স্মরণীয়: ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক সিরিজ় জয়ের পরে সিডনিতে বিরাট ও অনুষ্কা। ছবি: সংগৃহীত।
বরাবরই ক্রিকেট মাঠে আবেগপ্রবণ বিরাট কোহলিকে দেখা যায়। তাঁর আগ্রাসন, খুশিতে লাফিয়ে ওঠা, কখনও কখনও ফিল্ডিং করার সময় কোমর দোলানোর মতো অসংখ্য দৃশ্যের সাক্ষী থেকেছে জনতা। মাঠে একাধিক স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন বিরাট। কিন্তু সুখের আড়ালে দুঃখ রয়ে গিয়েছে মনের মধ্যে। যে চোখের জলের একমাত্র সাক্ষী তাঁর স্ত্রী অনুষ্কা শর্মা। বিরাটের অবসরের দিনে ইনস্টাগ্রামে সেই সংক্রান্ত একটি পোস্ট করেছিলেন বিরাট-পত্নী। আটচল্লিশ ঘণ্টা পরে ফের তিনি বিরাট ও টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে একটি পোস্ট করেন। যা মুহূর্তের মধ্যে আলোড়ন ফেলে দেয়।
আসলে এই ইনস্টাগ্রাম স্টোরি স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান বরুণ গ্রোভারের একটি পোস্টের জবাব। তিনি লিখেছেন, “যাদের কোনও বলার মতো কাহিনি আছে, তারাই টেস্ট ক্রিকেটে সফল হয়। এমন একটা কাহিনি যা সুদীর্ঘ এবং যার গভীরতা এতটাই যে পিচ নিয়ে ভাবে না, আবহাওয়া দেখে না, ঘাস আছে কী নেই, খুঁজতে যায় না, বাইশ গজ শুকনো না ভেজা তাতে কিছু এসে যায় না, দেশে খেলছি নাকি বিদেশে, তাতে কোনও ফারাক হয় না।’’
সোমবারই বিরাটের অবসরের পরে একটি আবেগঘন পোস্ট করেছিলেন অনুষ্কা। তিনি বলেছিলেন, “সবাই তোমার রেকর্ড এবং মাইলফলকের কথা বলবে, কিন্তু আমি মনে রাখব তোমার চোখের জল। যা তুমি কখনও কাউকে দেখাওনি। সেই লড়াই, যার সাক্ষী একমাত্র আমি।”
গত সোমবার টেস্ট ক্রিকেটকে বিদায় জানান বিরাট। ১২৩ টেস্টে তিনি করেছেন ৯২৩০ রান। ব্যাটিং গড় ৪৬.৮৫। রয়েছে ৩০টি শতরান। পরিসংখ্যানের দিক থেকে বিচার করলে লাল বলের ক্রিকেটে ভারতের সর্বকালের সেরা অধিনায়কের নাম বিরাট কোহলি। ৬৮ টেস্টে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। জিতেছেন ৪০টি-তে। বিরাটের অবসরের সিদ্ধান্তে ব্যথিত ইংল্যান্ডের প্রাক্তন অধিনায়ক মাইকেল ভন। নিজের কলামে তিনি লিখেছেন, ‘‘খুব কম ক্রিকেটারেরই টেস্ট থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত আমাকে হতাশ করে। কিন্তু খুব কষ্ট হচ্ছে এই গ্রীষ্মে ইংল্যান্ডে তো বটেই আর কখনওই সাদা জার্সিতে বিরাটকে দেখতে পাব না ভেবে।’’ যোগ করেছেন, ‘‘বিরাটের অবসরের সিদ্ধান্তে আমি শোকাহত। ক্রিকেটের সঙ্গে ৩০ বছরেরও বেশি সময় যুক্ত। বিশ্বাস করি না, টেস্টে বিরাটের চেয়ে ভাল কেউ কিছু করতে পারে।’’ আরও বলেছেন, ‘‘প্রায় এক দশক আগে বিরাট যখন অধিনায়ক হয়েছিল, আমি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম, ভারত টেস্ট ক্রিকেটে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। সাদা বলে অন্যতম সেরা ক্রিকেটার মহেন্দ্র সিংহ ধোনি। মনে হত, অধিনায়ক হওয়া সত্ত্বেও টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি ওর ভালবাসা ছিল না। ভারতের এমন এক জনকে দরকার ছিল যে পাগলের মতো টেস্টকে ভালবাসবে। অধিনায়ক হিসেবে বিরাট সেটাই করেছিল। ওর আবেগ, দক্ষতা সবসময় স্টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে চিন্তাভাবনা যথেষ্ট ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। বিরাট না থাকলে টেস্ট ক্রিকেট মলিন হয়ে যেত, কৌলিন্য হারাত। আগামী প্রজন্মকে টেস্ট ভালবাসতে শিখিয়েছে বিরাট-ই। ওর বিদায় টেস্ট ক্রিকেটের
জন্য বড় ধাক্কা।’’
ভনের মতোই হতাশ এবং ব্যথিত বিখ্যাত গীতিকার ও চিত্রনাট্যকার জাভেদ আখতার। তিনি এই সিদ্ধান্তকে আখ্যায়িত করছেন ‘অপরিণত’ বলে। বুধবার সকালে জাভেদ সমাজমাধ্যমে লেখেন, “মানছি বিরাট অবসরের সময়টা আমার থেকে ভাল জানত। কিন্তু একজন ভক্ত হিসেবে ওর এই ‘অপরিণত’ সিদ্ধান্ত আমাকে হতাশ করেছে। বিরাটের মধ্যে এখনও অনেক ক্রিকেট বেঁচে ছিল। আমি সর্বতোভাবে ওঁকে সিদ্ধান্ত পুর্নবিবেচনার আবেদন জানাচ্ছি।”
বিরাটের টেস্ট অবসরের সিদ্ধান্তের জন্য অতিরিক্ত ক্রিকেটকেই দায়ী করেছেন ১৯৮৩ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন ভারতীয় দলের অন্যতম সদস্য সৈয়দ কিরমানি। সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া এক ভিডিয়ো সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, “ক্রিকেটের অতিরিক্ত ধকল থেকেই হয়তো বিরাট এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রেকর্ডের কথা ভেবে ও কোনও দিন খেলেনি। আমার মনে হয় না, চাপে পড়ে বিরাট চটজলদি অবসর ঘোষণা করেছে।” তিনি যোগ করেছেন, “ছন্দ হারিয়েছে, না কি অন্য কারণে বিরাট অবসর নিয়েছে, এই সব প্রশ্ন তোলা এখন অর্থহীন। অবসরের সিদ্ধান্ত এক জন ক্রিকেটারের সম্পূর্ণ ভাবেই ব্যক্তিগত।”
বিরাটের শেষ টেস্ট সিরিজ় ছিল বর্ডার-গাওস্কর ট্রফি। একমাত্র পার্থে শতরান ছাড়া তাঁর সম্পর্কে বলার মতো কিছুই নেই। পাঁচ টেস্টে বিরাট মাত্র ১৯০ রান করেছিলেন। ব্যাটিং গড় ২৩.৭৫! অস্ট্রেলিয়া সফর থেকে ফিরে অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে দিল্লির হয়ে রঞ্জি ট্রফিতেও নেমেছিলেন বিরাট। কিন্তু সেখানেও তিনি ব্যর্থ হন। তা সত্ত্বেও কিরমানি মনে করছেন, বিরাটের মধ্যে এখনও ক্রিকেট অবশিষ্ট ছিল। ভারতের প্রাক্তন উইকেটকিপার বলেছেন, ‘‘বিরাটের মধ্যে এখনও প্রচুর ক্রিকেট অবশিষ্ট ছিল। প্রত্যেকেরই অবসরের নির্দিষ্ট সময় আসে। কিন্তু বিরাট ওর লাল বলের কেরিয়ারকে আরও কয়েক বছর দীর্ঘায়িত করতে পারত।” বিরাটের অবসরে হয়তো একটা প্রজন্ম টেস্ট ক্রিকেট থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে বলে আশঙ্কা কিরমানির।
এ দিকে বিরাটকে সম্মান জানাতে অভিনব পরিকল্পনা নিলেন ভক্তেরা। আগামী শনিবার আইপিএলে চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্সে বেঙ্গালুরু বনাম কলকাতা নাইট রাইডার্স ম্যাচে সাদা জার্সি পরে যাবেন তাঁরা। ১৪ বছর টেস্টে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার পরে গত সোমবার বিরাট অবসরের সিদ্ধান্ত নেন। শনিবারের ম্যাচে দর্শকদের উদ্দেশে আরসিবি’র সমর্থকরা বার্তা দিয়েছেন, ‘‘বিরাটকে সম্মান জানাতে সাদা জার্সি পরে স্টেডিয়ামে আসুন।’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে