(বাঁ দিকে) অতনু ঘোষ এবং ড্যারেল মিচেল (ডান দিকে)। ছবি: সমাজমাধ্যম।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনাল। রবিবার অহমদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে ভারত-নিউ জ়িল্যান্ড। সূর্যকুমার যাদবেরা চ্যাম্পিয়ন হলে গোটা দেশ যখন উচ্ছ্বাসে নাচবে, তখন কিছুটা হলেও খারাপ লাগবে কলকাতার অতনু ঘোষের। ব্যর্থতা যে সঙ্গী হবে তাঁর!
সূর্যদের সাফল্য মানেই অতনুর ব্যর্থতা। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে শিয়ালদহের কোলে মার্কেটের বাসিন্দা নিউ জ়িল্যান্ড দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। রাচিন রবীন্দ্র, ইশ সোধিদের মতো নিউ জ়িল্যান্ডের নাগরিকত্ব নেই তাঁর। হুগলির মশাটে জন্ম হওয়া অতনু ‘পেশাদার কিউয়ি’। মিচেল স্যান্টনারের দলের একমাত্র ম্যাসিয়োর তিনি।
নিউ জ়িল্যান্ড দলের সঙ্গে কবে থেকে রয়েছেন? অতনু ফোনে আনন্দবাজার ডট কম-কে বললেন, ‘‘২০২৩ সালের এক দিনের বিশ্বকাপ থেকে। তখন থেকে এই দলের সঙ্গে কাজ করছি। তবে আমি কখনও নিউ জ়িল্যান্ডে যাইনি। ওরা ভারতে এলেই আমায় ডেকে নেয়। ওদের সঙ্গে কাজ করি।’’
মশাট থেকে নিউ জ়িল্যান্ডের সাজঘরের এই যাত্রাপথের গল্পটা গল্পকেও হার মানিয়ে দেবে। অতনু যখন কথা বলছেন, তখন তিনি টিম বাসে। মিচেল স্যান্টনারদের সঙ্গে অহমদাবাদের হোটেল থেকে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে যাচ্ছেন। দুপুর ২টো থেকে অনুশীলন কিউয়িদের। বাস থেকেই শোনালেন উত্থানের কাহিনি।
কলকাতার ঘিঞ্জি কোলে মার্কেটই অতনুর জীবন বদলে দিয়েছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা নিয়ে পড়াশোনা করার জন্য মশাটের বাড়ি ছেড়ে অতনু থাকতেন কোলে মার্কেটের একটি মেসে। বাংলার কোচ লক্ষ্মীরতন শুক্লর বাড়িতে রান্নার কাজ করতেন অতনুর মা। সংসারের আর্থিক অনটন সামাল দিতে রান্নার কাজ করতে হত তাঁকে। অতনুর বাবা একটি মিষ্টির দোকানে কাজ করে যে আয় করেন, তাতে সংসার ভাল ভাবে চলে না। এই দুই যোগাযোগেই অতনুর ম্যাসিয়োর হওয়া।
কেমন সেই যাত্রা? অতনু বললেন, ‘‘কোলে মার্কেটে থাকার সময় থেকে ঋদ্ধিমান সাহা, অশোক দিন্ডার সঙ্গে আলাপ। অন্য দিকে, মায়ের সূত্রে পরিচয় হয়েছিল লক্ষ্মীদার সঙ্গে। বলতে পারেন, ওদের জন্যই এ পর্যন্ত এসেছি। আমি কিন্তু ক্রিকেট খেলতাম না। ঋদ্ধিদা, দিন্দাদারাই হঠাৎ বলল, ফিজিয়ো হতে। কোর্স করতে বলল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ততদিনে স্নাতক হয়ে গিয়েছি। তখন বাংলা সাহিত্য নিয়ে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করছিলাম। খবর নিয়ে জানলাম, ফিজিয়ো কোর্স করতে গেলে বিজ্ঞানের ডিগ্রি থাকতে হবে। ফলে আটকে গেলাম। তখনই ম্যাসিয়োরের কোর্সের কথা জানতে পারি। ম্যাসিয়োরের ক্ষেত্রে মাধ্যমিক পর্যন্ত সায়েন্স থাকলেই হবে। তখন সেই কোর্স করলাম।’’
পড়ার পর আর বসে থাকতে হয়নি অতনুকে। ক্রিকেটারেরা যেমন পর্যায়ক্রমে জাতীয় দলে সুযোগ পান, অতনুও ঠিক সে ভাবেই নিউ জ়িল্যান্ডের জাতীয় দলে। অতনু বললেন, ‘‘কালীঘাট ক্লাবের বাবলু কোলে ওঁদের ক্লাবে কাজ করার প্রস্তাব দেন। সেই শুরু। তার পর ইডেনে কর্নাটক খেলতে এসেছিল। ওদের একজন ম্যাসিয়োর লাগত। রবিন উথাপ্পা যোগাযোগ করেছিল লক্ষ্মীদার সঙ্গে। উনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন। কাজ করতে শুরু করি। আমার কাজ কর্নাটক দলের ভাল লেগে যায়। পাকাপাকি ভাবে ওদের সঙ্গে থাকার প্রস্তাব দেয়।’’
লোকেশ রাহুল, প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ, দেবদত্ত পাড়িক্কলদের একাধিক সাফল্যে অবদান রয়েছে অতনুর। রঞ্জি ট্রফি, বিজয় হজারে ট্রফি এবং ইরানি কাপ জয়ী কর্নাটক দলের সাজঘরে তিনি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। ২০১৭ সাল পর্যন্ত কর্নাটকের সঙ্গে কাজ করার পর ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) নজরে পড়ে যান। কাজ করার সুযোগ পান ভারত ‘এ’ দল, অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সঙ্গে। বছর তিনেক বোর্ডের সঙ্গে কাজ করার পর অতনু পা রাখেন আইপিএলে। ২০২০ সালে যুক্ত হন কলকাতা নাইট রাইডার্সের সঙ্গে।
কী ভাবে সুযোগ পেলেন কেকেআরে? অতনু বললেন, ‘‘তখন কেকেআর ম্যাসিয়োর চাইছিল। লক্ষ্মীদা আর বাংলার ফিজিয়ো বিকাশ কুন্ডু যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিল। কেকেআরের সঙ্গে কাজ করার সময় টিম সাউদি এবং লকি ফার্গুসনের সঙ্গে পরিচয়। আমার কাজ ওদের পছন্দ হয়েছিল। ২০২৩ বিশ্বকাপের সময় ওদের মাধ্যমেই নিউ জ়িল্যান্ড দলের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাই। সেই থেকে চলছে। ওরা ভারতে এলেই আমায় ডাকে।’’
(বাঁ দিকে) লক্ষ্মীরতন শুক্ল এবং অতনু ঘোষ (ডান দিকে)। ছবি: সংগৃহীত
চার বছর ধরে নিউ জ়িল্যান্ডের সঙ্গে কাজ করছেন। অভিজ্ঞতা কেমন আপনার? অতনুকে বেশ উচ্ছ্বসিত শোনাল। বললেন, ‘‘দারুণ অভিজ্ঞতা। অনেক দিন ধরেই এই দলটা আমার পরিচিত। এক দিনের বিশ্বকাপের সময়ও ওদের সঙ্গে ছিলাম। সেমিফাইনালে পৌঁছেছিল নিউ জ়িল্যান্ড। ভারতের কাছে হেরে গিয়েছিল। খারাপ লেগেছিল। তার পর টেস্ট সিরিজ়ে হোয়াইট ওয়াশ। খুব ভাল লেগেছিল। তবে এ বার ফাইনালে ওঠাটা সেরা পারফরম্যান্স। জিতলে তো কথাই নেই। সেরা সাফল্য হবে আমার এবং দলের।’’ কিন্তু তা হলে তো ভারতকে হারতে হবে? অতনুর বক্তব্য, ‘‘নিজের দেশকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হলে একটু তো খারাপ লাগবেই। তবে ভাল লাগবে অনেক বেশি। এই দলটাই তো আমায় পরিচিতি, প্রতিষ্ঠা দিয়েছে।’’
নিউ জ়িল্যান্ড দলটার সাফল্যের রহস্য বলতে গিয়ে অতনু বললেন, ‘‘এই দলে কোনও তারকা নেই। বড় প্রতিভা নেই। তা-ও সফল। কারণ এদের উপর চাপ নেই। সবাই ফুরফুরে মেজাজে থাকে। দলের একমাত্র ম্যাসিয়োর আমি। আধুনিক ক্রিকেটে ম্যাসিয়োর খুব গুরুত্বপূর্ণ। তা-ও আমার কোনও চাপ নেই। আগামী কাল বিশ্বকাপ ফাইনাল। অথচ গত কাল কেউ অনুশীলনই করেনি। সকলে মিলে গল্ফ খেলতে চলে গিয়েছিল। ভারতীয় দলের সঙ্গে এটাই মূল পার্থক্য। ভারতীয় দলের সকলের উপর প্রচুর চাপ থাকে। অনেক সময় ক্রিকেটারেরা চাপ নিয়েও ফেলেন। ভারতের মতো ক্রিকেট-পাগল দেশে সেটাই স্বাভাবিক। এখানে ও সব নেই। সবাই খোলামনে মাঠে নেমে খেলে।’’ কিউয়িদের ফাইনালে ওঠার কারণ হিসাবে আরও একটা কথা বললেন অতনু, ‘‘এরা ধরে ধরে পরিকল্পনা করে। প্রত্যেক দল, প্রত্যেক ক্রিকেটারের জন্য ছক তৈরি থাকে। আমি অবশ্য সে সবের অংশ নই। পরিকল্পনা নিয়ে আমার পক্ষে কিছু বলা সম্ভব নয়।’’
জয়প্রীত বুমরাহ-শুভমন গিলদের সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছে করে না আপনার? অতনু এ বার ডিফেন্স করলেন, ‘‘আমি খুব চাপের মধ্যে কাজ করতে পারি না। চাপ ব্যাপারটা আমার পছন্দও নয়। ভারতীয় দলের হয়ে কাজ করতে হলে প্রচুর চাপ নিতে হয়। তা ছাড়া, ভারতীয় দলের সব আছে। বুমরাহ-সূর্যদের সঙ্গে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা অনেক বেশি যোগ্য। অনেক বেশি অভিজ্ঞ। আমি এখনও সেই জায়গায় পৌঁছোতে পারিনি। তাই ভারতীয় দলের কাজ করার কথা ভাবি না। হয়তো ভবিষ্যতে কখনও সুযোগ পাব। এটা নিয়ে আমি খুব একটা চিন্তিত নই।’’
অতনু নিজে না ভাবলেও বাংলার কোচ তাঁকে নিয়ে আশাবাদী। লক্ষ্মী বললেন, ‘‘অতনু অত্যন্ত যোগ্য ম্যাসিয়োর। যখন যে দলের সঙ্গে কাজ করে, তখন একদম সেই দলের হয়ে যায়। নিজের ১০০ শতাংশ দিয়ে দেয়। ভীষণ পেশাদার। প্রতিটা সুযোগ সাফল্যের সঙ্গে কাজে লাগিয়েছে।’’
কিউয়ি ক্রিকেটারদের মধ্যে অতনুর প্রিয় বন্ধু ড্যারেল মিচেল। যিনি আবার ভারতীয় দলের অন্যতম প্রধান কাঁটা। মাঝেমধ্যেই অতনুকে নিয়ে নৈশভোজ করতে যান মিচেল। খাওয়ার সঙ্গে চলে দেদার আড্ডা। কাজের বাইরে অনেকটা সময় মিচেলের সঙ্গেই কাটান অতনু। বাড়িতে বাবা-মা, স্ত্রী-মেয়ে, ভাই রয়েছেন। নিউ জ়িল্যান্ড দলটাও এখন অতনুর পরিবার হয়ে গিয়েছে।
দয়ানন্দ গরানির কথা বাংলার ক্রিকেটপ্রেমীরা জানেন। কোলাঘাটের বাসিন্দা দীর্ঘ দিন ভারতীয় ক্রিকেট দলের সঙ্গে থ্রোডাউন বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেছেন। আইপিএলের একাধিক দলের সঙ্গেও কাজ করেছেন। যেমন মুর্শিদাবাদের সচিন মণ্ডল এখন ভারতীয় মহিলা দলের থ্রোডাউন বিশেষজ্ঞ। মশাটের অতনুও তেমন। তিনি শুধু বিশ্বকাপ ফাইনালে ভারতের প্রতিপক্ষ শিবিরে!