকিরিত তাপ মানব শরীর প্রবাহিত হয়। সেই বিকিরণ তাপ মাপার চেষ্টা করেছেন তাঁরা।
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মেলবোর্নে গাছের ছায়া যেখানে রয়েছে, সেখানে আবহাওয়া অনেক বেশি আরামদায়ক। খোলা রাস্তার তুলনায় গাছগাছালি ঘেরা ওই সব ঘাসজমিতে তাপমাত্রার হয়তো খুব একটা হেরফের হচ্ছে না, তবে আরাম অনেক বেশি। গাছের ছায়া রয়েছে, এমন জায়গায় পথচারীদের শরীর অনেক বেশি ঠান্ডা থাকে। খোলা জায়গার তুলনায় গাছে ঢাকা জায়গায় মানুষের শরীরে শোষিত বিকিরণ তাপ ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম।
মিউনিখে এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট ভাবে দেখা গিয়েছে। সেখানে গরমের দুপুরে খোলা রাস্তার তুলনায় গাছে ঢাকা ঘাসজমি, যেখানে ঝোপও রয়েছে, সে রকম জায়গায় তাপমাত্রা প্রায় ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম। হংকংয়েও গাছের চাদোয়া ঘেরা এলাকায় দিনের বেলা আবহাওয়া বেশ আরামদায়কই থাকে। তবে সেখানে বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় স্বস্তি তুলনায় কম।
তবে গবেষণায় এ-ও দেখা গিয়েছে, কোনও জায়গায় অনেক গাছ থাকলেই যে সেখানে পরিবেশ স্বস্তিদায়ক হবে, তা কিন্তু নয়। হংকংয়ের কোনও কোনও এলাকায় দেখা গিয়েছে, বড় বড় গাছের জঙ্গল হয়ে গিয়েছে। তা বলে সেই জায়গা কিন্তু আরামদায়ক নয়, বরং আর্দ্রতা বেশি থাকায় অস্বস্তি খুব বেশি। বিজ্ঞানীদের মতে, গাছ থেকে নির্গত জলীয় বাষ্প শুষ্ক আবহাওয়া শীতল করে। কিন্তু যেখানে আর্দ্রতা এমনিতেই বেশি, সেখানে নতুন করে স্বস্তি আনতে পারে না। মিউনিখের কিছু এলাকায় বড় বড় গাছ থাকায় বায়ু চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে উষ্ণ বায়ু আবদ্ধ হয়ে যায়। গাড়ি থেকে নির্গত দূষণও অপসারিত হতে পারে না।
তা বলে বড় গাছ রোপণ বন্ধ করলে চলবে না, এমনটাই মনে করেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, বুঝেশুনে পরিকল্পনা করে শহরে গাছ লাগাতে হবে। পার্কে বা শহরের মধ্যে বিস্তীর্ণ অংশে মাটিতে ঘাস লাগানোর পাশাপাশি বড় গাছ, গুল্ম, দুইই রোপণ করতে হবে।