সুজেট জর্ডনের ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া।
বুক থেকে যেন পাষাণ নেমে গেল! হে কলকাতা, জীবিত কলকাতা, আমার প্রিয় কলকাতা, তোমাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করতে চাই না। আমি শুধু বিচার চেয়েছিলাম। জীবিত অবস্থায় সে বিচার জেনে যেতে পারলাম না ঠিকই। কিন্তু আমি মরে যাওয়ার পরও তো মানুষ এটুকু জানতে পারল যে, সুজেট জর্ডন মিথ্যে অভিযোগ জানায়নি। মানুষ জানাল, ‘বড়লোকের ছেলেদের’ ফাঁসিয়ে ফায়দা তোলার জন্য কোনও ‘সাজানো ঘটনা’র খলনায়িকা আমি নই!
হে কলকাতা, জীবিত কলকাতা, আমার প্রিয় কলকাতা, এই বিচারের পরও তোমার কাছে কিছু প্রশ্ন রাখতে চাই! আমি এখন আনন্দ, বেদনার ঊর্ধে! আমার দুই মেয়ে নিশ্চয় আজ ওদের মায়ের জন্য কাঁদছে। আনন্দের কান্না। বিষাদেরও কান্না। আজ, এই মুহূর্তে আমি যদি ওদের পাশে থাকতে পারতাম, আজও সেই কথাটাই বলতাম- যে যাই বলুক, তুমি যদি সত্যি বলে থাক, দাঁতে দাঁত চেপে সব অন্যায়, সব অবিচার সহ্য করো! এক দিন, মানুষ তোমার কথাই মানবে!
ফেব্রুয়ারির গোড়ায়, হালকা শীতের সেই রাতটার মতো অন্ধকার রাত কোনও মেয়ের জীবনে যেন না আসে। এক দল পুরুষের উন্মত্ত পৈশাচিক লালসা আমার শরীরটাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছিল। অসহায় আমি। মধ্য রাতের শুনশান কলকাতার রাস্তা দিয়ে নিশ্চয় তখন একটা দু’টো গাড়ি হু হু করে ছুটে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু আমার চিৎকার, আমার আর্তনাদ শুনতে পাইনি কেউ। লালসা মিটিয়ে ওরা আমাকে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল রাস্তাতেই।
পড়ুন: কুৎসা সত্ত্বেও জানতাম, সত্যিটা বেরোবে
পান্ডা অধরাই, পার্ক স্ট্রিট ধর্ষণে দোষী ৩
এমন সময় সুজেটই নেই! খুব আফসোস হচ্ছে
কলকাতা, জীবিত কলকাতা, আমার প্রিয় কলকাতা, তার পর শুরু হল আমার জীবনের সব থেকে বড় যুদ্ধ। একা আমি। আর আমাকে ঘিরে ক্ষমতাবান, অর্থবান মানুষদের হাড় হিম করে দেওয়া দৃষ্টি। এই কলকাতাতেই। থানার পুলিশ অফিসার আমাকে এমন ভাবে দেখছিলেন, যেন আমিই অপরাধী! তবু পিছিয়ে যাইনি। যা হওয়ার হবে। শেষ পর্যন্ত দেখব। ছোট থেকেই প্রচণ্ড জেদি আমি। কিন্তু সেই আমিও মাঝে মধ্যে হতাশায় ভেঙে পড়েছি। মনে হয়েছে সহ ছেড়ে ছুড়ে পালিয়ে যাই। যে দিন প্রথম খবরটা বেরলো কাগজে, তার পর আমার চারপাশটাও হঠাৎ করে বদলাতে শুরু করল। আমার ছবি, আমার নাম কোথাও নাই বা বেরক- লোকে যেন কী করে সব জেনে যায়! ওই মেয়েটা...। এই মেয়েটা...। সেই মেয়েটা...। পথে ঘাটে বাড়তে শুরু করল আমার দিকে আঙুল তুলে দেখানো। বাড়িওয়ালা নোটিস দিয়ে দিল। ঘর ছাড়তে হবে। অর্থাৎ, আমার মতো মেয়েকে আর থাকতে দেওয়া যায় না। কত রকম প্রশ্ন! অত রাতে একা একটা মেয়ে কেন গিয়েছিল! এক সাংসদ তো বলেই দিলেন, খদ্দেরের সঙ্গে দরদামের গোলমাল থেকেই এই অভিযোগ! কত লোক চোখের ভাযায় বুঝিয়ে দিয়েছে, ‘তুমি একটা নষ্ট মেয়ে’। আর একটা ‘নষ্ট’ মেয়েকে ধর্ষণ করার অধিকার যেন পেয়েই থাকে ছেলেরা।
বারবার ভেবেছি, আমি তো কোনও অপরাধ করিনি! বরং জঘন্য এক অপরাধের শিকার হয়েছি। অথচ আমারই চারপাশ, আমারই চেনা-অচেনা মানুষ জন, আমারই সমাজের একটা অংশ আমার দিকেই কেমন একটা চোখে তাকিয়ে আছে! ভেঙে পড়েছি বহুবার। একা একা কেঁদেছি। হাল ছেড়ে দেব? এ শহর ছেড়েছুড়ে অন্য কোথাও চলে যাব? তার পরেই ফিরে এসেছে জেদ। কেন যাব? পালাব কেন? আমি পালিয়ে গেলে তো জিত হবে ওদেরই। লোকে তো বলবেই- দেখেছ, বলেছিলাম না, মেয়েটাই যত নষ্টের গোড়া।
এই পর্বে সব থেকে বড় ধাক্কাটা খেয়েছিলাম এমন এক জনের কাছ থেকে, যিনি আমারই মতো এক মেয়ে। আমার থেকেও অনেক বড় বড় যুদ্ধ জিতে, অনেক অন্যায়ের বিরুদ্ধে পথে নেমে, যিনি ক্ষমতার শীর্ষ বিন্দুতে এসেছেন। আমার মতো সাধারণ এক মেয়ের সঙ্গে তাঁর তোনও তুলনাই হয় না। আমার মতো নগণ্য এক মেয়েকে তিনি চেনেনও না। সেই তিনি, ক্ষমতার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে, প্রশাসনিক সদর দফতরে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করে দিলেন, আমার গোটা অভিযোগটাই নাকি সাজানো! যা কিছু ঘটেছে সব সাজানো! আমার যন্ত্রণা, আমার কান্না, আমার লড়াই- সব সাজানো! তবে কি সব শেষ? যে পুলিশ তদন্ত করে দেখবে ঘটনার সত্যাসত্য তারই শীর্ষমহল যদি একে সাজানো ঘটনা বলে দেয় তবে আর হবেটা কী? ভেঙে পড়েছিলাম ভীষণ।
আর ভেঙে পড়তে পড়তেই আবার দেখলাম, আমি একা নই। আমার পাশেও অনেক মানুষ আছেন। এ সমাজে, এ শহরে, এ সরকারে, এ প্রশাসনে-সব টাই এক রকম নয়। দময়ন্তী সেন যে দিন রাইটার্স আর লালবাজারের উল্টো সুরে বললেন, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, সে দিন বুকে আশার হাওয়াটা টের পেয়েছিলাম। সমাজের সব ‘সততাই’ তা হলে মেকি আর সাজানো নয়।
হে কলকাতা, জীবিত কলকাতা, আমার প্রিয় কলকাতা, তুমিই আমাকে শিখিয়েছ এক ধর্ষিতার মুখে সমাজের ঢেকে দেওয়া আবরণ কী ভাবে ছিঁড়ে ফেলতে হয়। আমি অপরাধী নই। অপরাধ যারা করল তারা বুক ফুলিয়ে ঘুরবে, আর ধর্ষিতা থাকবে মুখ লুকিয়ে, এ প্রহসন আর কত কাল চলবে? এই সমাজেরই তুলে-দেওয়া অবগুণ্ঠন খুলে ফেলে, আমি এক বিচার প্রার্থী ধর্ষিতা, তাই পথে নামলাম। মিছিলে হাঁটলাম আর পাঁচ জনের মতো। টিভি চ্যানেলে বসলাম। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালাম। বললাম, অন্ধকারে রেখো না আর আমায়, আলো ধরো আমার মুখে। এই দ্যাখো, আমি।
হে কলকাতা, জীবিত কলকাতা, আমার প্রিয় কলকাতা, আমি এখন অতীত। আমি বেঁচে ছিলাম। কিন্তু আমার মতো যে মেয়েরা বেঁচে আছে আজও, তাঁদের মুখ দেখিয়ে ঘুরতে দাও তোমার বুকে।
আর একটা ব্যক্তিগত কথা। আমার মেয়েদের দেখো! মা হারানো মেয়ে দু’টো যেন তোমার আশ্রয়ে, তোমার পথা ঘাটে, তোমার ফাইভ স্টারে, তোমার রেস্তোরাঁয়, তোমার দিনে-রাতে নিশ্চিন্তে ঘুরতে পারে। নিশ্চিন্তে থাকতে পারে।
মরে যাওয়া এক মায়ের শেষ প্রার্থনা এটাও।
(সুজেট জর্ডন এ বছর ১৩ মার্চ মারা যান। বেঁচে থাকলে হয়তো এই কথাগুলোই লিখতেন।)