কলকাতা প্রিমিয়ার লিগ

ক্রোমাদের ধাক্কায় লিগের স্বপ্ন প্রায় শেষ লাল-হলুদে

ম্যাচের ছয় মিনিটে কোস্টা রিকার হয়ে রাশিয়া বিশ্বকাপে খেলা লাল-হলুদ ডিফেন্ডার জনি আকোস্তাকে ইনসাইড ডজে ছিটকে দিয়ে গোল করেই গ্যালারির দিকে দৌড়ন ক্রোমা। উত্তেজনায় চিৎকার করছিলেন।

Advertisement

শুভজিৎ মজুমদার

শেষ আপডেট: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ০৪:৪৪
Share:

বিধ্বস্ত: ইস্টবেঙ্গল ফুটবলারদের ক্রোমার (বাঁ দিকে) সান্ত্বনা। ছবি: সুদীপ্ত ভৌমিক

ইস্টবেঙ্গলে টানা ন’বার কলকাতা প্রিমিয়ার লিগ জয়ের স্বপ্নভঙ্গ হওয়ার আতঙ্কের বিকেলে নাটকীয় প্রত্যাবর্তন কলকাতা ময়দানের দুই উপেক্ষিত ফুটবলার ও এক কোচের!

Advertisement

আনসুমানা ক্রোমা— গত মরসুমে মোহনবাগানের হয়ে কলকাতা প্রিমিয়ার লিগে দুর্দান্ত খেলেছিলেন তিনি। কিন্তু আই লিগের আগেই তাঁকে ছেঁটে ফেলেছিলেন সবুজ-মেরুন কর্তারা। আই লিগ চলাকালীন যোগ দেন লাল-হলুদ শিবিরে। কিন্তু নতুন মরসুমে তাঁকে রাখেনি ইস্টবেঙ্গল। সেই ক্রোমা পিয়ারলেসের জার্সি গায়ে এ বার দুই প্রধানের বিরুদ্ধেই গোল করলেন।

ম্যাচের ছয় মিনিটে কোস্টা রিকার হয়ে রাশিয়া বিশ্বকাপে খেলা লাল-হলুদ ডিফেন্ডার জনি আকোস্তাকে ইনসাইড ডজে ছিটকে দিয়ে গোল করেই গ্যালারির দিকে দৌড়ন ক্রোমা। উত্তেজনায় চিৎকার করছিলেন। যদিও ২৮ মিনিটে ঊরুর পেশিতে চোট পাওয়ায় মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। বাকি সময় সাইডলাইনের ধারে দাঁড়িয়ে উজ্জীবিত করে গেলেন সতীর্থদের। খেলা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রোমা খোঁড়াতে খোঁড়াতে ঢুকে পড়লেন মাঠে। বলছিলেন, ‘‘দুই প্রধানের বিরুদ্ধে নিজেকে প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম। সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। তবে আজ বেশি আনন্দ হচ্ছে।’’ বিপক্ষে বিশ্বকাপার ছিল বলে কি? শাহরুখ খানের ভক্তের জবাব, ‘‘মোহনবাগানের বিরুদ্ধে গোল করলেও জিততে পারিনি। এ বার জিতলাম।’’ তার পরেই ক্রোমার হুঙ্কার, ‘‘মাঠে সবাই সমান। কে বিশ্বকাপে খেলেছে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি কাউকে ভয় পাই না।’’

Advertisement

ইস্টবেঙ্গল ১ পিয়ারলেস ২

নরহরি শ্রেষ্ঠ— ইস্টবেঙ্গলের যুব দলে খেলতে খেলতেই সুযোগ পান সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের এলিট অ্যাকাডেমিতে। তার পরে যোগ দেন সালগাওকর ও ডিএসকে শিবাজিয়ান্স এফসি-তে। গত মরসুমে সই করেছিলেন মোহনবাগানে। কিন্তু অধিকাংশ সময় মাঠের বাইরেই কাটিয়েছেন। ক্রোমার মতো তিনিও নিজেকে প্রমাণ করার লক্ষ্য নিয়ে এই মরসুমে সই করেন পিয়ারলেসে। কাকতালীয় ভাবে বৃহস্পতিবার ক্রোমার পরিবর্তেই নরহরিকে নামান পিয়ারলেস কোচ বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য। ৭৮ মিনিটে ডান পায়ের দূরপাল্লার শটে গোল করে নরহরি কলকাতা লিগের ছবিটাই বদলে দিলেন। কারণ, তার ছ’মিনিট আগেই কাশিম আইদারার গোলে সমতা ফেরায় ইস্টবেঙ্গল। জয়ের জন্য মরিয়া মহম্মদ আল আমনারা যখন আক্রমণের ঝড় তুলেছেন, তখনই গতির বিরুদ্ধে গোল করে পিয়ারলেসকে এগিয়ে দেন নরহরি। ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার হাতে নিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘‘মরসুম শুরু হওয়ার আগে প্রচুর পরিশ্রম করেছি। নিজেকে বলতাম, প্রমাণ করার এটাই শেষ সুযোগ।’’

নরহরির ধাক্কাতেই ৪৬ ম্যাচ ও ১৪৮৮ দিন পরে কলকাতা লিগে হারের যন্ত্রণা ফিরল লাল-হলুদ শিবিরে। সেই সঙ্গে ফিরল খেতাব হাতছাড়া হওয়ার আতঙ্ক ও অসন্তোষ। লিগের প্রথম ম্যাচ থেকেই বিদেশি স্ট্রাইকারের অভাব বোঝা গিয়েছে। এ দিনও পিয়ারলেসের বিরুদ্ধে প্রথমার্ধে অন্তত চার গোলে এগিয়ে যেতে পারত ইস্টবেঙ্গল। কিন্তু একা জবি জাস্টিনই অবিশ্বাস্য ভাবে তিনটি গোল নষ্ট করেন। ক্ষুব্ধ সমর্থকদের প্রশ্ন, ‘‘কলকাতা লিগের কি কোনও গুরুত্ব নেই নতুন বিনিয়োগকারী সংস্থার কর্তাদের কাছে? নাকি বিদেশি স্ট্রাইকারের প্রয়োজন তাঁরা অনুভব করছেন না?’’ তাঁরা আরও বলেন, ‘‘প্রথম ম্যাচ থেকেই বিদেশি স্ট্রাইকারের অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অথচ, ন’টা ম্যাচ হয়ে যাওয়ার পরেও কাউকে সই করানো হল না। আগামী বছর ক্লাবের শতবর্ষ। এ বছর চ্যাম্পিয়ন হলে দশে দশ করার সুযোগ থাকত। এখন সব আশাই শেষ।’’

এই মুহূর্তে ন’ম্যাচে ২৩ পয়েন্ট নিয়ে লিগ টেবলের শীর্ষে মোহনবাগান। সমসংখ্যক ম্যাচ খেলে ইস্টবেঙ্গলের পয়েন্ট ২০। দুই প্রধানেরই বাকি দু’টো করে ম্যাচ। আমনারা শেষ দু’টো ম্যাচ জিতলে ২৬ পয়েন্ট নিয়ে লিগ শেষ করবেন। মোহনবাগানের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য দরকার ন্যূনতম চার পয়েন্ট। অর্থাৎ, একটি জয় ও একটি ড্র হলেই ন’বছর পরে শাপমুক্তি ঘটবে সবুজ-মেরুন শিবিরে। যদিও লাল-হলুদ কোচ বাস্তব রায় বলছেন, ‘‘চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আশা ক্ষীণ হলেও একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। দেখা যাক কী হয়।’’ সতর্ক সবুজ-মেরুন কোচ শঙ্করলাল চক্রবর্তীও। তিনি বলেন, ‘‘আমরা একটু সুবিধেজনক জায়গায় পৌঁছলাম। উচ্ছ্বসিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। কাস্টমসের বিরুদ্ধে পরের ম্যাচটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’’

বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য— তাঁর কোচিংয়েই বছর তিনেক আগে কলকাতা প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। কিন্তু আই লিগের মাঝপথে সরিয়ে দেওয়া হয় তাঁকে। তাঁর কোচিংয়ে ২০০৯ মরসুমে কলকাতা লিগ জিতেছিল মোহনবাগান। কিন্তু সব জায়গাতেই উপেক্ষিত হয়েছেন। এই মরসুমে তাঁর মগজাস্ত্রেই ঘায়েল তিন প্রধান। মোহনবাগানকে আটকেছেন। হারিয়েছেন ইস্টবেঙ্গল ও মহমেডানকে। অভিমানী বিশ্বজিৎ বললেন, ‘‘আমি তো নাকি কোচিং করাতেই পারি না।’’

ইস্টবেঙ্গল: রক্ষিত ডাগার, সামাদ আলি মল্লিক, মেহতাব সিংহ, জনি আকোস্তা, লালরাম চুলোভা (কমলপ্রীত সিংহ), লালডানমাওয়াইয়া রালতে, কাশিম আইদারা, মহম্মদ আল আমনা, লালরিনডিকা রালতে (বালি গগনদীপ সিংহ), ব্রেন্ডন ভানলালরেমডিকা রালতে (সুরাবুদ্দিন মল্লিক) ও জবি জাস্টিন।

পিয়ারলেস: সন্দীপ পাল, অভিনব বাগ, চিকা ওয়ালি, দলরাজ সিংহ, হীরা মণ্ডল, নুরউদ্দিন (লক্ষ্মীকান্ত মাণ্ডি), শাহরুখ রহমান, দীপঙ্কর দাস, রহিম নবি, আনসুমানা ক্রোমা (নরহরি শ্রেষ্ঠ) ও অ্যান্টনি উলফ।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
Advertisement
Advertisement
আরও পড়ুন