জ়িম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে অর্ধশতরানের পর অভিষেক শর্মা। ছবি: পিটিআই।
চেন্নাইয়ে জ়িম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে নামার আগেই সুখবর পেয়ে গিয়েছিল ভারত। দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ় হারায় আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল সূর্যকুমার যাদবদের। মাঠে সেই ছবিটা দেখা গেল। ব্যাটে-বলে জ়িম্বাবোয়েকে সহজেই হারাল ভারত। ৭২ রানে জিতে সেমিফাইনালের লড়াইয়ে প্রবল ভাবে রইলেন সূর্যেরা। রবিবার কলকাতার ইডেনে ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ় মুখোমুখি। সেটাই কার্যত কোয়ার্টার ফাইনাল। যে দল জিতবে, সেই দল জায়গা করে নেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে।
একটি বদল যে দলের ছবিটা বদলে দিতে পারে সেটা বৃহস্পতিবার চিপক স্টেডিয়ামে দেখা গেল। সমস্যায় থাকা টপ অর্ডারে ফেরানো হল সঞ্জু স্যামসনকে। অভিষেক শর্মার সঙ্গে ওপেন করলেন তিনি। চলতি বিশ্বকাপে প্রথম বার ওপেনিং জুটিতে রান এল। সেই শুরুই ভারতের জয়ের ভিত গড়ে দিল। যত সময় গড়াল, তত ম্যাচের দখল নিলেন সূর্যেরা।
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
সঞ্জু থাকায় ওপেনিং জুটিতে ডানহাতি-বাঁহাতি ব্যাটারের সুবিধা পেল ভারত। সেই কারণেই হয়তো প্রথম ওভারে বল করতে এলেন না অফ স্পিনার সিকন্দর রাজা। সেখানেই ভুল করলেন তিনি। পেসারদের বলের গতি কাজে লাগিয়ে দ্রুত রান তোলা শুরু করলেন সঞ্জু। তিনি থাকায় শুরুতে কিছুটা সময় নিলেন অভিষেক। ১৫ বলে ২৪ রান করে সঞ্জু আউট হলেও ভারতকে ভাল শুরু দিয়ে দেন তিনি। চার ওভারের মধ্যে ৫০ পার হয়ে যায় দলের।
চলতি বিশ্বকাপে এই প্রথম বার ছন্দে দেখাল অভিষেককে। পাওয়ার প্লে কাজে লাগালেন। তার পরেও ফিল্ডিংয়ের ফাঁক খুঁজে মারলেন। ২৬ বলে অর্ধশতরান করলেন। তবে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে এটি অভিষেকের দ্বিতীয় মন্থরতম অর্ধশতরান। ৩০ বলে ৫৫ রান করে আউট হলেন অভিষেক। চারটি চার ও চারটি ছক্কা মারলেন তিনি। রানে ফিরলেও এখনও সেই পুরনো অভিষেককে দেখা গেল না। বেশ কয়েকটি শট মারতে গিয়ে বলে ব্যাট ছোঁয়াতে পারলেন না। বোঝা গেল, এখনও একটু চাপ রয়েছে। তবে এই ইনিংসের পর তাঁর থেকেও বেশি স্বস্তি পাবেন গৌতম গম্ভীর।
এই ম্যাচে ভারতের প্রত্যেক ব্যাটার রান করলেন। আর তা-ও বেশ গ্রুত গতিতে। ঈশান কিশন ২৪ বলে ৩৮ ও অধিনায়ক সূর্যকুমার ১৩ বলে ৩৩ রান করলেন। তবে ভারতের রানকে ২৫০ পার করাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করলেন হার্দিক পাণ্ড্য ও তিলক বর্মা। তিন নম্বরে রান পাচ্ছিলেন না তিলক। তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁকে ইনিংসে ধরে খেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ছ’নম্বরে নেমে সেই কাজ করতে হল না তাঁকে। প্রথম বল থেকে হাত খোলার সুযোগ পেলেন।
হার্দিক ও তিলকের মধ্যে ৩১ বলে ৮৪ রানের জুটি হল। ইনিংসের শেষ দুই বলে জোড়া ছক্কা মেরে ২৩ বলে অর্ধশতরান পূরণ করলেন হার্দিক। তিলক ১৬ বলে ৪৪ রান করে অপরাজিত থাকলেন। ভারত ২০ ওভার শেষে ৪ উইকেট হারিয়ে করল ২৫৬ রান। চলতি বিশ্বকাপে এটি সর্বাধিক রান। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় সর্বাধিক রান। কুড়ি-বিশের ক্রিকেটে এটি ভারতেরও সর্বাধিক রান। এর আগে ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২১৮ রান করেছিল ভারত। সেই ম্যাচে ছয় বলে ছয় ছক্কা মেরেছিলেন যুবরাজ সিংহ। সেই রেকর্ড ১৯ বছর পর ভাঙল।
২৫৭ রান তাড়া করা যে জ়িম্বাবোয়ের পক্ষে প্রায় অসম্ভব তা বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু দেখার ছিল যে, জ়িম্বাবোয়ে রান তাড়ার শুরু কী ভাবে করে। জ়িম্বাবোয়ে শুরুটা মন্থর করল। পাওয়ার প্লে কাজে লাগাতে পারল না তারা। ফলে প্রথম ছয় ওভারে উইকেট না পড়লেও সেখানেই লড়াই থেকে হারিয়ে গেল তারা। তবে উইকেট পড়তে পারত। পাওয়ার প্লে-র শেষ ওভারে বরুণ চক্রবর্তীর বলে ক্যাচ তুলেছিলেন তাদিওয়ানাশে মারুমানি। পিছন দিকে অনেকটা দৌড়ে ঠিক জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিলেন রিঙ্কু সিংহ। কিন্তু ক্যাচ ফস্কালেন তিনি। চলতি বিশ্বকাপে এর থেকে অনেক কঠিন ক্যাচ ধরেছেন তিনি। দল থেকে বাদ পড়ায় কি কিছুটা হতাশ হয়ে পড়েছে রিঙ্কু? সেই কারণেই এই ভুল করলেন তিনি।
জ়িম্বাবোয়েকে প্রথম ধাক্কা দিলেন অক্ষর পটেল। স্পেলের দ্বিতীয় বলেই মারুমানিকে ২০ রানের মাথায় আউট করলেন তিনি। অক্ষর আরও এক বার বুঝিয়ে দিলেন, আগের ম্যাচে তাঁকে বাইরে রেখে কতটা ভুল করেছিলেন গম্ভীরেরা।
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
প্রতি ওভারের পর জরুরি রানরেট আরও বেড়ে যাচ্ছিল। বড় শট মারা ছাড়া উপায় ছিল না জ়িম্বাবোয়ের। ব্রায়ান বেনেট চেষ্টা করছিলেন। অক্ষরের এক ওভারে ১৯ রান করেন তিনি। কিন্তু তিনি একাই মারলে কী হবে? ডিয়ন মেয়ার্সকে ৬ রানের মাথায় আউট করেন বরুণ। বেনেটের সঙ্গে মিলে লড়াই চালান অধিনায়ক সিকন্দর। ভারতের পেসারদের নিশানা করেন তাঁরা। ৩৪ বলে অর্ধশতরান করেন বেনেট। চলতি বিশ্বকাপে এটি তাঁর তৃতীয় অর্ধশতরান।
পাঁচ বোলার থাকার পরেও শিবম দুবের হাতে বল তুলে দেন সূর্য। ওভার শেষ করতে ১০ বল করতে হয় তাঁকে। শিবমের সেই ওভারে ২৬ রান নেন বেনেট। কোনও দরকার ছিল না শিবমকে বল দেওয়ার। নইলে ভারতের জয়ের ব্যবধান আরও বেশি হত। কেন যে সূর্য এই সিদ্ধান্ত নিলেন তিনিই জানেন। আবার ইনিংসের শেষ ওভারেও বল করেন শিবম। দুই ওভারে ৪৬ রান দিলেন তিনি। শিবম বল না করলে ভারতের জয়ের ব্যবধান অন্তত ৩০ রান বেশি হত।
জয় প্রায় অসম্ভব হলেও লড়াই ছাড়েননি বেনেট ও সিকন্দর। প্রতি বলে বড় শট মারার চেষ্টা করছিলেন। ভারত ম্যাচ জিতলেও সূর্যের একটি চিন্তা থেকেই গেল। যে ভাবে বুমরাহ, বরুণদের বিরুদ্ধে জ়িম্বাবোয়ের ব্যাটারেরা বড় শট খেললেন, তাতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে নামার আগে কিছুটা চিন্তায় থাকবেন ভারতীয় বোলারেরা।
জুটি ভাঙলেন অর্শদীপ সিংহ। সিকন্দরকে ৩১ রানের মাথায় আউট করলেন তিনি। সেই ওভারেই শূন্য রানে ফেরালেন রায়ান বার্লকে। বেনেট শতরানের দিকে এগোচ্ছিলেন। ভারতের বোলিং আক্রমণ তাঁকে সমস্যায় ফেলতে পারেনি। তবে শেষ পর্যন্ত শতরান করতে পারলেন না তিনি। ৬ উইকেট হারিয়ে ১৮৪ রানে শেষ হল জ়িম্বাবোয়ের ইনিংস। ৯৭ রানে অপরাজিত থাকলেন বেনেট।