আকর্ষণ: অস্ট্রিয়া ম্যাচের প্রস্তুতিতে মগ্ন মেসি। ছবি: রয়টার্স।
ডালাসে এসে প্রথম যাঁর নাম ট্যাক্সিচালকের মুখে শুনবেন, তিনি লিয়োনেল মেসি নন। প্রথম যে জায়গাটায় তিনি যাওয়ার পরামর্শ দেবেন, তা মোটেও এটি অ্যান্ড টি স্টেডিয়াম নয়। যেখানে মেসির আর্জেন্টিনা আজ, সোমবার গ্রুপের দ্বিতীয় ম্যাচ খেলতে নামছে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে। বরং বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে ফাঁকা হাইওয়ে দিয়ে গাড়ির গতি তুলতে তুলতে বেশ ট্যুরিস্ট গাইডের মতো ভঙ্গিতে তিনি মনে করিয়ে দেবেন— ‘‘ডালাসে স্বাগত। জন এফ কেনেডির হত্যাস্থল বলে যা সারা পৃথিবীতে বিখ্যাত!’’
ডিলি প্লাজ়া। ২২ নভেম্বর, ১৯৬৩— এখানেই খুন হয়েছিলেন জন ফিৎজ়েরাল্ড কেনেডি। মানব সভ্যতার ইতিহাসে আজও সব চেয়ে আলোচিত, সব চেয়ে নৃশংস খুনগুলির একটি। ডাউনটাউন ডালাসে একটি সুসজ্জিত পার্ক ডিলি প্লাজ়া। হুডখোলা মোটরকেড প্যারেড করে যাচ্ছিলেন জেএফকে। টেক্সাস স্কুল ডিপোজ়িটরি বিল্ডিংয়ের ছ’তলা থেকে পর-পর গুলিতে তাঁকে ঝাঁঝরা করে দেয় লি হার্ভে ওসওয়াল্ড নামে আততায়ী। মাথায় এবং গলায় গুলি লাগে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের। কাছের পার্কল্যান্ড হাসপাতালে দ্রুত নিয়ে গিয়েও লাভ হয়নি। তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। এই টেক্সাস ব্যাঙ্ক ডিপোজ়িটরি বিল্ডিংয়ের ষষ্ঠ তলা, যেখান থেকে গুলি চালিয়েছিলেন লি হার্ভে ওসওয়াল্ড, সেখানেই করা হয় কেনেডি মিউজ়িয়াম। যেখানে জেএফকে-র জীবনের নানা অধ্যায়, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে অবদান এবং সেই হত্যাকাণ্ডকে ধরে রাখা হয়েছে।
কেনেডি হত্যাস্থল থেকে গাড়িতে আধ ঘণ্টা মতো লাগে বিশ্বকাপের স্টেডিয়ামে যেতে। জেএফকে গুলিবিদ্ধ হন দুপুর সাড়ে বারোটার সময়। তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয় একটা নাগাদ। কাছাকাছি সময়ে, দুপুর বারোটায় মেসিরা নামবেন এটি অ্যান্ড টি স্টেডিয়ামে। স্পনসর সংক্রান্ত বিধিনিষেধের জন্য প্রতিযোগিতা চলাকালীন নামকরণ পাল্টে শুধু ডালাস স্টেডিয়াম বলা হচ্ছে। ক্যানসাস সিটিতে রাতে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন গত বারের চ্যাম্পিয়নরা। এ বারে দুপুরের কড়া রোদে খেলার ঝক্কি নিতে হবে আর আমেরিকায় এখন তাপমাত্রা মোটামুটি চল্লিশ ডিগ্রির আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। তার জন্য মেসি-ম্যাজিক দেখা যাবে কি না ভেবে তাঁর ভক্তরা যদি উদ্বিগ্ন হন, তা হলে জানিয়ে রাখা যাক— এই বিশ্বকাপের সব চেয়ে অভিনব, সব চেয়ে তাক লাগানো স্টেডিয়ামে সোমবার খেলতে নামছে আর্জেন্টিনা। অনেকে ইতিমধ্যেই যাকে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সেরা কেন্দ্র আখ্যা দিয়ে ফেলেছেন।
ডালাস স্টেডিয়ামের সেরা আকর্ষণ ‘রিট্র্যাক্টেবল রুফ’। অর্থাৎ আবহাওয়া বুঝে ইচ্ছা মতো ছাদ বন্ধ করে দেওয়া যাবে। খুব গরম লাগলে বা জোরে বৃষ্টি নামলে খেলা বন্ধ করার ব্যাপারই নেই। রিমোটের একটা বাটন টিপলেই যথেষ্ট। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে স্টেডিয়ামের ভিতরে সম্পূর্ণ ভাবে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে। ডালাসের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে গিয়ে চল্লিশ ডিগ্রির তাপে চোখমুখ ঝলসে যাবে, মাঠে আসতে গিয়ে ঘাম ছুটে যাবে দর্শকদের, কিন্তু একবার ভিতরে ঢুকে পড়তে পারলে, নিশ্চিন্ত।
ভিতরের তাপমাত্রা ২০-২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে রাখা হবে। এমনই অত্যাধুনিক এয়ার কন্ডিশনিং ব্যবস্থা বসানো হয়েছে যে, মাঠের বিভিন্ন কোণে আলাদা ভাবে ঠান্ডা রাখার সুবন্দোবস্ত রয়েছে। অর্থাৎ, এমন হবে না যে, গ্যালারির একটা অংশ আরামে রয়েছে, অন্য কোথাও হয়তো দর্শকেরা গলদঘর্ম হচ্ছেন।
টেক্সাসের একটা প্রধান শহর ডালাস। জেএফকে হত্যাস্থল যেমন এখানে আসা ট্যুরিস্টদের প্রধান আকর্ষণ, তেমনই ‘টেক্সাস কাউবয়েজ়’-এর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির ছাপও এখানে স্পষ্ট। এখানকার এনএফএল দলের নাম ডালাস কাউবয়েজ়। তাদের ‘হোম’ এই মাঠ। বিশাল স্টেডিয়াম এমনিতে এক লক্ষের উপর দর্শকাসন। কিন্তু বিশ্বকাপে কমিয়ে সত্তর হাজার করতে হয়েছে যেহেতু ফিফার টিকিট সংক্রান্ত কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। কেন এত দর্শকাসন কমাতে হল? আমেরিকায় এনএফএল বা এনবিএ কেন এত জনপ্রিয় এবং তার নেপথ্যে কী অসাধারণ সব বাণিজ্যিক ভাবনা রয়েছে, তার একটা উদাহরণও হাতেনাতে পাওয়া গেল এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে। এনএফএল-এ দাঁড়িয়ে খেলা দেখার জন্যও টিকিটের ব্যবস্থা রয়েছে। আর সেই সংখ্যাটা বেশ বড়সড়। ম্যাচ দেখার জন্য যদি কেউ বসার সিট না-ও পায়, সব যদি আগে বিক্রি হয়ে থাকে তা হলে অপেক্ষাকৃত কম টাকায় দাঁড়িয়ে খেলা দেখার বক্স বা গ্যালারির টিকিট কিনেও মাঠে ঢুকতে পারে। ভারতে ক্রিকেট জনপ্রিয়তম খেলা, টিকিটের জন্য সব সময় হাহাকার লেগে রয়েছে বিশেষ করে সাদা বলের ক্রিকেটে বা আইপিএলের ম্যাচে। কিন্তু এমন কোনও উদ্ভাবনী শক্তি ভারতের ক্রিকেট প্রশাসকেরা এখনও দেখাতে পারেননি।
এখানেই শেষ নয়। চোখ ধাঁধানো লাইটিংয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্টেডিয়ামে যা সাউন্ড সিস্টেম বসানো হয়েছে, বিশ্বের যে কোনও সেরা থিয়েটার হল-কেও হার মানাতে বলে শুনলাম। প্রেজ়েন্টার থাকবেন। তিনি এক ঘণ্টা আগে থেকে দর্শকদের মনোরঞ্জনের জন্য মাইক হাতে তুলে নেবেন। স্থানীয় কর্তাদের কথায়, ‘‘একদম গমগম করবে পরিবেশ। সেরা বিনোদনের জন্য প্রস্তুত থাকুন।’’ যে দু’টি দেশ খেলছে, তাদের সমর্থকদের আবেগকে স্পর্শ করতে বিশেষ, বিশেষ গান পরিবেশন করা হবে। ইংল্যান্ড-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচ এখানে হয়েছে। হ্যারি কেন-রা যখন মাঠ ছাড়ছিলেন ‘বিটল্স’ বাজানো হচ্ছিল। এর সঙ্গে চারটি জায়ান্ট স্ক্রিন। যেগুলি এত বড় যে, জায়ান্ট না বলে সুপার-জায়ান্ট স্ক্রিন বলা যায়। চারটের মধ্যে দু’টোর মাপ শুনে বিশ্বাস করা যাচ্ছিল না। ৪৯ মিটার চওড়া, ২২ মিটার উচ্চতা।
আর্লিংটনে অবস্থিত এই স্টেডিয়ামের পাশেই রয়েছে গ্লোব লাইফ ফিল্ড। বেসবলের দল টেক্সাস রেঞ্জার্সের ‘হোম’। চল্লিশ হাজার দর্শকাসন, যা ভারতের অনেক ক্রিকেট মাঠে নেই। কিন্তু ফুটবলের ডালাস স্টেডিয়াম এত বিশাল যে, বেসবলের মাঠকে গালিভারের পাশে লিলিপুট মনে হবে। এখানকার ঘাসের ধরনও আলাদা। চলতি বিশ্বকাপে বেশির ভাগ মাঠে কৃত্রিম ঘাসের মাঠে খেলা হচ্ছে। এখানে হাইব্রিড ঘাস ব্যবহার করা হয়েছে, স্বাভাবিক ঘাসের পরিমাণ বেশি, অল্প কিছু কৃত্রিম মেশানো হয়েছে। প্রায় হাজার কিলোমিটার দূরের কোলোরাডোতে এই মাঠের ঘাস তৈরি করে একমাস আগে এনে লাগানো হয়েছে।
টেক্সাস ও ডালাস বারবিকিউয়ের জন্যও বিখ্যাত এবং এই কারণেই মনে হচ্ছে, এখানে মেসির আর্জেন্টিনা যে গ্রুপে তাদের বাকি দু’টি ম্যাচ খেলবে, তাদের জন্য সব চেয়ে মানানসই। ক্যানসাস সিটিতে দ্বিতীয় বারবিকিউ উৎসব সেরে তারা ডালাসে এসেছে। সেখানে আর্জেন্টিনীয় সব প্রিয় খাবার বানিয়েছেন দলের শেফ। যেমন ‘প্রোভো’, ‘চোরিজো’, তার সঙ্গে ‘সুইটব্রেড’। আর্জেন্টিনার শেফ দিয়েগো ইয়াকোভোনে খুবই জনপ্রিয় দলের মধ্যে। তাঁর জন্মদিন মেসির মতোই ২৪ জুন। বারবিকিউ সামলাতে গিয়ে অবশ্য তাঁকে বেশ হ্যাপায় পড়তে হচ্ছে। কারণ একদিকে সুস্বাদু খাবারও বানাতে হচ্ছে, আবার বিশ্বকাপ চলাকালীন নিউট্রিশনিস্টের কড়া নির্দেশেরও বাইরে যাওয়া যাবে না।
আর্জেন্টিনার বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী কার্লোস ‘লা মোনা’ জ়িমিনেজ়ের সঙ্গে মেসির সাক্ষাৎ নিয়েও আর্জেন্টিনা ভক্তদের মধ্যে প্রবল উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। একশোটির উপর হিট অ্যালবাম রয়েছে জ়িমিনেজ়ের। গান গাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি গান লেখেনও। দেশে ভীষণই জনপ্রিয়। মেসির সঙ্গে দেখা করে তিনি বলেছেন, ‘‘৭৬ বছর বয়স হয়ে গিয়েছে আমার। চেয়েছিলাম, তোমার সঙ্গে দেখা করতে।’’ মেসি তাঁকে বলেন, ‘‘আমিও খুব খুশি হয়েছি দেখা করতে পেরে। আপনি একজন কিংবদন্তি।’’ জ়িমিনেজ় ১৯৭৮, ১৯৮৬, ২০২২— তিনবারই আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের অভিযানে মাঠে-মাঠে ঘুরে খেলা দেখেছেন। এ বারেও ক্যানসাস সিটিতে উপস্থিত ছিলেন, ডালাসেও আসছেন। মারিয়ো কেম্পেস, মারাদোনা এবং কাতারে মেসির দলের জন্য তিনি পয়মন্ত ছিলেন। এ বারও তিনি ‘লাকি চার্ম’ হবেন বলে আগাম ঘোষণা করে দিয়েছেন। বার্বিকিউ বা কিংবদন্তি গায়কের সঙ্গে সময় কাটানোর মধ্যেই যদিও প্রস্তুতিতে কোনও ঘাটতি নেই স্কালোনির দলের। রবিবারও ক্যানসাস সিটিতে মহড়া সেরে ডালাসে তারা এল বিকেলের দিকে।
অস্ট্রিয়া ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ২২ নম্বর দল। ২৮ বছর পরে বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। দাভিদ আলাবা, মার্কো আরনাওতোভিচ, কনরাড লেমারের মতো অভিজ্ঞ ফুটবলারেরা রয়েছেন। বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের মার্সেল সাবিৎজ়ার দারুণ উন্নতি করেছেন। মাইকেল ক্যারিকের পরে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের দায়িত্বে থাকা র্যালফ রাংনিক কোচ। বায়ার্ন মিউনিখ প্রস্তাব দিলেও যাননি।
জেএফকে হত্যাপুরী। অত্যাধুনিক স্টেডিয়াম। কাউবয়েজ় রূপকথা। তার সঙ্গে মেসি-জাদু। জমজমাট ডালাস! লালমোহন গাঙ্গুলি হলে কী শিরোনাম দিতেন? ডালাসে ডঙ্কা?
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে